আজ শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২৮ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ২৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৮৮%

গৃহিণী থেকে মানবসেবায়: সুবিধাবঞ্চিতদের কল্যাণে কাজ করছেন সিদরাতুল মুনতাহা

  • MIT ERP
  • Update Time : 11:06:13 pm, Saturday, 12 September 2026
  • 9

গৃহিণী থেকে মানবসেবায়: সুবিধাবঞ্চিতদের কল্যাণে কাজ করছেন সিদরাতুল মুনতাহা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

স্বপ্ন সবাই দেখলেও মানুষের কল্যাণে তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার মানুষ কমই থাকে। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার উপকরণ দেওয়া এবং দেশকে সবুজে সাজানোর স্বপ্ন নিয়ে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন নারী সিদরাতুল মুনতাহা।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন গৃহিণী। তবে নিজেকে কেবল সংসারের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। গৃহিণীর পরিচয়ের বাইরে মানবিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন একজন স্বপ্নবাজ নারী। সিদরাতুল মুনতাহার স্বামী আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী বাংলাদেশ পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি। এর আগে তিনি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

স্বামীর কর্মসূত্রে পুলিশের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা তৈরি হলেও মানুষের জন্য কিছু করার মানসিকতা তার মধ্যে গড়ে উঠেছিল আরও আগে থেকেই। ছোটবেলা থেকেই মানুষের উপকার করার প্রতি তার আগ্রহ ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই আগ্রহ পরিণত হয়েছে সামাজিক দায়বদ্ধতায়। পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি ‘পুনাক’ বাংলাদেশ পুলিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংগঠন।

পুলিশ পরিবারের নারীদের সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি বিভিন্ন মানবিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে সিদরাতুল মুনতাহা চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুনাকের উপদেষ্টা এবং কেন্দ্রীয় পুনাক, ঢাকার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই দায়িত্বকে তিনি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক পদ হিসেবে দেখেন না; বরং মানুষের জন্য কাজ করার একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

সরকারের বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া, দরিদ্র ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষার উপকরণ বিতরণ, বিভিন্ন পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদানসহ নানা কর্মসূচিতে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষার উপকরণ তুলে দেওয়ার সময় তার চোখে থাকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

তার বিশ্বাস, একটি কলম, একটি খাতা কিংবা একটি বই হয়তো কোনো সুবিধাবঞ্চিত শিশুর জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। শুধু শিক্ষার্থী বা দরিদ্র মানুষের কল্যাণেই নয়, পরিবেশ রক্ষায়ও তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি সবুজ বাংলাদেশের স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখছেন। তার কাছে বৃক্ষরোপণ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশ রেখে যাওয়ার সামাজিক দায়িত্ব।

সিদরাতুল মুনতাহার কর্মকাণ্ডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংস্কৃতিচর্চা। পুলিশ সদস্যদের কর্মজীবন সাধারণত দায়িত্ব, কর্তব্য, শৃঙ্খলা ও ঝুঁকির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর পাশাপাশি তাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক চেতনা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানোও প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাই পুলিশ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সংস্কৃতির চর্চা ছড়িয়ে দিতে তিনি বিভিন্নভাবে কাজ করছেন।

তার উদ্যোগ ও অংশগ্রহণে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অনেকের আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে। এর আগে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের পুনাকের সভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময়ও সিদরাতুল মুনতাহা বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। সে সময় দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে রিকশা বিতরণ, খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা ও বাস্তবায়নে তার ভূমিকা প্রশংসিত হয়।

এসব কর্মকাণ্ডে তিনি কেবল সামনে থেকে নেতৃত্ব দেননি; বরং মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে কর্মসূচির ধরন নির্ধারণে সচেষ্ট ছিলেন। সেখানকার দু-একটি বিষয় এখনো মানুষের মুখে মুখে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, পথশিশু ও ভবঘুরে ব্যক্তিকে রাস্তা থেকে এনে বিভিন্ন সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় দেওয়া এবং তাদের পুনর্বাসন করার ব্যবস্থা করা। একটি ঘটনা এখনো কেউ ভুলতে পারেননি।

