আজ সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২৯ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ০১ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৮°C
সর্বোচ্চ: ৩৩°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৭৪%

হ্যাক হচ্ছে মানুষের বিশ্বাস

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:50:20 pm, Saturday, 12 September 2026
  • 15

হ্যাক হচ্ছে মানুষের বিশ্বাস

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

ভিডিও স্ক্রিনে দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ। চেনা মুখ, চেনা কণ্ঠ, স্বাভাবিক ঠোঁটের নড়াচড়া— সবকিছুই অবিকল সত্যি। তিনি বিনিয়োগের পরামর্শ দিচ্ছেন, বলছেন একটি নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে টাকা রাখলে মিলবে ‘নিশ্চিত মুনাফা’। ভিডিওটি দেখে আপনার একবারও সন্দেহ হবে না যে এটি তার বক্তব্য নয়। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন— ভিডিওটি তিনি কখনো তৈরি করেননি, কথাগুলোও তার নয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি এই ডিপফেক ভিডিও এখন মানুষের চোখের দেখাকেও অবিশ্বাস্য করে তুলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত কয়েক সেকেন্ডের ছবি, ভিডিও কিংবা কণ্ঠস্বরই যথেষ্ট। সেগুলো ব্যবহার করে তৈরি করা যাচ্ছে এমন এক ‘ডিজিটাল মানুষ’, যিনি বাস্তবে কখনো ওই কথা বলেননি, ওই জায়গায় দাঁড়াননি, এমনকি ওই ঘটনাতেও ছিলেন না।

এই নকল পরিচয়কে সামনে রেখে প্রতারকরা ছড়াচ্ছে ভুয়া বিনিয়োগের প্রলোভন, ঋণ ও চাকরির ফাঁদ, চিকিৎসার নামে অর্থ আদায় এবং নানা ধরনের অনলাইন প্রতারণা। অর্থাৎ প্রতারণার কৌশল বদলে গেছে এখন শুধু টাকা নয়, মানুষের চোখ, কান এবং বিশ্বাসকেও হ্যাক করা হচ্ছে।

রূপালী বাংলাদেশের দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ডিপফেক ভিডিও ও ভয়েস ক্লোনিং কীভাবে প্রতারণার প্রচারণাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলছে, কারা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, কীভাবে একটি সাধারণ ছবি বা কণ্ঠস্বর হয়ে উঠছে প্রতারণার অস্ত্র এবং এই নকল পরিচয়ের আড়ালে কীভাবে গড়ে উঠছে নতুন এক ডিজিটাল অপরাধের অর্থনীতি। গভীর রাত। ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার ফোনে হঠাৎ কল আসে।

ওপাশ থেকে ভেসে আসে ছোট ভাইয়ের আতঙ্কিত ও কান্নাজড়িত কণ্ঠ। ‘ভাইয়া, আমি বড় দুর্ঘটনায় পড়েছি। হাসপাতালে আছি। এখনই ৫০ হাজার টাকা পাঠাও। ’ পেছনে শোনা যায় অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, মানুষের চিৎকার আর হাসপাতালের ব্যস্ততার শব্দ। কণ্ঠটি এতটাই পরিচিত যে এক মুহূর্তের জন্যও সন্দেহ হয়নি তার। ভাইয়ের সঙ্গেই কথা বলছেন এটাই ছিল তার বিশ্বাস।

জরুরি পরিস্থিতির কথা ভেবে নির্দেশিত নম্বরে ৫০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন তিনি। কিছুক্ষণ পর সন্দেহ হওয়ায় আসল ভাইয়ের নম্বরে ফোন করেন। ওপাশ থেকে ভাই জানায়, সে সম্পূর্ণ সুস্থ এবং বাসাতেই আছে; কোনো দুর্ঘটনাই ঘটেনি। তখনই বুঝতে পারেন, ফোনের ওপাশে ছিলেন না তার ভাই, ছিল তার কণ্ঠের একটি কৃত্রিম সংস্করণ। সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ভিডিও কিংবা ভয়েস মেসেজ থেকে সংগ্রহ করা অল্প সময়ের অডিও ব্যবহার করেও এখন বিশ্বাসযোগ্য ভয়েস ক্লোন তৈরি করা সম্ভব।

