ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটটির দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। বাইরে ছিল রাজধানীর ব্যস্ততা। ভেতরে পড়ে ছিল ১৯ বছরের একটি নিথর জীবন। যে বয়সে স্বপ্ন থাকার কথা, সামনে থাকার কথা দীর্ঘ ভবিষ্যৎ— সেই বয়সেই মরিয়ম খাতুনের জীবনের শেষ দৃশ্য লেখা হলো শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) উদ্ধার হলো তার ঝুলন্ত মরদেহ। এখন শুরু হয়েছে আরেক পর্ব। মামলা, গ্রেপ্তার, অভিযোগ, পাল্টা বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা। কিন্তু এই কাহিনির সবচেয়ে ভয়ংকর অংশটি এখানেই নয়। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ভয়ংকর প্রশ্নটি হলো, মরিয়ম মারা যাওয়ার আগে কি সমাজ তাকে বাঁচার কোনো সুযোগ দিয়েছিল? নাকি আমরা সবাই মিলে এমন একটি দেয়াল তৈরি করেছিলাম, যার এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল ১৯ বছরের একটি মেয়ে, আর অন্য পাশে ছিল পরিবার, সম্পর্ক, ক্ষমতা, সামাজিক বিচার এবং লাখো অচেনা মানুষের চোখ?
মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেছেন। মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু এখানেই কি শেষ? মামলা হয়েছে, এটি আইনি ঘটনা। অভিযোগ সত্য কি না, কার বিরুদ্ধে কতটা প্রমাণ আছে, সেটি তদন্ত ও আদালতের বিষয়।
মরিয়মের মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণও তদন্ত ছাড়া বলা যাবে না। কিন্তু মৃত্যুর আগে যে পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য আদালতের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। সমাজবিজ্ঞানের জনক প্রখ্যাত ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম বলেছেন, আত্মহত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত বা মনস্তাত্ত্বিক বিষয় নয়; বরং এটি একটি সামাজিক ঘটনা।
সমাজ যখন কোনো ব্যক্তিকে চরম সংকটে একা ফেলে দেয় এবং ব্যক্তি যখন মনে করে, সমাজে তার কোনো আশ্রয় বা সংহতি নেই, তখনই সে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, গত জুলাইয়ে গাজী নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের একটি ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি কার মাধ্যমে ছড়াল, কে ছড়াল, কারা পুনরায় ছড়াল— এসব প্রশ্নের উত্তর এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি ব্যক্তিগত ভিডিও যখন অনুমতি ছাড়া জনসমক্ষে চলে আসে, তখন সেটি আর শুধু একটি ভিডিও থাকে না। তা হয়ে ওঠে ডিজিটাল অস্ত্র। একটি ক্লিক। কিছু শেয়ার। কিছু কুৎসিত মন্তব্য। হাজারো হাসির ইমোজি। লাখ লাখ কৌতূহলী প্রশ্ন। তারপর কোটি মানুষের চোখ। আর এসবের মাঝখানে কোনো এক মরিয়ম। যার ব্যক্তিগত জীবন মুহূর্তে কোটি কোটি জনতার সম্পত্তি হয়ে যায়।
কিন্তু কেউ কি তখন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি কেমন আছ? ১৯ বছরের একটি মেয়ের সঙ্গে ৭৫ বছর বয়সি একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিয়ে, ন্যাম ভবনের মতো জায়গায় ফ্ল্যাটে অবরুদ্ধ জীবন এবং লাগাতার মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, এসবের মাঝে মরিয়ম যখন চারপাশের সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও অসহায় বোধ করেছেন, তখনই তিনি এই চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।
এটি সমাজের যৌথ সুরক্ষাতন্ত্রের একটি বড় ব্যর্থতা। এ দেশের মানুষ ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানোর আগে তার চরিত্র বিচার করে। এ ধরনের ঘটনায় নির্যাতনের অভিযোগ শোনার আগে জানতে চায়, মেয়েটি ওই সম্পর্কে গেল কেন? ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়ানোর অপরাধীকে প্রশ্ন করার আগে ভিডিওতে থাকা নারীকে প্রশ্ন করা হয়, ভিডিওটি কেন তৈরি হয়েছিল? একজন বিপন্ন মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে তাকে সামাজিক বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।
