আজ মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৪ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ১৬ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
৩৫°C
সর্বোচ্চ: ৩৫°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ১৪%

আল্লাহ শেষ আশ্রয়টুকু রক্ষা করো! রাতভর অদম্য স্বেচ্ছাশ্রমে অলৌকিক প্রতিরোধ

  • MIT ERP
  • Update Time : 11:51:44 am, Tuesday, 29 September 2026
  • 10

আল্লাহ শেষ আশ্রয়টুকু রক্ষা করো! রাতভর অদম্য স্বেচ্ছাশ্রমে অলৌকিক প্রতিরোধ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

কপোতাক্ষ নদের উত্তাল ও প্রবাল জোয়ারের পানি তখন নতুন নির্মিত বিকল্প রিং বাঁধের একদম প্রান্তসীমা ছুঁইছুঁই। নদীর হিংস্র গর্জন আর অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি দেখে সাতক্ষীরার আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাহুনিয়া-শ্রীপুর এলাকার হাজারো মানুষের বুকে জমছিল সীমাহীন আতঙ্ক।

ভাঙনভেদে বাঁধ উপচে নোনা পানি ঢুকলেই তলিয়ে যাবে বসতভিটা, ভেসে যাবে জীবিকার শেষ সম্বল। চরম নিরাশা আর আশঙ্কার দোলাচলে সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে অশ্রুসজল চোখে করুণ আকুতিতে হাত তোলেন উপকূলের দিশাহারা বাসিন্দারা (‘আল্লাহ, আমাদের শেষ আশ্রয়টুকু রক্ষা করো। ) এলাকাবাসী জানায়, গত সোমবার ভোররাত থেকেই কুড়িকাহুনিয়া-শ্রীপুর এলাকায় কপোতাক্ষ নদের প্রধান বেড়িবাঁধে ভয়াবহ ধস নামলে সৃষ্টি হয় তীব্র সংকট।

খবর পেয়ে ভোর থেকেই স্থানীয় প্রায় ৩০০-৪০০ মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে মাটি, বাঁশের পাইলিং ও জিও ব্যাগ ফেলে নদের গ্রাস থেকে এলাকা রক্ষায় মরিয়া চেষ্টা চালান। কিন্তু দিনভর অক্লান্ত শ্রমের পর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে কপোতাক্ষের তীব্র ও ঘূর্ণায়মান স্রোতে সংস্কার করা অংশের বিরাট একটি অংশ মুহূর্তের মধ্যে পুনরায় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

মূল বাঁধ বিলীন হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয় এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। রাত বাড়ার সাথে সাথে স্থানীয় মসজিদগুলোর মাইক থেকে গ্রাম রক্ষায় আকুল আহ্বান জানানো হতে থাকে। মসজিদের মাইকের ধ্বনি শুনেই শত শত নারী-পুরুষ ও যুবক টর্চলাইট, কোদাল, ঝুড়ি এবং খালি বস্তা হাতে বাঁধের দিকে ছুটে আসেন। রাতের ঘুটঘুটে আঁধার দূর করতে দ্রুত ড্রাইভ দিয়ে জ্বালানো হয় জেনারেটরের জরুরি আলো।

এরপর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নেমে পড়েন বিকল্প রিং বাঁধ বাঁচানোর যুদ্ধে। বালুভর্তি বলগেট থেকে পাইপের সাহায্যে জিও টিউব ভর্তি করা এবং ভারী মাটির বস্তা ফেলে বিকল্প রিং বাঁধটি উঁচু ও মজবুত করার কাজ চলতে থাকে পূর্ণদ্যোদ্যমে। জরুরি ও সংকটময় পরিস্থিতির ভয়াবহ বর্ণনা দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা আবু সালেহ বলেন, রাতে গ্রামের মানুষ নিজেদের সব ভয় আর ক্লান্তি ভুলে রাজপথে ও বাঁধে নেমে এসেছিল।

রাত জেগে নতুন করে শ্রম দিয়ে যদি বিকল্প রিং বাঁধটি রক্ষা করা না যেত, তবে এতক্ষণে পুরো প্রতাপনগর ইউনিয়ন নোনা পানির নিচে তলিয়ে যেত। ক্ষোভ ও ক্ষোভমিশ্রিত কণ্ঠে ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দা আব্দুল খালেক বলেন, আমাদের সারা বছরই নদীর প্রাবল্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়। উপকূলীয় এ এলাকাটি গত কয়েকটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধাক্কা সামলে উঠে সবেমাত্র ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল; গাছে গাছে নতুন পাতা আর ফসলে ছেয়ে যাচ্ছিল ক্ষেত।

কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের চরম উদাসীনতার কারণে আবার সবকিছু ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই মুহূর্তেই বাঁধ পুরোপুরি ভেঙে গেলে হাজার হাজার বিঘার মৎস্যঘের ও ঘরবাড়ি নদীগর্ভে তলিয়ে যাবে। আবু দাউদ ঢালী (চেয়ারম্যান, প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদ) বলেন, রাত ১টার দিকে নদীতে যখন চরম জোয়ার, তখন সেই সংকটময় মুহূর্তে রিং বাঁধ রক্ষায় প্রায় চার শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী অক্লান্ত পরিশ্রম করছিলেন।

ভোররাতে ভাটা শুরু হলে নদের পানি কিছুটা কমলে মানুষ ঘরে ফেরার সুযোগ পান। তবে এটি সাময়িক স্বস্তি মাত্র; রিং বাঁধটি এখনই স্থায়ীভাবে মজবুত না করলে ভয়াবহ বিপদ আসন্ন। মিঠুন মৈত্র (সহকারী কমিশনার-ভূমি, আশাশুনি) বলেন, জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নির্দেশনায় রাত ৮টার দিকেই আমি ভাঙনকবলিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করি। নদীতে পানির চাপ ও স্রোত অস্বাভাবিক বেশি থাকায় নবনির্মিত রিং বাঁধটিও চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।

দ্রুততম সময়ে স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের উচ্চপর্যায়ের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও সমন্বয় রাখা হচ্ছে। রাশিদুল ইসলাম (উপবিভাগীয় প্রকৌশলী, পাউবো) বলেন, ভাঙনকবলিত স্থানে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ডাম্পিংয়ের কাজ চালানো হচ্ছে। মূল বাঁধের পেছনের বিকল্প রিং বাঁধটির স্থায়িত্ব বাড়াতে এবং উপকূলবাসীর ঝুঁকি কমাতে পাউবোর বিশেষজ্ঞ দল ও টেকনিশিয়ানরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

কপোতাক্ষের এই আকস্মিক ও ভয়াবহ ভাঙনে সমগ্র আশাশুনি উপজেলাজুড়েই এক থমথমে ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অদম্য সাহস, স্বেচ্ছাশ্রম এবং পাউবোর জরুরি প্রচেষ্টায় সোমবার রাতের সাময়িক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হলেও, রিং বাঁধটি স্থায়ী ও শক্তিশালী করা না হলে যেকোনো মুহূর্তে পুরো অঞ্চল নোনা পানিতে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন উপকূলীয় জনপদের পানিবন্দি হাজার হাজার মানুষ।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

যশোরের বেনাপোলে বাড়ছে মিষ্টি আখের চাষ, লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা

আল্লাহ শেষ আশ্রয়টুকু রক্ষা করো! রাতভর অদম্য স্বেচ্ছাশ্রমে অলৌকিক প্রতিরোধ

Update Time : 11:51:44 am, Tuesday, 29 September 2026

কপোতাক্ষ নদের উত্তাল ও প্রবাল জোয়ারের পানি তখন নতুন নির্মিত বিকল্প রিং বাঁধের একদম প্রান্তসীমা ছুঁইছুঁই। নদীর হিংস্র গর্জন আর অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি দেখে সাতক্ষীরার আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাহুনিয়া-শ্রীপুর এলাকার হাজারো মানুষের বুকে জমছিল সীমাহীন আতঙ্ক।

ভাঙনভেদে বাঁধ উপচে নোনা পানি ঢুকলেই তলিয়ে যাবে বসতভিটা, ভেসে যাবে জীবিকার শেষ সম্বল। চরম নিরাশা আর আশঙ্কার দোলাচলে সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে অশ্রুসজল চোখে করুণ আকুতিতে হাত তোলেন উপকূলের দিশাহারা বাসিন্দারা (‘আল্লাহ, আমাদের শেষ আশ্রয়টুকু রক্ষা করো। ) এলাকাবাসী জানায়, গত সোমবার ভোররাত থেকেই কুড়িকাহুনিয়া-শ্রীপুর এলাকায় কপোতাক্ষ নদের প্রধান বেড়িবাঁধে ভয়াবহ ধস নামলে সৃষ্টি হয় তীব্র সংকট।

খবর পেয়ে ভোর থেকেই স্থানীয় প্রায় ৩০০-৪০০ মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে মাটি, বাঁশের পাইলিং ও জিও ব্যাগ ফেলে নদের গ্রাস থেকে এলাকা রক্ষায় মরিয়া চেষ্টা চালান। কিন্তু দিনভর অক্লান্ত শ্রমের পর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে কপোতাক্ষের তীব্র ও ঘূর্ণায়মান স্রোতে সংস্কার করা অংশের বিরাট একটি অংশ মুহূর্তের মধ্যে পুনরায় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

