কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস নিজের সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অসহায়, অসচ্ছল ও সমস্যাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রশাসনিক ব্যস্ততা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে আসা সাধারণ মানুষের কথা শোনেন তিনি। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি তাদের সমস্যার একটি টেকসই সমাধানের পথ খুঁজে দেওয়ারও চেষ্টা করছেন এই কর্মকর্তা।
বর্তমানে ইউএনওর দায়িত্বের পাশাপাশি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা পরিষদ প্রশাসক ও পৌর প্রশাসকের দায়িত্বও পালন করছেন রূপম দাস। ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম, ভূমি অফিস, পৌরসভার নাগরিক সেবা, মোবাইল কোর্ট, বিভিন্ন তদন্ত ও মনিটরিং এবং সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে তাকে ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে। এর মধ্যেও অসচ্ছল মানুষের সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন তিনি।
সম্প্রতি চরপাকুন্দিয়া গ্রামের নুরু মিয়া বয়সের কারণে আগের মতো কাজ না পাওয়ায় উপজেলা পরিষদের গেটের নিচে অস্থায়ীভাবে চা বিক্রি শুরু করেন। সরকারি জায়গায় স্থায়ীভাবে দোকান বসানোর সুযোগ না থাকায় তাকে বিষয়টি জানানো হয়। পরে নিজের অসচ্ছলতা ও জীবিকার সমস্যার কথা ইউএনও রূপম দাসকে জানান নুরু মিয়া। নুরু মিয়ার কথা শুনে তাকে শুধু আর্থিক সহায়তা না দিয়ে চা বিক্রির জন্য একটি ফ্লাস্ক কিনে দেন ইউএনও।
এতে সরকারি জায়গায় স্থায়ীভাবে দোকান না বসিয়েও ফ্লাস্কে করে চা বিক্রি করে আয় করার সুযোগ তৈরি হয় তার। বর্তমানে সেই ফ্লাস্ক নিয়েই চা বিক্রি করছেন নুরু মিয়া। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নুরু মিয়া চরপাকুন্দিয়া এলাকায় সরকারি বরাদ্দের একটি ঘরে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। দীর্ঘদিন মানুষের কাজ করে সংসার চালালেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের সুযোগ কমে যায়।
পরে জীবিকার তাগিদে চা বিক্রির উদ্যোগ নেন তিনি। ইউএনওর দেওয়া ফ্লাস্ক তার সেই উদ্যোগ চালিয়ে যাওয়ার একটি মাধ্যম হয়েছে। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের অনেকে ইউএনওর উদ্যোগের প্রশংসা করেন। পাকুন্দিয়া বাজারের ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান মাসুদ নামের একজন মন্তব্য করেন, ‘মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।
’ ওমর ফারুক নামের আরেকজন লেখেন, ‘মানুষ মানুষের জন্য। মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে আপনার এ প্রয়াস প্রশংসার দাবিদার। ’ তবে রূপম দাসের কাছে আসা মানুষের সমস্যার ধরন শুধু জীবিকা-সংক্রান্ত নয়। চিকিৎসা, শিক্ষা ও আর্থিক সংকট নিয়েও অনেকে তার কাছে সহযোগিতা চান। প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি।
তার সহযোগিতার ক্ষেত্রে শুধু নগদ অর্থ দেওয়ার পরিবর্তে সম্ভব হলে সমস্যার বিকল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থাভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে না পারা দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদেরও ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করেন রূপম দাস। ভর্তি, পড়াশোনার খরচ ও পরীক্ষার ফি দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তার নজির রয়েছে তার। এমন একজন শিক্ষার্থী বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পড়াশোনা করছেন।
অর্থের কারণে যাতে তার পড়াশোনা বন্ধ না হয়, সে জন্য ওই শিক্ষার্থীকে নিয়মিত মাসিক খরচ পাঠান ইউএনও। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর অসচ্ছল মাকেও সহযোগিতা করেন তিনি। এ ছাড়া উচ্চশিক্ষায় যেতে না পারা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে না পারা কিংবা অর্থের অভাবে ফরম পূরণ করতে না পেরে পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদেরও প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করেন তিনি।
অসচ্ছল পরিবারের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থাও করেন। রূপম দাস জানান, প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা-৯টা পর্যন্ত দাপ্তরিক কাজে সময় দিতে হয় তাকে। পৌরসভার জন্মনিবন্ধন, ওয়ারিশান সনদসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবার কাজ প্রয়োজনে রাত ১২টা পর্যন্ত করতে হয়। এর বাইরে ভূমি অফিসের কাজ, মোবাইল কোর্ট, বিভিন্ন তদন্ত ও মনিটরিং, সরকারি কর্মসূচি এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযানেও অংশ নেন তিনি।
তিনি বলেন, আমি চাই সমাজের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে। একসঙ্গে চারটি দায়িত্ব পালন করলেও মানুষের যেন কোনো ধরনের হয়রানি না হয়, সে জন্য সাধ্যমতো সর্বোচ্চ সময় ও শ্রম দিই। প্রয়োজন হলে রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করি—রাষ্ট্রের অর্পিত দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালন করাই আমার মূল লক্ষ্য। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, সহায়তার জন্য আসা মানুষকে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের সমস্যাটি কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে কমানো যায়, সেটিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
নুরু মিয়ার ক্ষেত্রে ফ্লাস্ক দেওয়ার ফলে তিনি নিজেই চা বিক্রি করে আয় করার সুযোগ পেয়েছেন। জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন রূপম দাস। এর আগে তিনি রাজশাহীতে সিনিয়র সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ৩৭তম বিসিএসের কর্মকর্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণীবিজ্ঞানে স্নাতক এবং জেনেটিক্স অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন তিনি।
তার নিজ জেলা জয়পুরহাট। দাপ্তরিক দায়িত্বের পাশাপাশি মানুষের ব্যক্তিগত সমস্যা ও প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সহযোগিতার এসব উদ্যোগের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে তার কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।



