ফলে পরিচিত কণ্ঠস্বরও আর পরিচয়ের নিশ্চিত প্রমাণ নয়। কিন্তু কীভাবে কয়েক সেকেন্ডের একটি কণ্ঠস্বরকে এভাবে নকল করা সম্ভব হচ্ছে? গত মাসে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের ডিপফেক ভিডিও বানিয়ে যৌন শক্তিবর্ধক পণ্যের বিজ্ঞাপন বানায় একটি চক্র। সংবাদমাধ্যমে দেওয়া রেজাউল করিমের পুরোনো বক্তব্য প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবর্তন করে এই ভিডিও বানানো হয়।

ভিডিওতে দেখা যায়, সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম সংবাদমাধ্যমের সামনে বক্তব্য দিচ্ছেন। তার দুই পাশে বিভিন্ন ইসলামী দলের কয়েকজন নেতাও দাঁড়িয়ে আছেন। ভিডিওর নিচের দিকে ডান কোণে সময় টেলিভিশনের লোগো আংশিকভাবে দেখা যায়। ভিডিওতে চরমোনাই পীরকে একটি যৌন শক্তিবর্ধক পণ্যের বিষয়ে প্রচারণামূলক কথা বলতে শোনা যায়। পণ্যটি ব্যবহার করে নিজেও ইতিবাচক ফল পেয়েছেন বলে জানান তিনি।

ভিডিওর দৈর্ঘ্য মোট ২২ মিনিট হলেও প্রথম দুই মিনিটে তার বক্তব্যের অংশটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ২০ মিনিট একটি মিউজিক যুক্ত করে স্ক্রিন কালো করে রাখা। ভিডিওটির সঙ্গে বিজ্ঞাপনে একটি ওয়েবসাইটের লিংক দেখা যায়। লিংকে ক্লিক করলে ডেইলি স্টারের আদলে তৈরি একটি ওয়েবসাইট সামনে আসে, যেখানে পণ্যটির বিস্তারিত উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন আছে।

অর্থাৎ প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার নতুন মাত্রা হলো অপরাধীরা এখন শুধু মানুষের চেহারা বা কণ্ঠস্বর নয়, প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল পরিচয়ও নকল করতে পারছে। রূপালী বাংলাদেশের দীর্ঘ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভয়েস ক্লোন তৈরির প্রথম উপকরণ একটি মানুষের কণ্ঠস্বর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভিডিও, রিলস, ইউটিউব, টিকটক কিংবা ভয়েস মেসেজে প্রকাশিত কয়েক সেকেন্ডের অডিও অপরাধীদের জন্য হয়ে উঠতে পারে সেই উপকরণ।

নিজের অজান্তেই অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া কণ্ঠস্বর তাই পরিণত হতে পারে প্রতারণার অস্ত্রে। সংগৃহীত অডিও এআই-ভিত্তিক ভয়েস ক্লোনিং টুলে প্রক্রিয়াজাত করে কণ্ঠের স্বর, টোন, উচ্চারণ ও কথা বলার ধরন বিশ্লেষণ করা হয়। এরপর অপরাধী যে লেখা বা নির্দেশ দেয়, সেটিই তৈরি করা যায় টার্গেট ব্যক্তির কণ্ঠের আদলে। পরিস্থিতিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে এর সঙ্গে যুক্ত করা হয় কান্না, আতঙ্ক, গাড়ির হর্ন কিংবা অ্যাম্বুলেন্সের মতো পটভূমির শব্দ।

ফলে একটি কৃত্রিম ফোনকলও ভুক্তভোগীর কাছে বাস্তব জরুরি পরিস্থিতি বলে মনে হতে পারে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কণ্ঠ নকলের পর প্রতারকদের হাতে এখন আরও শক্তিশালী অস্ত্র মানুষের মুখ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত একটি ছবি বা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও ব্যবহার করেই তৈরি করা যাচ্ছে এমন কৃত্রিম মুখ, যা কথা বলতে, হাসতে, চোখের পলক ফেলতে, এমনকি মাথা ঘোরাতেও পারে।

জেনারেটিভ এআই ও ডিপফেক প্রযুক্তির সমন্বয়ে পরিচিত মানুষ কিংবা বিশিষ্ট ব্যক্তির মুখ ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্য ভিডিও ও লাইভ যোগাযোগের ফাঁদ। ‘সিন্থেটিক আইডেন্টিটি’র অদৃশ্য জগৎ : কণ্ঠ ও মুখ নকলের পর প্রতারণার আরও ভয়ংকর ধাপ হলো ‘সিন্থেটিক আইডেন্টিটি’, যেখানে একজন বাস্তব মানুষের কিছু পরিচয়-তথ্যের সঙ্গে অন্য ব্যক্তির ছবি বা তথ্য মিলিয়ে তৈরি করা হয় একটি কৃত্রিম পরিচয়।

