গাজা যুদ্ধ, সিরিয়ায় সামরিক উপস্থিতি এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে তুরস্ক-ইসরায়েল সম্পর্ক ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। একসময় ঘনিষ্ঠ সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকা দুই দেশ এখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে পরস্পরের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সামনে এসেছে।
বিশেষ করে সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক প্রভাব বৃদ্ধিকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখছে ইসরায়েল। প্রশ্ন উঠছে— তবে কি এই উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত সরাসরি তুরস্ক-ইসরায়েল যুদ্ধে রূপ নেবে? একসময় ঘনিষ্ঠ ছিল তুরস্ক-ইসরায়েল তুরস্ক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশগুলোর একটি। ১৯৪৯ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৯০-এর দশকে তাদের সামরিক সহযোগিতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। যৌথ সামরিক মহড়া, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং অস্ত্র আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ১৯৯৬ সালে এই সামরিক সহযোগিতা আরও জোরালো হয়। ইসরায়েল তুরস্কের যুদ্ধবিমান আধুনিকায়নেও ভূমিকা রাখে। কিন্তু গাজা ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে বদলে যায়।
২০১০ সালের মাভি মারমারা ঘটনায় তুরস্কের নাগরিকসহ কয়েকজন নিহত হওয়ার পর সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতি ঘটে। গাজা যুদ্ধ বদলে দেয় সব হিসাব ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হলে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেন। এর আগে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল উল্লেখযোগ্য।
২০২৩ সালে দুই দেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। তবে গাজা যুদ্ধের পর সেই সম্পর্ক কার্যত ভেঙে পড়ে। ২০২৪ সালের মে মাসে তুরস্ক ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের আমদানি-রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেয়। আঙ্কারা জানায়, গাজায় পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ না দেওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। সিরিয়াই এখন সংঘাতের নতুন কেন্দ্র তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে সিরিয়া।
সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর দেশটির ক্ষমতার কাঠামো বদলে যায়। নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে তুরস্ক। সীমান্ত নিরাপত্তা, সামরিক সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে আঙ্কারার ভূমিকা বাড়ছে। অন্যদিকে সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ইসরায়েল। গত ১৮ আগস্ট সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের উত্তেজনা আরও বাড়ে।
ইসরায়েলের দাবি ছিল, সেখানে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছিল। তবে তুরস্ক ও সিরিয়া এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ঘটনাটি অবশ্য একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক তৎপরতার ওপর ইসরায়েল গভীর নজর রাখছে। নেতানিয়াহুর হুঁশিয়ারি সিরিয়ায় হামলার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু তুরস্ককে সতর্ক করে বলেছেন, সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি দক্ষিণ দিকে বাড়তে দেওয়া হবে না।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে সতর্ক করেছেন। ইসরায়েলের অবস্থান হলো, সিরিয়ায় তুরস্ক এমন কোনো সামরিক কাঠামো তৈরি করতে পারবে না, যা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে। অন্যদিকে আঙ্কারার অবস্থান—সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের মধ্যে থেকে দেশটির নতুন সরকারের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা করা তুরস্কের বৈধ অধিকার।
এই দুই বিপরীত অবস্থানই সিরিয়াকে সম্ভাব্য সংঘাতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র করে তুলেছে। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তুরস্কের আইনি পদক্ষেপ ইসরায়েল-তুরস্ক উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তুরস্কের আইনি উদ্যোগ। ২১ আগস্ট তুরস্ক জানায়, গাজামুখী গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় ইসরায়েলি অভিযানের ঘটনায় নেতানিয়াহু ও আরেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।
তুরস্কের পক্ষ থেকে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ চাওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর কথাও জানানো হয়েছে। তবে মনে রাখা দরকার, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ নিজে কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়। এটি কোনো ব্যক্তিকে শনাক্ত ও সাময়িকভাবে আটক করার জন্য সদস্য দেশগুলোর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সহযোগিতার অনুরোধ। তারপরও রাজনৈতিকভাবে এই পদক্ষেপের গুরুত্ব অনেক।
কারণ ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক সরাসরি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এমন আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। তাহলে কি সত্যিই যুদ্ধ হবে? বর্তমান পরিস্থিতিতে সরাসরি পূর্ণাঙ্গ তুরস্ক-ইসরায়েল যুদ্ধের সম্ভাবনা তাৎক্ষণিকভাবে খুব বেশি বলে মনে হচ্ছে না। তবে দুই দেশের মধ্যে সীমিত সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি আগের তুলনায় বেড়েছে—বিশেষ করে সিরিয়ায়। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হতে পারে ভুল হিসাব বা অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ।
যেমন, কোনো ইসরায়েলি হামলায় তুরস্কের সেনা বা সামরিক উপদেষ্টা হতাহত হলে আঙ্কারার ওপর পাল্টা জবাব দেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে। একইভাবে তুরস্কের কোনো সামরিক পদক্ষেপে ইসরায়েলি সেনা বা স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তেল আবিবও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এ ধরনের পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ থেকেই বড় সংঘাতের সূত্রপাত হতে পারে। সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে তুরস্ক সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংঘাতের কথা মাথায় রেখে গত এক দশকে তুরস্ক নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে।
ড্রোন, যুদ্ধজাহাজ, সাঁজোয়া যান, ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা তৈরিতে দেশটি সক্ষমতা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তিতে তুরস্ক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। এর ফলে সামরিক সরঞ্জামের ক্ষেত্রে বিদেশি নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ পেয়েছে দেশটি। এর পাশাপাশি ‘স্টিল ডোম’ নামে সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও গড়ে তুলছে আঙ্কারা।
এতে রাডার, কমান্ড ও কন্ট্রোল, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করার কথা। ইসরায়েলের অন্যতম বড় সামরিক সক্ষমতা হলো যুদ্ধবিমান ও দূরপাল্লার আঘাত হানার ক্ষমতা। তাই তুরস্কের জন্য শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক সহযোগিতাও বাড়াচ্ছে আঙ্কারা সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতাও জোরদার করছে তুরস্ক।
সম্প্রতি তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরালো হয়েছে। তবে এই সহযোগিতাকে সরাসরি ইসরায়েলবিরোধী সামরিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং মধ্যপ্রাচ্যে পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতায় তুরস্কের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা হিসেবেই এটি দেখা হচ্ছে। যুদ্ধ নয়, প্রতিরোধের শক্তি—এরদোয়ানের কৌশল?
সবকিছু মিলিয়ে এরদোয়ানের সামনে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে নিজের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো। গাজা ইস্যুতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও আইনি চাপ অব্যাহত রাখা, সিরিয়ায় নতুন সরকারের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি—এই তিনটি পথেই এগোতে পারে আঙ্কারা। তুরস্ক-ইসরায়েল সম্পর্কের বর্তমান উত্তেজনা তাই সরাসরি যুদ্ধের দিকে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো কঠিন।
তবে সিরিয়ায় দুই দেশের সামরিক স্বার্থ যেভাবে মুখোমুখি হচ্ছে, তাতে অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের ঝুঁকি অবশ্যই বাড়ছে।
















