একসময় গ্রামবাংলার মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা সামগ্রীর অন্যতম ছিল বাঁশের তৈরি পণ্য। মাছ রাখার ঝুড়ি, কুলা, ডালা, মুরগির খাচা, মাছ ধরার পলো, কলমদানি, ফুলদানি, চালুনি থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতো বাঁশের তৈরি সামগ্রী।
সময়ের পরিবর্তনে প্লাস্টিক ও ককশিটের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় কমেছে বাঁশজাত পণ্যের চাহিদা। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে বাঁশের সংকট ও কাঁচামালের বাড়তি দামে সংকটে পড়েছে সোনারগাঁয়ের শত বছরের পুরোনো এ কুটিরশিল্প। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার সাদিপুর ইউনিয়নের ব্রহ্মপুর নদের তীরবর্তী গোলনগর গ্রামে এখনো বাঁশ দিয়ে মাছ রাখার ঝুড়ি তৈরি করছেন কয়েকজন কারিগর।
জানা যায়, একসময় এই এলাকায় প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই বাঁশের তৈজসপত্র তৈরি হতো, তখন দুই শতাধিক কুটিরশিল্পী এই পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে রয়েছেন ত্রিশ জনের মতো। কারিগর মাসুম মিয়া প্রায় ত্রিশ বছর ধরে বাঁশের পণ্য তৈরির সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, একসময় এ কাজের ব্যাপক চাহিদা ছিল। অনেক পরিবার বাঁশের পণ্য তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করত।
বর্তমানে প্লাস্টিকের তৈরি ঝুড়ি ও ককশিটের বক্সের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাঁশের পণ্যের চাহিদা অনেক কমে গেছে। কুটিরশিল্পী বেনু মিয়া বলেন, স্বাধীনতার আগ থেইক্যা আমরা এই কাজ কইরা আসতেছি। আগে এলাকায়ই বাঁশ পাওয়া যাইত, তাই খরচও কম আছিল। এখন বাঁশ পাওয়া যায় না, দূর থেইকা বাঁশ আনতে হয়। প্লাস্টিক আসার পর আমাদের এই কাজের চাহিদাও অনেক কমছে।
তারপরও বাপ-দাদার এই পেশা আঁকড়ে ধরে আছি। সরকারি সহযোগিতা পাইলে এই কাজটা আবার ভালোভাবে চালাইতে পারতাম। কারিগররা জানান, মুলি বাঁশ ও ওড়া বাঁশ দিয়ে এসব মাছ রাখার ঝুড়ি তৈরি করা হয়। আগে স্থানীয়ভাবে পাওয়া বাঁশ দিয়েই এ কাজ চলত। কিন্তু বর্তমানে এলাকায় বাঁশের সংকট দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাঁশ প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে যাওয়ায় এখন গাজীপুরের কাপাসিয়া এলাকা থেকে বাঁশ সংগ্রহ করতে হয়।
এতে পরিবহনসহ কাঁচামালের খরচ বেড়ে গেছে। তাদের ভাষ্য, যে বাঁশ আগে প্রায় ১৫০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটি কিনতে প্রায় ৩৫০ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। একটি বড় আকারের মাছ রাখার ঝুড়ি তৈরি করতে প্রায় চার ঘণ্টা সময় লাগে। আকারভেদে এসব ঝুড়ি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তৈরি করা ঝুড়ি যাত্রাবাড়ীসহ ঢাকার বিভিন্ন মাছের আড়তে নিয়ে বিক্রি করা হয়।
মাছের ক্রেতা ও বিক্রেতারা এসব ঝুড়ি ব্যবহার করেন। এ পেশায় শুধু পুরুষ নয়, নারীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। গোলনগর গ্রামের অনেক পরিবারে নারী-পুরুষ একসঙ্গে বাঁশের পণ্য তৈরির কাজ করেন। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা বাঁশ সংগ্রহ ও ঝুড়ির কাঠামো তৈরির পাশাপাশি নারীরা বাঁশ চিরে প্রস্তুত করা ও বুননের কাজে অংশ নেন। পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত শ্রমেই তৈরি হয় এসব পণ্য।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুর রশিদ বলেন, নব্বইয়ের দশকে গোলনগর গ্রামে শতাধিক কারিগর দিয়ে বাঁশের ঝুড়ি তৈরি করতেন। তখন এসব ঝুড়ি বিদেশে মাছ ও কাঁকড়া রপ্তানির কাজেও ব্যবহার করা হতো। ফলে বাঁশের পণ্যের ভালো চাহিদা ছিল এবং অনেক পরিবার এ ব্যবসার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছিল। তিনি বলেন, বর্তমানে প্লাস্টিকের ঝুড়ি ও ককশিটের বক্স জনপ্রিয় হওয়ায় বাঁশজাত পণ্যের কদর কমেছে।
একই সঙ্গে বাঁশের সংকট ও দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচও বেড়েছে। ফলে অনেক কারিগর পেশা পরিবর্তন করেছেন। নতুন প্রজন্মও এ পেশায় আগ্রহী হচ্ছে না। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গোলনগর এলাকায় প্রায় শত বছর ধরে বাঁশের পণ্য তৈরির ঐতিহ্য চলে আসছে। একসময় গ্রামের নারী-পুরুষ উভয়েই এ কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাঁশের পণ্য তৈরি ছিল অনেক পরিবারের আয়ের অন্যতম উৎস।
বর্তমানে কারিগরের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী এ কুটিরশিল্পটি টিকে থাকার সংকটে পড়েছে। কারিগর ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারি সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহযোগিতা এবং বাঁশজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে হারিয়ে যেতে বসা এ কুটিরশিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। এতে একদিকে শত বছরের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে, অন্যদিকে স্থানীয় নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও ধরে রাখা যাবে।



