ফলে পরিচয়টির কিছু অংশ সত্য হলেও সেটি কোনো একজন মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিচয় ব্যবহার করে আর্থিক ও ডিজিটাল সেবার স্বয়ংক্রিয় যাচাইব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ ধরনের ছায়া পরিচয় তৈরিতে ব্যবহার করা হতে পারে ফাঁস হওয়া বা চুরি করা ব্যক্তিগত তথ্য নাম, জন্মতারিখ, এনআইডি নম্বর কিংবা ঠিকানা।

এসব তথ্যের সঙ্গে অন্য ব্যক্তির ছবি বা জাল নথি যুক্ত করে তৈরি করা হয় নতুন একটি পরিচয়। পরিচয়ের কিছু তথ্য বাস্তব হওয়ায় প্রথম ধাপে সেটি শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এরপর অনলাইন অ্যাকাউন্ট খোলার সময় এনআইডি, নথি ও মুখের ছবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করা হয়। এই যাচাইয়ের কোনো ধাপে যদি পরিচয়, নথি ও প্রকৃত ব্যক্তির মধ্যে যথেষ্ট কার্যকর মিল নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে জাল পরিচয় ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

উন্নত ছবি সম্পাদনা, ডিপফেক ও অন্যান্য এআই প্রযুক্তি সেই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এমন একটি ছায়া পরিচয় সফলভাবে ব্যবহৃত হলে প্রকৃত অপরাধী তার আড়ালে থেকে যেতে পারে। ব্যাংক হিসাব, মোবাইল সংযোগ, ডিজিটাল ওয়ালেট কিংবা অনলাইন লেনদেনে সেই পরিচয় ব্যবহৃত হলে তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে সন্দেহ গিয়ে পড়তে পারে, যার আসল তথ্য চুরি করা হয়েছে, তার ওপরই।

ফলে একজন নিরপরাধ নাগরিক অজান্তেই অন্যের অপরাধের আর্থিক বা আইনি ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ অপরাধীরা এখন শুধু মানুষের মুখ বা কণ্ঠ নকল করছে না; চুরি করা তথ্যের ওপর দাঁড় করিয়ে তৈরি করছে এমন এক ‘ছায়া মানুষ’, যার পরিচয় বাস্তব ব্যবস্থায় দৃশ্যমান হলেও নিয়ন্ত্রণ থাকে অন্যের হাতে। ডিপফেক, ভয়েস ক্লোনিং প্রতারণার সাতটি স্তর : দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের তিন মাসের অনুসন্ধানে পাওয়া চিত্র বলছে, এআই নিজে কোনো অপরাধী নয়; এটি অপরাধীদের হাতে ব্যবহৃত একটি শক্তিশালী প্রযুক্তিগত হাতিয়ার।

এর পেছনে রয়েছে দেশি-বিদেশি একাধিক স্তরে কাজ করা মানব নেটওয়ার্ক। অনুসন্ধানে এই কাঠামোর সাতটি সম্ভাব্য স্তর চিহ্নিত হয়েছে। শীর্ষে থাকা বিদেশি অপরাধী চক্র থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রযুক্তি সহায়তাকারী, ডিজিটাল প্রচারক, ছদ্মবেশী কল সেন্টার, নিয়োগকারী, মিউল অ্যাকাউন্ট পরিচালনাকারী এবং শেষ পর্যন্ত অর্থ সরানোর নেটওয়ার্ক। এই চেইনের শুরুতে থাকা অপরাধী গোষ্ঠী প্রযুক্তি ও প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ করে।

স্থানীয় প্রযুক্তি সহায়তাকারীরা প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার, সার্ভার ও ডিজিটাল অবকাঠামো সচল রাখে। এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া বিজ্ঞাপন, ডিপফেক ভিডিও বা লোভনীয় অফারের মাধ্যমে শিকার খোঁজে ডিজিটাল মার্কেটাররা। কল সেন্টার থেকে সেই শিকারদের ফোন করে তথ্য, টাকা বা অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। একই সময়ে মিউল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্যের নামে থাকা ব্যাংক ও এমএফএস হিসাব ব্যবহার করে অর্থের প্রথম স্তরের গন্তব্য তৈরি করা হয়।

