যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করায় দেশটির অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ডলারের বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রার মর্যাদার কারণে এখনই পরিস্থিতি চরম সংকটজনক না হলেও অর্থনীতিবিদরা বিষয়টিকে একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন।
মাত্র এক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার সময় দেশটির ঋণ ছিল ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের কিছু কম। বর্তমানে ঋণ বাড়ছে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯০ হাজার ডলার, অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। কীভাবে এত বড় হলো ঋণ? যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ প্রথমবার ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে প্রায় ২০০ বছর সময় লেগেছিল।
১৯৮১ সালে ওই মাইলফলককে সতর্কসংকেত হিসেবে দেখেছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানও। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি ব্যয় দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি সেই হারে হয়নি। ট্রাম্প ও জো বাইডেন—দুই প্রশাসনের সময়ই বিভিন্ন খাতে বড় ধরনের সরকারি ব্যয় হয়েছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট এবং কোভিড-১৯ মহামারির মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিপুল ঋণ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন কর কমানোর ফলে সরকারের রাজস্বও চাপে পড়েছে। এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ সুদের হার যুক্ত হওয়ায় ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় আরও বেড়েছে। সুদ পরিশোধেই যাচ্ছে বিপুল অর্থ অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি হলো সুদের ব্যয়। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে।
বর্তমানে সরকারের মোট কর রাজস্বের প্রায় ২০ শতাংশই ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে, যা প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয়ের চেয়েও বেশি। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনীতির অধ্যাপক এরিক সোয়ানসনের মতে, এক দশক আগের তুলনায় এখন সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো সুদের হার। দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার বহু বছরের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এর পেছনে মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত সরকারি ঋণ নেওয়ার বিষয়টিও ভূমিকা রাখছে।
সরকারের পাশাপাশি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিপুল অর্থ ধার করছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের অর্থের জন্য সরকারের সঙ্গে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতাও তৈরি হয়েছে। এখনই কি বড় সংকট? যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ বর্তমানে ৪১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণসীমার কাছাকাছি। কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৬ সালের মধ্যে দেশটির জাতীয় ঋণ প্রায় ৬৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পরিস্থিতি এখনো তাৎক্ষণিক বিপর্যয়ের পর্যায়ে যায়নি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হওয়া এবং ডলার বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় অন্য অনেক দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা বেশি। অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এল-ইরিয়ানের ভাষায়, পরিস্থিতি এখন ‘হলুদ সতর্কসংকেতের’ পর্যায়ে রয়েছে, ‘লাল সতর্কসংকেতের’ নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ জিডিপির প্রায় ১২৬ শতাংশ। জাপান ও ইতালির মতো কয়েকটি জি-৭ দেশের তুলনায় এই অনুপাত এখনো কম। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ধীরে ধীরে কমছে বলে সতর্ক করেছেন সোয়ানসন। এতে একটি নেতিবাচক চক্র তৈরি হতে পারে—বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সরকারকে আরও বেশি সুদ দিতে হবে, আর তাতে নতুন ঋণ নেওয়ার খরচ আরও বাড়বে।
প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপরও যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ পরিস্থিতির প্রভাব শুধু সরকারের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ঋণের খরচ বাড়লে বন্ধকী ঋণ, গাড়ি কেনার ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারও বাড়তে পারে। এতে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ বেশি চাপে পড়বেন। অন্যদিকে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়লে তারা বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।
ফলে সাধারণ ভোক্তাদের ওপরও মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কমিটি ফর এ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের প্রেসিডেন্ট মায়া ম্যাকগিনেসের মতে, শেষ পর্যন্ত ঋণের বোঝা কোনো না কোনোভাবে মানুষের ব্যক্তিগত অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। সামনে কী করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র? যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ধীর হলেও এখনো প্রবৃদ্ধির মধ্যে রয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে সরকারের কর রাজস্ব বাড়বে, যা সরকারি ব্যয় ও ঋণের সুদ পরিশোধে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট না হলে সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। সম্ভাব্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে করব্যবস্থায় সংস্কার, সরকারি ব্যয় কমানো কিংবা কঠোর ব্যয়সংকোচন নীতি। প্রয়োজনে ঋণ পুনর্গঠনের মতো পদক্ষেপও আলোচনায় আসতে পারে।
সম্প্রতি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ সরকারি বন্ড পুনঃক্রয়ের মাধ্যমে বাজারে বন্ডের চাহিদা বাড়িয়ে ঋণের সুদের হার কমানোর চেষ্টা করেছে। তবে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। একদিন পরই দীর্ঘমেয়াদি ঋণের খরচ আবার বেড়ে যায়। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু একই সময়ে বড় ধরনের ঘাটতি কমানোর জন্য কর বাড়ানো বা সরকারি ব্যয় কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া রাজনৈতিকভাবে কঠিন।
এল-ইরিয়ানের আশঙ্কা, আগামী দুই থেকে তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর মতো বড় কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং রাজনৈতিক আলোচনায় এখনো কর কমানোর বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।




















