নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে বিশাল একটি হিমবাহ ধসে ভয়াবহ বন্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১৮০ জন নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। হিমবাহের বরফ, পাথর, পলি ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ তীব্র গতিতে উপত্যকার মধ্য দিয়ে নেমে এসে সীমান্তবর্তী এলাকা এবং নেপালের ভাটির জনপদগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে।
কীভাবে শুরু হলো বিপর্যয় বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নেপালের তিব্বত-সংলগ্ন পার্বত্য এলাকায় প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা থেকে হিমবাহের একটি বিশাল অংশ ভেঙে উপত্যকায় পড়ে। এতে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, পলি ও গাছপালা একসঙ্গে নিচের দিকে ধেয়ে আসে। নিউজিল্যান্ডের জিএনএস সায়েন্সের প্রধান বিজ্ঞানী সাইমন কক্স বলেন, হিমবাহ ধসের ফলে তৈরি ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত গিরিখাতের মধ্য দিয়ে তীব্র গতিতে নেমে আসে।
পথে থাকা প্রায় সবকিছুই এই স্রোতে ভেসে যায়। প্রথমে এই স্রোত একটি সীমান্ত চৌকিতে আঘাত হানে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত দ্রুত পুরো এলাকা গ্রাস করছে। এ সময় মানুষ প্রাণ বাঁচাতে নিরাপদ স্থানের দিকে ছুটে পালানোর চেষ্টা করেন। এরপর সেই ধ্বংসাত্মক স্রোত ভাটির দিকে নেপালে প্রবেশ করে। এতে একাধিক গ্রাম প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি সেতু ও বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে যায়।
ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধসের কম্পন ঘটনাটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এর ফলে সৃষ্ট কম্পন প্রথমে ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত করা হয়। পরে বিস্তারিত বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে জানায়, এটি প্রকৃত ভূমিকম্প নয়; বরং হিমবাহ ধস ও ভূমিধসের কারণে সৃষ্ট একটি ভূকম্পনীয় ঘটনা। এই কম্পন ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূকম্পনীয় সংকেত হিসেবে রেকর্ড হয়।
স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ঘটনাটি ঘটে। সাইমন কক্সের মতে, ঠিক কত পরিমাণ হিমবাহ ধসে পড়েছে, তা নির্ধারণ করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে প্রাথমিকভাবে এর পরিমাণ ৫ লাখ ঘনমিটার থেকে কয়েক কোটি ঘনমিটার পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্যাটেলাইট ছবিতে খোঁজা হচ্ছে ধসের চিহ্ন দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ঘটনাটি ঘটায় উদ্ধারকাজ ও সরেজমিন তদন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফলে বিজ্ঞানীরা ঘটনার আগে ও পরে তোলা স্যাটেলাইট ছবি এবং মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করছেন। ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলিংটনের হিমবাহবিদ লরেন ভার্গো বলেন, ঘটনার আগের ও পরের স্যাটেলাইট ছবি তুলনা করে পাহাড়ের কোন অংশ ধসে গেছে এবং এতে ভূপ্রকৃতিতে কতটা পরিবর্তন এসেছে, তা বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে। কোথা থেকে এলো এত পানি?
নেপালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভূকম্পন শনাক্ত হওয়ার পরপরই কাছের একটি পানি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে সংকেত পাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ভাটির দিকে থাকা আরও কয়েকটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রও ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ে। তবে সীমান্তের কাছে কালিখোলা এলাকায় দুপুর ২টা ১৪ মিনিটে পানির স্তর ১২ দশমিক ৩ মিটার পর্যন্ত উঠে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে—এটি কি হিমবাহ হ্রদের আকস্মিক বন্যা বা গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (জিএলওএফ)?