সব শেষে আসে অর্থ সরানোর স্তর। বিভিন্ন হিসাব ঘুরিয়ে সংগৃহীত অর্থ ডিজিটাল লেনদেন বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে দেশের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ফলে একজন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি আসলে কয়েকটি আলাদা স্তরের সমন্বিত কাজ। সহজ করে বললে, কেউ শিকার খুঁজছে, কেউ প্রযুক্তি দিচ্ছে, কেউ ফোন করছে, কেউ হিসাব দিচ্ছে, আর কেউ অর্থের চূড়ান্ত গন্তব্য নিশ্চিত করছে।

এআই দিয়ে শুধু মানুষ নয়, প্রতিষ্ঠানও নকল হচ্ছে : প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার নতুন মাত্রা হলো— অপরাধীরা এখন শুধু মানুষের চেহারা বা কণ্ঠস্বর নয়, পুরো একটি প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল পরিচয়ই নকল করতে পারছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে কয়েক মিনিটেই তৈরি হচ্ছে পরিচিত ব্যাংক, বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি সংস্থার আদলে ওয়েবসাইট, নোটিশ, লাইসেন্স ও ডিজিটাল নথি।

কোথাও নকল ব্যাংকিং পোর্টালের মাধ্যমে গ্রাহকের পাসওয়ার্ড ও ওটিপি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, কোথাও আবার নামি বিনিয়োগ বা ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের মতো দেখতে ভুয়া প্ল্যাটফর্মে কৃত্রিম মুনাফার হিসাব দেখিয়ে টাকা নেওয়া হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় নকলের আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো— সরকারি সংস্থার ছদ্মবেশ। বাংলাদেশ ব্যাংক, বিআরটিএ, নির্বাচন কমিশন, সিআইডি বা ডিবির নাম-লোগো ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে নকল নোটিশ, সার্টিফিকেট, লাইসেন্স ও আইনি চিঠি।

এআই দিয়ে ভাষা, ডিজাইন ও স্বাক্ষরের আদলও এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে এগুলো আসল বলে মনে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সিইও বা শীর্ষ কর্মকর্তার এআই ভয়েস ক্লোন ও ডিপফেক ভিডিও কোম্পানির কর্মীদের জরুরি অর্থ স্থানান্তর বা গোপন তথ্য দেওয়ার জন্য প্রতারণামূলক নির্দেশ পাঠানোর ঘটনাও এখন নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

যা বলছে তদারকি সংস্থাগুলো : বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী বলেন, ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটকে যখন কোনো ডিপফেক ভিডিও বা ভিউয়া এআই বিজ্ঞাপন ছড়ায়, আমরা মেটা ও গুগলের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তবে আন্তর্জাতিক টেক জায়ান্টদের কাছ থেকে দ্রুত রেসপন্স পাওয়া এবং কনটেন্ট টেক-ডাউন করার ক্ষেত্রে এখনো কিছুটা সময় লেগে যায়, যা একটি বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।

সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) সানা শামিনুর রহমান বলেন, আগে ভুয়া কল চিনতে পারা সহজ ছিল, কিন্তু এআই ভয়েস ক্লোনিং এবং ট্রাফিক ফাইন স্ক্যামের কারণে অপরাধীরা নিখুঁতভাবে মানুষকে ঠকাচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি চক্রকে ধরেছি।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কারিগরি বিশ্লেষণ : সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ আরিফ মঈনুদ্দিনের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতিতে ডিপফেক ও ভয়েস ক্লোনিং এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু চোখে দেখা বা কানে শোনা দিয়ে আসল-নকলের পার্থক্য করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। উন্নত জেনারেটিভ এআই মুখের অভিব্যক্তি, আলো-ছায়া, কণ্ঠস্বর ও ঠোঁটের নড়াচড়া এমনভাবে তৈরি করতে পারে যে, সাধারণ দর্শকের কাছে তা বাস্তব বলেই মনে হতে পারে।

ফলে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা হলো ক্রস-ভেরিফিকেশন। পরিচিত কেউ ফোন বা ভিডিও কলে হঠাৎ টাকা, ওটিপি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চাইলে শুধু কণ্ঠ বা মুখ দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে অন্য একটি পরিচিত নম্বরে যোগাযোগ করে সত্যতা যাচাই করা জরুরি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

