আজ বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৪ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ১৭ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৯°C
সর্বোচ্চ: ৩৫°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৩৯%

দাদুর বর্তমান জীবন ও অতীতের কর্মজীবন

  • MIT ERP
  • Update Time : 12:06:46 am, Wednesday, 30 September 2026
  • 9

দাদুর বর্তমান জীবন ও অতীতের কর্মজীবন

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

দাদুর বয়স ৮৯; চুপচাপ থাকেন, নামাজ, তাসবিহ আর কুরআনের মাঝে একাকী সময় কাটে তার। আগের মতো শত শত মানুষ তার দরজায় ভিড় করে না, তিনিও চান না কেউ এসে তাকে বিরক্ত করুক। সরকারের জাঁদরেল সেক্রেটারি ছিলেন তিনি, তাই কলমের শক্তিও ছিল যথেষ্ট।

দীর্ঘ চাকরি জীবনে তার সুপারিশে বহু মানুষের ভাগ্য বদলেছে। যারাই তার কাছে চাকরির জন্য আবেদন-নিবেদন নিয়ে গেছেন, তিনি কাউকে ফিরিয়েছেন বলে জানা যায় না, সুবিধামতো ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এলাকার মানুষ তাকে খুবই ভালোবাসত; কিংবা হয়তো উল্টোটাও সত্য, তিনি মানুষদের চাকরি দিতে পেরেছিলেন বলেই হয়তো এলাকায় তার অত নাম হয়েছিল। কিন্তু এখন সময় ভিন্ন; বার্ধক্যের গোধূলিলগ্নে এসে দাদু এক অদ্ভুত মানসিক যন্ত্রণায় ভুগেছেন।

তিনি প্রায়ই গভীর আফসোসের সুরে বলেন, “সুপারিশ করে যত মানুষের চাকরি দিয়েছিলাম, সেগুলোর সবই ছিল অপরাধ। ঘুষ নিয়ে চাকরি দেওয়ার অপরাধের চেয়ে সুপারিশ করে চাকরি দেওয়ার অপরাধ কোনো অংশেই কম নয়”। কিন্তু কেন তিনি এমন ভাবছেন? দাদুর সরল স্বীকারোক্তি—সব নিয়োগ বিধিতেই একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষা পদ্ধতি থাকে, যেখানে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমানভাবে মেধা প্রমাণের অধিকার রয়েছে।

লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা এবং প্র্যাক্টিকেল পরীক্ষা মিলিয়ে তৈরি হয় ফাইনাল ফলাফল। সেই ফলাফলের মেধাভিত্তিক সিরিয়াল অনুযায়ীই চাকরি হওয়ার কথা। কিন্তু সুপারিশের কারণেই সেই নিয়ম ভেঙে যাদের চাকরিগুলো দেওয়া হয়, তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সত্যিকারের প্রাপ্য ব্যক্তি নয়। আর যোগ্যতা প্রমান করে এগিয়ে থেকে যারা সেই চাকরিগুলোর দাবিদার, তাদেরকে বাদ পড়তে হয়।

দাদু কান্নাভেজা কণ্ঠে বললেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই যে একজন যোগ্য প্রার্থীর অধিকার কেড়ে নেওয়া হলো, এটি মস্ত বড় গুনাহ— এই গুনাহ কেবল ভুক্তভোগী ক্ষমা করলেই ক্ষমা পাওয়া যায়, অন্যথায় নয়। কিন্তু আমি ভাবছি, আধুনিক যুগের অসংখ্য দাদুর কথা, মামার কথা, চাচা, খালু আর মুরুব্বিদের কথা, যারা সুপারিশ করতে খুবই ভালোবাসেন। তারা চান যে মানুষ তাদের কাছে আসুক, তাদের কাছে অনুরোধ করুক, তাদের সুপারিশ প্রার্থনা করুক।

কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে, যদি আমার সুপারিশে কারো একটা চাকরি হয়, তবে সেটা নিশ্চয়ই অত্যন্ত পুণ্য কর্ম, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ এর জন্য আমাকে বরকত দেবেন। তারা এমনটা সত্যিই বিশ্বাস করেন, কিন্তু তারা ভুলে যান যে সেই সুপারিশের অন্ধকার দিকটি আসলে কী! সুপারিশ কি তিনি ন্যায়বিচারের জন্য করছেন, নিয়ম কে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সুপারিশ করছেন নাকি সুপারিশ করতে পারার মধ্যে যে আনন্দ, সেই আনন্দ উপভোগ করতে চাইছেন।

সুপারিশ করতে পারার মধ্যে সত্যিই এক অদ্ভুত আনন্দ আছে; কিন্তু এমন আনন্দের উৎস কী? আসলে এই আনন্দের শেকড় গেঁথে রয়েছে মানুষের সামাজিক অহংবোধের গভীরে। যখন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে কেউ তদবির নিয়ে আসে, তখন অবচেতনভাবেই তিনি নিজেকে কেন্দ্রবিন্দু বলে অনুভব করতে থাকেন। মানুষেরা যখন হাত জোড় করে বা বিনীত হয়ে কোনো আবদার নিয়ে সামনে দাঁড়ায়, তখন সুপারিশকারী যেন একধরনের অদৃশ্য দেবত্বের স্বাদ অনুভব করেন।

এরই ফলে কাউকে পুলিশ থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া, কাউকে চাকরি পাইয়ে দেওয়া বা কোনো জটিলতা সমাধান করে দেওয়ার ক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারা তাকে এক ধরনের তুষ্টি দেয়। এমন মানুষ নিজেকে মসিহা ভাবতে শুরু করেন। আবার কিছু মানুষ যখন কর্মজীবন থেকে অবসর নেন কিংবা ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন, যখন তার চারপাশের কোলাহল কমে যায়, সুপারিশ করার ক্ষমতাটি তখন তার মাঝে অদৃশ্য চুম্বক হিসেবে কাজ করে, যার মাধ্যমে তিনি নিজের গুরুত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন।

যখন কেউ সুপারিশের মাধ্যমে উপকৃত হন এবং কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তার নাম স্মরণ করেন বা সম্মান দেখান, তখন সেই প্রশংসার সুবাস সুপারিশকারীর অহংকারকে তৃপ্ত করে। কিন্তু সমস্যা হলো, সুপারিশ এক সময় নিজেই আর সুপারিশের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না; এর এক ভয়ঙ্কর বিবর্তন ঘটে। যাঁরা সুপারিশের আশায় দরজায় দরজায় ঘুরতে শুরু করেন, তাঁদের মাঝে আস্তে আস্তে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়; কার উপহার বা তোষামোদ কত বেশি আকর্ষণীয়।

এভাবেই জন্ম নেয় ‘গিফট কালচার’ বা উপহার সংস্কৃতি; কৃতজ্ঞতা প্রকাশ রূপ নেয় দামি উপঢৌকন বা নানা ধরনের মনতুষ্টির আয়োজনে। এরপর সেই সংস্কৃতি আরও এক ধাপ এগিয়ে যুক্ত হয় সুপারিশ, গিফট আর কিছু নগদ লেনদেনের কালচারে। আর এভাবেই পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির যোগ্যতার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে তার দলীয় পরিচয়, বিশেষ কোনো সংগঠনের পদ বা কার কতটুকু রাজনৈতিক ও সামাজিক লবিং রয়েছে সেই শক্তি।

এরপর যখন সব ধাপগুলো পেরিয়ে যায়, তখন সেখানে সরাসরি শুরু হয় নিরেট ও নগ্ন দুর্নীতির কালচার। একটি সমাজব্যবস্থার ভয়াবহ পরিণতি এখানেই। যে সমাজে সুপারিশ, উপহার আর অর্থের জোরে সবকিছু কেনাবেচা হয়, সে সমাজে পড়াশোনা, মেধা বা কঠোর পরিশ্রমের কোনো মূল্য থাকে না। আইনের শাসন ও ইনসাফ হারিয়ে যায়। যোগ্য ব্যক্তি বঞ্চিত হন আর অযোগ্যরা ক্ষমতার মসনদে বসে সমাজকে পঙ্গু করে দেয়।

