আজ রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
১৫ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি
৩১°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৮°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯৮%

মাদকের অন্ধকার দূর করে আলোর পথে চট্টগ্রাম রেঞ্জ

  • MIT ERP
  • Update Time : 01:55:25 pm, Saturday, 29 August 2026
  • 21

মাদকের অন্ধকার দূর করে আলোর পথে চট্টগ্রাম রেঞ্জ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

মাদক একটি নীরব ঘাতক, যা গুলি ছোড়ে না কিংবা বিস্ফোরণ ঘটায় না; অথচ ধীরে ধীরে একজন মানুষ, একটি পরিবার এবং একটি পুরো প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেয়। মাদকের এই ভয়াল বিস্তার তাই কেবল আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।

আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন সাহসী, সৎ ও দৃঢ় নেতৃত্ব। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর দায়িত্ব গ্রহণের পর মাদকের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। রেঞ্জের বিভিন্ন জেলা সফর করে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও জোরদার করার বার্তাও দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ক্ষেত্রে মাদকের বিষয়টি অন্য যে-কোনো অঞ্চলের তুলনায় আরও স্পর্শকাতর। কারণ এই রেঞ্জের অন্তর্ভুক্ত কক্সবাজারের টেকনাফ দীর্ঘদিন ধরেই দেশের মাদক পরিস্থিতির আলোচিত একটি নাম। বিশেষ করে ইয়াবা পাচারের সঙ্গে টেকনাফের নাম বহু বছর ধরে আলোচনায় রয়েছে। সীমান্তবর্তী অবস্থান এবং মাদক চোরাচালানের নানা রুটের কারণে এই অঞ্চলে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কঠিন বাস্তবতা।

এই বাস্তবতার মধ্যেই একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা যখন মাদকের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের ঘোষণা দেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের প্রত্যাশা বেড়ে যায়। আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ মাদকের বিরুদ্ধে তার অবস্থান নতুন কোনো বিষয় নয়। এর আগে সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

অর্থাৎ দায়িত্বের স্থান পরিবর্তন হলেও মাদকের বিরুদ্ধে তার অবস্থানের ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন আসেনি। একজন পুলিশ কর্মকর্তার প্রকৃত পরিচয় তার পদবি দিয়ে নয়, তার কর্ম দিয়ে। একজন কর্মকর্তার সততা, নিষ্ঠা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের দৃঢ়তা এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে। আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা হিসেবে যে পরিচিতি অর্জন করেছেন, মাদকের বিরুদ্ধে তার অবস্থান সেই পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করা আর সেটি বাস্তবে কার্যকর করা এক বিষয় নয়। মাদকবিরোধী অভিযানকে কার্যকর করতে হলে শুধু বাহক কিংবা খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না। মাদকের মূল উৎস কোথায়, কারা সরবরাহ করছে, কারা অর্থের জোগান দিচ্ছে, কারা পরিবহন করছে এবং কারা এই বিশাল নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।

বিশেষ করে টেকনাফের মতো সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে সফলতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী গোয়েন্দা তৎপরতা। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মাদকের চালান দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের পর কোন পথে কোথায় যাচ্ছে, কারা তা গ্রহণ করছে এবং কীভাবে বাজারজাত হচ্ছে—পুরো চক্রকে শনাক্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ মাদক একটি বহুমাত্রিক অপরাধ। এর বিরুদ্ধে লড়াইটিও হতে হবে বহুমাত্রিক। আরেকটি বিষয় কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি। মাদক ব্যবসায়ীরা যদি কোনো পুলিশ সদস্য বা অন্য কোনো প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতা কিংবা প্রশ্রয় পাওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে যত বড় অভিযানই পরিচালনা করা হোক না কেন, মাদকের মূল শিকড় উপড়ে ফেলা কঠিন হবে।

তাই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রকৃত প্রয়োগ তখনই সম্ভব, যখন মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের সহযোগীদের পাশাপাশি অপরাধে সহায়তাকারী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে মাদক নির্মূলের লড়াই শুধু পুলিশের একার নয়। একটি তরুণকে মাদক থেকে দূরে রাখতে পরিবারকে ভূমিকা রাখতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

সমাজের জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দকেও এগিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে যারা ইতোমধ্যে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকাসক্ত—দুই বিষয়কে এক করে দেখলে সমস্যার পূর্ণ সমাধান হবে না। যারা মাদক বিক্রি করে এবং একটি প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন।

অন্যদিকে যারা আসক্তির শিকার, তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ প্রয়োজন। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর সামনে তাই বড় একটি সুযোগও রয়েছে, আবার বড় একটি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তার ঘোষিত কঠোর অবস্থান যদি মাঠপর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে মাদকের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম রেঞ্জে একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে।

