আজ শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২০ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৮°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯৮%

বাড়ছে মহাকাশযুদ্ধের শঙ্কা: যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা তীব্র

  • MIT ERP
  • Update Time : 07:20:44 am, Saturday, 5 September 2026
  • 15

বাড়ছে মহাকাশযুদ্ধের শঙ্কা: যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা তীব্র

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

পৃথিবীর কক্ষপথে সামরিক ও বাণিজ্যিক উপগ্রহের সংখ্যা দ্রুত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহাকাশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে। সম্ভাব্য মহাকাশ সংঘাতের প্রস্তুতিতে দুই দেশই উপগ্রহবিরোধী অস্ত্র, ধাওয়াকারী উপগ্রহ, লেজার, তড়িৎ-চৌম্বকীয় অস্ত্র এবং অন্য মহাকাশযানকে অনুসরণ বা কবজা করার প্রযুক্তি উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে।

চলতি বছরের জুনে মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের নজর এড়িয়ে চীনের একটি অত্যন্ত গোপন মানববিহীন মহাকাশযান পৃথিবীর শত শত মাইল ওপরে একটি ছোট উপগ্রহ কক্ষপথে ছাড়ে। মহাকাশ পর্যবেক্ষণকারী মার্কিন প্রতিষ্ঠান লিওল্যাবসের তথ্য অনুযায়ী, অবমুক্ত করা বস্তুটি পরে আরেকটি চীনা উপগ্রহকে প্রদক্ষিণ করে আবার মূল মহাকাশযানের দিকে ফিরে আসে। এই মহাকাশযান বা মিশনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে খুব কম তথ্যই প্রকাশ্যে এসেছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রও একই ধরনের গোপন মানববিহীন মহাকাশযান পরিচালনা করে। রয়টার্সের পর্যালোচিত নথি, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ তথ্য এবং বর্তমান ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের বক্তব্যে দুই দেশের সামরিক মহাকাশ কর্মসূচির দ্রুত অগ্রগতির চিত্র উঠে এসেছে। অন্য মহাকাশযান ধাওয়া ও কবজার প্রযুক্তি : চীনের সামরিক গবেষকেরা এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, যার মাধ্যমে একটি মহাকাশযান অন্য মহাকাশযানকে অনুসরণ, ধাওয়া এবং প্রয়োজনে কবজা করতে পারে।

বিভিন্ন পেটেন্ট, প্রযুক্তি হস্তান্তর নথি ও গবেষণাপত্রে এ ধরনের প্রযুক্তির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। শুধু ধাওয়া বা কবজা নয়, মহাকাশেই উপগ্রহে পুনরায় জ্বালানি সরবরাহের প্রযুক্তি নিয়েও চীন কাজ করছে। এর ফলে কোনো মহাকাশযান দীর্ঘ সময় কক্ষপথে সক্রিয় থাকার সুযোগ পেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাকাশে জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা ভবিষ্যতের সামরিক অভিযানে বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে।

চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানও একসঙ্গে শত শত উপগ্রহ পরিচালনার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। এমনকি একাধিক মহাকাশযানকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু আটকে ফেলার ধারণাও বিভিন্ন নথিতে উঠে এসেছে। তবে এসব প্রযুক্তির সবই যে সামরিক হামলার উদ্দেশ্যে তৈরি হচ্ছে, তা নিশ্চিত নয়। মহাকাশে জ্বালানি সরবরাহ কিংবা অকেজো উপগ্রহকে কক্ষপথ পরিবর্তনে সহায়তা করার মতো প্রযুক্তির বেসামরিক ও শান্তিপূর্ণ ব্যবহারও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের যৌথ মহাকাশ অভিযান : চীনের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও মিত্রদের সঙ্গে মহাকাশে যৌথ অভিযান বাড়াচ্ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য একটি সন্দেহভাজন চীনা গোয়েন্দা উপগ্রহের গতিপথের কাছাকাছি যৌথ মহাকাশ অভিযান পরিচালনা করে। মহাকাশ গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান স্লিংশট অ্যারোস্পেসের তথ্য অনুযায়ী, কলোরাডোর একটি ঘাঁটি থেকে নির্দেশ দিয়ে মার্কিন সামরিক উপগ্রহকে যুক্তরাজ্যের একটি উপগ্রহের খুব কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

