নব্বইয়ের দশকের সেই উত্তাল সময়। ক্যাসেট প্লেয়ারে বাজছে তুমি আমার, তোমাকে চাই কিংবা সাথি তুমি আমার জীবনে। দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার, তরুণদের মাথায় বাঁধা রুমাল আর চোখে সানগ্লাস।
প্রেক্ষাগৃহের সামনে উপচে পড়া ভিড়Ñসবই ছিল শুধু একটি নামের জাদুতে, তিনি শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। তবে রুপালি পর্দা তাকে চেনে ‘সালমান শাহ’ নামে। আজ ঢাকাই সিনেমার এই ধ্রুবতারার ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৬ সালের এই দিনে মাত্র ২৫ বছর বয়সে কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে না-ফেরার দেশে চলে যান তিনি। তিন দশক কেটে গেলেও আজ পর্যন্ত তার জনপ্রিয়তায় এতটুকু মরচে পড়েনি; বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে তার অবিনশ্বর ম্যাজিক।
১৯৯৩ সালে পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে সালমান শাহর রুপালি পর্দায় অভিষেক ঘটে। প্রথম সিনেমা দিয়েই তিনি বাজিমাত করেন। এরপর মাত্র তিন বছরের সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ারে অভিনয় করেছেন ২৭টি চলচ্চিত্রে। যার প্রায় প্রতিটিই ছিল ব্যাবসায়িক দিক থেকে সফল। শাবনূরের সঙ্গে তার অনস্ক্রিন রসায়ন বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম সেরা জুটি হিসেবে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছে।
সালমান শাহ কেবল একজন অভিনেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন কালচারাল আইকন। তার বাচনভঙ্গি, চুলের স্টাইল, কানের দুল, কিংবা পরনের পোশাকÑসবকিছুই সেই সময়ের তরুণদের মাঝে এক উন্মাদনা তৈরি করেছিল। বর্তমান যুগের অভিনেতারাও ফ্যাশনের ক্ষেত্রে তাকে আদর্শ মেনে চলেন। দীর্ঘ ৩০ বছর পরও তার স্টাইল স্টেটমেন্ট সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও আধুনিক।
নায়কের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকাই সিনেমার বরেণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা ও কাহিনিকার ছটকু আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘সালমানের অগণিত ভক্ত এবং অগণিত মানুষ ওকে ভালোবাসে। তাই ওর মৃত্যু নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার সমাধান হওয়া উচিত। সালমানের প্রতি আমরা অবিচার করছি। সালমানের মৃত্যুদিনে আমাদের একটাই চাওয়া, ওর মৃত্যুর রহস্য উন্মোচন হোক।
’ স্মৃতিচারণা করে তিনি আরও বলেন, ‘সালমান শাহ মানুষ হিসেবে দারুণ ছিল। যখন কাজ করত, আনন্দ নিয়ে করত। সবাইকে নিয়ে সব সময় আনন্দে মেতে থাকত। চরিত্রে ডুবে যেত। ’ একসঙ্গে পর্দা ভাগ করতে না পারায় আফসোস করে অমিত হাসান বলেন, ‘সালমান স্বল্প সময়ে যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, তা অনেক শিল্পীই করতে পারেনি। আমি নিজেও পারিনি।
আমাদের তিনবার দেখা হয়েছিল। চমৎকার এবং বন্ধুত্বসুলভ ছেলে ছিল সালমান। আমার দুর্ভাগ্য যে তার সঙ্গে কাজ হয়নি। তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। ’ মৃত্যুর তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সালমান শাহকে ঘিরে ভক্ত ও বিনোদন অঙ্গনের আবেগ এখনো সতেজ। ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘দীপ্ত টিভি’ ৫ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সপ্তাহজুড়ে আয়োজন করেছে ‘সালমান শাহ চলচ্চিত্র উৎসব’।
যেখানে টানা সাত দিন তার জনপ্রিয় সাতটি সিনেমা (যেমন ‘বিচার হবে’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’) প্রদর্শিত হবে। এ ছাড়া, নব্বইয়ের দশকে তাকে ঘিরে ভক্তদের উন্মাদনার গল্প নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে বিশেষ চলচ্চিত্র ‘লাভ ৯৬’। অন্যান্য চ্যানেলেও প্রচার হবে সালমান অভিনীত সিনেমাগুলো। এদিকে, সালমান শাহর মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে তিন দিনব্যাপী উন্মুক্ত সিনেমা প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)।
সিনেমাপ্রেমী দর্শক ও সালমান শাহর ভক্ত-অনুরাগীদের জন্য বিএফডিসি প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সালমান শাহর চলে যাওয়ার এতগুলো বছর পার হয়ে গেলেও তার মৃত্যুর রহস্য আজও পুরোপুরি উদঘাটিত হয়নি। ভক্ত ও পরিবারের দাবি, তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আইনি লড়াই আর তদন্তের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এখনো আদালত ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোর টেবিলে ঘুরপাক খাচ্ছে তার মৃত্যুর ফাইল।
মৃত্যু মানুষকে ধুয়ে-মুছে দেয়, কিন্তু সালমান শাহর ক্ষেত্রে তা খাটেনি। তিনি সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক রাজপুত্র, যিনি রাজপ্রাসাদ ছেড়ে গেলেও ভক্তদের হৃদয়ের সিংহাসনটি আজও নিজের দখলেই রেখে দিয়েছেন। ঢালিউডের আকাশে বহু তারার মেলা বসলেও, সালমান শাহর মতো উজ্জ্বল ও দীপ্তিময় তারা আর দ্বিতীয়টি আসেনি।



