বিশ্বের তরুণদের স্বপ্নপূরণে রাশিয়াকে সহযোগী করার আহ্বান পুতিনের

হ্যাক হচ্ছে মানুষের বিশ্বাস

Update Time : 10:50:20 pm, Saturday, 12 September 2026

ভিডিও স্ক্রিনে দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ। চেনা মুখ, চেনা কণ্ঠ, স্বাভাবিক ঠোঁটের নড়াচড়া— সবকিছুই অবিকল সত্যি। তিনি বিনিয়োগের পরামর্শ দিচ্ছেন, বলছেন একটি নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে টাকা রাখলে মিলবে ‘নিশ্চিত মুনাফা’। ভিডিওটি দেখে আপনার একবারও সন্দেহ হবে না যে এটি তার বক্তব্য নয়। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন— ভিডিওটি তিনি কখনো তৈরি করেননি, কথাগুলোও তার নয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি এই ডিপফেক ভিডিও এখন মানুষের চোখের দেখাকেও অবিশ্বাস্য করে তুলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত কয়েক সেকেন্ডের ছবি, ভিডিও কিংবা কণ্ঠস্বরই যথেষ্ট। সেগুলো ব্যবহার করে তৈরি করা যাচ্ছে এমন এক ‘ডিজিটাল মানুষ’, যিনি বাস্তবে কখনো ওই কথা বলেননি, ওই জায়গায় দাঁড়াননি, এমনকি ওই ঘটনাতেও ছিলেন না।

এই নকল পরিচয়কে সামনে রেখে প্রতারকরা ছড়াচ্ছে ভুয়া বিনিয়োগের প্রলোভন, ঋণ ও চাকরির ফাঁদ, চিকিৎসার নামে অর্থ আদায় এবং নানা ধরনের অনলাইন প্রতারণা। অর্থাৎ প্রতারণার কৌশল বদলে গেছে এখন শুধু টাকা নয়, মানুষের চোখ, কান এবং বিশ্বাসকেও হ্যাক করা হচ্ছে।

রূপালী বাংলাদেশের দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ডিপফেক ভিডিও ও ভয়েস ক্লোনিং কীভাবে প্রতারণার প্রচারণাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলছে, কারা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, কীভাবে একটি সাধারণ ছবি বা কণ্ঠস্বর হয়ে উঠছে প্রতারণার অস্ত্র এবং এই নকল পরিচয়ের আড়ালে কীভাবে গড়ে উঠছে নতুন এক ডিজিটাল অপরাধের অর্থনীতি। গভীর রাত। ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার ফোনে হঠাৎ কল আসে।

ওপাশ থেকে ভেসে আসে ছোট ভাইয়ের আতঙ্কিত ও কান্নাজড়িত কণ্ঠ। ‘ভাইয়া, আমি বড় দুর্ঘটনায় পড়েছি। হাসপাতালে আছি। এখনই ৫০ হাজার টাকা পাঠাও। ’ পেছনে শোনা যায় অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, মানুষের চিৎকার আর হাসপাতালের ব্যস্ততার শব্দ। কণ্ঠটি এতটাই পরিচিত যে এক মুহূর্তের জন্যও সন্দেহ হয়নি তার। ভাইয়ের সঙ্গেই কথা বলছেন এটাই ছিল তার বিশ্বাস।

জরুরি পরিস্থিতির কথা ভেবে নির্দেশিত নম্বরে ৫০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন তিনি। কিছুক্ষণ পর সন্দেহ হওয়ায় আসল ভাইয়ের নম্বরে ফোন করেন। ওপাশ থেকে ভাই জানায়, সে সম্পূর্ণ সুস্থ এবং বাসাতেই আছে; কোনো দুর্ঘটনাই ঘটেনি। তখনই বুঝতে পারেন, ফোনের ওপাশে ছিলেন না তার ভাই, ছিল তার কণ্ঠের একটি কৃত্রিম সংস্করণ। সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ভিডিও কিংবা ভয়েস মেসেজ থেকে সংগ্রহ করা অল্প সময়ের অডিও ব্যবহার করেও এখন বিশ্বাসযোগ্য ভয়েস ক্লোন তৈরি করা সম্ভব।

