বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী ইসহাক মুন্সির নিয়মিত বেতনের মধ্যবিত্ত সংসারে স্বাভাবিক জীবনই কাটছিল। তবে একদিন ফেসবুকের নিউজফিডে জুয়ার একটি সাইটের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখে কৌতূহলবশত তিনি সেখানে ক্লিক করেন।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মাত্র এক হাজার টাকা জমা দিয়ে শুরু করলেন খেলা। চোখের পলকে সেই এক হাজার টাকা হয়ে গেল পঁচিশ হাজার! মনে হলো, এ যেন আকাশ থেকে পড়া সৌভাগ্য। সেই শুরু। এরপর হার-জিতের দোলাচলে দিন কাটতে লাগল। এক মাসের মাথায় ভিটেমাটি বন্ধক রেখে খোয়ালেন ১৮ লাখ টাকা। থামলেন না তবু। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করলেন আরও ৯ লাখ।
আজ ইসহাক মুন্সি চাকরিহীন, ঋণের বোঝায় ন্যুব্জ, পাওনাদারদের ভয়ে ঘরছাড়াÑনিজের বাসাতেও থাকতে পারেন না তিনি। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের রতন চন্দ্র দেবনাথের গল্পটা আরও করুণ। ছোট্ট একটা পানের দোকান দিয়ে কোনোরকমে সংসার চালাতেন। অনলাইন জুয়ার পাল্লায় পড়ে ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে একসময় মুক্তির পথ হিসেবে বেছে নিলেন আত্মহত্যা। এই দুটি নাম কেবল দুটি সংখ্যা নয়Ñএরা প্রতীক।
প্রতীক লাখো তরুণ-তরুণীর, প্রতীক হাজারো পরিবারের, যারা প্রতিদিন এই মোবাইল স্ক্রিনের ভেতরের এক অদৃশ্য দানবের কাছে নিজেদের জীবন, সঞ্চয়, সম্মান বন্ধক রেখে দিচ্ছেন নীরবে। অনলাইন জুয়া বাংলাদেশে হঠাৎ করে আসেনি। বছরের পর বছর ধরে এটি একটি বিশাল অবকাঠামো হিসেবে গড়ে উঠেছে। দেশের অভ্যন্তরে এমনকি একটি নির্দিষ্ট জেলাকে এই ব্যবসার আঁতুড়ঘর বলা হয়, যেখানে শত শত এজেন্ট, সাব-এজেন্ট ও মাস্টার এজেন্ট নিয়ে গড়ে উঠেছে সুবিন্যস্ত এক নেটওয়ার্ক।
দেশে দুই থেকে তিনশর বেশি জুয়ার সাইট সক্রিয়, যার একটা বড় অংশ পরিচালিত হয় বিদেশ থেকে; মূলত পাঁচটি দেশ থেকে : আমেরিকা, মালয়েশিয়া, চীন, দুবাই ও রাশিয়া। ওয়ান এক্সবেট, মেলবেট, মোস্টবেট, বেট৩৬৫-এর মতো নাম এখন মানুষের মুখে মুখে। একজন খেলোয়াড় যখন বিকাশ, নগদ, রকেট বা উপায়ের মাধ্যমে টাকা পাঠান, তখন সেই টাকা এজেন্টের কাছে জমা হয় এবং খেলোয়াড়ের অ্যাকাউন্টে যোগ হয় সমপরিমাণ কয়েন।
জিতলে খেলোয়াড় উত্তোলন করেন, এজেন্ট তখন নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা পাঠিয়ে দেন। এভাবে চলতে থাকে ডিপোজিট আর উইথড্রয়ের এক অবিরাম চক্র। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের ভেতরে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় টাকা যেতে যেখানে কোনো বাধা নেই, সেখানে কীভাবে এই টাকা শেষ পর্যন্ত সীমানা পেরিয়ে বিদেশে চলে যায়? উত্তর লুকিয়ে আছে ক্রিপ্টোকারেন্সি আর হুন্ডিতে।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জমা হওয়া টাকা নির্দিষ্ট কমিশন রেখে এজেন্টরা ক্রিপ্টোকারেন্সি বা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করে দেন বিদেশে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকে বেকার তরুণ-তরুণী এবং মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের একটি চক্র, যারা কমিশনের বিনিময়ে এই পাচার-যন্ত্রের একেকটি খুচরা যন্ত্রাংশ হয়ে কাজ করে। শুধু মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেই বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয় বলে ধারণা করা হয়।
আর এর বাইরে থাকা শত শত আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে যে অঙ্কের লেনদেন হয়, এর প্রকৃত হিসাব হয়তো কারও কাছেই নেই। এখানেই এই সমস্যার সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি লুকিয়ে। সরকার একাধিকবার ঘোষণা দিয়েছে শত শত জুয়ার সাইট বন্ধ করার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গুগলে সামান্য একটু সার্চ করলেই এসব সাইট এখনো সহজলভ্য। কোনো ভিপিএনের প্রয়োজনও পড়ে না; যা প্রমাণ করে, প্রকৃত অর্থে এই সাইটগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।
বন্ধ হয়েছে কেবল কাগজে-কলমে বা সাময়িকভাবে কিছু স্থানীয় সাইট। বাংলাদেশে জুয়া আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। ইতিমধ্যে সরকার সাড়ে তিন হাজারের বেশি জুয়ার সাইট বন্ধ করার দাবি করেছে এবং সিআইডি, ডিবি, র‍্যাবের হাতে ধরাও পড়েছেন শতাধিক পরিচালক। কিন্তু প্রতিটি সাইট বন্ধ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন ডোমেইনে, নতুন নামে আবার চালু হয়ে যায় একই কারবার।
