আজ মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৬ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
বজ্রসহ বৃষ্টি
২৯°C
সর্বোচ্চ: ৩০°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯৯%

নিষেধাজ্ঞা শেষ: উৎকোচ ও দস্যু আতঙ্কে সুন্দরবনে জীবিকার যুদ্ধে বনজীবীরা

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:26:51 am, Tuesday, 1 September 2026
  • 5

নিষেধাজ্ঞা শেষ: উৎকোচ ও দস্যু আতঙ্কে সুন্দরবনে জীবিকার যুদ্ধে বনজীবীরা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী ও মৎস্যসম্পদের প্রজনন সুরক্ষায় টানা তিন মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে আজ মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) থেকে আবারও খুলছে সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের দুয়ার।

নিয়ম মেনে পাস-পারমিট (বিএলসি) নিয়ে বনে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন জেলে, বাওয়ালী ও মৌয়ালরা। একই সঙ্গে ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের জন্যও উন্মুক্ত হচ্ছে এই বিশ্ব ঐতিহ্য। তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বনের দুয়ার খুললেও ঘুষ-দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং বনদস্যুতার আতঙ্কে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার বনজীবী। সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।

আজ থেকে বন খোলার প্রশাসনিক প্রস্তুতি হিসেবে জুলাই মাসে বিভিন্ন স্টেশনে বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) নবায়নের কাজ সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনে ১,০১৬টি, কদম তলায় ৬২৩টি, কৈখালীতে ৪৩৮টি এবং কোবাতক স্টেশনে ৫৯২টি বিএলসি নবায়ন করা হয়েছে। নবায়ন ফি নিয়ে নয়ছয় ও দালাল সিন্ডিকেটের অভিযোগ বনের দুয়ার খুললেও জেলেদের মুখে হাসির বদলে ক্ষোভের ছাপ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক জেলে অভিযোগ করেন, সরকার নির্ধারিত বিএলসি নবায়ন ফি মাত্র ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা হলেও চার স্টেশনের কর্মকর্তা ও দালাল চক্রের যোগসাজশে লাইসেন্সপ্রতি ৯০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। সরাসরি ফি জমা দিতে গেলে জেলেদের ঘুরিয়ে দালালদের কাছে পাঠাতেন বন কর্মকর্তারা।

ভুক্তভোগী বনজীবীরা বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা এরফান উদ্দিন, কদম তলা ও কৈখালী স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শ্যামাপ্রসাদ রায় এবং কোবাতক স্টেশন কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে দালাল চক্র লালন-পালনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তোলেন। এ ছাড়া বিএলসি নবায়নে এই ব্যাপক অনিয়ম চাপা দিতে কর্মকর্তা ও তাদের সহযোগী সিন্ডিকেট অপচেষ্টা চালিয়েছে বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় জেলেরা।

অভিযোগ অস্বীকার বন কর্মকর্তাদের দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা এরফান উদ্দিন, কদম তলা ও কৈখালীর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শ্যামাপ্রসাদ রায় এবং কোবাতক স্টেশন কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বিষয়টিকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তাদের ভাষ্য, ধৃত মাছ ও কাঁকড়ার ওজন এবং নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ফি হিসাব হয়, ফলে ৩৪ টাকা ৫০ পয়সাই চূড়ান্ত নয়।

সার্বিক বিষয়ে সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বনসংরক্ষক মশিউর রহমান জানান, উত্থাপিত অনিয়মের বিষয়ে তিনি অবগত নন। তবে কোনো কর্মকর্তা অনিয়মে জড়িত থাকলে সংশ্লিষ্ট স্টেশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দস্যু আতঙ্ক ও অর্থনৈতিক সংকট দীর্ঘ বিরতির পর বন খোলার খবরে শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা, পদ্মপুকুর ও কৈখালী গ্রামে কর্মচাঞ্চল্য ফিরলেও জেলেদের মনে তাড়া করে ফিরছে জলদস্যুদের ভয়।

