চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী নেজামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে বিতর্কিত ও বন্ধ হয়ে যাওয়া দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের জাল সনদপত্র দিয়ে দীর্ঘ একযুগ ধরে চাকরি করার অভিযোগ উঠেছে মো. আব্দুস সালাম নামে এক লাইব্রেরিয়ানের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগের শুরু থেকেই তিনি ভুয়া ও জাল শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র (সার্টিফিকেট) ব্যবহার করে সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা (এমপিও) উত্তোলন করে আসছেন। স্থানীয় ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১২ বছর পূর্বে নেজামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘সহকারী লাইব্রেরিয়ান’ (বর্তমান পদবি: গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান সহকারী) পদে সনদ জালিয়াতি করে নিয়োগ পান মো. আব্দুস সালাম।
নিয়োগের শর্তানুযায়ী গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে ভুয়া ডিপ্লোমা বা সমমানের সনদপত্র জমা দিয়ে তিনি চাকরিতে যোগদান করেন এবং পরবর্তীতে তার এমপিওভুক্তিকরণ সম্পন্ন হয়। তবে সম্প্রতি তার জমা দেওয়া শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্রটি ভুয়া ও জাল বলে এলাকায় গুঞ্জন ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, আব্দুস সালাম মূলত একজন আওয়ামী লীগের পদধারী নেতা।
তিনি তার নিয়োগের সময় আওয়ামী লীগের নেজাপুর ৪নং ওয়ার্ডের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলেন। আওয়ামী লীগের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা তিনি ভোগ করেছেন। তা ছাড়া তিনি যে প্রতিষ্ঠান বা বোর্ড থেকে লাইব্রেরি সায়েন্সের সনদ দেখিয়েছেন, বাস্তবে তিনি সেখান থেকে কোনো কোর্স সম্পন্ন করেননি। মোটা অঙ্কের টাকা ও জালিয়াতির মাধ্যমে এই সনদ তৈরি করে তিনি দিনের পর দিন বহাল তবিয়তে চাকরি করে যাচ্ছেন, যা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।
তারা আরও বলেন, যেখানে সরকার ‘জাল ও ভুয়া সনদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, সেখানে নিজামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের মতো নামকরা একটি প্রতিষ্ঠানে একজন ভুয়া সনদধারী চাকরি করছে কীভাবে? বিগত ১২ বছর ধরে এভাবে জালিয়াতি করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন মহল।
তারা অবিলম্বে এই জালিয়াতির সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযুক্ত লাইব্রেরিয়ানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে ওই বিদ্যালয়ে আরও কেউ জাল সনদে চাকরি করছে কি না, তাও খতিয়ে দেখার জোর দাবি উঠেছে। এ বিষয়ে অভিযুক্ত লাইব্রেরিয়ান আব্দুস সালামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে সনদের সত্যতা যাচাইয়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
অন্যদিকে, নেজামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও বর্তমান ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বুলবুল আহমেদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, সনদ জালিয়াতির বিষয়টি আমরা মৌখিকভাবে শুনেছি। তবে এখনো লিখিত কোনো অভিযোগ বা দাপ্তরিক নির্দেশনা পাইনি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি তদন্তের নির্দেশ দেয় বা সনদ যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়, তবে বিদ্যালয় প্রশাসন সব ধরনের সহযোগিতা করবে।
অপরাধ প্রমাণিত হলে অবশ্যই বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই বিষয়ে নাচোল উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার দুলাল উদ্দিন বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাল সনদে চাকরি করার কোনো সুযোগ নেই। নেজামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ানের সনদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন জালিয়াতির ঘটনা শিক্ষা ব্যবস্থার ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করছে বলে মনে করছেন স্থানীয় শিক্ষাবিদেরা। দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে—এমনটাই প্রত্যাশা নাচোলবাসীর।



