মানুষ এখন শুধু মাদক উদ্ধারের সংখ্যা দেখতে চায় না। তারা দেখতে চায় মাদকের মূল সিন্ডিকেট কতটা দুর্বল হয়েছে। তারা জানতে চায় সীমান্তপথে মাদক প্রবেশ কতটা কমেছে। তারা দেখতে চায় বড় কারবারিরা আইনের আওতায় এসেছে কি না। সবচেয়ে বড় কথা—তারা চায় তাদের সন্তানরা মাদকের ভয়াল ছোবল থেকে নিরাপদ থাকুক। একজন পুলিশ কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় সাফল্য তখনই, যখন তার নেতৃত্বে অপরাধীরা শুধু গ্রেপ্তারের ভয় পায় না, অপরাধ করার সাহসও হারিয়ে ফেলে।

ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি তাই কেবল একটি প্রশাসনিক ঘোষণা হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে যদি বাস্তব ও ধারাবাহিক কার্যক্রমে রূপ নেয়, তাহলে এর সুফল পেতে পারে পুরো চট্টগ্রাম রেঞ্জ। বিশেষ করে কক্সবাজার-টেকনাফের মতো আলোচিত এলাকায় মাদকের নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে তা জাতীয় পর্যায়েও একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে।

মাদকের বিরুদ্ধে এই লড়াই দীর্ঘমেয়াদি। এখানে সাফল্য এক দিনে আসে না। প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, সাহস, সততা, পেশাদারিত্ব এবং কোনো ধরনের আপস না করার মানসিকতা। ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম রেঞ্জ সেই কঠিন পথেই কতটা এগিয়ে যেতে পারে—তার উত্তর দেবে সময়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তাটি ইতোমধ্যেই পৌঁছে গেছে।

এখন প্রয়োজন সেই বার্তাকে বাস্তবতায় রূপ দেওয়া। কারণ মাদকবিরোধী যুদ্ধ আসলে কোনো একজন কর্মকর্তার যুদ্ধ নয়; এটি একটি প্রজন্মকে বাঁচানোর যুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধে নেতৃত্ব যত দৃঢ় হবে, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর সম্ভাবনাও তত বেশি শক্তিশালী হবে। আকাশ চৌধুরী : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মৃত্যু ঢাকায়, দাফন দিল্লিতে: সালাহউদ্দিন আহমদ

মাদকের অন্ধকার দূর করে আলোর পথে চট্টগ্রাম রেঞ্জ

Update Time : 01:55:25 pm, Saturday, 29 August 2026

মাদক একটি নীরব ঘাতক, যা গুলি ছোড়ে না কিংবা বিস্ফোরণ ঘটায় না; অথচ ধীরে ধীরে একজন মানুষ, একটি পরিবার এবং একটি পুরো প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেয়। মাদকের এই ভয়াল বিস্তার তাই কেবল আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।

আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন সাহসী, সৎ ও দৃঢ় নেতৃত্ব। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর দায়িত্ব গ্রহণের পর মাদকের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। রেঞ্জের বিভিন্ন জেলা সফর করে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও জোরদার করার বার্তাও দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ক্ষেত্রে মাদকের বিষয়টি অন্য যে-কোনো অঞ্চলের তুলনায় আরও স্পর্শকাতর। কারণ এই রেঞ্জের অন্তর্ভুক্ত কক্সবাজারের টেকনাফ দীর্ঘদিন ধরেই দেশের মাদক পরিস্থিতির আলোচিত একটি নাম। বিশেষ করে ইয়াবা পাচারের সঙ্গে টেকনাফের নাম বহু বছর ধরে আলোচনায় রয়েছে। সীমান্তবর্তী অবস্থান এবং মাদক চোরাচালানের নানা রুটের কারণে এই অঞ্চলে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কঠিন বাস্তবতা।

এই বাস্তবতার মধ্যেই একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা যখন মাদকের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের ঘোষণা দেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের প্রত্যাশা বেড়ে যায়। আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ মাদকের বিরুদ্ধে তার অবস্থান নতুন কোনো বিষয় নয়। এর আগে সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