স্থানীয় জেলে আমিরুল ইসলাম বলেন, গত তিন মাস আয় বন্ধ থাকায় ধারদেনা করে পরিবার চালাতে হয়েছে। এখন বনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে আরেক জেলে রিপন গাজী আক্ষেপ করে বলেন, পাস পেয়ে বনে নামব ঠিকই, কিন্তু দস্যুদের উৎপাত বড় দুশ্চিন্তার কারণ। বনে ঢুকলেই ডাকাত দলকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। এত টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই।

দস্যুদের এই চড়া চাঁদা ও প্রাণনাশের ঝুঁকিতে অনেক বনজীবী এবার বনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় পর্যটন খাত একদিকে জেলেদের হাহাকার, অন্যদিকে পর্যটন খাতে স্বস্তির বাতাস। নীলডুমুর ট্রলার মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম জানান, পর্যটকদের ওপর নির্ভর করে এই অঞ্চলের প্রায় ৫০০ ট্রলার চলে। টানা তিন মাস বন্ধ থাকায় চালক ও শ্রমিকেরা কষ্টে দিন কাটিয়েছেন।

এখন আবার পর্যটক আসা শুরু করলে উপকূলীয় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা এরফান উদ্দিন জানান, প্রশাসনিক প্রস্তুতি শেষে আজ থেকেই পারমিট দেওয়া হচ্ছে। তবে বনের স্বাভাবিক বিকাশ ও পরিবেশ সুরক্ষায় বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার, অবৈধ জালের ব্যবহার কিংবা বন্যপ্রাণীর ক্ষতি করার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে।

একদিকে দীর্ঘ তিন মাস পর উপকূলীয় অর্থনীতিতে গতি ফেরার প্রত্যাশা, অন্যদিকে নবায়নে ঘুষ-দুর্নীতি ও বনদস্যুদের চাঁদাবাজির ভয়—সব মিলিয়ে চরম উৎকণ্ঠা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া নিয়ে আজ সুন্দরবনে নামছেন বনজীবীরা। জলদস্যু দমন এবং দালাল সিন্ডিকেট ভাঙতে অবিলম্বে কঠোর সরকারি পদক্ষেপের আকুল আবেদন জানিয়েছেন খেটে খাওয়া এই মানুষেরা।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

খালেদা জিয়ার আদর্শেই এগোবে বিএনপি: রিজভী

নিষেধাজ্ঞা শেষ: উৎকোচ ও দস্যু আতঙ্কে সুন্দরবনে জীবিকার যুদ্ধে বনজীবীরা

Update Time : 10:26:51 am, Tuesday, 1 September 2026

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী ও মৎস্যসম্পদের প্রজনন সুরক্ষায় টানা তিন মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে আজ মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) থেকে আবারও খুলছে সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের দুয়ার।

নিয়ম মেনে পাস-পারমিট (বিএলসি) নিয়ে বনে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন জেলে, বাওয়ালী ও মৌয়ালরা। একই সঙ্গে ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের জন্যও উন্মুক্ত হচ্ছে এই বিশ্ব ঐতিহ্য। তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বনের দুয়ার খুললেও ঘুষ-দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং বনদস্যুতার আতঙ্কে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার বনজীবী। সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।

আজ থেকে বন খোলার প্রশাসনিক প্রস্তুতি হিসেবে জুলাই মাসে বিভিন্ন স্টেশনে বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) নবায়নের কাজ সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনে ১,০১৬টি, কদম তলায় ৬২৩টি, কৈখালীতে ৪৩৮টি এবং কোবাতক স্টেশনে ৫৯২টি বিএলসি নবায়ন করা হয়েছে। নবায়ন ফি নিয়ে নয়ছয় ও দালাল সিন্ডিকেটের অভিযোগ বনের দুয়ার খুললেও জেলেদের মুখে হাসির বদলে ক্ষোভের ছাপ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক জেলে অভিযোগ করেন, সরকার নির্ধারিত বিএলসি নবায়ন ফি মাত্র ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা হলেও চার স্টেশনের কর্মকর্তা ও দালাল চক্রের যোগসাজশে লাইসেন্সপ্রতি ৯০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। সরাসরি ফি জমা দিতে গেলে জেলেদের ঘুরিয়ে দালালদের কাছে পাঠাতেন বন কর্মকর্তারা।