প্রশ্ন জাগে, কেন একের পর এক তরুণ-তরুণী এই ফাঁদে পা দিচ্ছেন? উত্তরটা জটিল, কিন্তু বোঝা কঠিন নয়। প্রথমত, এই ফাঁদ শুরু হয় একটি সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক কৌশল দিয়ে। নতুন খেলোয়াড়কে শুরুতে ইচ্ছাকৃতভাবে জিতিয়ে দেওয়া হয়। সামান্য বিনিয়োগে বড় লাভ দেখে মনে জন্ম নেয় একধরনের মিথ্যা আত্মবিশ্বাসÑমনে হয়, ‘আমি বুঝি কৌশলটা রপ্ত করে ফেলেছি, নিয়মিত আয় করতে পারব।
’ এই বিভ্রম থেকেই বাড়তে থাকে বাজির অঙ্ক, আর একসময় জেতার নেশায় মানুষ ঢেলে দেন সঞ্চয়, ধারদেনা, এমনকি ব্যবসার মূলধন পর্যন্ত। দ্বিতীয়ত, বেকারত্ব ও দ্রুত বিত্তবান হওয়ার আকাক্সক্ষা এই আসক্তিকে আরও উসকে দিচ্ছে। কম পরিশ্রমে বেশি আয়ের স্বপ্ন যখন বাস্তব জীবনের সংগ্রাম আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে মিশে যায়, তখন মোবাইল স্ক্রিনের এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি অনেকের কাছেই হয়ে ওঠে সহজ পালানোর রাস্তা।
তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেদার বিজ্ঞাপন আর তারকাদের সংশ্লিষ্টতা এই আসক্তিকে দিচ্ছে একধরনের স্বাভাবিকতার মুখোশ। পরিচিত মুখ যখন এসব সাইটের প্রচারণায় অংশ নেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে সংশয় কমে যায়, বিশ্বাস বাড়ে। অনলাইন জুয়ার ক্ষতি কেবল আর্থিক নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিবারিক অশান্তি, বিশ্বাসভঙ্গ, সামাজিক মর্যাদাহানি, এমনকি অপরাধপ্রবণতা।
প্রথমে নিজের জমানো টাকা দিয়ে শুরু করা মানুষটি একসময় বন্ধু-স্বজনের কাছে হাত পাতেন, তারপর ঋণের ফাঁদে আটকা পড়েন। ঋণ শোধ করতে না পেরে কেউ কেউ বেছে নেন প্রতারণার পথ, কেউবা হারিয়ে ফেলেন বাঁচার ইচ্ছেটুকুই। এ যেন এক নীরব মহামারি, যা প্রতিদিন গ্রাস করছে হাজারো পরিবারের স্বপ্ন আর নিরাপত্তা। প্রিয় তরুণ ভাই ও বোন, একটা কথা মনে রাখতে হবেÑঅনলাইন জুয়া কোনো বিনিয়োগ নয়, এটি এক সুপরিকল্পিত ফাঁদ, যেখানে দীর্ঘমেয়াদে জেতার সম্ভাবনা কখনোই খেলোয়াড়ের পক্ষে থাকে না, থাকে কেবল প্ল্যাটফর্মের মুনাফা নিশ্চিত করার জন্য।
শুরুর সেই ছোট্ট জয়টুকু কোনো সৌভাগ্য নয়; বরং একটি সুচিন্তিত কৌশল, যা আপনাকে গভীর জলে টেনে নিয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ মাত্র। জীবনে বড় হওয়ার, স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখা দোষের কিছু নয়; বরং সেটাই তারুণ্যের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ যেন হয় শ্রম, দক্ষতা আর ধৈর্যের পথ, কোনো জুয়ার টেবিলের অনিশ্চয়তা নয়। যে টাকা এক রাতে আসে, সেই টাকা এক রাতেই মিলিয়ে যেতে পারে।
আর সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে আপনার সম্মান, আপনার পরিবার, এমনকি আপনার জীবনও। যদি আপনি ইতিমধ্যে এই মোহজালে জড়িয়ে পড়ে থাকেন, লজ্জা বা ভয়ে চুপ করে থাকবেন না। এটি কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ, যাতে লাখো মানুষ পা দিয়েছেন। পরিবারকে জানান, বিশ্বস্ত কারও সাহায্য নিন, প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
একটি ভুল স্বীকার করার সাহসই আপনাকে নতুন করে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। আর যারা এখনো এই পথে পা বাড়াননি, তাদের বলি, কৌতূহলও কখনো কখনো কাল হয়ে দাঁড়ায়। একটিমাত্র ক্লিক থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা কারও জীবনে বয়ে আনতে পারে অপূরণীয় ক্ষতি। তাই সচেতন থাকুন, প্রিয়জনদের সচেতন করুন। রাষ্ট্রের কাছে জোরালো দাবি জানান কার্যকর আইন প্রয়োগের, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো বন্ধের, আর্থিক লেনদেনের চ্যানেল চিহ্নিত করার।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ গড়ে উঠতে হবে নিজেদের ভেতর থেকেইÑসচেতনতা, সংযম আর সাহসের মধ্য দিয়ে। তারুণ্য মানে সম্ভাবনা, তারুণ্য মানে ভবিষ্যৎ গড়ার শক্তি। এই শক্তিকে কোনো ভার্চুয়াল জুয়ার টেবিলে বিসর্জন দেওয়ার কোনো মানে হয় না। আসুন, আজই সিদ্ধান্ত নিইÑনিজের জীবন, নিজের পরিবার আর নিজের ভবিষ্যতের হাল নিজেই ধরব, কোনো মিথ্যা প্রতিশ্রুতির হাতে নয়।


















