চট্টগ্রামের পাহাড় শুধু ভূপ্রকৃতির অংশ নয়; এটি নগরের পরিবেশগত ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য, জলাধার ও প্রাকৃতিক নিরাপত্তাব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সেই পাহাড় যখন ধীরে ধীরে কেটে সমতল হয়, সরকারি খাসজমি যখন অনানুষ্ঠানিকভাবে প্লটে ভাগ হয়ে যায়, আর নিম্নবিত্ত মানুষের আবাসনের প্রয়োজনকে সামনে রেখে একটি দখল-বাণিজ্যের কাঠামো তৈরি হয়—তখন সেটি আর বিচ্ছিন্ন কোনো ভূমি-সংক্রান্ত ঘটনা থাকে না।
এটি রাষ্ট্রের ভূমি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা, নগর পরিকল্পনা এবং আইনের শাসনের জন্য সরাসরি সতর্কবার্তা। সহযোগী একটি দৈনিকের সরেজমিন প্রতিবেদন বলছে,সরু মেঠো পথ পাহাড়ের গা বেয়ে ওপরে উঠে গেছে। দুই পাশে টিন, বাঁশ আর বেড়ার ছোট ছোট ঘর। কোনোটি পাহাড়ের ঢালে বিপজ্জনকভাবে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কোনোটি আবার পাহাড় কেটে নির্মমভাবে সমান করা জায়গায় মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।
কোথাও নতুন ঘরের কাঠের কাঠামো উঠছে, কোথাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সদ্য কাটা রক্তাভ মাটি। কয়েকটি স্থানে কুড়াল ও করাতের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে আছে বহু বছরের পুরোনো কাটা গাছের গুঁড়ি। এটি কোনো সুদূর দুর্গম বনাঞ্চলের ছবি নয়; চট্টগ্রাম নগরের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বরইতলী এলাকার বর্তমান বাস্তবতা। চট্টগ্রাম নগরের সীমানার ভেতরে হলেও সেখানে পৌঁছাতে হয় হাটহাজারীর বড় দিঘিরপাড় থেকে ভাটিয়ারী সংযোগ সড়ক ধরে।
৩ নম্বর বাজার থেকে মাত্র এক কিলোমিটার ভেতরে ঢুকলেই পাহাড়ঘেরা বরইতলী। আজ এই সবুজ বরইতলী রূপ নিচ্ছে এক বিভীষিকায়। প্রশাসনিক উদাসীনতা, রাজনৈতিক মাফিয়া চক্রের লোভাতুর দৃষ্টি আর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নীরব দর্শকে পরিণত হওয়ার সুযোগে চট্টগ্রামের বুকে যেন ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে আরেক ‘জঙ্গল সলিমপুর’।
এই পাহাড় নিধন ও অবৈধ দখলের খেলা কেবল কোনো স্থানীয় পরিবেশগত সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক খাসজমি ব্যবস্থাপনা, ভূমি দস্যুতা, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা অপরাধ সিন্ডিকেট এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরুপায় জীবনসংগ্রামের এক নিদারুণ ও নির্মম জাতীয় প্রতিফলন। সরকারি নথিপত্র এবং সরেজমিন বাস্তবের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল ফারাক, বরইতলী তার এক জ্বলন্ত দলিল।
ভূমি অফিসের সরকারি নথি অনুযায়ী, জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী মৌজার ৩৫৯২, ৩৬৯৬, ৩০৫৩ ও ৩৫৩০ নম্বর বিএস দাগের অধীনে মোট ৯৪ দশমিক ৪৫ একর জমি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত সরকারি ভূমি। নথিতে ৩৫৯২ দাগকে ‘টিলা’, ৩০৫৩ দাগকে ‘ছন খোলা’ এবং বাকি দুটি দাগকে ‘নাল’ জমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু কাগজের এই শ্রেণিবিন্যাসকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাস্তব চিত্রে দেখা যায়, এসব এলাকার বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে উঁচু-নিচু পাহাড় এবং সেই পাহাড়ের গা চিরে প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে হাজারো অবৈধ বসতি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের হিসাবমতে, শুধু বরইতলী অংশেই বর্তমানে তিন শতাধিক পরিবার বাস করছে। আর চারপাশের পুরো পাহাড়ি অঞ্চল হিসাব করলে এই সংখ্যা কয়েক’শ ছাড়িয়ে যাবে। দুঃখজনক বিষয় হলো, আজ পর্যন্ত সরকারের কোনো দপ্তর থেকে এই এলাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ জরিপ চালানো হয়নি। ফলে কত একর খাসজমি হাতছাড়া হয়েছে বা ঠিক কতগুলো পরিবার সেখানে বাস করছে, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে নেই।
