আজ শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৩ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ০৬ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৯°C
সর্বোচ্চ: ৩৬°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৩১%

বিশেষ অভিযান সত্ত্বেও রাজধানীতে থামছে না মাদক কারবার

  • MIT ERP
  • Update Time : 11:11:12 pm, Friday, 18 September 2026
  • 19

বিশেষ অভিযান সত্ত্বেও রাজধানীতে থামছে না মাদক কারবার

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

রাজধানীতে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। এসব অভিযানে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য উদ্ধার এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হলেও থামছে না মাদকের কারবার। এক এলাকায় অভিযান চালানো হলে মাদক কারবারিরা অন্য এলাকায় তাদের বেচাকেনা চালিয়ে যাচ্ছে।

কোনো বিক্রেতা ধরা পড়লে তার জায়গা নিচ্ছে আরেকজন। একটি স্পটে চাপ বাড়লে কারবার সরছে পাশের গলি বা অন্য এলাকায়। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, অভিযানের মাঝেও মাদকের বাজার এতটা সক্রিয় থাকে কীভাবে? কারা ধরা পড়ছে আর আড়ালে থাকছে কারা? বাহক ও খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তারের মধ্যেই কি সীমাবদ্ধ থাকছে অভিযান? নাকি পৌঁছানো যাচ্ছে না সরবরাহ, অর্থ ও মূল হোতা পর্যন্ত?

ঢাকার মাদক কারবারের সাম্প্রতিক চিত্র বলছে, সমস্যাটি শুধু রাস্তায় থাকা একজন বিক্রেতা বা বাহককে ঘিরে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরবরাহ, পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা বিক্রির একাধিক স্তর। কোনো কোনো এলাকায় মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ ও অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও ঘটছে। ঢাকায় নতুন নতুন স্পটে বিক্রি হচ্ছে মাদক। মাদক ব্যবসা বিস্তারেও যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য।

একসময় নির্দিষ্ট কয়েকটি স্পটে বেচাকেনা সীমিত থাকলেও এখন ছড়িয়ে পড়েছে অলিগলি থেকে পাড়ামহল্লা, বস্তি, আবাসিক এলাকা, রেললাইন, বাজার, গ্যারেজ, এমনকি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। কোনোভাবেই রোখা যাচ্ছে না এর বিস্তার। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আকতার হোসেন জানান, মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টা থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর ৫০ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইনসহ বিভিন্ন প্রকারের বিপুল পরিমাণ মাদকসহ ৫৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ৫৮টি মামলা রুজু হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫৪৬ জনকে। তাদের কাছ থেকেও বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করা হয়। প্রতিদিন গড়ে ৫ শতাধিক ব্যক্তি মাদকসহ গ্রেপ্তার হচ্ছেন। ডিএমপির বিশেষ অভিযানের হিসাব অনুযায়ী, ১ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে ৮ হাজার ৮০০ জন গ্রেপ্তার হয়েছে।

তাদের বিরুদ্ধে ৯৪০টি মামলা হয়েছে। অভিযান জোরদার থাকলেও থামছে না মাদকের চাকা। বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, একজন বিক্রেতা গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার জায়গায় নতুন বিক্রেতা কোথা থেকে আসে, কোন পথে আসে মাদকের চালান, সরবরাহকারী কারা, মাদকের অর্থের নিয়ন্ত্রণ থাকে কার হাতে? আর খুচরা বিক্রেতাদের হাতে যে নেটওয়ার্ক মাদক পৌঁছে দিচ্ছে, সেই নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রক কারা?

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পুলিশ কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযানের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো— মাঠ পর্যায়ের মাদক বিক্রেতাদের শনাক্ত করা গেলেও শীর্ষ নেটওয়ার্ক পর্যন্ত পৌঁছানো অনেকটাই কঠিন। একজন বাহক কিংবা খুচরা বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করা গেলেও তার নেপথ্যের লোকজন এবং চালানের অর্থের উৎস চিহ্নিত করা যায় না নানা কারণে।

’ তার মতে, একটি মাদক নেটওয়ার্ককে যদি গাছের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে খুচরা বিক্রেতা তার দৃশ্যমান ডালপালার অংশ। কিন্তু সরবরাহ ও অর্থের মূল কাঠামো থাকে অনেক গভীরে। ডালপালা ছাঁটা হলে নতুন ডাল গজাতে পারে। শিকড় পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারলে কাঠামোটি টিকে যায়। এ জন্য শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যা দিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানের কার্যকারিতা বিচার করা কঠিন।

