ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান (মিল্টন) দায়িত্ব নিয়েছেন ছয় মাস। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নগরের পরিচ্ছন্নতা, জলাবদ্ধতা নিরসন, খাল উদ্ধার, পরিবেশ রক্ষা, সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবা নিশ্চিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছেন তিনি।
পাশাপাশি নগরবাসীর দুর্ভোগ কমাতে অপরিকল্পিত সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়নকাজে সমন্বয় নিশ্চিতে ওয়াসা, তিতাস, রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। ঢাকা উত্তর সিটিকে আরো পরিচ্ছন্ন, সবুজ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে।
রূপালী বাংলাদেশ : জনদুর্ভোগ কমাতে জলাবদ্ধতা নিরসন, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার মতো দৃশ্যমান সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান কেন হচ্ছে না? শফিকুল ইসলাম খান : রাজধানীর এসব সমস্যা হঠাৎ করে বা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনসংখ্যার চাপ, জলাধার ও খাল সংকুচিত হওয়া এবং বিভিন্ন সংস্থার আলাদা আলাদা পরিকল্পনার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
ফলে রাতারাতি সব পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। কোথায় সমস্যা বেশিÑ সেগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হলো, দৃশ্যমান কাজের পাশাপাশি এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে একই সমস্যা বারবার ফিরে না আসে। রূপালী বাংলাদেশ : জলাবদ্ধতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয়। শুধু ড্রেন পরিষ্কার রাখাই কি এই সমস্যার সমাধান?
শফিকুল ইসলাম খান : না, শুধু ড্রেন পরিষ্কার করে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। খালের পানিপ্রবাহ, ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক, জলাধার ও পানি নিষ্কাশনের সঙ্গে যুক্ত পুরো ব্যবস্থাকে একসঙ্গে দেখতে হবে। এ কারণে খাল পরিষ্কার ও দখলমুক্ত রাখার পাশাপাশি যেসব এলাকা নিয়মিত পানিতে তলিয়ে যায়, সেগুলোকে আলাদা করে চিহ্নিত করা হচ্ছে। মিরপুর মুসলিম বাজার খালেও বড় পরিসরে বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে।
রূপালী বাংলাদেশ : খাল পরিষ্কার করার পর আবারও সেখানে ময়লা ফেলা ও দখলের অভিযোগ উঠছে। সেক্ষেত্রে অভিযান কতটা ফলপ্রসু বলে মনে করেন? শফিকুল ইসলাম খান : এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খাল একবার পরিষ্কার বা দখলমুক্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নিয়মিত নজরদারি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি এবং মানুষের আচরণে পরিবর্তনÑ তিনটিই দরকার।
মানুষ যদি আবার খালে ময়লা ফেলে, তাহলে সরকারি অর্থ ও শ্রম দুটোই অপচয় হয়। তাই নাগরিক সচেতনতার পাশাপাশি যারা ইচ্ছাকৃতভাবে জলাশয় দূষিত করে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। রূপালী বাংলাদেশ : রাজধানীতে একই রাস্তা বারবার খোঁড়াখুঁড়ির বিষয়টি পুরনো। এ বিষয়ে আপনাকে সোচ্চার দেখা গেছে। এটি নিয়ন্ত্রণ বা কীভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায় বলে মনে করেন?
শফিকুল ইসলাম খান : রাস্তার কাজ শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থাগুলোকে যুক্ত করা জরুরি। ওয়াসা, তিতাস, রাজউকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ইউটিলিটি লাইন আছে। একটি সংস্থা রাস্তা সংস্কার করার পর অন্য সংস্থা এসে সেটি কাটলে নাগরিকের দুর্ভোগ বাড়ে, অর্থও অপচয় হয়। তাই আগে পরিকল্পনা, পরে কাজÑ এই পদ্ধতিতে যেতে হবে। এ বিষয়ে একাধিক সমন্বয় সভাও হয়েছে।
ফলাফলের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। রূপালী বাংলাদেশ : তবে কি নগর ব্যবস্থাপনা বা জনদুর্ভোগের বড় দুর্বলতা সমন্বয়ের অভাব বলে মনে করেন? শফিকুল ইসলাম খান : সমন্বয়ের ঘাটতি একটি বড় বিষয়। তবে শুধু সমন্বয় করলেই হবে না; প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজের দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করতে হবে। পরিকল্পনা নেওয়ার সময় একটি সংস্থাকে বাদ দিয়ে অন্য সংস্থা কাজ করলে পরে সমস্যা তৈরি হয়।
তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায় থেকেই সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার। রূপালী বাংলাদেশ : গুলশান-বনানীতেও লেকগুলো দূষিত হচ্ছে। নগরের অভিজাত এলাকার জলাশয় রক্ষা করতে না পারলে অন্য এলাকার পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব? শফিকুল ইসলাম খান : জলাশয় কোনো এলাকার ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এগুলো পুরো নগরের পরিবেশব্যবস্থার অংশ। গুলশান-বনানী লেকের দূষণের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সংস্থার কার্যকর সমন্বয় জরুরি।
পয়ঃবর্জ্য যাতে জলাশয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সিটি করপোরেশন একা এই কাজ করতে পারবে না। সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে। রূপালী বাংলাদেশ : ফুটপাত দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে উচ্ছেদ অভিযান চলে, আবার কিছুদিন পর আগের অবস্থায় ফিরে যায়। স্থায়ী সমাধানে করণীয় কী? শফিকুল ইসলাম খান : শুধু উচ্ছেদ করে সমস্যার সমাধান হবে না।
যারা ফুটপাতে ব্যবসা করেন, তাদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। তাই বিকল্প স্থানে হকারদের নিবন্ধিতভাবে বসার সুযোগ তৈরির চিন্তা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পথচারীর চলাচলের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। নগর ব্যবস্থাপনায় মানবিকতা এবং শৃঙ্খলাÑ দুটিই প্রয়োজন। রূপালী বাংলাদেশ : আপনি নগরবাসী ও তাদের উন্নয়নে কী ধরনের পরিবর্তন দেখতে চান?
শফিকুল ইসলাম খান : আমি মনে করি, বৃহৎ প্রকল্পের তালিকার চেয়ে নাগরিকের প্রতিদিনের দুর্ভোগ কমানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তাগুলো অকারণে খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ হবে, বৃষ্টিসহ সব ধরনের পানি নিষ্কাষন দ্রুত হবে। নগরবাসী সচেতন হবেন, যেন তাদের কর্মকাণ্ডে রাজধানীর খাল-জলাশয়গুলো বর্জ্যে ভরে না যায়। একইসঙ্গে নগরবাসী নিরাপদে চলাচল করতে পারবেন।
কাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি এসব স্থানে বাস্তব পরিবর্তন প্রয়োজন বলে বিশ্বাস করি। রাজধানীর সমস্যার সমাধান করতে হলে সাময়িক ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনার দিকে যেতে হবে। সে লক্ষ্যেই আমাদের কাজ করতে হবে, আর সেসব কাজের মূল্যায়ন করবেন নগরবাসী।

