অর্থাৎ দায়িত্বের স্থান পরিবর্তন হলেও মাদকের বিরুদ্ধে তার অবস্থানের ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন আসেনি। একজন পুলিশ কর্মকর্তার প্রকৃত পরিচয় তার পদবি দিয়ে নয়, তার কর্ম দিয়ে। একজন কর্মকর্তার সততা, নিষ্ঠা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের দৃঢ়তা এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে। আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা হিসেবে যে পরিচিতি অর্জন করেছেন, মাদকের বিরুদ্ধে তার অবস্থান সেই পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করা আর সেটি বাস্তবে কার্যকর করা এক বিষয় নয়। মাদকবিরোধী অভিযানকে কার্যকর করতে হলে শুধু বাহক কিংবা খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না। মাদকের মূল উৎস কোথায়, কারা সরবরাহ করছে, কারা অর্থের জোগান দিচ্ছে, কারা পরিবহন করছে এবং কারা এই বিশাল নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।

বিশেষ করে টেকনাফের মতো সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে সফলতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী গোয়েন্দা তৎপরতা। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মাদকের চালান দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের পর কোন পথে কোথায় যাচ্ছে, কারা তা গ্রহণ করছে এবং কীভাবে বাজারজাত হচ্ছে—পুরো চক্রকে শনাক্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ মাদক একটি বহুমাত্রিক অপরাধ। এর বিরুদ্ধে লড়াইটিও হতে হবে বহুমাত্রিক। আরেকটি বিষয় কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি। মাদক ব্যবসায়ীরা যদি কোনো পুলিশ সদস্য বা অন্য কোনো প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতা কিংবা প্রশ্রয় পাওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে যত বড় অভিযানই পরিচালনা করা হোক না কেন, মাদকের মূল শিকড় উপড়ে ফেলা কঠিন হবে।

তাই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রকৃত প্রয়োগ তখনই সম্ভব, যখন মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের সহযোগীদের পাশাপাশি অপরাধে সহায়তাকারী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে মাদক নির্মূলের লড়াই শুধু পুলিশের একার নয়। একটি তরুণকে মাদক থেকে দূরে রাখতে পরিবারকে ভূমিকা রাখতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

সমাজের জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দকেও এগিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে যারা ইতোমধ্যে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকাসক্ত—দুই বিষয়কে এক করে দেখলে সমস্যার পূর্ণ সমাধান হবে না। যারা মাদক বিক্রি করে এবং একটি প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন।

অন্যদিকে যারা আসক্তির শিকার, তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ প্রয়োজন। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর সামনে তাই বড় একটি সুযোগও রয়েছে, আবার বড় একটি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তার ঘোষিত কঠোর অবস্থান যদি মাঠপর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে মাদকের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম রেঞ্জে একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে।

মানুষ এখন শুধু মাদক উদ্ধারের সংখ্যা দেখতে চায় না। তারা দেখতে চায় মাদকের মূল সিন্ডিকেট কতটা দুর্বল হয়েছে। তারা জানতে চায় সীমান্তপথে মাদক প্রবেশ কতটা কমেছে। তারা দেখতে চায় বড় কারবারিরা আইনের আওতায় এসেছে কি না। সবচেয়ে বড় কথা—তারা চায় তাদের সন্তানরা মাদকের ভয়াল ছোবল থেকে নিরাপদ থাকুক। একজন পুলিশ কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় সাফল্য তখনই, যখন তার নেতৃত্বে অপরাধীরা শুধু গ্রেপ্তারের ভয় পায় না, অপরাধ করার সাহসও হারিয়ে ফেলে।

ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি তাই কেবল একটি প্রশাসনিক ঘোষণা হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে যদি বাস্তব ও ধারাবাহিক কার্যক্রমে রূপ নেয়, তাহলে এর সুফল পেতে পারে পুরো চট্টগ্রাম রেঞ্জ। বিশেষ করে কক্সবাজার-টেকনাফের মতো আলোচিত এলাকায় মাদকের নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে তা জাতীয় পর্যায়েও একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে।

মাদকের বিরুদ্ধে এই লড়াই দীর্ঘমেয়াদি। এখানে সাফল্য এক দিনে আসে না। প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, সাহস, সততা, পেশাদারিত্ব এবং কোনো ধরনের আপস না করার মানসিকতা। ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম রেঞ্জ সেই কঠিন পথেই কতটা এগিয়ে যেতে পারে—তার উত্তর দেবে সময়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তাটি ইতোমধ্যেই পৌঁছে গেছে।

এখন প্রয়োজন সেই বার্তাকে বাস্তবতায় রূপ দেওয়া। কারণ মাদকবিরোধী যুদ্ধ আসলে কোনো একজন কর্মকর্তার যুদ্ধ নয়; এটি একটি প্রজন্মকে বাঁচানোর যুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধে নেতৃত্ব যত দৃঢ় হবে, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর সম্ভাবনাও তত বেশি শক্তিশালী হবে। আকাশ চৌধুরী : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।