স্যাটেলাইট ইমেজের দিকে তাকালে দেখা যায়, সবুজের বুক চিরে ছাতার মতো ছড়িয়ে পড়ছে অপরিকল্পিত ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি। রাষ্ট্র নিজের সম্পদ রক্ষায় কতটা উদাসীন ও ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে থাকতে পারে, বরইতলীর ৯৪ একর খাসজমি দখল হয়ে যাওয়া তারই এক চরম নজির। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে,সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর আজ বাংলাদেশের ইতিহাসে পাহাড় দখল, মাফিয়া রাজত্ব এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির এক অভিশপ্ত নাম হিসেবে পরিচিত।
কয়েক দশক আগে জঙ্গল সলিমপুরেও ঠিক একইভাবে পাহাড় দখল করে প্লট তৈরি করা শুরু হয়েছিল। ৫০ বা ১০০ টাকার স্ট্যাম্পে ভুয়া হস্তান্তর নামা বানিয়ে টাকার বিনিময়ে হাতবদল হতো সরকারি জমি। পরবর্তীতে সেটি একটি অদম্য ও বিশাল জনপদে রূপ নেয়। আজ জঙ্গল সলিমপুর থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করতে গেলে রাষ্ট্রকে চরম প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়, সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মুখোমুখি হতে হয়, এমনকি উচ্ছেদ অভিযান জটিল থেকে জটিলতর হয়ে ওঠে।
জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী ও বরইতলীর বর্তমান পরিস্থিতি যেন সেই জঙ্গল সলিমপুরের প্রারম্ভিক অধ্যায়ের হুবহু প্রতিচ্ছবি। জঙ্গল সলিমপুর যে অভিশপ্ত পথে হেঁটেছিল, বরইতলী আজ ঠিক একই পথে ধাবিত হচ্ছে। পাহাড় কেটে সমতল করা, সরকারি খাসজমি খণ্ড খণ্ড করে প্লট বানিয়ে বিক্রি করা, অশিক্ষিত ও নিম্ন আয়ের মানুষকে সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ে সিন্ডিকেট চালানো—সবকিছুই ঘটছে সলিমপুরের পদাঙ্ক অনুসরণ করে।
জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী এখনো সলিমপুরের মতো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি; কিন্তু এখনই যদি এর লাগাম টেনে ধরা না হয়, তবে চট্টগ্রামকে আরও একটি অপরাধের অভয়ারণ্য সহ্য করতে হবে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সম্প্রতি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, ‘আরেকটা জঙ্গল সলিমপুর হওয়ার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। দ্রুত সেখানে অভিযান পরিচালনা করে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করা হবে।
’ কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই অঙ্গীকার কি কেবল কাগজের বাঘ বা মিডিয়ার বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক অ্যাকশন দেখা যাবে? কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, সরকারের এ ধরনের হুংকার অনেক সময়ই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক টেবিলের নিচে চাপা পড়ে হারিয়ে যায়। বরইতলীতে বসতি স্থাপনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উঠে আসে এক দীর্ঘ চার দশকের ট্র্যাজেডি।
আজ থেকে প্রায় চার দশক আগে, ১৯৮৬ সালের দিকে এখানে প্রথম মানুষের আনাগোনা শুরু হয়। তৎকালীন স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ মানিকের ভাষ্যমতে, তখন সেখানে মোটে ১০ থেকে ১৫টি জীর্ণ কুটির ছিল। কিন্তু ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। সন্দ্বীপ, হাতিয়াসহ উপকূলীয় অঞ্চলের নদীভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়ে ভিটামাটি হারানো শত শত বাস্তুচ্যুত মানুষ একটু মাথার গোঁজার ঠাঁইয়ের খোঁজে এসে ভিড় জমান এই পাহাড়ে।