একাধিক মাদক বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাদক কারবারের একটি বড় কৌশল হলো দ্রুত জায়গা পরিবর্তন। একটি এলাকায় অভিযান হলে সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ থাকে। পরে অন্য গলি, বাসা কিংবা নতুন স্পটে আবার শুরু হয় কারবার। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প দীর্ঘদিন ধরেই মাদকবিরোধী অভিযানের আওতায় রয়েছে। ক্যাম্পে একদিকে পুলিশের অভিযান চলে, অন্যদিকে চলে মাদক বিক্রি।

এটি নিত্যদিনের চিত্র। তবে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান বলেছেন, অভিযানের কারণে মোহাম্মদপুরের মাদক ও অন্যান্য অপরাধের প্রবণতা অনেকাংশেই কমেছে। এলাকায় সব ধরনের অপরাধ রুখতে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় ২৪৭টি মাদক স্পট রয়েছে। মাদক ডিলারের সংখ্যা ২৩১। আর সক্রিয় কারবারির সংখ্যা সাড়ে ৩ হাজারের বেশি।

বড় মাদক স্পটগুলোর মধ্যে অন্যতম কড়াইল বস্তি, মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প, মিরপুরের বিহারি পট্টি, রূপনগর বস্তি, শেরেবাংলানগর এলাকা, কামরাঙ্গীরচর, কল্যাণপুর, মুগদা-মানিকনগর, হাজারীবাগ, রায়ের বাজার এলাকা। রাজধানীর মাদকবাজারকে শুধু ঢাকার অলিগলির সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে দেশের ১৮ জেলার ১০৫টি সীমান্ত পয়েন্টকে মাদক প্রবেশের পথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের বিভিন্ন করিডর দিয়ে দেশে ঢোকে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, ক্রিস্টাল মেথ, গাঁজাসহ ২৭ ধরনের মাদক। এসব চালানের বড় গন্তব্য রাজধানী ঢাকা। ফলে ঢাকার একটি স্পটে খুচরা বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করলেই সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগে না। সীমান্তে বিপুল পরিমাণ মাদক ও চোরাচালান পণ্য জব্দ হলেও সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না।

বিজিবির সরাইল রিজিয়নের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই ৯১৩ কোটি টাকার বেশি মূল্যের মাদক ও চোরাচালান পণ্য জব্দ হয়েছে। বিপুল এই জব্দের বিপরীতে প্রশ্ন হলো, কতটা চালান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রের দাবি, সীমান্ত দিয়ে ঢাকার দিকে আসা মাদকের একটি অংশ প্রথমে বিভিন্ন এলাকার বস্তির গোপন কুঠুরিতে মজুদ করা হয়।

পরে চাহিদা ও ঝুঁকি বিবেচনায় বিভিন্ন স্পটে সরবরাহ করা হয়। ফলে একটি স্পটে অভিযান চালিয়ে খুচরা বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করলেও পেছনের মজুত ও সরবরাহব্যবস্থা অক্ষত থাকে। আবার কোনো স্পটে বেচাকেনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হতে না হতেই বেছে নেওয়া হয় নতুন স্পট। এভাবে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকের হরদম কেনাবেচা চলছে রাজধানীতে।

বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, একটি এলাকায় বারবার অভিযান হওয়ার পরও যদি সেখানে নতুন করে মাদক বিক্রেতা তৈরি হয়, তাহলে শুধু স্পটে অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান কতটা সম্ভব। তাদের মতে, একটি মাদক স্পট সাধারণত একক কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। সেখানে সরবরাহকারী, পরিবহনকারী, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা এবং অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি থাকতে পারে।

জানা গেছে, মাদক কারবার ঘিরে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি আধিপত্য বিস্তারের সংঘাতেও রূপ নিচ্ছে। গত ৩০ আগস্ট রাজধানীর গেণ্ডারিয়ার স্বামীবাগের মুনশিরটেক এলাকায় মাদক কারবারের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে পথচারী ও ব্যবসায়ীসহ তিনজন আহত হন। এই ঘটনায় ডিবি চারজনকে গ্রেপ্তার করে। ডিবির দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা একটি সংঘবদ্ধ অবৈধ অস্ত্র, সন্ত্রাস ও মাদক কারবারি চক্রের সক্রিয় সদস্য।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স-নীতি অবলম্বন করে অভিযান পরিচালনা করছি। তবে শুধু অভিযানেই মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। মাদক নির্মূলে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সমাজ থেকে মাদককে রুখে দেওয়া সম্ভব। ’ অপরাধ বিশ্লেষক ড. ওমর ফারুক বলেন, ‘মাদক কারবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ অপেক্ষাকৃত আড়ালে থাকা দিক হলো অর্থের প্রবাহ।

