দিন দিন কমার তুলনায় বাড়ছেই গ্যাসের সংকট। সংকট এত তীব্র আকার ধারণ করেছে যে বিদ্যুতে গ্যাসের সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিশেষ করে গত দুই দিন লোডশেডিংয়ে চরম দুর্বিষহ দিন কাটাতে হয়েছে দেশবাসীকে।
এক্সিলারেটের টার্মিনাল পুনরায় চালু হলে সাময়িকভাবে সরবরাহ বাড়লেও চাহিদার তুলনায় ঘাটতি রয়ে গেছে বিপুল। শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন থেকে শুরু করে আবাসিক গ্রাহক প্রায় সব শ্রেণির ভোক্তাই কমবেশি ভুগছে গ্যাসের স্বল্পতা ও নিম্নচাপে। একের পর এক এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা, খারাপ আবহাওয়ায় এলএনজি কার্গো খালাসে বিঘ্ন এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে সংকট এখন কাঠামোগত রূপ নিচ্ছে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বলছে, শুধু একটি টার্মিনাল সচল করলেই সংকটের স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। কারণ দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩.৮-৩.৯ বিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি হলেও স্বাভাবিক সময়েও সরবরাহ তার চেয়ে অনেক কম। আগস্টের মাঝামাঝি সংকটের সবচেয়ে খারাপ সময়ে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ নেমে এসেছিল প্রায় ১,৯৩০-২,২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। বিপরীতে চাহিদা ছিল প্রায় ৩,৮০০-৩,৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট।
অর্থাৎ কোনো কোনো দিনে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৬-১.৯ বিলিয়ন ঘনফুট। পেট্রোবাংলার সর্বশেষ তথ্য বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার দেশে গ্যাসের সরবরাহ ছিল ২ হাজার ১৯৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহ করা হয় ১ হাজার ৬২৫ এমএমসিএফডি গ্যাস এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে সরবরাহ হয় ৫৭০ এমএমসিএফডি পরিমাণ গ্যাস।
এরপর গত শুক্রবার চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ছিল ২ হাজার ২০১ এমএমসিএফডি গ্যাস। যেখানে দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহ করা হয় ১ হাজার ৬২১ এমএমসিএফডিড গ্যাস এবং আমদানিকৃত উৎস থেকে সরবরাহ করা হয় ৫৮০ এমএমসিএফডি গ্যাস। আর গতকাল শনিবার এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সময়ে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বেড়ে হয় ২ হাজার ৪০৭ এমএমসিএফডি গ্যাস। যেখানে দেশীয় উৎস থেকে ১ হাজার ৬২১ এমএমসিএফডি এবং আমদানি উৎস থেকে যোগ হয় ৬৮৬ এমএমসিএফডি গ্যাস।
এক্সিলারেটরের টার্মিনালটি চালু হলে কিছুটা সরবরাহ বাড়লেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকে ১ হাজার এমএমসিএফডি’র চাইতে বেশি পরিমাণ গ্যাস। একের পর এক বিপর্যয় এলএনজি টার্মিনালে দেশের বর্তমান গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট প্রতিদিন।
স্বাভাবিক অবস্থায় এই দুটি টার্মিনাল জাতীয় গ্রিডে প্রায় ১,০০০-১,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারে। কিন্তু জুলাইয়ের শেষ দিকে একটি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি সমস্যার পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হতে থাকে। একপর্যায়ে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। পরে আংশিকভাবে সরবরাহ ফিরলেও আরেক টার্মিনালও নানা সমস্যায় পড়ায় সংকট দীর্ঘায়িত হয়।
১৩ আগস্ট পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। খারাপ আবহাওয়ার কারণে এলএনজি বহনকারী জাহাজ টার্মিনালে ভিড়তে না পারায় সামিটের টার্মিনাল সরবরাহ কমাতে কমাতে একপর্যায়ে প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তখন দুটি টার্মিনাল মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে আসে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। মোট গ্যাস সরবরাহও নেমে যায় প্রায় ১,৯৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
পরিস্থিতি সাময়িকভাবে কিছুটা স্বাভাবিক হয় সামিটের টার্মিনালটি পুনরায় সরবরাহ শুরু করার পর। ১৪ আগস্ট সন্ধ্যায় টার্মিনালটি প্রায় ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট দিয়ে সরবরাহ শুরু করে এবং ধীরে ধীরে ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতায় যাওয়ার কথা জানানো হয়। কিন্তু এর মধ্যেই এক্সিলারেটের টার্মিনালে আবার সমস্যা দেখা দেয়। ফলে একটি টার্মিনাল সচল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যটির সরবরাহ বন্ধ বা কমে যাওয়ার ঘটনা সংকটের গভীরতাকে আরও স্পষ্ট করে।
তিন দিন পর এক্সিলারেট টার্মিনালের গ্যাস সরবরাহ পুনরায় চালু : কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) বা এলএনজি টার্মিনালটি তিন দিন বন্ধ থাকার পর পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করে গতকাল শনিবার দুপুর থেকে। এটিতে রিগ্যাসিফিকেশন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় দেশের চলমান তীব্র গ্যাস সংকটে কিছুটা স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে।