ফলে পরিচিত কণ্ঠস্বরও আর পরিচয়ের নিশ্চিত প্রমাণ নয়। কিন্তু কীভাবে কয়েক সেকেন্ডের একটি কণ্ঠস্বরকে এভাবে নকল করা সম্ভব হচ্ছে? গত মাসে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের ডিপফেক ভিডিও বানিয়ে যৌন শক্তিবর্ধক পণ্যের বিজ্ঞাপন বানায় একটি চক্র। সংবাদমাধ্যমে দেওয়া রেজাউল করিমের পুরোনো বক্তব্য প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবর্তন করে এই ভিডিও বানানো হয়।

ভিডিওতে দেখা যায়, সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম সংবাদমাধ্যমের সামনে বক্তব্য দিচ্ছেন। তার দুই পাশে বিভিন্ন ইসলামী দলের কয়েকজন নেতাও দাঁড়িয়ে আছেন। ভিডিওর নিচের দিকে ডান কোণে সময় টেলিভিশনের লোগো আংশিকভাবে দেখা যায়। ভিডিওতে চরমোনাই পীরকে একটি যৌন শক্তিবর্ধক পণ্যের বিষয়ে প্রচারণামূলক কথা বলতে শোনা যায়। পণ্যটি ব্যবহার করে নিজেও ইতিবাচক ফল পেয়েছেন বলে জানান তিনি।

ভিডিওর দৈর্ঘ্য মোট ২২ মিনিট হলেও প্রথম দুই মিনিটে তার বক্তব্যের অংশটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ২০ মিনিট একটি মিউজিক যুক্ত করে স্ক্রিন কালো করে রাখা। ভিডিওটির সঙ্গে বিজ্ঞাপনে একটি ওয়েবসাইটের লিংক দেখা যায়। লিংকে ক্লিক করলে ডেইলি স্টারের আদলে তৈরি একটি ওয়েবসাইট সামনে আসে, যেখানে পণ্যটির বিস্তারিত উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন আছে।

অর্থাৎ প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার নতুন মাত্রা হলো অপরাধীরা এখন শুধু মানুষের চেহারা বা কণ্ঠস্বর নয়, প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল পরিচয়ও নকল করতে পারছে। রূপালী বাংলাদেশের দীর্ঘ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভয়েস ক্লোন তৈরির প্রথম উপকরণ একটি মানুষের কণ্ঠস্বর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভিডিও, রিলস, ইউটিউব, টিকটক কিংবা ভয়েস মেসেজে প্রকাশিত কয়েক সেকেন্ডের অডিও অপরাধীদের জন্য হয়ে উঠতে পারে সেই উপকরণ।

নিজের অজান্তেই অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া কণ্ঠস্বর তাই পরিণত হতে পারে প্রতারণার অস্ত্রে। সংগৃহীত অডিও এআই-ভিত্তিক ভয়েস ক্লোনিং টুলে প্রক্রিয়াজাত করে কণ্ঠের স্বর, টোন, উচ্চারণ ও কথা বলার ধরন বিশ্লেষণ করা হয়। এরপর অপরাধী যে লেখা বা নির্দেশ দেয়, সেটিই তৈরি করা যায় টার্গেট ব্যক্তির কণ্ঠের আদলে। পরিস্থিতিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে এর সঙ্গে যুক্ত করা হয় কান্না, আতঙ্ক, গাড়ির হর্ন কিংবা অ্যাম্বুলেন্সের মতো পটভূমির শব্দ।

ফলে একটি কৃত্রিম ফোনকলও ভুক্তভোগীর কাছে বাস্তব জরুরি পরিস্থিতি বলে মনে হতে পারে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কণ্ঠ নকলের পর প্রতারকদের হাতে এখন আরও শক্তিশালী অস্ত্র মানুষের মুখ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত একটি ছবি বা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও ব্যবহার করেই তৈরি করা যাচ্ছে এমন কৃত্রিম মুখ, যা কথা বলতে, হাসতে, চোখের পলক ফেলতে, এমনকি মাথা ঘোরাতেও পারে।

জেনারেটিভ এআই ও ডিপফেক প্রযুক্তির সমন্বয়ে পরিচিত মানুষ কিংবা বিশিষ্ট ব্যক্তির মুখ ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্য ভিডিও ও লাইভ যোগাযোগের ফাঁদ। ‘সিন্থেটিক আইডেন্টিটি’র অদৃশ্য জগৎ : কণ্ঠ ও মুখ নকলের পর প্রতারণার আরও ভয়ংকর ধাপ হলো ‘সিন্থেটিক আইডেন্টিটি’, যেখানে একজন বাস্তব মানুষের কিছু পরিচয়-তথ্যের সঙ্গে অন্য ব্যক্তির ছবি বা তথ্য মিলিয়ে তৈরি করা হয় একটি কৃত্রিম পরিচয়।