রাষ্ট্র যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগে গৃহহীন হওয়া এই মানুষগুলোর পুনর্বাসনে ব্যর্থ হয়েছে, তখন ভূমিদস্যু ও রাজনৈতিক দালাল চক্র তাদের সামনে ‘ত্রাতা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পোশাকশ্রমিক, দিনমজুর, রিকশাচালক, রংমিস্ত্রি কিংবা গাড়িচালকদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষকে লক্ষ্য বানিয়ে শুরু হয় এক রমরমা খাসজমি কেনাবেচার বাণিজ্য। বরইতলীর সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অন্তত ৩০ জন বাসিন্দার প্রত্যেকেই ৭০ হাজার থেকে শুরু করে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়ে ছোট ছোট পাহাড় কেটে তৈরি করা জায়গা কিনেছেন।
পাহাড়ের ওপরে বসবাসকারী পোশাকশ্রমিক আবদুর রহিমের করুণ স্বীকারোক্তি পুরো ব্যবস্থার অন্ধকার দিকটি উন্মোচিত করে দেয়। তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেরা পাহাড় কাটিনি। যারা জায়গা বিক্রি করেছে, তারাই পাহাড় কেটে ছোট ছোট প্লট তৈরি করে বুঝিয়ে দিয়েছে। কোনো কাগজ দেয়নি। ’ ক্রেতারা কেউ কোনো বৈধ দলিল দেখাতে পারেননি। যা দেওয়া হয়েছে, তা হলো মাত্র ৫০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে তৈরি একটি তথাকথিত ‘হস্তান্তর দলিল’।
এই স্ট্যাম্পের কোনো আইনি ভিত্তি নেই, রাষ্ট্রীয় রেকর্ডে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। এমন একটি ভুয়া হস্তান্তরের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যেখানে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর মনোয়ারা বেগম নামে এক নারী পাঁচটি সেমিপাকা ঘরসহ সরকারি খাসজমি সাত লাখ টাকায় মো. সাইফুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী সুরমা আক্তারের কাছে হস্তান্তর করেন। দলিলের নাম দেওয়া হয়েছে ‘টিলা’।
অর্থাৎ বুক ফুলিয়ে পাহাড়ের টিলা কেনাবেচা হচ্ছে স্ট্যাম্পের কাগজে! সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, এই খেটে খাওয়া নিম্নবিত্ত মানুষেরা নিজেদের জীবনের জমাকৃত সমস্ত সঞ্চয়— কেউ বা এনজিওর ঋণ, কেউ বা প্রবাসে থাকা স্বজনের রক্তঘাম অর্জিত টাকা তুলে দিয়েছেন ভূমিদস্যুদের হাতে। তারা ভুয়া স্ট্যাম্পকে প্রকৃত দলিল মনে করে নিশ্চিন্তে ঘর বেঁধেছেন।
কিন্তু আজ যখন উচ্ছেদের খাঁড়াগা নেমে আসছে, তখন প্রকৃত অপরাধী দালাল চক্র টাকা পকেটে পুরে সটকে পড়েছে, আর বলির পাঠা হতে চলেছে এই অসহায় ভূমিহীন মানুষগুলো। বাংলাদেশের যেকোনো অপরাধমূলক বা অবৈধ কর্মকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক দলীয় প্রভাবের উপস্থিতি এক নগ্ন সত্যি। বরইতলীও এর ব্যতিক্রম নয়। ক্ষমতাসীনদের দলীয় পরিচয় ও ক্ষমতার দাপটকে কাজে লাগিয়ে এখানে একের পর এক পাহাড় কেটে সমতল করা হয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর গাজী শফিউল আজমের অনুসারী হিসেবে পরিচিত এক প্রভাবশালী দলীয় চক্র এলাকাটিতে পাহাড় কাটা ও নতুন ঘর নির্মাণে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল। সাধারণ বাসিন্দারা তটস্থ থাকতেন এই রাজনৈতিক মাফিয়াদের ভয়ে। যদিও এ বিষয়ে কোনো লিখিত আইনি নথি পাওয়া যায়নি এবং কাউন্সিলরের কোনো সরাসরি বক্তব্য মেলেনি, কিন্তু স্থানীয় প্রতিটি ইট-পাথর এই দলীয় দাপটের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, কিন্তু পাহাড় খেকোদের সিন্ডিকেটের কোনো বদল ঘটে না। সরকার বদল হলেও কেবল মুখের রঙ আর দলীয় ব্যানার বদলায়, অপরাধের ধারা থাকে একই। বর্তমানে এই এলাকায় পাহাড় কাটা ও জমি হস্তান্তরে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের দাপট দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, হাটহাজারী উপজেলা ভূমি অফিসের প্রতিবেদনে পাহাড় কাটার সাথে যুক্ত হিসেবে উঠে এসেছে মোহাম্মদ হোসাইন নামে এক ব্যক্তির নাম, যিনি নিজেকে বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন।
যদিও তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে একে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। একইভাবে, পোশাকশ্রমিক আবদুর রহিমসহ একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন যে বর্তমানে পাহাড় কাটা ও জায়গা কেনাবেচায় প্রধান প্রভাব খাটাচ্ছেন মো. রুবেল নামের এক ব্যক্তি। রুবেল নিজেকে হাটহাজারী উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক সহদপ্তর সম্পাদক বলে পরিচয় দেন।