একই সময়ে চীনের শিয়ান ১২-০১ নামের একটি সন্দেহভাজন গোয়েন্দা উপগ্রহ ওই স্থান থেকে মাত্র ৮৩ কিলোমিটার নিচ দিয়ে অতিক্রম করছিল। মহাকাশের বিশাল দূরত্বের তুলনায় ৮৩ কিলোমিটারকে অত্যন্ত কাছাকাছি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কয়েকজন মহাকাশ বিশেষজ্ঞের মতে, এই অভিযান বেইজিংকে দেওয়া একটি কৌশলগত বার্তা হতে পারে। এর মাধ্যমে মিত্রদের মধ্যে সহযোগিতা ও সক্ষমতা প্রদর্শনের পাশাপাশি অন্য দেশের উপগ্রহে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যও থাকতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যৌথ অভিযানের কথা প্রকাশ করলেও চীনা উপগ্রহের এতটা কাছে যাওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে জানায়নি। মহাকাশে সামরিক অভিযানের অনেক তথ্যই নিরাপত্তার কারণে গোপন রাখা হয়। মহাকাশকে যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে দেখছে সামরিক বাহিনী : আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে উপগ্রহের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। যোগাযোগ, নেভিগেশন, নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে সামরিক বাহিনীগুলো উপগ্রহের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

ফলে কোনো দেশের মহাকাশ সক্ষমতা অচল করে দিতে পারলে তার স্থলভিত্তিক সামরিক ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, সম্ভাব্য কোনো সংঘাতের শুরুতেই প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সম্পদকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এ কারণে শুধু নিজেদের উপগ্রহ রক্ষা নয়, প্রয়োজনে প্রতিপক্ষের মহাকাশ সম্পদে আঘাত হানার সক্ষমতাও গড়ে তোলার কথা বলছেন তারা।

মার্কিন মহাকাশ কমান্ডের প্রধান জেনারেল স্টিফেন হোয়াইটিং মহাকাশ সংঘাতের জন্য প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, প্রতিরোধব্যবস্থা ব্যর্থ হলে মহাকাশে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। পশ্চিমা কর্মকর্তারা ভূমিভিত্তিক লেজার, বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যাহত করার ব্যবস্থা, সাইবার হামলা এবং উপগ্রহবিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখছেন।

‘শিকারি’ উপগ্রহের উত্থান : যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়াÑতিন দেশই এমন বিশেষ উপগ্রহ পরিচালনা করছে, যেগুলো নিজেদের কক্ষপথ পরিবর্তন করে অন্য মহাকাশযানের কাছে যেতে পারে। চীনা উপগ্রহগুলো ইতোমধ্যে একাধিক মহাকাশযানকে খুব কাছাকাছি এনে সমন্বিতভাবে গতিপথ পরিবর্তনের মতো জটিল মহড়া চালিয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এ ধরনের কার্যক্রমকে অনেক সময় যুদ্ধবিমানের মুখোমুখি লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া চীনা মহাকাশযান নিষ্ক্রিয় উপগ্রহকে ধরে অন্য কক্ষপথে সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও প্রদর্শন করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। গত বছর চীন কক্ষপথে জ্বালানি স্থানান্তরের একটি পরীক্ষা চালিয়েছে বলেও মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। মহাকাশে পুনরায় জ্বালানি পাওয়ার সুযোগ থাকলে একটি মহাকাশযান দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকতে পারে এবং প্রয়োজনে একাধিক লক্ষ্যবস্তুর কাছে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