পুরো সমাজব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ে। মেধাবী তরুণদের স্বপ্নগুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়, আর জাতি হারায় তার অগ্রগতির স্বাভাবিক গতিশীলতা। কিন্তু সুপারিশ কি সবসময়ই অন্যায়? না, অনেক ক্ষেত্রেই সুপারিশের প্রয়োজন আছে। যেমন—একজন ব্যক্তি চাকরির জন্য এসেছেন, কিন্তু নিয়োগকর্তা এই ব্যক্তিকে চেনেন না বা জানেন না, তাই হয়তো সেই ব্যক্তিকে নিরাপদ মনে করছেন না বা নিয়োগ দিতে চাইছেন না।

এমন ক্ষেত্রে সুপারিশের নিশ্চয়ই প্রয়োজন আছে। কিন্তু যেখানে আমার সুপারিশের ফলে একজনকে কিছু দিতে গিয়ে অন্য কাউকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, সেই সুপারিশ আসলে সুপারিশ নয়, সেটা পাপাচার। তাহলে, সুপারিশ সংস্কৃতির এই পাপাচার কীভাবে বন্ধ করা সম্ভব? প্রয়োজন সরকারের দায়িত্বশীল মানুষদের মাঝে সচেতনতা; প্রয়োজন অন্যায়কে বুঝতে পারা এবং সুপারিশকে লজ্জাজনক আচরণ হিসেবে সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টি করা।

সুপারিশ সংস্কৃতিকে অত্যন্ত অসম্মানজনক আচরণ হিসেবে দেখার শিক্ষা চালু করা দরকার। তবে অবশ্যই সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ম এমনভাবে গড়ে তোলা দরকার, যেন সেখানে সুপারিশের শক্তি প্রভাব খাটাতে না পারে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

কোটালীপাড়ায় স্কুল কমিটি গঠনে অনিয়মের অভিযোগ প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে

দাদুর বর্তমান জীবন ও অতীতের কর্মজীবন

Update Time : 12:06:46 am, Wednesday, 30 September 2026

দাদুর বয়স ৮৯; চুপচাপ থাকেন, নামাজ, তাসবিহ আর কুরআনের মাঝে একাকী সময় কাটে তার। আগের মতো শত শত মানুষ তার দরজায় ভিড় করে না, তিনিও চান না কেউ এসে তাকে বিরক্ত করুক। সরকারের জাঁদরেল সেক্রেটারি ছিলেন তিনি, তাই কলমের শক্তিও ছিল যথেষ্ট।

দীর্ঘ চাকরি জীবনে তার সুপারিশে বহু মানুষের ভাগ্য বদলেছে। যারাই তার কাছে চাকরির জন্য আবেদন-নিবেদন নিয়ে গেছেন, তিনি কাউকে ফিরিয়েছেন বলে জানা যায় না, সুবিধামতো ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এলাকার মানুষ তাকে খুবই ভালোবাসত; কিংবা হয়তো উল্টোটাও সত্য, তিনি মানুষদের চাকরি দিতে পেরেছিলেন বলেই হয়তো এলাকায় তার অত নাম হয়েছিল। কিন্তু এখন সময় ভিন্ন; বার্ধক্যের গোধূলিলগ্নে এসে দাদু এক অদ্ভুত মানসিক যন্ত্রণায় ভুগেছেন।

তিনি প্রায়ই গভীর আফসোসের সুরে বলেন, “সুপারিশ করে যত মানুষের চাকরি দিয়েছিলাম, সেগুলোর সবই ছিল অপরাধ। ঘুষ নিয়ে চাকরি দেওয়ার অপরাধের চেয়ে সুপারিশ করে চাকরি দেওয়ার অপরাধ কোনো অংশেই কম নয়”। কিন্তু কেন তিনি এমন ভাবছেন? দাদুর সরল স্বীকারোক্তি—সব নিয়োগ বিধিতেই একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষা পদ্ধতি থাকে, যেখানে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমানভাবে মেধা প্রমাণের অধিকার রয়েছে।

লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা এবং প্র্যাক্টিকেল পরীক্ষা মিলিয়ে তৈরি হয় ফাইনাল ফলাফল। সেই ফলাফলের মেধাভিত্তিক সিরিয়াল অনুযায়ীই চাকরি হওয়ার কথা। কিন্তু সুপারিশের কারণেই সেই নিয়ম ভেঙে যাদের চাকরিগুলো দেওয়া হয়, তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সত্যিকারের প্রাপ্য ব্যক্তি নয়। আর যোগ্যতা প্রমান করে এগিয়ে থেকে যারা সেই চাকরিগুলোর দাবিদার, তাদেরকে বাদ পড়তে হয়।

দাদু কান্নাভেজা কণ্ঠে বললেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই যে একজন যোগ্য প্রার্থীর অধিকার কেড়ে নেওয়া হলো, এটি মস্ত বড় গুনাহ— এই গুনাহ কেবল ভুক্তভোগী ক্ষমা করলেই ক্ষমা পাওয়া যায়, অন্যথায় নয়। কিন্তু আমি ভাবছি, আধুনিক যুগের অসংখ্য দাদুর কথা, মামার কথা, চাচা, খালু আর মুরুব্বিদের কথা, যারা সুপারিশ করতে খুবই ভালোবাসেন। তারা চান যে মানুষ তাদের কাছে আসুক, তাদের কাছে অনুরোধ করুক, তাদের সুপারিশ প্রার্থনা করুক।

কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে, যদি আমার সুপারিশে কারো একটা চাকরি হয়, তবে সেটা নিশ্চয়ই অত্যন্ত পুণ্য কর্ম, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ এর জন্য আমাকে বরকত দেবেন। তারা এমনটা সত্যিই বিশ্বাস করেন, কিন্তু তারা ভুলে যান যে সেই সুপারিশের অন্ধকার দিকটি আসলে কী! সুপারিশ কি তিনি ন্যায়বিচারের জন্য করছেন, নিয়ম কে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সুপারিশ করছেন নাকি সুপারিশ করতে পারার মধ্যে যে আনন্দ, সেই আনন্দ উপভোগ করতে চাইছেন।

সুপারিশ করতে পারার মধ্যে সত্যিই এক অদ্ভুত আনন্দ আছে; কিন্তু এমন আনন্দের উৎস কী? আসলে এই আনন্দের শেকড় গেঁথে রয়েছে মানুষের সামাজিক অহংবোধের গভীরে। যখন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে কেউ তদবির নিয়ে আসে, তখন অবচেতনভাবেই তিনি নিজেকে কেন্দ্রবিন্দু বলে অনুভব করতে থাকেন। মানুষেরা যখন হাত জোড় করে বা বিনীত হয়ে কোনো আবদার নিয়ে সামনে দাঁড়ায়, তখন সুপারিশকারী যেন একধরনের অদৃশ্য দেবত্বের স্বাদ অনুভব করেন।

এরই ফলে কাউকে পুলিশ থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া, কাউকে চাকরি পাইয়ে দেওয়া বা কোনো জটিলতা সমাধান করে দেওয়ার ক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারা তাকে এক ধরনের তুষ্টি দেয়। এমন মানুষ নিজেকে মসিহা ভাবতে শুরু করেন। আবার কিছু মানুষ যখন কর্মজীবন থেকে অবসর নেন কিংবা ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন, যখন তার চারপাশের কোলাহল কমে যায়, সুপারিশ করার ক্ষমতাটি তখন তার মাঝে অদৃশ্য চুম্বক হিসেবে কাজ করে, যার মাধ্যমে তিনি নিজের গুরুত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন।