এলএনজি কার্গোর ঘাটতির কারণে গত তিন দিন এই টার্মিনাল দিয়ে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, এদিন দুপুর ২টার দিকে এক্সিলারেট টার্মিনাল থেকে পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। দুপুর ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত দুটি এফএসআরইউ থেকে দেশে মোট এলএনজি সরবরাহের পরিমাণ ছিল ৬৭০ এমএমসিএফডি।
অন্যদিকে, জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,৩০০ এমএমসিএফডিতে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, টার্মিনালটিতে এলএনজি সরবরাহকারী জাহাজ আজ রোববার পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের একদিন আগে শনিবার জাহাজটি পৌঁছে যাওয়ায় টার্মিনালটি চালু করা সম্ভব হয়েছে। এর আগে, মজুত এলএনজি শেষ হয়ে যাওয়ায় গত ১৯ আগস্ট থেকে এই টার্মিনালটি থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, যা দেশের বিদ্যমান গ্যাস সংকটকে আরও প্রকট করে তোলে।
সাময়িক স্বস্তি, কিন্তু সংকট কাটেনি গতকাল শনিবার এক্সিলারেটের টার্মিনালটি চালু হওয়ায় গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও চাহিদা প্রায় ৩,৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট হওয়ায় ঘাটতি তখনো ছিল প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ টার্মিনালগুলো স্বাভাবিকভাবে চললেও দেশে গ্যাসের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এ কারণেই বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন বর্তমান সংকট কি কেবল সাময়িক টার্মিনাল বিপর্যয়ের ফল, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সরবরাহ-চাহিদার মৌলিক ভারসাম্যহীনতা?
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমছে গ্যাস ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অন্যতম সমস্যা হলো দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়া। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধীরে ধীরে কমছে, কিন্তু সেই অনুপাতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো যায়নি। ফলে ঘাটতি পূরণে এলএনজির ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বেড়েছে। স্বাভাবিক দিনেও বাংলাদেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ঘনফুট, অথচ দেশীয় উৎপাদনসহ মোট সরবরাহ প্রায় ২.৬-২.৭ বিলিয়ন ঘনফুটের আশপাশে থাকে।
এলএনজি থেকে আসে প্রায় ১ বিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি। অর্থাৎ দেশীয় উৎপাদন কমার সঙ্গে সঙ্গে আমদানি করা এলএনজি দিয়ে ঘাটতি পূরণের একটি নির্ভরশীল কাঠামো তৈরি হয়েছে। একটি টার্মিনাল বন্ধ হলেই কেন এত বড় সংকট বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি অবকাঠামোর বড় অংশ দুটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল। ফলে একটি টার্মিনাল পুরোপুরি বা আংশিক বন্ধ হলে জাতীয় গ্রিডে সরাসরি কয়েকশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়।
জুলাইয়ে একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ কমেছিল। তখন জাতীয় গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২,১৭০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে, যেখানে চাহিদা ছিল প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, এতে বোঝা যায়, দেশের গ্যাস ব্যবস্থায় বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা বা পর্যাপ্ত বাফার সক্ষমতা এখনো যথেষ্ট নয়। আমাদের দেশীয় সক্ষমতা না বাড়ানো গেলে এ রকম দুর্ভোগ বারবার পোহাতে হবে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ খাত গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট। কিন্তু গ্যাসের অভাবে অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ৪,০০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছিল।
বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ঘনফুট হলেও সংকটের সময় এই খাত পেয়েছে মাত্র ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। ফলে গ্যাস সংকট সরাসরি বিদ্যুৎ সংকটে রূপ নিয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং হয়েছে। ১০ আগস্ট জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের ঘাটতি ৩,৭০০ মেগাওয়াটের বেশি হয়েছিল। রাজধানীসহ দেশের বেশির ভাগ অঞ্চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।
তীব্র গরমে দিশাহারা হয়ে পড়েছে জনজীবন। রাজধানীর মুগদা এলাকার বাসিন্দা আনিসুর রহমান বলেন, বিগত বছরগুলোতে অনেক রকম দুর্ভোগ পোহাইছি। কিন্তু কারেন্টের এই অবস্থা ছিল না। এখন দিনে যে কয় ঘণ্টা কারেন্ট থাকে তার হিসাব ছাইড়া দিছি। কয় ঘণ্টা থাকে না বলতে পারমু ঠিকঠাক। একই অভিযোগ করেন বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, তীব্র গরমে লোডশেডিংয়ে ছোট বাচ্চাগুলোর এত কষ্ট হচ্ছে।
শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত গ্যাসের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল খাতগুলোর অন্যতম শিল্প। বিশেষ করে টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং, স্টিল, সিরামিক, কাচ, সার ও বিভিন্ন ধরনের ভারী শিল্পে গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। গ্যাসের চাপ শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সংকটের সময় কারখানা সচল রাখতে বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডারে সিএনজি সরবরাহের দাবি পর্যন্ত জানিয়েছে।
এতে শুধু শিল্প উৎপাদন কমছে না বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, বাড়ছে সময়মতো পণ্য রপ্তানি করতে না পারার ঝুঁকি। বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, গ্যাস সরবরাহ অনিশ্চিত হলে একটি কারখানার জন্য উৎপাদন পরিকল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
স্বাভাবিক হয়নি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ গ্যাস সংকটের আরেকটি দৃশ্যমান প্রভাব দেখা গেছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। কম চাপের কারণে অনেক স্টেশন পর্যাপ্ত গ্যাস পায়নি। কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ির সারি তৈরি হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে।
গ্যাস সংকটে ভোগান্তি কমছে না সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকদের। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় দিনের বড় একটি সময় কেটে যাচ্ছে সিএনজি স্টেশনে। এতে একদিকে যেমন আয় কমছে, অন্যদিকে দৈনিক জমার টাকা পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে চালকদের। শনিবার দুপুরে চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাস নিতে একটি সিএনজি স্টেশনে গিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়া একটি সিএনজি স্টেশনের সামনে অপেক্ষারত চালক সাদিকুল আহমেদ বলেন, একটি গাড়ি নিয়ে দিনে দুইবার গ্যাস নিতে হয়। কিন্তু গ্যাসের চাপ কম থাকায় প্রতিবারই দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। দুই দফায় গ্যাস নিতে গিয়ে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা সময় চলে যাচ্ছে। ফলে যাত্রী পরিবহনের জন্য রাস্তায় থাকার সময় কমে যাচ্ছে এবং স্বাভাবিকভাবেই আয়ও কমে যাচ্ছে।
চালকদের অনেকের ক্ষেত্রে প্রতিদিন গাড়ির মালিককে ১২০০ টাকা জমা দিতে হয়। এর বাইরে জ্বালানি খরচ, খাবারসহ অন্যান্য ব্যয় রয়েছে। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে দীর্ঘ সময় স্টেশনে অপেক্ষা করায় অনেক দিন এই ১২০০ টাকা জমার অর্থই তুলতে পারছেন না তারা। গ্যাস সংকটের সমাধানে দ্রুত সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তারা আবাসিক গ্রাহকরাও ভুক্তভোগী শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরবরাহ দিতে গিয়ে আবাসিক গ্রাহকদের অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যায়।
চুলা জ্বলছে না, রান্না করতে দীর্ঘ সময় লাগছে এমন অভিযোগ নতুন নয়। বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কমে গেলে সাধারণ মানুষকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়। এতে পরিবারের মাসিক ব্যয় বাড়ে। মূল সংকট ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞদের দাবি, বর্তমান সংকটের দিকে তাকালে কয়েকটি দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, প্রথমত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধির গতি প্রয়োজনের তুলনায় কম।
দ্বিতীয়ত, এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে। তৃতীয়ত, আমদানিকৃত এলএনজি জাতীয় গ্রিডে ঢোকানোর ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত বিকল্প সীমিত। চতুর্থত, শিল্প, বিদ্যুৎ, আবাসিক ও পরিবহন সব খাতের চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ বৃদ্ধির সক্ষমতা সেই হারে বাড়েনি। পঞ্চমত, গ্যাস সংকট দেখা দিলে কোন খাতে কতটা সরবরাহ কমানো হবে- এমন অগ্রাধিকারভিত্তিক সংকট ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
সংকট থেকে বের হওয়ার পথ হিসেবে তিনি বলেন, গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধানে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্থলভাগের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধান দ্রুত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ওয়ার্কওভার ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, এলএনজি আমদানির পাশাপাশি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে একাধিক উৎস ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।
চতুর্থত, একটি বা দুটি টার্মিনালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।


















