ভোর না হতেই যে হাত দুটো লাঙলের মুঠো শক্ত করে ধরে কিংবা কাদা-মাটিতে জীবনের ঘাম ঝরায়, সেই হাতের মূল শক্তি ছিল একটিই স্বপ্ন—সন্তানকে সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে হবে। অক্ষরজ্ঞানের সীমা খুব বেশি দূর না থাকলেও, সন্তানের শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখার মেধা ও সাহসে কোনো কমতি ছিল না তাদের।
অবশেষে সেই দীর্ঘ লড়াই, অদম্য ত্যাগ আর মা-বাবার অজস্র প্রার্থনার ফল মিলল। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সহকারী সিভিল জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে পরিবারের সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করেছেন প্রত্যন্ত গ্রামের সন্তান শেখ আসিফ হোসেন। সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা থানার প্রত্যন্ত গ্রাম বড় কাশিপুর। এই নিভৃত পল্লীর সন্তান আসিফ।
বাবা শেখ জিল্লুর রহমান পেশায় সাধারণ কৃষক, আর মা ফরিদা খাতুন গৃহিণী। সংসারের নিত্যদিনের টানাটানি আর সীমাবদ্ধতার মাঝেও ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার প্রশ্নে কখনো আপস করেননি এই দম্পতি। অভাবের দিনগুলোতেও সন্তানের বই-খাতার অভাব হতে দেননি তারা। বাবা-মায়ের এই নিরলস পরিশ্রম আর ভালোবাসাই আসিফের পথচলার প্রধান জ্বালানি হয়ে কাজ করেছে। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই আসিফ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও অধ্যবসায়ী।
গ্রামের কাশিপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক শেষ করার পর ভর্তি হন পাটকেলঘাটা হারুণ-অর-রশিদ মহাবিদ্যালয়ে। সেখান থেকে সফলতার সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে নিজের লক্ষ্য স্থির করেন আইন অঙ্গনে। পরে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রিতে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে বিচারক হওয়ার কঠিন লড়াইয়ে নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করেন আসিফ। রাতদিন এক করে করা সেই তপস্যার ফল মিলল ১৮তম বিজেএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলে। এ খবরে কাশিপুর গ্রামজুড়ে নেমে আসে উৎসবের আমেজ। শিক্ষক, সহপাঠী, বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের বাঁধভাঙা শুভেচ্ছায় ভাসছেন আসিফ ও তার পরিবার। এমন সাফল্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পরম করুণাময়ের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন শেখ আসিফ হোসেন।
তিনি বলেন, ‘আমার এই অর্জন একা আমার নয়। বাবা-মায়ের হাড়ভাঙা খাটুনি, ত্যাগ, শিক্ষকবৃন্দের পথপ্রদর্শন এবং বন্ধুবান্ধব ও গ্রামবাসীর দোয়ার ফসল এটি।



















