হাম শুধু শিশুদের শরীরেই আঘাত করছে না, অসংখ্য পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তিতে আঘাত করছে। সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেকে বিক্রি করছেন নিজের সম্পদ। হামে আক্রান্ত প্রতি ১০ পরিবারের প্রায় ৯টিই চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় মেটাতে ঋণ নিয়েছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) ও ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের (আইএফআরসি) যৌথ জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
এদিকে, হামের উপসর্গ নিয়ে সোমবার (৩ আগস্ট) আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে নতুন করে ১১৩ জনের শরীরে হাম শনাক্তের তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। যৌথ জরিপে উদ্বেগজনক তথ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত পরিবারগুলোর প্রায় ৮৯ শতাংশ চিকিৎসার খরচ চালাতে ঋণের ওপর নির্ভর করেছে। একই সঙ্গে ৬১ শতাংশ পরিবার চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে নিজেদের সঞ্চয়ও শেষ করে ফেলেছে; অর্থাৎ একটি শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়া অনেক পরিবারের জন্য একই সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আর্থিক সংকট ডেকে আনছে।
দেশের ১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া হামে আক্রান্ত ২ হাজার ৭৪৬টি পরিবারের ওপর এই মূল্যায়ন পরিচালনা করা হয়। জরিপের উদ্দেশ্য ছিল হামের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বোঝার পাশাপাশি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে জরুরি নগদ সহায়তার জন্য নির্বাচন করা। মূল্যায়নের পর ২ হাজার ৪০০ পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে জরুরি নগদ সহায়তা দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া হলেও চিকিৎসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা ব্যয় পরিবারগুলোর ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলো জানিয়েছে, চিকিৎসা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট খাতে গড়ে প্রতিটি পরিবারকে প্রায় ১৬ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। এর বাইরে রয়েছে হাসপাতালে যাতায়াত, খাবার, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং দীর্ঘসময় হাসপাতালে অবস্থানের খরচ।
জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছে শতভাগ পরিবার। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ পরিবার ওষুধকে সবচেয়ে জরুরি সহায়তা হিসেবে উল্লেখ করেছে। ৩৩ শতাংশ পরিবার চেয়েছে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি-সংক্রান্ত সহায়তা। আর ২২ শতাংশ পরিবারের কাছে খাদ্যসহায়তা ছিল সবচেয়ে জরুরি। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে ৪ শতাংশ পরিবার নিজেদের সম্পদ বিক্রি করেছে।
আর প্রায় ৩ শতাংশ পরিবার অনুদানের ওপর নির্ভর করেছে। হামে আক্রান্ত ১১ মাসের মেয়েকে নিয়ে রংপুর থেকে ঢাকায় এসেছে হাজেরা খাতুনের পরিবার। মেয়েকে নিয়ে জুন মাসে ঢাকায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসেন তিনি। জীবনে প্রথমবার ঢাকায় এসে সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে ইতোমধ্যে ৭০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে তাদের।
হাজেরা খাতুন বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনা মূল্যে হলেও অনেক খরচ এর বাইরে থাকে। শুধু অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় আসতেই আমাদের প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। প্রতিদিন খাবার কিনতে হচ্ছে, বিভিন্ন মেডিকেল পরীক্ষার খরচ দিতে হচ্ছে, সঙ্গে আরও নানা দৈনন্দিন ব্যয় রয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া রোগীদের মধ্যে ৭৫ শতাংশের বয়স চার বছরের মধ্যে।
৬ থেকে ১৭ বছর বয়সি রোগী ১৯ শতাংশ এবং ১৮ বছরের বেশি বয়সি রোগী ৬ শতাংশ। এদিকে, হাম মোকাবিলায় শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমেও যুক্ত রয়েছে বিডিআরসিএস। আইএফআরসি ও এর অংশীদারদের সহায়তায় বাংলাদেশ সরকারের দেশব্যাপী হাম টিকাদান কর্মসূচিতে সহায়তা দিয়েছে সংস্থাটি। হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু দেশে এক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু এবং ১১৩ জনের শরীরে হাম শনাক্তের তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
অধিদপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়, রোববার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে যে তিনজনের প্রাণ গেছে, তাদের মধ্যে ২ জন সিলেট বিভাগের। অন্যজন ঢাকা বিভাগের। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৮৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৯৬ জনের। এ ছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে ৭৫১ জন প্রাণ হারিয়েছে।




