আরেকটি হলো, এক পাগলী মেয়ে গর্ভবতী অবস্থায় রাস্তায় ঘোরাঘুরি করছিল। এরপর তিনি তাকে সেখান থেকে বাগবাড়ি খুকুমণি নিবাসে নিয়ে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। সেখানে তিনি সন্তান প্রসব করেন। এ ছাড়া জাকারিয়া নামের এক যুবককে রাস্তা থেকে নিয়ে শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে হস্তান্তর করেন। এ রকম অসংখ্য সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে তিনি আলোচিত। এ ছাড়া সিলেটে আরও একটি ঘটনা সবার দৃষ্টিগোচর হয়েছে।

আর সেটি হলো, এক যুবতী মেয়েকে বিবাহের ব্যবস্থা করে দেওয়া। সবাই অবগত যে সমাজসেবার অধীনে পুনর্বাসন কেন্দ্রে যারা অবস্থান করে, তাদের বয়স ১৮ বছর হলে সেখানে আর রাখা হয় না। এমনই এক মেয়ের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর সিদরাতুল মুনতাহার নেতৃত্বে অর্থায়নের ব্যবস্থা করে এবং সমাজসেবা অফিসের তত্ত্বাবধানে ওই মেয়েকে বিয়ে দেওয়া হয়। এই বিবাহ অনুষ্ঠানে শ্রম, প্রবাসীকল্যাণ এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

আমরা সবাই জানি, একজন পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী হিসেবে সামাজিক পরিচিতি পাওয়া তার জন্য কঠিন ছিল না। কিন্তু তিনি সেই পরিচয়কে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং স্বামীর দায়িত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত সামাজিক পরিসরকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন। তার কর্মকাণ্ডে বারবার উঠে এসেছে একটি বিষয়— মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ।

সিদরাতুল মুনতাহার এই পথচলায় কোনো বড় পদ বা পরিচিতি মুখ্য নয়; মুখ্য হলো কাজ। একজন গৃহিণী হয়েও তিনি দেখিয়ে দিচ্ছেন, সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সমাজের জন্যও কাজ করা সম্ভব। তার কাছে নারী মানে শুধু ঘর সামলানো নয়; নারী চাইলে নিজের সামর্থ্য, মমতা ও মানবিকতা কাজে লাগিয়ে সমাজের পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখতে পারেন। তার স্বপ্নের পরিধিও তাই ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

দরিদ্র শিশুর হাতে শিক্ষার উপকরণ তুলে দেওয়া থেকে শুরু করে অসহায় মানুষের জীবনযাত্রায় সহায়তা করা, পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণ কিংবা পুলিশ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সাংস্কৃতিক চেতনা বিকশিত করা— সবকিছুর মধ্যেই তিনি খুঁজে নেন মানবিকতার স্পর্শ। সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে নীরবে কাজ করে যান। তাদের কর্মকাণ্ড হয়তো সব সময় বড় শিরোনাম হয় না, কিন্তু মানুষের জীবনে তার প্রভাব থেকে যায় দীর্ঘদিন।

সিদরাতুল মুনতাহাও তেমনই একজন। মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেই তিনি নিজের আনন্দ খুঁজে পান। তার কাছে মানুষের পাশে দাঁড়ানো কোনো দায়িত্বের বোঝা নয়; বরং এটি তার স্বপ্নের অংশ। একজন গৃহিণী থেকে সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় এক স্বপ্নবাজ নারী হয়ে ওঠার এই যাত্রা নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার। তার কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো পুরস্কার বা স্বীকৃতি নয়; বরং একজন অসহায় মানুষের মুখের হাসি, কোনো দরিদ্র শিক্ষার্থীর চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন কিংবা একটি নতুন গাছের ছায়ায় বেড়ে ওঠা আগামী প্রজন্ম।

সিদরাতুল মুনতাহা সেই স্বপ্নই দেখছেন— মানুষের জন্য, সমাজের জন্য এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য। আর সেই স্বপ্ন পূরণের পথে তিনি এগিয়ে চলেছেন নিজের মতো করে, নীরবে, নিরলসভাবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