জিএলওএফ কী? হিমবাহ গলে তৈরি হওয়া পানি যখন কোনো হ্রদে জমা হয় এবং সেই হ্রদকে আটকে রাখা দুর্বল প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যায়, তখন বিপুল পরিমাণ পানি আকস্মিকভাবে নিচের দিকে নেমে আসে। এই ঘটনাকেই বলা হয় গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা জিএলওএফ। তবে ঘটনাস্থলের কাছে কোনো বড় বিদ্যমান হিমবাহ হ্রদের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন।
তাদের ধারণা, হিমবাহের নিচে বা ভেতরে জমে থাকা পানি ধসে পড়া বরফের সঙ্গে জলপ্রপাতের মতো নিচে নেমে এসে ভয়াবহ স্রোত তৈরি করতে পারে। আরেকটি সম্ভাবনা হলো, ধসে পড়া বরফ ও ধ্বংসাবশেষ সাময়িকভাবে নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। এতে উজানে পানি জমে যায়। পরে সেই বাধা সরে গেলে জমে থাকা পানি একসঙ্গে প্রবল বেগে ভাটির দিকে ধেয়ে আসে। বর্ষা ও হিমবাহ গলার পানিতে বেড়েছে ঝুঁকি বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘটনার সময় উজানের নদীগুলোতে গ্রীষ্মকালে হিমবাহ গলে যাওয়া এবং বর্ষার বৃষ্টির কারণে পানির প্রবাহ আগে থেকেই বেশি ছিল।
এর সঙ্গে হিমবাহ ধসের ফলে বিপুল পরিমাণ পাথর, কাদা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ নদীতে যুক্ত হওয়ায় স্রোত আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। ফলে এটি শুধু বন্যা নয়, বরং পানি, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের একটি শক্তিশালী প্রবাহে পরিণত হয়। সতর্কবার্তা পেলেও পালানোর সময় ছিল অল্প নেপালি কর্তৃপক্ষ স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে প্রথম বন্যার খবর পায়। এরপর ভোতে খোশি নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোকে উচ্চ সতর্কতায় থাকতে এবং নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়।
তবে কত মানুষ এই সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন এবং সতর্ক হওয়ার পর নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য তারা কতটা সময় পেয়েছিলেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় এ ধরনের আকস্মিক বন্যার ক্ষেত্রে দ্রুত পালানোর সুযোগ খুবই সীমিত। কাদা, পাথর ও পানির মিশ্রণ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নেমে আসায় অনেক সময় যানবাহনে করেও নিরাপদে সরে যাওয়া সম্ভব হয় না।
জলবিজ্ঞানী হাতিম শরীফের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত উঁচু স্থানে উঠে যাওয়াই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা? নির্দিষ্ট কোনো হিমবাহ ধসকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন হিমবাহ ও পার্বত্য অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে হিমবাহ দ্রুত পশ্চাদপসরণ করছে। এর ফলে একদিকে ভাটির মানুষের পানির উৎসের ওপর প্রভাব পড়ছে, অন্যদিকে হিমবাহ হ্রদ ও পাহাড়ি ঢালের অস্থিতিশীলতা বাড়ছে। এতে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও অন্যান্য পার্বত্য দুর্যোগের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। হিমবাহবিদ লরেন ভার্গোর মতে, এ ধরনের ঝুঁকি কমানোর দীর্ঘমেয়াদি উপায়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সীমিত করা এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো।
আবারও সামনে এলো হিমালয়ের ভয়াবহ ঝুঁকি নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, দুর্গম হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধস, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস কতটা দ্রুত ভয়াবহ দুর্যোগে পরিণত হতে পারে। একটি হিমবাহের বিশাল অংশ পাহাড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া থেকে শুরু করে নদীর গতিপথ বদলে দেওয়া, পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত তৈরি করা এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভাটির জনপদে বিপর্যয় নামিয়ে আনা—পুরো ঘটনাপ্রবাহই হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলের ভঙ্গুরতা ও আকস্মিক দুর্যোগের ভয়াবহতা নতুন করে সামনে এনেছে।

