পাল্টা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র : যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের অন্যতম প্রধান মহাকাশ শক্তি হলেও চীন দ্রুত উপগ্রহের সংখ্যা ও মিশনের জটিলতা বাড়াচ্ছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও নিজস্ব মহাকাশ সক্ষমতা শক্তিশালী করছে এবং মিত্রদের সঙ্গে যৌথ অভিযান বাড়াচ্ছে। মার্কিন মহাকাশ বাহিনী গত জুনে ভূমিভিত্তিক একটি তড়িৎ-চৌম্বকীয় অস্ত্র যুক্ত করার কথা জানিয়েছে।

এর উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষের উপগ্রহকে অচল বা অকার্যকর করে দেওয়া। এর পাশাপাশি কক্ষপথে প্রতিরোধ ও আক্রমণ সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বলা হচ্ছে। অন্যদিকে, চীন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সামরিকীকরণের সমালোচনা করেছে। বেইজিং দাবি করেছে, তারা মহাকাশের শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের পক্ষে এবং মহাকাশে অস্ত্রের প্রতিযোগিতার বিরোধী। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাদের মহাকাশযান ও উপগ্রহের কার্যক্রমকে শান্তিপূর্ণ গবেষণা ও মহাকাশ পরিবেশ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত বলে বর্ণনা করেছে।

কক্ষপথে বাড়ছে উত্তেজনা : পৃথিবীর কক্ষপথ যত ঘনবসতিপূর্ণ হচ্ছে, ততই সামরিক ও বাণিজ্যিক উপগ্রহের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মহাকাশে কোনো সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব শুধু মহাকাশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; যোগাযোগ, নেভিগেশন, গোয়েন্দা নজরদারি এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মহাকাশ সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা তাই ভবিষ্যতের যুদ্ধের ধরন বদলে দিতে পারে।

কক্ষপথে ধাওয়া, নজরদারি, জ্বালানি সরবরাহ, কবজা এবং উপগ্রহ অচল করার প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ততই মহাকাশকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনার নতুন অধ্যায় তৈরি হচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

সামান্য বৃষ্টিতেই কাদার সাগর: চাঁপাইনবাবগঞ্জে চরম ভোগান্তি

বাড়ছে মহাকাশযুদ্ধের শঙ্কা: যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা তীব্র

Update Time : 07:20:44 am, Saturday, 5 September 2026

পৃথিবীর কক্ষপথে সামরিক ও বাণিজ্যিক উপগ্রহের সংখ্যা দ্রুত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহাকাশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে। সম্ভাব্য মহাকাশ সংঘাতের প্রস্তুতিতে দুই দেশই উপগ্রহবিরোধী অস্ত্র, ধাওয়াকারী উপগ্রহ, লেজার, তড়িৎ-চৌম্বকীয় অস্ত্র এবং অন্য মহাকাশযানকে অনুসরণ বা কবজা করার প্রযুক্তি উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে।

চলতি বছরের জুনে মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের নজর এড়িয়ে চীনের একটি অত্যন্ত গোপন মানববিহীন মহাকাশযান পৃথিবীর শত শত মাইল ওপরে একটি ছোট উপগ্রহ কক্ষপথে ছাড়ে। মহাকাশ পর্যবেক্ষণকারী মার্কিন প্রতিষ্ঠান লিওল্যাবসের তথ্য অনুযায়ী, অবমুক্ত করা বস্তুটি পরে আরেকটি চীনা উপগ্রহকে প্রদক্ষিণ করে আবার মূল মহাকাশযানের দিকে ফিরে আসে। এই মহাকাশযান বা মিশনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে খুব কম তথ্যই প্রকাশ্যে এসেছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রও একই ধরনের গোপন মানববিহীন মহাকাশযান পরিচালনা করে। রয়টার্সের পর্যালোচিত নথি, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ তথ্য এবং বর্তমান ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের বক্তব্যে দুই দেশের সামরিক মহাকাশ কর্মসূচির দ্রুত অগ্রগতির চিত্র উঠে এসেছে। অন্য মহাকাশযান ধাওয়া ও কবজার প্রযুক্তি : চীনের সামরিক গবেষকেরা এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, যার মাধ্যমে একটি মহাকাশযান অন্য মহাকাশযানকে অনুসরণ, ধাওয়া এবং প্রয়োজনে কবজা করতে পারে।