নাসির গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা শিল্পপতি নাসির উদ্দিন বিশ্বাসের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

গৃহিণী থেকে মানবসেবায়: সুবিধাবঞ্চিতদের কল্যাণে কাজ করছেন সিদরাতুল মুনতাহা

Update Time : 11:06:13 pm, Saturday, 12 September 2026

স্বপ্ন সবাই দেখলেও মানুষের কল্যাণে তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার মানুষ কমই থাকে। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার উপকরণ দেওয়া এবং দেশকে সবুজে সাজানোর স্বপ্ন নিয়ে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন নারী সিদরাতুল মুনতাহা।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন গৃহিণী। তবে নিজেকে কেবল সংসারের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। গৃহিণীর পরিচয়ের বাইরে মানবিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন একজন স্বপ্নবাজ নারী। সিদরাতুল মুনতাহার স্বামী আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী বাংলাদেশ পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি। এর আগে তিনি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

স্বামীর কর্মসূত্রে পুলিশের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা তৈরি হলেও মানুষের জন্য কিছু করার মানসিকতা তার মধ্যে গড়ে উঠেছিল আরও আগে থেকেই। ছোটবেলা থেকেই মানুষের উপকার করার প্রতি তার আগ্রহ ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই আগ্রহ পরিণত হয়েছে সামাজিক দায়বদ্ধতায়। পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি ‘পুনাক’ বাংলাদেশ পুলিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংগঠন।

পুলিশ পরিবারের নারীদের সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি বিভিন্ন মানবিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে সিদরাতুল মুনতাহা চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুনাকের উপদেষ্টা এবং কেন্দ্রীয় পুনাক, ঢাকার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই দায়িত্বকে তিনি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক পদ হিসেবে দেখেন না; বরং মানুষের জন্য কাজ করার একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

সরকারের বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া, দরিদ্র ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষার উপকরণ বিতরণ, বিভিন্ন পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদানসহ নানা কর্মসূচিতে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষার উপকরণ তুলে দেওয়ার সময় তার চোখে থাকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

তার বিশ্বাস, একটি কলম, একটি খাতা কিংবা একটি বই হয়তো কোনো সুবিধাবঞ্চিত শিশুর জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। শুধু শিক্ষার্থী বা দরিদ্র মানুষের কল্যাণেই নয়, পরিবেশ রক্ষায়ও তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি সবুজ বাংলাদেশের স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখছেন। তার কাছে বৃক্ষরোপণ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশ রেখে যাওয়ার সামাজিক দায়িত্ব।

সিদরাতুল মুনতাহার কর্মকাণ্ডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংস্কৃতিচর্চা। পুলিশ সদস্যদের কর্মজীবন সাধারণত দায়িত্ব, কর্তব্য, শৃঙ্খলা ও ঝুঁকির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর পাশাপাশি তাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক চেতনা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানোও প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাই পুলিশ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সংস্কৃতির চর্চা ছড়িয়ে দিতে তিনি বিভিন্নভাবে কাজ করছেন।

তার উদ্যোগ ও অংশগ্রহণে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অনেকের আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে। এর আগে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের পুনাকের সভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময়ও সিদরাতুল মুনতাহা বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। সে সময় দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে রিকশা বিতরণ, খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা ও বাস্তবায়নে তার ভূমিকা প্রশংসিত হয়।

এসব কর্মকাণ্ডে তিনি কেবল সামনে থেকে নেতৃত্ব দেননি; বরং মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে কর্মসূচির ধরন নির্ধারণে সচেষ্ট ছিলেন। সেখানকার দু-একটি বিষয় এখনো মানুষের মুখে মুখে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, পথশিশু ও ভবঘুরে ব্যক্তিকে রাস্তা থেকে এনে বিভিন্ন সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় দেওয়া এবং তাদের পুনর্বাসন করার ব্যবস্থা করা। একটি ঘটনা এখনো কেউ ভুলতে পারেননি।

