চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোই যেন কাল হয়েছিল রাগিবুল হাসান হৃদয়ের জীবনে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে ঢুকে দুর্বৃত্তরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে।
ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিলেন বাবা মামুনুর রশিদও। তাকেও কুপিয়ে আহত করা হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল হৃদয়কে। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় থেমে যায় তার জীবন। সময়টা ছিল ঈদের আগের দিন। পরদিন ঈদের আনন্দের বদলে পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। আর হৃদয়ের মৃত্যুর পরদিনই সন্তান জন্ম দেন তার স্ত্রী। পৃথিবীতে আসা সেই সন্তান বাবাকে কখনো দেখার সুযোগও পেল না।
প্রায় পাঁচ বছর পর সেই হত্যার ঘটনায় আদালতের রায়ে মিলেছে দণ্ড। দুজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন বগুড়ার আদালত। সোমবার (৩১ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ-৫ এর বিচারক কৌশিক আহমেদ খোন্দকার আলোচিত এ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—সাদ্দাম হোসেন স্বাধীন ও মো. রাব্বি।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া তিনজন হলেন- আশিক, শাকিল ও মতিন। একই সঙ্গে পাঁচ আসামিকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। আদালতের আদেশ অনুযায়ী, জরিমানার অর্থের অর্ধেক নিহত হৃদয়ের সন্তানকে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাকি অর্ধেক জমা হবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। মামলার নথি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ২০ জুলাই সন্ধ্যায় বগুড়া মহানগরের কৈপাড়া পুকুরপাড় এলাকায় হৃদয়দের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদা দাবি করেন আসামিরা।
চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে ঢুকে হৃদয়কে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে আহত করেন। ছেলেকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে তার বাবা মামুনুর রশিদও হামলার শিকার হন। গুরুতর আহত হৃদয়কে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় হৃদয়ের মা আয়েশা সিদ্দিকা বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন।
তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ শেষে আদালত পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডের রায় দেন। রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে হৃদয়ের বাবা-মায়ের চোখে ছিল জল। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ছেলের হত্যার বিচার পাওয়ার স্বস্তির সঙ্গে মিশে ছিল সন্তান হারানোর গভীর শোক। কান্নাজড়িত কণ্ঠে হৃদয়ের মা আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, তার একমাত্র ছেলে ছিলেন কোরআনের হাফেজ।
ঈদের আগের দিন তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয়। পরদিন ঈদের দিনই তিনি মারা যান। এরপর আরও একটি নির্মম স্মৃতি সামনে আসে—হৃদয়ের মৃত্যুর পরদিনই তার স্ত্রী সন্তান প্রসব করেন। বাবার মুখ দেখার আগেই পৃথিবীতে আসে সেই শিশু। আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ‘আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। আমরা রায়ে সন্তুষ্ট। দ্রুত এই রায় কার্যকর হোক।
’ হৃদয়ের বাবা মামুনুর রশিদও আদালতের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মাসুদার রহমান বলেন, চাঁদা না পেয়ে আসামিরা হৃদয়কে নৃশংসভাবে হত্যা করেন। তদন্ত শেষে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত পাঁচ আসামিকে দণ্ড দিয়েছেন। তিনি বলেন, রায় দ্রুত কার্যকর করা হলে নিহতের পরিবার ন্যায়বিচারের পূর্ণতা পাবে। একটি চাঁদার দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল বিরোধ।
শেষ হয়েছিল একটি পরিবারের একমাত্র ছেলেকে হারানোর মধ্য দিয়ে। পাঁচ বছর পর আদালতের রায়ে সেই ঘটনার আইনি পরিণতি হলেও, হৃদয়ের বাবা-মায়ের কাছে ফিরে আসবে না সেই ঈদের দিন হারিয়ে যাওয়া সন্তান—আর বাবাকে না দেখেই বড় হতে থাকা শিশুটির কাছেও ‘বাবা’ শব্দটি থেকে যাবে এক অপূর্ণ গল্প হয়ে।



