যদিও তিনি ক্ষমতার দাপট দেখানোর কথা অস্বীকার করেছেন, তবে বরইতলীতে জমির মধ্যস্থতা (দালালি) করার কথা সরাসরি স্বীকারও করেছেন। কেবল দেশেই নয়, এই চক্রের থাবা বিস্তৃত প্রবাসী বাংলাদেশীদের ওপরও। আবুধাবিপ্রবাসী স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ ফরহাদ অভিযোগ করেছেন যে, এই রুবেল তাঁর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন এবং গত ২৭ জুলাই ফরহাদ বাংলাদেশ দূতাবাসে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
এই যে রাজনৈতিক পরিচয়ের ছাতা ব্যবহার করে খাসজমি বিক্রি, চাঁদা আদায় এবং পাহাড় কেটে ধ্বংস করার মহোৎসব—এটি প্রমাণ করে যে দল মত নির্বিশেষে একশ্রেণির রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হায়েনা এই দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। পাহাড় রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় ভূমি প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত হতাশাজনক ও প্রশ্নবিদ্ধ।
বরইতলীতে গত ১০ বছরে একটিও কার্যকর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়নি! প্রশাসন জেনেছে, দেখেছে, কিন্তু পাহাড় ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত নীরব দর্শক হয়ে অপেক্ষা করেছে। চলতি বছরের জুনে পাহাড় কাটার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পর হাটহাজারী উপজেলা ভূমি অফিস এলাকাটি পরিদর্শন করে। সেই চিঠির সূত্র ধরে ২৮ জুলাই পরিবেশ অধিদপ্তর বরইতলীর ১৪টি স্থানে ভয়াবহ পাহাড় কাটার প্রমাণ পায়।
তারা হিসাব করে দেখে, অন্তত ১৮ হাজার ৯৯৪ ঘনফুট (প্রায় ৫৩৮ ঘনমিটার) পাহাড়ি মাটি কেটে উধাও করে দেওয়া হয়েছে! তবে পরিবেশপ্রেমীদের মতে, এটি পুরো বরইতলীর পাহাড় ধ্বংসের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র। পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? তারা ৪ আগস্ট ১৪ জন ব্যক্তিকে সর্বসাকুল্যে ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা করে তাদের দায়িত্ব শেষ করেছে!
এটি আইনি ব্যবস্থার নামে এক চরম তামাশা। যে পাহাড় কেটে লাখ লাখ টাকা দালালি করা হচ্ছে, সাত লাখ টাকায় প্লট বিক্রি হচ্ছে, সেখানে মাত্র কয়েক হাজার টাকা জরিমানা করা মূলত ভূমিদস্যুদের আরও উৎসাহ দেওয়ার সামিল। জরিমানের টাকা পরিমাপ করে ভূমিদস্যুরা পাহাড় কাটাকে তাদের ‘ব্যবসায়িক খরচ’ (Operating Cost) হিসেবে ধরে নিচ্ছে। জরিমানা দিয়ে তারা কাটা পাহাড়ে পাকা ঘর তুলে দিব্যি বসবাস করছে; কিন্তু খাসজমিও উদ্ধার হয়নি, কাটা পাহাড়ও আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়নি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা প্রশাসনিক তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থার কথা বলছেন, পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটিকে চিঠি দেওয়ার কথা বলছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যখন পাহাড়ের বুক চিরে স্কেভেটর দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছিল, তখন এই সব দপ্তর কোন ঘুমঘোরে আচ্ছন্ন ছিল? বরইতলীর এই সংকট কেবল একটি স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি বাংলাদেশের সার্বিক পরিবেশগত দূরদর্শিতার অভাবকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন অত্যন্ত চমৎকারভাবে এই দখলদারিত্বের মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলী ছকটি বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে: “নিম্নবিত্ত ও অসহায় মানুষকে সামনে রেখে প্রথমে বসতি তৈরি এবং পরে সেই বসতির আড়ালে ধাপে ধাপে পাহাড় কেটে সমতল করা পাহাড় দখলের একটি অতি পরিচিত ও পুরোনো প্রবণতা।
