আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এমন দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষস্থানীয় দেশ রাশিয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং তাদের মিত্র দেশগুলোর কয়েক হাজার নিষেধাজ্ঞা ঝুলছে রাশিয়ার ওপর।
সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত ‘ব্রিকস’ শীর্ষ সম্মেলনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানিয়েছেন, তিন হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে রাশিয়ার ওপর। তবে এসব নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত হলেও রাশিয়াকে কোণঠাসা করা যাবে না বলে মত দেশটির শীর্ষ কর্তাদের। এসব নিষেধাজ্ঞার ফলে রাশিয়া উলটো আরও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করছে বলে দাবি দেশটির।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিনিময়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা মার্কিন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ায় ‘সুইফট কোড বিনিময়’ বন্ধ থাকায় রাশিয়ার সাথে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিনিময় করা যায় না। সুইফট কোড বিনিময়ের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে অর্থ মুদ্রা বিনিময় হয়। ২০২২ সালে ইউক্রেন রাশিয়া সংকট শুরু হলে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে এই সেবা রাশিয়ায় বন্ধ হয়ে যায়।
এর ফলে রাশিয়ার সাথে বহিঃবিশ্বের মুদ্রা বিনিময় বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি ভিসা, মাস্টার কার্ড এবং আমেরিকান এক্সপ্রেস পরিচালিত ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড ব্যবহারও বন্দ হয়ে যায় দেশটিতে। ফলে রাশিয়ায় ভ্রমণ করা কোন বিদেশি পর্যটক তার আন্তর্জাতিক ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড দিয়ে দেশটিতে আর কোন লেনদেন করতে পারেন না। তাদের জন্য ‘ক্যাশ’ বা নগদ অর্থই লেনদেনের একমাত্র উপাদান।
এমন পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনে যথাক্রমে ‘মির’ এবং ‘এ৭’ নামে দুইটি সমাধান এনেছে রাশিয়া। রাশিয়ায় বসবাসকারীদের জন্য ভিসা ও মাস্টারকার্ডের মতো ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড সেবা দেয় ‘মির’। তবে ইউক্রেন সংকটের আগে রুশ ব্যাংকগুলো দ্বারা ইস্যুকৃত ভিসা ও মাস্টার কার্ড এখনও দেশটিতে সচল।
তবে সেটি শুধু রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ লেনদেনে সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে লেনদেনে ‘এ৭’ নামক আর্থিক প্রতিষ্ঠান চালু করেছে রাশিয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলারের বিপরীতে এ৭ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে স্থানীয় মুদ্রা এবং রাশিয়ার মুদ্রা রুবল এ লেনদেন করে থাকে। সম্প্রতি রাশিয়ার ইকাতেরিনবার্গ শহরে অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল অব ইয়ুথ ২০২৬’ এ অংশ নেয় ‘এ৭’।
ফেস্টিভ্যালে প্রতিষ্ঠানের ভেন্যুতে কর্মরত প্রতিনিধিরা জানান, রাশিয়ার বাইরেও এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশে ১০০টিরও বেশি দেশে কার্যক্রম রয়েছে এ৭ এর। দেশগুলোতে সরাসরি এবং এজেন্টের মাধ্যমে কার্যালয়ও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিনিময়ের মাধ্যমে অর্জিত মুনাফা থেকে রাশিয়ার বাজেটে এখন পর্যন্ত ২৫ বিলিয়নের বেশি রুবল বা প্রায় ২৭ কোটি টাকা কর প্রদান করেছে এ৭।