যখন কেউ সুপারিশের মাধ্যমে উপকৃত হন এবং কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তার নাম স্মরণ করেন বা সম্মান দেখান, তখন সেই প্রশংসার সুবাস সুপারিশকারীর অহংকারকে তৃপ্ত করে। কিন্তু সমস্যা হলো, সুপারিশ এক সময় নিজেই আর সুপারিশের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না; এর এক ভয়ঙ্কর বিবর্তন ঘটে। যাঁরা সুপারিশের আশায় দরজায় দরজায় ঘুরতে শুরু করেন, তাঁদের মাঝে আস্তে আস্তে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়; কার উপহার বা তোষামোদ কত বেশি আকর্ষণীয়।

এভাবেই জন্ম নেয় ‘গিফট কালচার’ বা উপহার সংস্কৃতি; কৃতজ্ঞতা প্রকাশ রূপ নেয় দামি উপঢৌকন বা নানা ধরনের মনতুষ্টির আয়োজনে। এরপর সেই সংস্কৃতি আরও এক ধাপ এগিয়ে যুক্ত হয় সুপারিশ, গিফট আর কিছু নগদ লেনদেনের কালচারে। আর এভাবেই পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির যোগ্যতার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে তার দলীয় পরিচয়, বিশেষ কোনো সংগঠনের পদ বা কার কতটুকু রাজনৈতিক ও সামাজিক লবিং রয়েছে সেই শক্তি।

এরপর যখন সব ধাপগুলো পেরিয়ে যায়, তখন সেখানে সরাসরি শুরু হয় নিরেট ও নগ্ন দুর্নীতির কালচার। একটি সমাজব্যবস্থার ভয়াবহ পরিণতি এখানেই। যে সমাজে সুপারিশ, উপহার আর অর্থের জোরে সবকিছু কেনাবেচা হয়, সে সমাজে পড়াশোনা, মেধা বা কঠোর পরিশ্রমের কোনো মূল্য থাকে না। আইনের শাসন ও ইনসাফ হারিয়ে যায়। যোগ্য ব্যক্তি বঞ্চিত হন আর অযোগ্যরা ক্ষমতার মসনদে বসে সমাজকে পঙ্গু করে দেয়।

পুরো সমাজব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ে। মেধাবী তরুণদের স্বপ্নগুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়, আর জাতি হারায় তার অগ্রগতির স্বাভাবিক গতিশীলতা। কিন্তু সুপারিশ কি সবসময়ই অন্যায়? না, অনেক ক্ষেত্রেই সুপারিশের প্রয়োজন আছে। যেমন—একজন ব্যক্তি চাকরির জন্য এসেছেন, কিন্তু নিয়োগকর্তা এই ব্যক্তিকে চেনেন না বা জানেন না, তাই হয়তো সেই ব্যক্তিকে নিরাপদ মনে করছেন না বা নিয়োগ দিতে চাইছেন না।

এমন ক্ষেত্রে সুপারিশের নিশ্চয়ই প্রয়োজন আছে। কিন্তু যেখানে আমার সুপারিশের ফলে একজনকে কিছু দিতে গিয়ে অন্য কাউকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, সেই সুপারিশ আসলে সুপারিশ নয়, সেটা পাপাচার। তাহলে, সুপারিশ সংস্কৃতির এই পাপাচার কীভাবে বন্ধ করা সম্ভব? প্রয়োজন সরকারের দায়িত্বশীল মানুষদের মাঝে সচেতনতা; প্রয়োজন অন্যায়কে বুঝতে পারা এবং সুপারিশকে লজ্জাজনক আচরণ হিসেবে সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টি করা।

সুপারিশ সংস্কৃতিকে অত্যন্ত অসম্মানজনক আচরণ হিসেবে দেখার শিক্ষা চালু করা দরকার। তবে অবশ্যই সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ম এমনভাবে গড়ে তোলা দরকার, যেন সেখানে সুপারিশের শক্তি প্রভাব খাটাতে না পারে।