জঙ্গল সলিমপুরের তিল তিল করে গড়ে ওঠা বিষবৃক্ষের তিক্ত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলীতে এখনই কঠোর হস্তে পাহাড় কাটা ও দখল সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। ” অধ্যাপক কামাল হোসাইনের এই পর্যবেক্ষণকে সমগ্র দেশের প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে পরিবেশ রক্ষায় আইন আছে, ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)’ অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও মারাত্মক শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
কিন্তু আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাবে তা কেবল কাগুজে বাঘে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো কেবল সুন্দর প্রাকৃতিক ল্যান্ডস্কেপ নয়; এগুলো নগরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, প্রাকৃতির জলাধার ধরে রাখা এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বজায় রাখতে প্রাকৃতিক প্রাচীর হিসেবে কাজ করে। একের পর এক পাহাড় কেটে সাবাড় করার ফলে প্রতি বর্ষায় চট্টগ্রামে ভয়াবহ পাহাড় ধস ঘটে, ডজন ডজন প্রাণহানি ঘটে এবং নগরে সৃষ্টি হয় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।
জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী যদি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে চট্টগ্রাম শহর প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ হারিয়ে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। এখনই যদি বরইতলীকে দ্বিতীয় জঙ্গল সলিমপুর হওয়া থেকে বাঁচাতে হয়, তবে সরকারকে আমলাতান্ত্রিক চিঠিপত্র চালাচালি বন্ধ করে ক্র্যাশ প্রোগ্রামে নামতে হবে। ১.জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অবিলম্বে কঠোর ও নিরপেক্ষ উচ্ছেদ অভিযান চালাতে হবে।
কোনো রাজনৈতিক পরিচয় যেন উচ্ছেদের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। ২. যেসব ভূমিদস্যু, দালাল এবং রাজনৈতিক চক্র (যেমন অতীতে বা বর্তমানে যুক্ত থাকা গাজী শফিউল আজম বা রুবেলদের মতো অভিযুক্ত ব্যক্তিরা) সাধারণ মানুষের কাছে ভুয়া স্ট্যাম্পে খাসজমি বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে ক্রিমিনাল আইনে গ্রেপ্তার ও তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে হবে।
৩.যে সমস্ত দরিদ্র পোশাকশ্রমিক বা দিনমজুর প্রতারিত হয়ে জীবনের শেষ সম্বল হারিয়ে এখানে ঘর বেঁধেছেন, তাদের চিহ্নিত করে সরকারের আশ্রায়ণ বা পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় খাসজমির বাইরে মানবিক ভিত্তিতে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। ৪.৯৪.৪৫ একর খাসজমি অবিলম্বে কাঁটাতারের বেড়া ও ডিজিটাল সাইনবোর্ড দিয়ে চিহ্নিত করতে হবে। পাহাড় কাটছে কি না তা পর্যবেক্ষণে নিয়মিত ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।
৫.পাহাড় কাটার অপরাধে অর্থদণ্ড দিয়ে পার পাওয়া বন্ধ করতে হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে অ জামিনযোগ্য কারাদণ্ডের বিধান কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। পরিশেষে বলতে চাই,চট্টগ্রামের পরিবেশ, ঐতিহ্য ও নিরাপত্তা রক্ষায় বরইতলীকে বাঁচানো জরুরি। জঙ্গল সলিমপুরের অভিশাপ আমরা একবার দেখেছি; দ্বিতীয়বার সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া মানে রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের চরম ব্যর্থতাকে স্বীকার করে নেওয়া।
সময় শেষ হয়ে আসছে, বরইতলীর পাহাড় রক্ষা করতে হলে আঘাত হানতে হবে এখনই—দেরি হয়ে গেলে আরেকটি জঙ্গল সলিমপুরের জন্ম ঠেকানো আর কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। সুতরাং এখনই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া একান্ত জরুরী। লেখক : আহসান হাবিব বরুন, সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
