একজন খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ টাকার মাদক আসলে একটি বড় অর্থনৈতিক চক্রের শেষ প্রান্তের লেনদেন হতে পারে। সেই অর্থ কোথা থেকে এসেছে, কার কাছে যাচ্ছে এবং কীভাবে আবার মাদক কেনার কাজে ব্যবহার হচ্ছে, তা শনাক্ত করা জরুরি। ’ তিনি আরও বলেন, ‘মাদকবিরোধী তদন্তে তাই মাদকের পাশাপাশি অর্থের পথ অনুসরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

একটি চালান আটক করা যেমন জরুরি, তেমনি সেই চালানের অর্থদাতা ও সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করাও প্রয়োজন। ’ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে মাদক ঢোকার পথ, পরিবহনব্যবস্থা, পাইকারি সরবরাহ এবং রাজধানীর খুচরা বাজার পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ঢাকার একটি স্পটে অভিযান চালিয়ে একজন বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করা গেলেও সরবরাহব্যবস্থা অক্ষত থাকলে সেই জায়গা পূরণ করতে নতুন বিক্রেতা তৈরি হতে পারে।

তাদের মতে, মাদক ব্যবসা বহুমাত্রিক অপরাধ। এখানে একজন বিক্রেতা গ্রেপ্তার হলে তার জায়গায় আরেকজন দাঁড়াতে পারে। কিন্তু সরবরাহের উৎস বন্ধ করা গেলে বাজারে চাপ তৈরি হয়। অর্থের প্রবাহ বন্ধ করা গেলে নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়। আর মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা গেলে পুরো কাঠামো ভেঙে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এ জন্য মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি প্রয়োজন সমন্বিত তদন্ত।

মাদকের উৎস, সরবরাহপথ, অর্থের লেনদেন, সম্পদ ও নেটওয়ার্কের পারস্পরিক সম্পর্ক বের করতে হবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

দাম বৃদ্ধির পরও ঢাকার বাজারে সয়াবিন তেলের সংকট কাটেনি

বিশেষ অভিযান সত্ত্বেও রাজধানীতে থামছে না মাদক কারবার

Update Time : 11:11:12 pm, Friday, 18 September 2026

রাজধানীতে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। এসব অভিযানে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য উদ্ধার এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হলেও থামছে না মাদকের কারবার। এক এলাকায় অভিযান চালানো হলে মাদক কারবারিরা অন্য এলাকায় তাদের বেচাকেনা চালিয়ে যাচ্ছে।

কোনো বিক্রেতা ধরা পড়লে তার জায়গা নিচ্ছে আরেকজন। একটি স্পটে চাপ বাড়লে কারবার সরছে পাশের গলি বা অন্য এলাকায়। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, অভিযানের মাঝেও মাদকের বাজার এতটা সক্রিয় থাকে কীভাবে? কারা ধরা পড়ছে আর আড়ালে থাকছে কারা? বাহক ও খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তারের মধ্যেই কি সীমাবদ্ধ থাকছে অভিযান? নাকি পৌঁছানো যাচ্ছে না সরবরাহ, অর্থ ও মূল হোতা পর্যন্ত?

ঢাকার মাদক কারবারের সাম্প্রতিক চিত্র বলছে, সমস্যাটি শুধু রাস্তায় থাকা একজন বিক্রেতা বা বাহককে ঘিরে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরবরাহ, পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা বিক্রির একাধিক স্তর। কোনো কোনো এলাকায় মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ ও অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও ঘটছে। ঢাকায় নতুন নতুন স্পটে বিক্রি হচ্ছে মাদক। মাদক ব্যবসা বিস্তারেও যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য।