বিভিন্ন পেটেন্ট, প্রযুক্তি হস্তান্তর নথি ও গবেষণাপত্রে এ ধরনের প্রযুক্তির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। শুধু ধাওয়া বা কবজা নয়, মহাকাশেই উপগ্রহে পুনরায় জ্বালানি সরবরাহের প্রযুক্তি নিয়েও চীন কাজ করছে। এর ফলে কোনো মহাকাশযান দীর্ঘ সময় কক্ষপথে সক্রিয় থাকার সুযোগ পেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাকাশে জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা ভবিষ্যতের সামরিক অভিযানে বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে।

চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানও একসঙ্গে শত শত উপগ্রহ পরিচালনার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। এমনকি একাধিক মহাকাশযানকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু আটকে ফেলার ধারণাও বিভিন্ন নথিতে উঠে এসেছে। তবে এসব প্রযুক্তির সবই যে সামরিক হামলার উদ্দেশ্যে তৈরি হচ্ছে, তা নিশ্চিত নয়। মহাকাশে জ্বালানি সরবরাহ কিংবা অকেজো উপগ্রহকে কক্ষপথ পরিবর্তনে সহায়তা করার মতো প্রযুক্তির বেসামরিক ও শান্তিপূর্ণ ব্যবহারও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের যৌথ মহাকাশ অভিযান : চীনের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও মিত্রদের সঙ্গে মহাকাশে যৌথ অভিযান বাড়াচ্ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য একটি সন্দেহভাজন চীনা গোয়েন্দা উপগ্রহের গতিপথের কাছাকাছি যৌথ মহাকাশ অভিযান পরিচালনা করে। মহাকাশ গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান স্লিংশট অ্যারোস্পেসের তথ্য অনুযায়ী, কলোরাডোর একটি ঘাঁটি থেকে নির্দেশ দিয়ে মার্কিন সামরিক উপগ্রহকে যুক্তরাজ্যের একটি উপগ্রহের খুব কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

একই সময়ে চীনের শিয়ান ১২-০১ নামের একটি সন্দেহভাজন গোয়েন্দা উপগ্রহ ওই স্থান থেকে মাত্র ৮৩ কিলোমিটার নিচ দিয়ে অতিক্রম করছিল। মহাকাশের বিশাল দূরত্বের তুলনায় ৮৩ কিলোমিটারকে অত্যন্ত কাছাকাছি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কয়েকজন মহাকাশ বিশেষজ্ঞের মতে, এই অভিযান বেইজিংকে দেওয়া একটি কৌশলগত বার্তা হতে পারে। এর মাধ্যমে মিত্রদের মধ্যে সহযোগিতা ও সক্ষমতা প্রদর্শনের পাশাপাশি অন্য দেশের উপগ্রহে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যও থাকতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যৌথ অভিযানের কথা প্রকাশ করলেও চীনা উপগ্রহের এতটা কাছে যাওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে জানায়নি। মহাকাশে সামরিক অভিযানের অনেক তথ্যই নিরাপত্তার কারণে গোপন রাখা হয়। মহাকাশকে যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে দেখছে সামরিক বাহিনী : আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে উপগ্রহের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। যোগাযোগ, নেভিগেশন, নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে সামরিক বাহিনীগুলো উপগ্রহের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

ফলে কোনো দেশের মহাকাশ সক্ষমতা অচল করে দিতে পারলে তার স্থলভিত্তিক সামরিক ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, সম্ভাব্য কোনো সংঘাতের শুরুতেই প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সম্পদকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এ কারণে শুধু নিজেদের উপগ্রহ রক্ষা নয়, প্রয়োজনে প্রতিপক্ষের মহাকাশ সম্পদে আঘাত হানার সক্ষমতাও গড়ে তোলার কথা বলছেন তারা।