ফলে পরিচয়টির কিছু অংশ সত্য হলেও সেটি কোনো একজন মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিচয় ব্যবহার করে আর্থিক ও ডিজিটাল সেবার স্বয়ংক্রিয় যাচাইব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ ধরনের ছায়া পরিচয় তৈরিতে ব্যবহার করা হতে পারে ফাঁস হওয়া বা চুরি করা ব্যক্তিগত তথ্য নাম, জন্মতারিখ, এনআইডি নম্বর কিংবা ঠিকানা।

এসব তথ্যের সঙ্গে অন্য ব্যক্তির ছবি বা জাল নথি যুক্ত করে তৈরি করা হয় নতুন একটি পরিচয়। পরিচয়ের কিছু তথ্য বাস্তব হওয়ায় প্রথম ধাপে সেটি শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এরপর অনলাইন অ্যাকাউন্ট খোলার সময় এনআইডি, নথি ও মুখের ছবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করা হয়। এই যাচাইয়ের কোনো ধাপে যদি পরিচয়, নথি ও প্রকৃত ব্যক্তির মধ্যে যথেষ্ট কার্যকর মিল নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে জাল পরিচয় ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

উন্নত ছবি সম্পাদনা, ডিপফেক ও অন্যান্য এআই প্রযুক্তি সেই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এমন একটি ছায়া পরিচয় সফলভাবে ব্যবহৃত হলে প্রকৃত অপরাধী তার আড়ালে থেকে যেতে পারে। ব্যাংক হিসাব, মোবাইল সংযোগ, ডিজিটাল ওয়ালেট কিংবা অনলাইন লেনদেনে সেই পরিচয় ব্যবহৃত হলে তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে সন্দেহ গিয়ে পড়তে পারে, যার আসল তথ্য চুরি করা হয়েছে, তার ওপরই।

ফলে একজন নিরপরাধ নাগরিক অজান্তেই অন্যের অপরাধের আর্থিক বা আইনি ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ অপরাধীরা এখন শুধু মানুষের মুখ বা কণ্ঠ নকল করছে না; চুরি করা তথ্যের ওপর দাঁড় করিয়ে তৈরি করছে এমন এক ‘ছায়া মানুষ’, যার পরিচয় বাস্তব ব্যবস্থায় দৃশ্যমান হলেও নিয়ন্ত্রণ থাকে অন্যের হাতে। ডিপফেক, ভয়েস ক্লোনিং প্রতারণার সাতটি স্তর : দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের তিন মাসের অনুসন্ধানে পাওয়া চিত্র বলছে, এআই নিজে কোনো অপরাধী নয়; এটি অপরাধীদের হাতে ব্যবহৃত একটি শক্তিশালী প্রযুক্তিগত হাতিয়ার।

এর পেছনে রয়েছে দেশি-বিদেশি একাধিক স্তরে কাজ করা মানব নেটওয়ার্ক। অনুসন্ধানে এই কাঠামোর সাতটি সম্ভাব্য স্তর চিহ্নিত হয়েছে। শীর্ষে থাকা বিদেশি অপরাধী চক্র থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রযুক্তি সহায়তাকারী, ডিজিটাল প্রচারক, ছদ্মবেশী কল সেন্টার, নিয়োগকারী, মিউল অ্যাকাউন্ট পরিচালনাকারী এবং শেষ পর্যন্ত অর্থ সরানোর নেটওয়ার্ক। এই চেইনের শুরুতে থাকা অপরাধী গোষ্ঠী প্রযুক্তি ও প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ করে।

স্থানীয় প্রযুক্তি সহায়তাকারীরা প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার, সার্ভার ও ডিজিটাল অবকাঠামো সচল রাখে। এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া বিজ্ঞাপন, ডিপফেক ভিডিও বা লোভনীয় অফারের মাধ্যমে শিকার খোঁজে ডিজিটাল মার্কেটাররা। কল সেন্টার থেকে সেই শিকারদের ফোন করে তথ্য, টাকা বা অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। একই সময়ে মিউল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্যের নামে থাকা ব্যাংক ও এমএফএস হিসাব ব্যবহার করে অর্থের প্রথম স্তরের গন্তব্য তৈরি করা হয়।