একসময় নির্দিষ্ট কয়েকটি স্পটে বেচাকেনা সীমিত থাকলেও এখন ছড়িয়ে পড়েছে অলিগলি থেকে পাড়ামহল্লা, বস্তি, আবাসিক এলাকা, রেললাইন, বাজার, গ্যারেজ, এমনকি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। কোনোভাবেই রোখা যাচ্ছে না এর বিস্তার। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আকতার হোসেন জানান, মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টা থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর ৫০ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইনসহ বিভিন্ন প্রকারের বিপুল পরিমাণ মাদকসহ ৫৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ৫৮টি মামলা রুজু হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫৪৬ জনকে। তাদের কাছ থেকেও বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করা হয়। প্রতিদিন গড়ে ৫ শতাধিক ব্যক্তি মাদকসহ গ্রেপ্তার হচ্ছেন। ডিএমপির বিশেষ অভিযানের হিসাব অনুযায়ী, ১ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে ৮ হাজার ৮০০ জন গ্রেপ্তার হয়েছে।

তাদের বিরুদ্ধে ৯৪০টি মামলা হয়েছে। অভিযান জোরদার থাকলেও থামছে না মাদকের চাকা। বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, একজন বিক্রেতা গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার জায়গায় নতুন বিক্রেতা কোথা থেকে আসে, কোন পথে আসে মাদকের চালান, সরবরাহকারী কারা, মাদকের অর্থের নিয়ন্ত্রণ থাকে কার হাতে? আর খুচরা বিক্রেতাদের হাতে যে নেটওয়ার্ক মাদক পৌঁছে দিচ্ছে, সেই নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রক কারা?

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পুলিশ কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযানের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো— মাঠ পর্যায়ের মাদক বিক্রেতাদের শনাক্ত করা গেলেও শীর্ষ নেটওয়ার্ক পর্যন্ত পৌঁছানো অনেকটাই কঠিন। একজন বাহক কিংবা খুচরা বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করা গেলেও তার নেপথ্যের লোকজন এবং চালানের অর্থের উৎস চিহ্নিত করা যায় না নানা কারণে।

’ তার মতে, একটি মাদক নেটওয়ার্ককে যদি গাছের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে খুচরা বিক্রেতা তার দৃশ্যমান ডালপালার অংশ। কিন্তু সরবরাহ ও অর্থের মূল কাঠামো থাকে অনেক গভীরে। ডালপালা ছাঁটা হলে নতুন ডাল গজাতে পারে। শিকড় পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারলে কাঠামোটি টিকে যায়। এ জন্য শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যা দিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানের কার্যকারিতা বিচার করা কঠিন।

একাধিক মাদক বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাদক কারবারের একটি বড় কৌশল হলো দ্রুত জায়গা পরিবর্তন। একটি এলাকায় অভিযান হলে সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ থাকে। পরে অন্য গলি, বাসা কিংবা নতুন স্পটে আবার শুরু হয় কারবার। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প দীর্ঘদিন ধরেই মাদকবিরোধী অভিযানের আওতায় রয়েছে। ক্যাম্পে একদিকে পুলিশের অভিযান চলে, অন্যদিকে চলে মাদক বিক্রি।

এটি নিত্যদিনের চিত্র। তবে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান বলেছেন, অভিযানের কারণে মোহাম্মদপুরের মাদক ও অন্যান্য অপরাধের প্রবণতা অনেকাংশেই কমেছে। এলাকায় সব ধরনের অপরাধ রুখতে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় ২৪৭টি মাদক স্পট রয়েছে। মাদক ডিলারের সংখ্যা ২৩১। আর সক্রিয় কারবারির সংখ্যা সাড়ে ৩ হাজারের বেশি।

বড় মাদক স্পটগুলোর মধ্যে অন্যতম কড়াইল বস্তি, মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প, মিরপুরের বিহারি পট্টি, রূপনগর বস্তি, শেরেবাংলানগর এলাকা, কামরাঙ্গীরচর, কল্যাণপুর, মুগদা-মানিকনগর, হাজারীবাগ, রায়ের বাজার এলাকা। রাজধানীর মাদকবাজারকে শুধু ঢাকার অলিগলির সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে দেশের ১৮ জেলার ১০৫টি সীমান্ত পয়েন্টকে মাদক প্রবেশের পথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের বিভিন্ন করিডর দিয়ে দেশে ঢোকে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, ক্রিস্টাল মেথ, গাঁজাসহ ২৭ ধরনের মাদক। এসব চালানের বড় গন্তব্য রাজধানী ঢাকা। ফলে ঢাকার একটি স্পটে খুচরা বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করলেই সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগে না। সীমান্তে বিপুল পরিমাণ মাদক ও চোরাচালান পণ্য জব্দ হলেও সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না।