আরেকটি হলো, এক পাগলী মেয়ে গর্ভবতী অবস্থায় রাস্তায় ঘোরাঘুরি করছিল। এরপর তিনি তাকে সেখান থেকে বাগবাড়ি খুকুমণি নিবাসে নিয়ে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। সেখানে তিনি সন্তান প্রসব করেন। এ ছাড়া জাকারিয়া নামের এক যুবককে রাস্তা থেকে নিয়ে শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে হস্তান্তর করেন। এ রকম অসংখ্য সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে তিনি আলোচিত। এ ছাড়া সিলেটে আরও একটি ঘটনা সবার দৃষ্টিগোচর হয়েছে।

আর সেটি হলো, এক যুবতী মেয়েকে বিবাহের ব্যবস্থা করে দেওয়া। সবাই অবগত যে সমাজসেবার অধীনে পুনর্বাসন কেন্দ্রে যারা অবস্থান করে, তাদের বয়স ১৮ বছর হলে সেখানে আর রাখা হয় না। এমনই এক মেয়ের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর সিদরাতুল মুনতাহার নেতৃত্বে অর্থায়নের ব্যবস্থা করে এবং সমাজসেবা অফিসের তত্ত্বাবধানে ওই মেয়েকে বিয়ে দেওয়া হয়। এই বিবাহ অনুষ্ঠানে শ্রম, প্রবাসীকল্যাণ এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

আমরা সবাই জানি, একজন পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী হিসেবে সামাজিক পরিচিতি পাওয়া তার জন্য কঠিন ছিল না। কিন্তু তিনি সেই পরিচয়কে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং স্বামীর দায়িত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত সামাজিক পরিসরকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন। তার কর্মকাণ্ডে বারবার উঠে এসেছে একটি বিষয়— মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ।

সিদরাতুল মুনতাহার এই পথচলায় কোনো বড় পদ বা পরিচিতি মুখ্য নয়; মুখ্য হলো কাজ। একজন গৃহিণী হয়েও তিনি দেখিয়ে দিচ্ছেন, সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সমাজের জন্যও কাজ করা সম্ভব। তার কাছে নারী মানে শুধু ঘর সামলানো নয়; নারী চাইলে নিজের সামর্থ্য, মমতা ও মানবিকতা কাজে লাগিয়ে সমাজের পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখতে পারেন। তার স্বপ্নের পরিধিও তাই ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

দরিদ্র শিশুর হাতে শিক্ষার উপকরণ তুলে দেওয়া থেকে শুরু করে অসহায় মানুষের জীবনযাত্রায় সহায়তা করা, পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণ কিংবা পুলিশ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সাংস্কৃতিক চেতনা বিকশিত করা— সবকিছুর মধ্যেই তিনি খুঁজে নেন মানবিকতার স্পর্শ। সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে নীরবে কাজ করে যান। তাদের কর্মকাণ্ড হয়তো সব সময় বড় শিরোনাম হয় না, কিন্তু মানুষের জীবনে তার প্রভাব থেকে যায় দীর্ঘদিন।

সিদরাতুল মুনতাহাও তেমনই একজন। মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেই তিনি নিজের আনন্দ খুঁজে পান। তার কাছে মানুষের পাশে দাঁড়ানো কোনো দায়িত্বের বোঝা নয়; বরং এটি তার স্বপ্নের অংশ। একজন গৃহিণী থেকে সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় এক স্বপ্নবাজ নারী হয়ে ওঠার এই যাত্রা নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার। তার কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো পুরস্কার বা স্বীকৃতি নয়; বরং একজন অসহায় মানুষের মুখের হাসি, কোনো দরিদ্র শিক্ষার্থীর চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন কিংবা একটি নতুন গাছের ছায়ায় বেড়ে ওঠা আগামী প্রজন্ম।

সিদরাতুল মুনতাহা সেই স্বপ্নই দেখছেন— মানুষের জন্য, সমাজের জন্য এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য। আর সেই স্বপ্ন পূরণের পথে তিনি এগিয়ে চলেছেন নিজের মতো করে, নীরবে, নিরলসভাবে।