সব শেষে আসে অর্থ সরানোর স্তর। বিভিন্ন হিসাব ঘুরিয়ে সংগৃহীত অর্থ ডিজিটাল লেনদেন বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে দেশের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ফলে একজন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি আসলে কয়েকটি আলাদা স্তরের সমন্বিত কাজ। সহজ করে বললে, কেউ শিকার খুঁজছে, কেউ প্রযুক্তি দিচ্ছে, কেউ ফোন করছে, কেউ হিসাব দিচ্ছে, আর কেউ অর্থের চূড়ান্ত গন্তব্য নিশ্চিত করছে।

এআই দিয়ে শুধু মানুষ নয়, প্রতিষ্ঠানও নকল হচ্ছে : প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার নতুন মাত্রা হলো— অপরাধীরা এখন শুধু মানুষের চেহারা বা কণ্ঠস্বর নয়, পুরো একটি প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল পরিচয়ই নকল করতে পারছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে কয়েক মিনিটেই তৈরি হচ্ছে পরিচিত ব্যাংক, বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি সংস্থার আদলে ওয়েবসাইট, নোটিশ, লাইসেন্স ও ডিজিটাল নথি।

কোথাও নকল ব্যাংকিং পোর্টালের মাধ্যমে গ্রাহকের পাসওয়ার্ড ও ওটিপি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, কোথাও আবার নামি বিনিয়োগ বা ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের মতো দেখতে ভুয়া প্ল্যাটফর্মে কৃত্রিম মুনাফার হিসাব দেখিয়ে টাকা নেওয়া হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় নকলের আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো— সরকারি সংস্থার ছদ্মবেশ। বাংলাদেশ ব্যাংক, বিআরটিএ, নির্বাচন কমিশন, সিআইডি বা ডিবির নাম-লোগো ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে নকল নোটিশ, সার্টিফিকেট, লাইসেন্স ও আইনি চিঠি।

এআই দিয়ে ভাষা, ডিজাইন ও স্বাক্ষরের আদলও এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে এগুলো আসল বলে মনে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সিইও বা শীর্ষ কর্মকর্তার এআই ভয়েস ক্লোন ও ডিপফেক ভিডিও কোম্পানির কর্মীদের জরুরি অর্থ স্থানান্তর বা গোপন তথ্য দেওয়ার জন্য প্রতারণামূলক নির্দেশ পাঠানোর ঘটনাও এখন নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

যা বলছে তদারকি সংস্থাগুলো : বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী বলেন, ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটকে যখন কোনো ডিপফেক ভিডিও বা ভিউয়া এআই বিজ্ঞাপন ছড়ায়, আমরা মেটা ও গুগলের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তবে আন্তর্জাতিক টেক জায়ান্টদের কাছ থেকে দ্রুত রেসপন্স পাওয়া এবং কনটেন্ট টেক-ডাউন করার ক্ষেত্রে এখনো কিছুটা সময় লেগে যায়, যা একটি বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।

সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) সানা শামিনুর রহমান বলেন, আগে ভুয়া কল চিনতে পারা সহজ ছিল, কিন্তু এআই ভয়েস ক্লোনিং এবং ট্রাফিক ফাইন স্ক্যামের কারণে অপরাধীরা নিখুঁতভাবে মানুষকে ঠকাচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি চক্রকে ধরেছি।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কারিগরি বিশ্লেষণ : সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ আরিফ মঈনুদ্দিনের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতিতে ডিপফেক ও ভয়েস ক্লোনিং এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু চোখে দেখা বা কানে শোনা দিয়ে আসল-নকলের পার্থক্য করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। উন্নত জেনারেটিভ এআই মুখের অভিব্যক্তি, আলো-ছায়া, কণ্ঠস্বর ও ঠোঁটের নড়াচড়া এমনভাবে তৈরি করতে পারে যে, সাধারণ দর্শকের কাছে তা বাস্তব বলেই মনে হতে পারে।

ফলে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা হলো ক্রস-ভেরিফিকেশন। পরিচিত কেউ ফোন বা ভিডিও কলে হঠাৎ টাকা, ওটিপি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চাইলে শুধু কণ্ঠ বা মুখ দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে অন্য একটি পরিচিত নম্বরে যোগাযোগ করে সত্যতা যাচাই করা জরুরি।