এ৭ প্রতিনিধিরা জানান, দ্রুতই এশিয়া এবং আফ্রিকার আরও কিছু দেশে নিজেদের কার্যক্রম বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে বেশকিছু মার্কিন এবং ইউরোপিয়ান প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের সেবা বন্ধ রয়েছে রাশিয়ায়। যেমন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ‘উবার’, এস্তোনিয়ার ‘বোল্ট’ এর মতো টেক জায়ান্টগুলো রাশিয়ায় ব্যবহার করা যায় না।
এমনকি বিভিন্ন আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ওপেন এআই এর চ্যাটজিপিটি বা গুগলের জেমিনি’র মতো প্ল্যাটফর্মগুলো রাশিয়াতে ব্যবহার করা যায় না। এমনকি অনুবাদকারী সমাধান ‘গুগল ট্রান্সলেটর’, দিকনির্দেশনা প্রদানকারী ‘গুগল ম্যাপস’, ফাইল সংরক্ষণ ও বিনিময়কারী ‘গুগল ড্রাইভস’, পেমেন্ট গেটওয়ে ‘গুগল পে’ এর মতো ডিজিটাল ইকোসিস্টেমেরও বিকল্প তৈরি করেছে রাশিয়া।
‘ইয়ানডেক্স’ নামক রাশিয়ার একটি প্ল্যাটফর্মেই একই সাথে সার্চ ইঞ্জিন (ইয়ানডেক্স ব্রাউজার), ম্যাপ (ইয়ানডেক্স ম্যাপ), অনুবাদক (ইয়ানডেক্স ট্রান্সলেট), পেমেন্ট গেটওয়ে, রাইড শেয়ারিং (ইয়ানডেক্স গো), ই-কমার্স সেবার সমন্বয়ে ‘ইয়ানডেক্স’ ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে রাশিয়া। এ ছাড়াও চীনের উইচ্যাটের মতো ‘ম্যাক্স’ এবং টেলিগ্রামের বিকল্প হিসেবে ‘ভিকে’ দেশটিতে এখন বেশ জনপ্রিয়।
রাশিয়ার জনগণ এবং সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে শুরুতে বেশ বিপাকে পড়লেও, এখন বিষয়টির সাথে মানিয়ে নিয়েছেন তারা। নিষেধাজ্ঞার কারণে বিকল্প সমাধান তৈরির মাধ্যমে নিজেদেরকে পূর্বের যেকোন সময়ের তুলনায় আরও বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণ হিসেবে দাবি করছেন তারা। ইয়ুথ ফেস্টিভ্যালে আগত পেশায় ঠিকাদার ইউরি গুস্তভ নামে এক রুশ নাগরিক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, নিষেধাজ্ঞার ফলে আমাদের (রাশিয়া) আরও ভালো হয়েছে।
রাশিয়ার নিজস্ব উৎপাদন এবং ব্যবসা বেড়েছে। যে বিষয়টির জন্য আগে বাইরের কোন কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল থাকতাম, সেই নির্ভরশীলতা কমেছে। যেমন ম্যাক ডোনাল্ড, বার্গার কিং বা কেএফসি’র মতো ফাস্টফুড চেইনগুলো বিদেশি মালিকানায় ছিল। এখন সেগুলো রাশিয়ানদের মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে। রাশিয়ানরা সেগুলো কিনে নিয়ে ‘রি-ব্র্যান্ডিং’ করে এখানকার বাজারে ব্যবসা করছে।
এতে আমাদের দেশিয় উৎপাদন বেড়েছে। অর্থ এবং মুনাফা দুটোই দেশে থাকছে। একই সুরে ইয়ুথ ফেস্টিভ্যালে বক্তব্য দিয়েছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ফেস্টিভ্যালে এক ব্রিফিং এ নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গে মারিয়া বলেন, পাশ্চাত্য দেশগুলো বিশ্বমঞ্চে রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার অসারতা উপলব্ধি করেছে, কারণ এটি আসলে অসম্ভব।
আমার মনে হয়, তাদের এই ধারণার যে কোনো ভিত্তি নেই, তা তারা নিজেরাই বুঝতে পেরেছে। তারা এখন আর বিচ্ছিন্নকরণের কথা বলে না, কারণ তা হাস্যকর। এখন তারা রাশিয়ার পরাজয় বা এ জাতীয় বিষয় নিয়ে কথা বলছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, আমাদের বিচ্ছিন্ন করার এবং আমাদের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করার যে নীতি তারা নিয়েছিল, তা অনেক আগেই ব্যর্থ হয়েছে।

























