স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) যেন ধীরে ধীরে পছন্দের কর্মস্থল বেছে নেওয়ার এক অঘোষিত প্ল্যাটফর্মে পরিণত হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নিজ জেলা বা নিজ এলাকায় কর্মকর্তাদের পদায়নের অভিযোগ থামছে না। বরং প্রজ্ঞাপন জারির পরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিজ জেলায় দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, নীতিমালা কি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ? সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে গত ২ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়, এলজিইডির কোনো কর্মকর্তাকে তার নিজ জেলা কিংবা স্বামী বা স্ত্রীর নিজ জেলায় পদায়ন করা যাবে না। সেই নির্দেশনার কয়েক দিনের মধ্যেই একাধিক কর্মকর্তাকে নিজ জেলায় দায়িত্ব দেওয়া হয়। সমালোচনার মুখে দুজনের বদলির আদেশ প্রত্যাহার হলেও রহস্যজনক কারণে বহাল রাখা হয় আরও দুজনের পদায়ন। জানা গেছে, প্রজ্ঞাপন জারির পর লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কাওসার আলম, নারায়ণগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসানুজ্জামান, এলজিইডি সদর দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) জাহানারা পারভীন এবং একটি প্রকল্পের উপপরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিনকে নিজ জেলায় পদায়ন করা হয়। পরে সমালোচনার মুখে কাওসার আলম ও আহসানুজ্জামানের বদলির আদেশ বাতিল করা হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে বহাল থাকে জাহানারা পারভীন ও মোহাম্মদ জামাল উদ্দিনের পদায়ন। এতে এলজিইডির ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে, একই ধরনের ঘটনায় ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো কেন? জাহানারা পারভীন ও জামাল উদ্দিনের খুঁটির জোর কোথায়? এলজিইডির চট্টগ্রাম অঞ্চলের রেজিলিয়েন্ট আরবান অ্যান্ড টেরিটোরিয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের উপপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মোহাম্মদ জামাল উদ্দিনের বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার পূর্ব উরকিরচর এলাকায়। সূত্র জানিয়েছে, স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে এবং দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে কাজ করায় স্থানীয় ঠিকাদারদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে। এমন অবস্থায় প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী যেখানে তাকে অন্যত্র বদলি করার কথা, সেখানে গত ৫ জুলাই তাকে চট্টগ্রাম জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয়। পরদিন ৬ জুলাই তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ দেন। রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপকালে তিনি (জামাল উদ্দিন) বদলির তথ্য নিশ্চিত করলেও প্রজ্ঞাপন উপেক্ষা করে নিজ জেলায় কীভাবে পদায়ন পেলেন, সে প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান। আরেকটি আলোচিত পদায়ন এলজিইডি সদর দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) জাহানারা পারভীনকে ঘিরে। গত ১৬ জুলাই তাকে টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করা হয়। অথচ সরকারি নথি ও জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী, তার এবং তার স্বামীর স্থায়ী ঠিকানা টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায় একই গ্রামে। এ ছাড়া তার স্বামী ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এসব বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জাহানারা পারভীন কথা বলতে রাজি হননি। এদিকে, সদ্য জারি হওয়া নীতিমালার সঙ্গে এই পদায়নের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন খোদ এলজিইডি সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, নিজ এলাকায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করলে স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যাবসায়িক প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকা কঠিন। এতে ঠিকাদারদের সঙ্গে অস্বচ্ছ সম্পর্ক, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাববলয় তৈরির ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাদের ভাষ্য, বদলির আগে বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং প্রশাসনিক লবিংয়ের মাধ্যমে পছন্দের জেলায় পদায়নের চেষ্টা করেন কিছু কর্মকর্তা। ফলে প্রশাসনিক প্রয়োজনের পরিবর্তে অন্য বিবেচনাই প্রাধান্য পাচ্ছে। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এলজিইডির তিনজন কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, যাদের শক্তিশালী যোগাযোগ রয়েছে, তাদের জন্য নিয়ম এক রকম। আর বাকিদের জন্য আরেক রকম। বিশ্লেষকদের মতে, জনপ্রশাসনে নিজ এলাকায় পদায়নের ওপর বিধিনিষেধ নতুন নয়। উদ্দেশ্য একটাই, স্থানীয় প্রভাবমুক্ত থেকে দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করা। তাদের মতে, একই ধরনের ঘটনায় একেকজনের ক্ষেত্রে একেক ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে পুরো নীতিমালার গ্রহণযোগ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এতে শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলাই নয়, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলজিইডি দেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন বাস্তবায়নকারী সংস্থা। প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। ফলে বদলি-পদায়ন নিয়ে সামান্য অনিয়মের অভিযোগও জনআস্থার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হলে কোনো উত্তর দেননি। তবে এর আগে তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেছিলেন, মন্ত্রীর নির্দেশেই এসব পদায়ন করা হয়েছে। নিজ জেলায় পদায়নের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি মন্ত্রীকে অবহিত করেছিলেন কি না সে প্রশ্নের অবশ্য কোনো জবাব দেননি তিনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এলজিইডির সাম্প্রতিক এসব পদায়ন এখন আর কেবল বদলি-সংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। এটি সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং উন্নয়ন প্রকল্পে জবাবদিহির প্রশ্নেও নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তাদের দাবি, একই নীতিমালার ভিন্ন প্রয়োগের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। যদি বিশেষ বিবেচনায় কোনো ব্যতিক্রম করা হয়ে থাকে, তবে তার লিখিত কারণ জনসম্মুখে প্রকাশ করা প্রয়োজন। অন্যথায় বদলি-পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে বিদ্যমান প্রশ্ন আরও গভীর হবে।
10:38 pm, Wednesday, 29 July 2026
শিরোনাম :