মূল বাঁধ বিলীন হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয় এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। রাত বাড়ার সাথে সাথে স্থানীয় মসজিদগুলোর মাইক থেকে গ্রাম রক্ষায় আকুল আহ্বান জানানো হতে থাকে। মসজিদের মাইকের ধ্বনি শুনেই শত শত নারী-পুরুষ ও যুবক টর্চলাইট, কোদাল, ঝুড়ি এবং খালি বস্তা হাতে বাঁধের দিকে ছুটে আসেন। রাতের ঘুটঘুটে আঁধার দূর করতে দ্রুত ড্রাইভ দিয়ে জ্বালানো হয় জেনারেটরের জরুরি আলো।

এরপর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নেমে পড়েন বিকল্প রিং বাঁধ বাঁচানোর যুদ্ধে। বালুভর্তি বলগেট থেকে পাইপের সাহায্যে জিও টিউব ভর্তি করা এবং ভারী মাটির বস্তা ফেলে বিকল্প রিং বাঁধটি উঁচু ও মজবুত করার কাজ চলতে থাকে পূর্ণদ্যোদ্যমে। জরুরি ও সংকটময় পরিস্থিতির ভয়াবহ বর্ণনা দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা আবু সালেহ বলেন, রাতে গ্রামের মানুষ নিজেদের সব ভয় আর ক্লান্তি ভুলে রাজপথে ও বাঁধে নেমে এসেছিল।

রাত জেগে নতুন করে শ্রম দিয়ে যদি বিকল্প রিং বাঁধটি রক্ষা করা না যেত, তবে এতক্ষণে পুরো প্রতাপনগর ইউনিয়ন নোনা পানির নিচে তলিয়ে যেত। ক্ষোভ ও ক্ষোভমিশ্রিত কণ্ঠে ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দা আব্দুল খালেক বলেন, আমাদের সারা বছরই নদীর প্রাবল্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়। উপকূলীয় এ এলাকাটি গত কয়েকটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধাক্কা সামলে উঠে সবেমাত্র ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল; গাছে গাছে নতুন পাতা আর ফসলে ছেয়ে যাচ্ছিল ক্ষেত।

কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের চরম উদাসীনতার কারণে আবার সবকিছু ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই মুহূর্তেই বাঁধ পুরোপুরি ভেঙে গেলে হাজার হাজার বিঘার মৎস্যঘের ও ঘরবাড়ি নদীগর্ভে তলিয়ে যাবে। আবু দাউদ ঢালী (চেয়ারম্যান, প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদ) বলেন, রাত ১টার দিকে নদীতে যখন চরম জোয়ার, তখন সেই সংকটময় মুহূর্তে রিং বাঁধ রক্ষায় প্রায় চার শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী অক্লান্ত পরিশ্রম করছিলেন।

ভোররাতে ভাটা শুরু হলে নদের পানি কিছুটা কমলে মানুষ ঘরে ফেরার সুযোগ পান। তবে এটি সাময়িক স্বস্তি মাত্র; রিং বাঁধটি এখনই স্থায়ীভাবে মজবুত না করলে ভয়াবহ বিপদ আসন্ন। মিঠুন মৈত্র (সহকারী কমিশনার-ভূমি, আশাশুনি) বলেন, জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নির্দেশনায় রাত ৮টার দিকেই আমি ভাঙনকবলিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করি। নদীতে পানির চাপ ও স্রোত অস্বাভাবিক বেশি থাকায় নবনির্মিত রিং বাঁধটিও চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।

দ্রুততম সময়ে স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের উচ্চপর্যায়ের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও সমন্বয় রাখা হচ্ছে। রাশিদুল ইসলাম (উপবিভাগীয় প্রকৌশলী, পাউবো) বলেন, ভাঙনকবলিত স্থানে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ডাম্পিংয়ের কাজ চালানো হচ্ছে। মূল বাঁধের পেছনের বিকল্প রিং বাঁধটির স্থায়িত্ব বাড়াতে এবং উপকূলবাসীর ঝুঁকি কমাতে পাউবোর বিশেষজ্ঞ দল ও টেকনিশিয়ানরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

কপোতাক্ষের এই আকস্মিক ও ভয়াবহ ভাঙনে সমগ্র আশাশুনি উপজেলাজুড়েই এক থমথমে ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অদম্য সাহস, স্বেচ্ছাশ্রম এবং পাউবোর জরুরি প্রচেষ্টায় সোমবার রাতের সাময়িক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হলেও, রিং বাঁধটি স্থায়ী ও শক্তিশালী করা না হলে যেকোনো মুহূর্তে পুরো অঞ্চল নোনা পানিতে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন উপকূলীয় জনপদের পানিবন্দি হাজার হাজার মানুষ।