বিজিবির সরাইল রিজিয়নের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই ৯১৩ কোটি টাকার বেশি মূল্যের মাদক ও চোরাচালান পণ্য জব্দ হয়েছে। বিপুল এই জব্দের বিপরীতে প্রশ্ন হলো, কতটা চালান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রের দাবি, সীমান্ত দিয়ে ঢাকার দিকে আসা মাদকের একটি অংশ প্রথমে বিভিন্ন এলাকার বস্তির গোপন কুঠুরিতে মজুদ করা হয়।

পরে চাহিদা ও ঝুঁকি বিবেচনায় বিভিন্ন স্পটে সরবরাহ করা হয়। ফলে একটি স্পটে অভিযান চালিয়ে খুচরা বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করলেও পেছনের মজুত ও সরবরাহব্যবস্থা অক্ষত থাকে। আবার কোনো স্পটে বেচাকেনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হতে না হতেই বেছে নেওয়া হয় নতুন স্পট। এভাবে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকের হরদম কেনাবেচা চলছে রাজধানীতে।

বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, একটি এলাকায় বারবার অভিযান হওয়ার পরও যদি সেখানে নতুন করে মাদক বিক্রেতা তৈরি হয়, তাহলে শুধু স্পটে অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান কতটা সম্ভব। তাদের মতে, একটি মাদক স্পট সাধারণত একক কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। সেখানে সরবরাহকারী, পরিবহনকারী, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা এবং অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি থাকতে পারে।

জানা গেছে, মাদক কারবার ঘিরে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি আধিপত্য বিস্তারের সংঘাতেও রূপ নিচ্ছে। গত ৩০ আগস্ট রাজধানীর গেণ্ডারিয়ার স্বামীবাগের মুনশিরটেক এলাকায় মাদক কারবারের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে পথচারী ও ব্যবসায়ীসহ তিনজন আহত হন। এই ঘটনায় ডিবি চারজনকে গ্রেপ্তার করে। ডিবির দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা একটি সংঘবদ্ধ অবৈধ অস্ত্র, সন্ত্রাস ও মাদক কারবারি চক্রের সক্রিয় সদস্য।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স-নীতি অবলম্বন করে অভিযান পরিচালনা করছি। তবে শুধু অভিযানেই মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। মাদক নির্মূলে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সমাজ থেকে মাদককে রুখে দেওয়া সম্ভব। ’ অপরাধ বিশ্লেষক ড. ওমর ফারুক বলেন, ‘মাদক কারবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ অপেক্ষাকৃত আড়ালে থাকা দিক হলো অর্থের প্রবাহ।

একজন খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ টাকার মাদক আসলে একটি বড় অর্থনৈতিক চক্রের শেষ প্রান্তের লেনদেন হতে পারে। সেই অর্থ কোথা থেকে এসেছে, কার কাছে যাচ্ছে এবং কীভাবে আবার মাদক কেনার কাজে ব্যবহার হচ্ছে, তা শনাক্ত করা জরুরি। ’ তিনি আরও বলেন, ‘মাদকবিরোধী তদন্তে তাই মাদকের পাশাপাশি অর্থের পথ অনুসরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

একটি চালান আটক করা যেমন জরুরি, তেমনি সেই চালানের অর্থদাতা ও সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করাও প্রয়োজন। ’ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে মাদক ঢোকার পথ, পরিবহনব্যবস্থা, পাইকারি সরবরাহ এবং রাজধানীর খুচরা বাজার পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ঢাকার একটি স্পটে অভিযান চালিয়ে একজন বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করা গেলেও সরবরাহব্যবস্থা অক্ষত থাকলে সেই জায়গা পূরণ করতে নতুন বিক্রেতা তৈরি হতে পারে।

তাদের মতে, মাদক ব্যবসা বহুমাত্রিক অপরাধ। এখানে একজন বিক্রেতা গ্রেপ্তার হলে তার জায়গায় আরেকজন দাঁড়াতে পারে। কিন্তু সরবরাহের উৎস বন্ধ করা গেলে বাজারে চাপ তৈরি হয়। অর্থের প্রবাহ বন্ধ করা গেলে নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়। আর মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা গেলে পুরো কাঠামো ভেঙে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এ জন্য মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি প্রয়োজন সমন্বিত তদন্ত।

মাদকের উৎস, সরবরাহপথ, অর্থের লেনদেন, সম্পদ ও নেটওয়ার্কের পারস্পরিক সম্পর্ক বের করতে হবে।