এরপর যখন সে আর থাকে না, তখন কয়েক ঘণ্টা শোক করে। আহা উঁহু করে। তারপর অন্য খবরের দিকে চলে যায়। এভাবেই একটি সমাজ তার বিবেক হারায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইফুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, মরিয়মের পরিবার অভিযোগ করেছে, বিয়ের পর থেকে তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছে। প্ররোচনা করা হয়েছে আত্মহত্যায়। তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের এসব সত্যতা তদন্তে নির্ধারিত হবে। নজরুলের বক্তব্যও তদন্তের অংশ। কিন্তু আরও অনেক প্রশ্ন আছে, যেগুলোর উত্তরও খুঁজে বের করা দরকার। মরিয়মের মৃত্যুর পর তার বিছানা থেকে হাতে লেখা কিছু চিরকুট উদ্ধারের কথা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। সেখানে প্রথম স্ত্রীর অধিকার, ভালোবাসা ভাগ হয়ে যাওয়ার কষ্ট, নিজেকে প্রতারিত ও পরাজিত মনে করার মতো অনুভূতির কথা থাকার দাবি করা হয়েছে।
জানা দরকার, তাদের দুজনের সম্পর্কের ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য কেমন ছিল? একজন ১৯ বছরের তরুণী এই বয়সের দাপুটে একজন সংসদ সদস্যের কাছে অবস্থান কতটা স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করতে পেরেছিলেন? তিনি নিরাপদ ছিলেন কি না? তার ওপর কোনো চাপ ছিল কি না? এসব প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে শুধু একটি মৃত্যুর ক্লিনিক্যাল কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে; হত্যা, না আত্মহত্যা— সেটা জানা যাবে।
কিন্তু এই মৃত্যুর প্রকৃত গল্প বা নেপথ্যে মূল কারণগুলো অস্পষ্ট থেকে যাবে। তিনি আরও বলেন, মানুষ সাধারণত একটি কারণে ভেঙে পড়ে না। অনেক সময় আঘাত আসে একসঙ্গে কয়েকটি দিক থেকে। সম্পর্কের সংকট, অর্থসংকট, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক অপমান, ডিজিটাল হয়রানি, একাকিত্ব, ভয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা— এ রকম অনেক। এগুলো একসঙ্গে জমতে জমতে একজন মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে পারে, যেখান থেকে বের হওয়ার পথ সে আর দেখতে পায় না।
তাই মরিয়মের মৃত্যুকে শুধু প্রেমের ঘটনা, শুধু দাম্পত্য বিরোধ কিংবা শুধু একজন ব্যক্তির দায় হিসেবে দেখলে ঘটনাটির বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যাবে। কারণ মরিয়মের চারপাশে শুধু মানুষ ছিল না, ছিল একটি সমাজ। সমাজ কখনোই দায়বদ্ধতার বাইরে নয়। সমাজের কেউ ভিডিও ছড়িয়েছে কি না, কেউ অপমান করেছে কি না, কেউ উসকানি দিয়েছে কি না, কেউ নির্যাতনের কথা জেনেও চুপ থেকেছে কি না, এসবও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত; বিশেষ করে ডিজিটাল জগতের ভূমিকা নতুন করে দেখতে হবে।
মরিয়মের মামার প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় এই বিয়ে হয়েছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবার ও সমাজ যখন একজন তরুণীর ইচ্ছার চেয়ে অর্থ ও ক্ষমতার লোভকে প্রাধান্য দেয়, তখন সেটি আর সাধারণ বিয়ে থাকে না, তা একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধে রূপ নেয়। আমরা এমন একসময়ে বাস করছি, যখন কারো ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজার মানুষের হাতে পৌঁছে যায়।