ভুক্তভোগী বনজীবীরা বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা এরফান উদ্দিন, কদম তলা ও কৈখালী স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শ্যামাপ্রসাদ রায় এবং কোবাতক স্টেশন কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে দালাল চক্র লালন-পালনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তোলেন। এ ছাড়া বিএলসি নবায়নে এই ব্যাপক অনিয়ম চাপা দিতে কর্মকর্তা ও তাদের সহযোগী সিন্ডিকেট অপচেষ্টা চালিয়েছে বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় জেলেরা।

অভিযোগ অস্বীকার বন কর্মকর্তাদের দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা এরফান উদ্দিন, কদম তলা ও কৈখালীর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শ্যামাপ্রসাদ রায় এবং কোবাতক স্টেশন কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বিষয়টিকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তাদের ভাষ্য, ধৃত মাছ ও কাঁকড়ার ওজন এবং নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ফি হিসাব হয়, ফলে ৩৪ টাকা ৫০ পয়সাই চূড়ান্ত নয়।

সার্বিক বিষয়ে সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বনসংরক্ষক মশিউর রহমান জানান, উত্থাপিত অনিয়মের বিষয়ে তিনি অবগত নন। তবে কোনো কর্মকর্তা অনিয়মে জড়িত থাকলে সংশ্লিষ্ট স্টেশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দস্যু আতঙ্ক ও অর্থনৈতিক সংকট দীর্ঘ বিরতির পর বন খোলার খবরে শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা, পদ্মপুকুর ও কৈখালী গ্রামে কর্মচাঞ্চল্য ফিরলেও জেলেদের মনে তাড়া করে ফিরছে জলদস্যুদের ভয়।

স্থানীয় জেলে আমিরুল ইসলাম বলেন, গত তিন মাস আয় বন্ধ থাকায় ধারদেনা করে পরিবার চালাতে হয়েছে। এখন বনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে আরেক জেলে রিপন গাজী আক্ষেপ করে বলেন, পাস পেয়ে বনে নামব ঠিকই, কিন্তু দস্যুদের উৎপাত বড় দুশ্চিন্তার কারণ। বনে ঢুকলেই ডাকাত দলকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। এত টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই।

দস্যুদের এই চড়া চাঁদা ও প্রাণনাশের ঝুঁকিতে অনেক বনজীবী এবার বনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় পর্যটন খাত একদিকে জেলেদের হাহাকার, অন্যদিকে পর্যটন খাতে স্বস্তির বাতাস। নীলডুমুর ট্রলার মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম জানান, পর্যটকদের ওপর নির্ভর করে এই অঞ্চলের প্রায় ৫০০ ট্রলার চলে। টানা তিন মাস বন্ধ থাকায় চালক ও শ্রমিকেরা কষ্টে দিন কাটিয়েছেন।

এখন আবার পর্যটক আসা শুরু করলে উপকূলীয় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা এরফান উদ্দিন জানান, প্রশাসনিক প্রস্তুতি শেষে আজ থেকেই পারমিট দেওয়া হচ্ছে। তবে বনের স্বাভাবিক বিকাশ ও পরিবেশ সুরক্ষায় বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার, অবৈধ জালের ব্যবহার কিংবা বন্যপ্রাণীর ক্ষতি করার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে।

একদিকে দীর্ঘ তিন মাস পর উপকূলীয় অর্থনীতিতে গতি ফেরার প্রত্যাশা, অন্যদিকে নবায়নে ঘুষ-দুর্নীতি ও বনদস্যুদের চাঁদাবাজির ভয়—সব মিলিয়ে চরম উৎকণ্ঠা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া নিয়ে আজ সুন্দরবনে নামছেন বনজীবীরা। জলদস্যু দমন এবং দালাল সিন্ডিকেট ভাঙতে অবিলম্বে কঠোর সরকারি পদক্ষেপের আকুল আবেদন জানিয়েছেন খেটে খাওয়া এই মানুষেরা।