ক্লাসরুমে শিক্ষক, ছুটির পর সেই শিক্ষকই কোচিংয়ের গুরু। অভিযোগ উঠেছে, নিজস্ব কোচিংয়ে না পড়লে পরীক্ষায় কম নম্বর দেওয়ার ভয় দেখানো হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। কোথাও কোথাও দেওয়া হচ্ছে মানসিক চাপ।
এমনকি শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। ফলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ের শিক্ষকের কাছেই কোচিং করতে হচ্ছে। যশোরের বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একশ্রেণির শিক্ষকের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ক্লাসের নামে শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে বাধ্য করার এমন অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের পাঠদান শেষে স্কুল শুরুর আগে কিংবা ছুটির পর নিজস্ব কোচিং সেন্টার অথবা ব্যক্তিগত ব্যাচে শিক্ষার্থীদের পড়ান সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা।
আর সেই কোচিংয়ে না পড়লে বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় ইচ্ছাকৃতভাবে কম নম্বর দেওয়ার ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগ অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যশোর শহরের এমএসটিপি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, নিউটাউন বালিকা বিদ্যালয়, নিউটাউন বাদশাহ ফয়সল ইসলামী ইনস্টিটিউট, সম্মিলনী ইনস্টিটিউশন, তালবাড়ীয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সেবা সংঘ বালিকা বিদ্যালয় ও মিউনিসিপ্যাল প্রিপারেটরি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একশ্রেণির শিক্ষকের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে।
অভিভাবকদের ভাষ্য, বিদ্যালয়ের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকই যখন বিদ্যালয়ের বাইরে একই শিক্ষার্থীদের পড়ান, তখন সেই কোচিং এড়িয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে পরীক্ষার নম্বর নিয়ে চাপ থাকলে অনেক শিক্ষার্থী অনিচ্ছা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের কাছে কোচিং করতে বাধ্য হয়। তাদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে যে শিক্ষক যে বিষয়ের পাঠদান করেন, অনেক ক্ষেত্রেই তিনিই আবার বিদ্যালয়ের বাইরে একই শিক্ষার্থীদের অর্থের বিনিময়ে পড়ান।
ফলে সন্তানের পড়াশোনা ও পরীক্ষার ফল নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে ওই শিক্ষকের কাছে পড়াতে হচ্ছে। সম্প্রতি এমএসটিপি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক শিমুলের বিরুদ্ধে কোচিংয়ে না পড়ার কারণে এক ছাত্রীকে শারীরিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ঘটনাটি সামনে আসার পর বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বাইরে কোচিং করানো এবং কোচিংয়ে না পড়লে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ তৈরির অভিযোগটি নতুন করে আলোচনায় আসে।
অভিভাবকদের প্রশ্ন, বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একজন শিক্ষক যদি একই শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের বাইরে অর্থের বিনিময়ে পড়ান, তাহলে শিক্ষার্থীরা কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পায়? তাদের দাবি, কোনো শিক্ষার্থীকে কোচিংয়ে যেতে বাধ্য করা কিংবা কোচিং না করায় তার মূল্যায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
অভিভাবকদের অভিযোগ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও কার্যকর নজরদারি বা দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব একটা দেখা যায় না। কোচিং বাণিজ্য বন্ধে শুধু সতর্কতা নয়, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। এ বিষয়ে যশোর শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আব্দুল হান্নান বলেন, কোচিং না পড়ায় কোনো শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় কম নম্বর দেওয়ার অভিযোগ লিখিতভাবে পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষকদের এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। নিউটাউন বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুরাইয়া শিরিন বলেন, তার বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বাইরে কোচিং করান কি না, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন। জেলা শিক্ষা অফিসার মাহফুজুল হোসেন বলেন, কোচিং করানো ও গাইড বই পড়ানো সরকারিভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) খান মাসুম বিল্লাহ বলেন, কোচিংয়ে না পড়ায় পরীক্ষায় নম্বর কম দেওয়ার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


