মার্কিন মহাকাশ কমান্ডের প্রধান জেনারেল স্টিফেন হোয়াইটিং মহাকাশ সংঘাতের জন্য প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, প্রতিরোধব্যবস্থা ব্যর্থ হলে মহাকাশে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। পশ্চিমা কর্মকর্তারা ভূমিভিত্তিক লেজার, বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যাহত করার ব্যবস্থা, সাইবার হামলা এবং উপগ্রহবিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখছেন।

‘শিকারি’ উপগ্রহের উত্থান : যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়াÑতিন দেশই এমন বিশেষ উপগ্রহ পরিচালনা করছে, যেগুলো নিজেদের কক্ষপথ পরিবর্তন করে অন্য মহাকাশযানের কাছে যেতে পারে। চীনা উপগ্রহগুলো ইতোমধ্যে একাধিক মহাকাশযানকে খুব কাছাকাছি এনে সমন্বিতভাবে গতিপথ পরিবর্তনের মতো জটিল মহড়া চালিয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এ ধরনের কার্যক্রমকে অনেক সময় যুদ্ধবিমানের মুখোমুখি লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া চীনা মহাকাশযান নিষ্ক্রিয় উপগ্রহকে ধরে অন্য কক্ষপথে সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও প্রদর্শন করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। গত বছর চীন কক্ষপথে জ্বালানি স্থানান্তরের একটি পরীক্ষা চালিয়েছে বলেও মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। মহাকাশে পুনরায় জ্বালানি পাওয়ার সুযোগ থাকলে একটি মহাকাশযান দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকতে পারে এবং প্রয়োজনে একাধিক লক্ষ্যবস্তুর কাছে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

পাল্টা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র : যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের অন্যতম প্রধান মহাকাশ শক্তি হলেও চীন দ্রুত উপগ্রহের সংখ্যা ও মিশনের জটিলতা বাড়াচ্ছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও নিজস্ব মহাকাশ সক্ষমতা শক্তিশালী করছে এবং মিত্রদের সঙ্গে যৌথ অভিযান বাড়াচ্ছে। মার্কিন মহাকাশ বাহিনী গত জুনে ভূমিভিত্তিক একটি তড়িৎ-চৌম্বকীয় অস্ত্র যুক্ত করার কথা জানিয়েছে।

এর উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষের উপগ্রহকে অচল বা অকার্যকর করে দেওয়া। এর পাশাপাশি কক্ষপথে প্রতিরোধ ও আক্রমণ সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বলা হচ্ছে। অন্যদিকে, চীন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সামরিকীকরণের সমালোচনা করেছে। বেইজিং দাবি করেছে, তারা মহাকাশের শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের পক্ষে এবং মহাকাশে অস্ত্রের প্রতিযোগিতার বিরোধী। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাদের মহাকাশযান ও উপগ্রহের কার্যক্রমকে শান্তিপূর্ণ গবেষণা ও মহাকাশ পরিবেশ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত বলে বর্ণনা করেছে।

কক্ষপথে বাড়ছে উত্তেজনা : পৃথিবীর কক্ষপথ যত ঘনবসতিপূর্ণ হচ্ছে, ততই সামরিক ও বাণিজ্যিক উপগ্রহের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মহাকাশে কোনো সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব শুধু মহাকাশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; যোগাযোগ, নেভিগেশন, গোয়েন্দা নজরদারি এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মহাকাশ সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা তাই ভবিষ্যতের যুদ্ধের ধরন বদলে দিতে পারে।

কক্ষপথে ধাওয়া, নজরদারি, জ্বালানি সরবরাহ, কবজা এবং উপগ্রহ অচল করার প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ততই মহাকাশকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনার নতুন অধ্যায় তৈরি হচ্ছে।