রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘ কর্মজীবনে ঋণ ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং কৃষি ও এসএমই অর্থায়নের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন মোহাম্মদ গোলাম মর্তুজা।
রূপালী ব্যাংক দিয়ে শুরু হওয়া তার কর্মজীবন গড়িয়েছে জনতা ব্যাংক হয়ে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) পর্যন্ত। মাঝখানে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রায় ২৮ বছরের এই কর্মজীবনে তার দায়িত্বের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল ঋণ ব্যবস্থাপনা ও বৈদেশিক বাণিজ্য; বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম, এসএমই উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, কৃষিঋণ এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের মতো ব্যাংকিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোয় কাজ করেছেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে রাকাবের ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ব্যাংকের আমানত বৃদ্ধি ও খেলাপি ঋণ কমার যে তথ্য সামনে এসেছে, তা তার কর্মজীবনের আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি। ব্যাংকটির দায়িত্ব পালনের সময় প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার কৃষক পরিবারকে ঋণমুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়। ১৯৯৮ সালে ব্যাংকার্স রিক্রুটমেন্ট কমিটির মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগ পেয়ে সিনিয়র অফিসার হিসেবে রূপালী ব্যাংকে যোগ দেন গোলাম মর্তুজা।
দীর্ঘ সময় এই ব্যাংকেই বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। রূপালী ব্যাংকে কর্মরত অবস্থায় বৈদেশিক বাণিজ্য, ঋণ বিতরণ এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে তার কাজের স্বীকৃতিও মিলেছে। ২০১৮ সালে রূপালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে জেনারেল ম্যানেজার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হিসেবে শিল্পঋণ বিভাগের দায়িত্ব পান তিনি।
পরে প্রায় পাঁচ বছর ব্যাংকটির ক্রেডিট ও ফরেন ট্রেড বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে এসএমই উদ্যোক্তা ও নতুন রপ্তানিকারকদের অর্থায়নের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ পান তিনি। ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের মতে, বৈদেশিক বাণিজ্যের জটিল নিয়মকানুন এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও কাজে সহায়তা করেছে। ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বড় ধরনের সংকটে পড়ে।
সরকার তখন অর্থনীতির বিভিন্ন খাত সচল রাখতে প্রণোদনা ঋণের উদ্যোগ নেয়। ওই সময় রূপালী ব্যাংকের প্রণোদনা ঋণ বিতরণ কার্যক্রমেও যুক্ত ছিলেন গোলাম মর্তুজা। ব্যাংক-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের জন্য ঋণ বিতরণের কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নে তিনি ভূমিকা রাখেন। শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ওই সংকটকালীন অর্থায়নের আওতায় আনার ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে প্রশংসাপত্র দেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কৃষি অর্থায়নেও দায়িত্ব পালন করেছেন গোলাম মর্তুজা। ২০২২ সালে তার নেতৃত্বে রূপালী ব্যাংক কৃষিঋণ বিতরণে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ অর্জন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে সনদ পায় বলে ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য কৃষিঋণ বিতরণ একটি নিয়মিত অগ্রাধিকার।
এ খাতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিষয়টি তাই ব্যাংকগুলোর বার্ষিক কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের অন্যতম সূচক। ২০২৩ সালে জনতা ব্যাংকে যোগ দেন গোলাম মর্তুজা। সেখানে ঋণ আদায়ের পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্যের দায়িত্বও পান তিনি। আমদানি-রপ্তানি ব্যবসার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে ব্যাংকটির ফরেন ট্রেড বিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। জনতা ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকালে বৈদেশিক বাণিজ্য, ট্রেজারি ও ঋণ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ সময়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও ঋণ আদায়ের বিভিন্ন উদ্যোগেও তিনি যুক্ত ছিলেন। দায়িত্বকালে ব্যাংকের ব্যাবসায়িক কার্যক্রমে তার ভূমিকার জন্য পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রশংসা পেয়েছেন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক পরিবর্তন ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
সেই সময় জনতা ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবেও প্রায় দুই মাস দায়িত্ব পালন করেন গোলাম মর্তুজা। ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে তার দায়িত্বের মধ্যে ছিল ব্যাংকের সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালনা, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্য এবং ট্রেজারি ব্যবস্থাপনা। ওই সময় ব্যাংকের নিয়মিত কার্যক্রম সচল রাখা ছিল ব্যবস্থাপনার অন্যতম চ্যালেঞ্জ। বৈদেশিক বাণিজ্যে গোলাম মর্তুজার পেশাগত দক্ষতার একটি স্বীকৃতি হলো ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) থেকে অর্জিত ফরেন ট্রেড-সংক্রান্ত পেশাগত সনদ।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত তিনি। রূপালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এসএমই ও বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ব্যাংকিং খাতের কর্মকর্তাদের মতে, বৈদেশিক বাণিজ্যের নিয়মকানুন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক লেনদেন ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় তার দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে কাজে এসেছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সাত মাসের বেশি সময় রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন গোলাম মর্তুজা। রাকাব মূলত দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষক ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত একটি বিশেষায়িত ব্যাংক। ফলে সেখানে এমডির দায়িত্ব পালনের সময় কৃষিঋণ, আমানত সংগ্রহ ও খেলাপি ঋণ কমানো ছিল ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গোলাম মর্তুজার দায়িত্বকালে রাকাবের আমানত প্রায় ৯০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পায়। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার ৩১ থেকে কমে প্রায় ১৬ শতাংশে নেমে আসে। এ ছাড়া প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার কৃষক পরিবারকে ঋণমুক্ত করার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষকদের ঋণসংক্রান্ত সরকারের নীতিগত লক্ষ্য বাস্তবায়নে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে ব্যাংকের আর্থিক সূচকে কোনো পরিবর্তনের পেছনে একক কোনো কর্মকর্তার ভূমিকা নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। গোলাম মর্তুজার কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে পাওয়া প্রশংসাপত্র, সনদ ও দায়িত্বের তালিকা তার পেশাগত পথচলার একটি দিক তুলে ধরে।
অন্যদিকে একজন ব্যাংকারের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে ঋণ বিতরণ, আদায়, খেলাপি ঋণ, আমানত, বৈদেশিক বাণিজ্য ও ব্যাংকের আয়-ব্যয়ের মতো প্রাতিষ্ঠানিক সূচকও গুরুত্বপূর্ণ। তাই তার কর্মজীবনের সাফল্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং দায়িত্বকালের আগে ও পরের আর্থিক সূচক তুলনা করা হলে চিত্রটি আরও পরিষ্কার হবে।
ব্যাংকিং খাতে তার দীর্ঘ পেশাগত যাত্রাকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রচার বা প্রশংসার চেয়ে দায়িত্বকালের প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল, নথিভুক্ত অর্জন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়নই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।



















