ভোরের সোনালি আলো ফোটার আগেই বগুড়ার গ্রামীণ জনপদে শুরু হয় এক ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে চলে পটল, লাউ, কাঁচামরিচ, মিষ্টি কুমড়া, বেগুন ও শিম তোলার উৎসব। কৃষকরা যত্ন করে গাছ থেকে টাটকা এসব সবজি তুলে বস্তায় ভরেন।
এরপর স্থানীয় পাইকারি হাট ঘুরে ট্রাকভর্তি সেই সবজি ছুটতে শুরু করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্তে। তবে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বগুড়ার এই সবজির সুবাস এখন ছড়াচ্ছে সুদূর প্রবাসেও। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে বগুড়ার বাছাই করা মানসম্মত সবজি এখন নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। মূলত প্রবাসে থাকা লাখো বাংলাদেশির নাড়ির টানের কারণেই বিদেশের বাজারে দিন দিন বাড়ছে দেশি শাকসবজির কদর।
ভিনদেশে নিজের দেশের মাটির সুবাস পেতে প্রবাসীরা সাগ্রহে কিনে নিচ্ছেন এসব টাটকা সবজি। কৃষি অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে, নিরাপদ উপায়ে সবজি উৎপাদন, সঠিক গ্রেডিং বা বাছাই প্রক্রিয়া, আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং এবং দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে বগুড়া থেকে সবজি রপ্তানির পরিধি বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। দীর্ঘদিন ধরেই বগুড়াকে দেশের অন্যতম প্রধান সবজির ভাণ্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সারা বছরই কোনো না কোনো সবজির বাম্পার ফলন হয়। মৌসুমভেদে পটল, আলু, বাঁধাকপি, ফুলকপি, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, বেগুন, শসা, শিম ও কাঁচামরিচ উৎপাদনে এ অঞ্চলের কৃষকরা বেশ মুন্সিয়ানা দেখিয়ে আসছেন। বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে জেলায় ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ৩ লাখ টন সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের আধুনিক পরিচর্যার কারণে প্রতিবছরই জেলার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যায়। উৎপাদিত এসব সবজির বর্তমান বাজারমূল্য ইতোমধ্যে দেড় হাজার কোটি টাকার ল্যান্ডমার্ক ছাড়িয়ে গেছে। বগুড়ার এই কৃষি বিপ্লবের মূল কেন্দ্রবিন্দু শিবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক মহাস্থান হাট। জেলার সবচেয়ে বড় এই পাইকারি সবজির মোকামকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল এক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
প্রতিদিন ভোর থেকে কৃষক, পাইকার, আড়তদার ও ব্যাপারীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো হাট এলাকা। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উৎপাদিত সবজি প্রথমে এই হাটে আসে। এরপর সেখান থেকে একদিকে যেমন দেশের বিভিন্ন জেলার কাঁচাবাজারের চাহিদা মেটানো হয়, অন্যদিকে রপ্তানিকারকদের মাধ্যমে এসব সবজি পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক লজিস্টিক চেইনে। বগুড়ার সবজির মধ্যে সুস্বাদু পটলের আলাদা কদর রয়েছে।
বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত এই পটল সংগ্রহের পর মুহূর্তের মধ্যে মহাস্থান হাটে চলে আসে। সতেজ ও নিখুঁত পটলগুলো আলাদা করে দেশের বাজারের পাশাপাশি রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা হয়। শিবগঞ্জ উপজেলার উদীয়মান সবজি চাষি রায়হান ইসলাম বলেন, পটল বা অন্য সবজি চাষে শ্রম এবং উৎপাদন খরচ দুটোই ভালো পরিমাণে থাকে। তবে যদি ন্যায্য দাম পাওয়া যায়, তবেই পরিশ্রম সার্থক হয়।
আমাদের উৎপাদিত সবজি যখন বিদেশে পৌঁছায়, তখন ভীষণ গর্ব হয়। সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে যদি সরাসরি বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা যেত, তবে কৃষকরা আরও বেশি লাভবান হতেন। মহাস্থান হাটের অভিজ্ঞ পাইকারি ব্যবসায়ী সাগর হোসেন জানান, আমরা শিবগঞ্জসহ আশপাশের এলাকা থেকে সেরা মানের সবজি সংগ্রহ করে কঠোরভাবে বাছাই করি। এরপর সেগুলো বিশেষভাবে প্যাকেটজাত করে কাভার্ড ভ্যানে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়।
সেখান থেকে জলপথে কন্টেইনারে করে মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, বাহরাইন, কিংবা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইউরোপের বাজারে পৌঁছে যায় আমাদের দেশি সবজি। তিনি আরও যোগ করেন, বিদেশে আমাদের পণ্যের বিশাল বাজার রয়েছে। তবে কেবল চাহিদা থাকলেই হবে না, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা জরুরি। নিরাপদ উৎপাদন পদ্ধতি এবং উন্নত প্যাকেজিং নিশ্চিত করতে পারলে বগুড়া হতে পারে দেশের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানি হাব।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বগুড়ার সবজির চাহিদা বাড়তে থাকলে পুরো অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিশাল রূপান্তর ঘটবে। এতে কেবল কৃষক নন; বরং পরিবহন শ্রমিক, আড়তদার, পাইকার, প্যাকেজিং শ্রমিক এবং রপ্তানি খাতের সাথে জড়িত হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ও ভাগ্যের চাকা আরও গতিশীল হবে।
বগুড়ার উর্বর মাটি থেকে তোলা একটি পটল যখন মহাস্থান হাটের সীমানা পেরিয়ে প্রবাসীদের ডাইনিং টেবিলে পৌঁছে, তখন সেটি কেবল একটি সাধারণ কৃষিপণ্য থাকে না; এর সাথে মিশে থাকে একজন খেটে খাওয়া কৃষকের বুকভরা স্বপ্ন এবং একটি জেলার অপার সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক শক্তির গল্প। প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক পরিকাঠামো পেলে ‘সবজির রাজধানী’ খ্যাত বগুড়া অচিরেই বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির অন্যতম প্রধান মুকুট হয়ে উঠবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।
