আক্রান্ত ব্যক্তি চাইলেও সেটি পৃথিবীর সব জায়গা থেকে সরিয়ে ফেলতে পারেন না। একটি মুছে দেওয়া পোস্টেরও স্ক্রিনশট থাকে। একটি বন্ধ করা অ্যাকাউন্টেরও কপি থাকে। একটি গোপন মুহূর্ত খুব দ্রুত ভাইরাল হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দিন বলেন, সমাজ যখন একজন চরম নির্যাতনের শিকার নারীকে আইনি বা সামাজিকভাবে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন ব্যক্তি নিজেকে একা ও গুরুত্বহীন মনে করে।
প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা নারীদের ওপর হওয়া পারিবারিক ও মানসিক সহিংসতাকে সমাজ যখন ‘পারিবারিক বিষয়’ বলে আড়াল করতে চায়, তখন তা ভুক্তভোগীকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়। এটি পুরোপুরি সামাজিক কাঠামোরই দায়বদ্ধতার অভাব।
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক ড. রাসেল হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, চরম ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, পারিবারিক সংকট ও বৈষম্যমূলক সামাজিক পরিবেশের কারণে যখন কোনো মানুষের মধ্যে চরম হতাশা জন্ম নেয় এবং সমাজ যখন তাকে মানসিক বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সমর্থন দিতে পারে না, তখন আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়।
মরিয়মের ঘটনাটি একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়, আমাদের পরিবারগুলো কি নিরাপদ আশ্রয়, নাকি সামাজিক বিচারের প্রথম আদালত? একজন মেয়ে বিপদে পড়লে আমরা কী বলি, আমাকে সব বলো। নাকি বলি, তুমি এমন করলে কেন? এই দুটি বাক্যের পার্থক্য কখনো কখনো জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য হয়ে দাঁড়ায়। ড. রাসেল আরও বলেন, মরিয়মের মৃত্যুর তদন্ত তাই শুধু ফ্ল্যাটের দরজা, মরদেহ, ময়নাতদন্ত আর এজাহারের মধ্যে আটকে থাকা উচিত নয়।
তদন্তে খুঁজে দেখা দরকার তার জীবনের শেষ কয়েক মাসের পূর্ণ সময়রেখা। ভিডিও ছড়ানোর পর কী ঘটেছিল? কারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল? কেউ তাকে হুমকি দিয়েছিল কি না? পারিবারিক বিরোধ কতটা তীব্র ছিল? তিনি কার কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন? কেউ তার বিপন্নতার কথা জানত কি না? জানলে কী করেছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো মরিয়মকে ফিরিয়ে আনবে না। কিন্তু ভবিষ্যতের কোনো মরিয়মকে বাঁচাতে পারে।
আর তাই এখন সমাজকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি ভুক্তভোগীর চরিত্র বিচার করব, নাকি তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করব? মরিয়মের মৃত্যুর পর যদি আমরা শুধু গাজী নজরুলকে নিয়ে আলোচনা করি, তাহলে হয়তো একজন ব্যক্তিকে ঘিরে বিতর্ক হবে। কিন্তু যদি প্রশ্ন করি, কেন একজন তরুণী এতগুলো চাপের মধ্যে একা হয়ে গেলেন, তাহলে আমরা নিজেদেরও কাঠগড়ায় দাঁড় করাব।
সমাজ বিশ্লেষকেরা বলছেন, মরিয়মদের মৃত্যু ঘিরে তদন্ত হয়, বিচার হয়, যার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, প্রমাণ হলে তার আইনগত পরিণতি হয়। কিন্তু সমাজের বিচার? সেটি কে করবে? বাস্তবে ঘটছে কি? মরিয়মদের মৃত্যুর পরও ব্যক্তিগত ভিডিওকে বিনোদন মনে করা হচ্ছে। ভুক্তভোগীকে দোষী বানিয়ে সম্পর্কের নামে নির্যাতনকে স্বাভাবিক করা হচ্ছে। এ দেশের সাধারণ মানুষ ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন করতে ভয় পান এবং বিপন্ন মানুষকে একা ফেলে রাখেন।
এমনটাই যদি হয়, তাহলে আগামী মরিয়মের জন্য আমাদের হাতে থাকবে শুধু আরেকটি শোকবার্তা। আরেকটি লাশ। আরেকটি মামলা। আরেকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ঝড়। তারপর? ফের নীরবতা। আবার আসবে আরেকটা মরিয়ম। প্রশ্ন হচ্ছে, আর কত মরিয়ম মরলে আমরা বুঝব, কাউকে মেরে ফেলার জন্য এ ধরনের ডিজিটাল অস্ত্র কতটা ভয়ংকর।





















