আজ রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৪ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ০৭ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ১০০%

মাটির মানুষ থেকে জলবায়ুর সন্ধানে

  • MIT ERP
  • Update Time : 07:55:44 am, Sunday, 20 September 2026
  • 14

মাটির মানুষ থেকে জলবায়ুর সন্ধানে

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটার কুমিরা গ্রামের এক সাধারণ পরিবার থেকে যাত্রা শুরু। শৈশবে বৃত্তি পরীক্ষায় জেলায় প্রথম হওয়া, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা, একই সঙ্গে শিক্ষকতা ও উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি—প্রতিটি ধাপেই ছিল নিজের ওপর বিশ্বাস আর নিরন্তর চেষ্টা।

এত ব্যস্ততার মাঝেও ইন্টারনেটে রাত জেগে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কলারশিপের তথ্য খুঁজেছেন, প্রফেসরদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। সেই দীর্ঘ চেষ্টার ফল কানাডায় উচ্চশিক্ষা, পরিবেশবিষয়ক পেশা, বাংলাদেশে ফিরে ইউএনডিপিতে কাজ, জার্মানিতে গবেষণা এবং আবার কানাডায় পিএইচডির পথে এগিয়েছেন মো. শরীফ মাহমুদ। বর্তমানে তার গবেষণার বিষয় আর্থ সিস্টেম মডেলিংÑ কার্বন ও নাইট্রোজেন চক্রের মতো জটিল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে আরও ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা।

তার দীর্ঘপথচলা নিয়ে কথা বলছেন রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিনহাজুর রহমান নয়ন সাতক্ষীরার কুমিরা থেকে আপনার শিক্ষাজীবনের শুরুটা কীভাবে? আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটার কুমিরা গ্রামে। খুব সাধারণ পরিবেশে মা-বাবা ও ভাইবোনদের সঙ্গে শৈশব কেটেছে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিলাম। পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষায় সাতক্ষীরা জেলায় প্রথম হওয়ার পর পরিবার ও আশপাশের মানুষের মধ্যে আমাকে নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়।

আমার মধ্যেও আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে। পরে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করে এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফলাফল করি। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় ঢাকার আবাসিক মেসে মানিয়ে নিতে না পেরে কোচিং ছেড়ে বাড়িতে নিজে প্রস্তুতি নিই। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলেও ২০০১ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সে ভর্তি হই। মূল বই পড়তাম, নিজের নোট নিজেই তৈরি করতাম।

পরে বন্ধু ও জুনিয়ররাও সেই নোট ব্যবহার করত। চার বছরের ব্যাচেলর ডিস্টিংশন নিয়ে শেষ করি। ছোটবেলা থেকেই বিদেশে পড়াশোনা ও গবেষণার স্বপ্ন ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়, ২০০৩ সালের দিকে ইন্টারনেটে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কলারশিপ ও প্রফেসরদের খোঁজ শুরু করি। দ্বিতীয় বর্ষেই অক্সফোর্ডের একজন প্রফেসরকে ই-মেইল করেছিলাম। তিনি জানিয়েছিলেন, মাস্টার্সের জন্য আমি তখনো অনেক ছোট।

কিন্তু সেই উত্তর আমাকে বড় অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। তখন থেকেই মনে হয়েছিল, চেষ্টা করলে দূর থেকেও পৌঁছানো যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? ২০০৭ সালের নভেম্বরে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে যোগ দিই। তখন লেকচারার হতে ব্যাচেলর ডিগ্রিই যথেষ্ট ছিল। ছাত্রজীবন শেষ করে অল্প সময়ের মধ্যে শিক্ষক হিসেবে ক্লাসে দাঁড়ানো যেমন গর্বের ছিল, তেমনি চ্যালেঞ্জিংও।

একই সঙ্গে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স চলছিল। প্রায় আট মাসের মধ্যে শিক্ষকতা, মাস্টার্স শেষ করা এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিÑ সব একসঙ্গে চলেছে। ২০০৮ সালে কানাডায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়ার পর সেই স্বপ্নের টানে শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিই। সময়টা ছোট হলেও ক্যারিয়ারের জন্য সিদ্ধান্তটি বড় ছিল। একসঙ্গে পাঁচটি কোর্স ও মাস্টার্স কীভাবে সামলেছেন?

একসঙ্গে পাঁচটি কোর্স পড়ানো সহজ ছিল না। লেকচারার হিসেবে যোগ দেওয়ার সময় মাস্টার্সের কোর্সওয়ার্ক প্রায় শেষ, থিসিসের কাজ বাকি ছিল। প্রতিটি ক্লাসের আগে প্রস্তুতি নিতাম, লাইব্রেরি ও ল্যাবে বেশি সময় কাটাতাম এবং প্রায় প্রতিদিন রাত জেগে লেকচার তৈরি করতাম। শিক্ষার্থীদের টেস্ট ও আলোচনার পেছনেও সময় দিতাম। নিজের ছাত্রজীবনে যেসব ঘাটতি অনুভব করেছি, সেগুলো যেন আমার শিক্ষার্থীরা কম পায়Ñ সেদিকে নজর রাখতাম।

বই পড়া ও বিষয়গুলোর মধ্যে মিল খুঁজে শেখার অভ্যাস তৈরি করার চেষ্টা করেছি। অনেক বছর পরও সাবেক শিক্ষার্থীরা যোগাযোগ করে এবং তখনকার পড়ানোর কথা মনে করিয়ে দেয়। টিচার হিসেবে অবসর নিলেও ভেতরের শিক্ষক সত্তা থেকে এখনো অবসর নেওয়া হয়নি। কানাডায় মাস্টার্স ও পিএইচডির সময়ও টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের কারণে নোট তৈরি ও শিক্ষার্থীদের পড়াতে হয়েছে।

কানাডায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেন? বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্ন অনেক আগে থেকেই ছিল। অনার্সের দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই কোন দেশে, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে, কী যোগ্যতা লাগেÑ এসব খোঁজ শুরু করি। সিদ্ধান্ত ছিল, পূর্ণ স্কলারশিপ ছাড়া পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ দিয়ে বিদেশে যাব না। কানাডার প্রতি শুরু থেকেই আগ্রহ ছিল। দেশটি মাল্টিকালচারাল ও শান্তিপ্রিয়, পাশাপাশি গবেষণা ও লেখাপড়ার মানও উন্নত।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদের ল্যাবে সুযোগ খুঁজতে থাকি। ২০০৮ সালে ডালহৌসি ইউনিভার্সিটি থেকে অ্যাটমোসফেরিক সায়েন্সে ফুল ফান্ড পাই। পরে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারি ও ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটিতেও ফুল ফান্ডসহ মাস্টার্সের সুযোগ পাই। নিজের অবস্থা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে ক্যালগারিতে মাস্টার্স করার সিদ্ধান্ত নিই। স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়ার লক্ষ্য কীভাবে তৈরি হয়?

আমার বাবা ছিলেন গ্রামের সাধারণ মানুষ এবং কৃষিই ছিল আয়ের মূল উৎস। মা ছিলেন গৃহিণী। তাই শুরু থেকেই লক্ষ্য ছিল নিজের যোগ্যতায় স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়া। পরিবারের জমি বিক্রি করে স্বপ্ন পূরণ করতে চাইনি। তাই ঠিক করেছিলাম, ফুল ফান্ড পেলে তবেই যাব। স্কলারশিপকে লক্ষ্য করে বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রাম বেছে নিয়েছি, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ করেছি এবং বারবার চেষ্টা করেছি।

ডালহৌসি ইউনিভার্সিটি থেকে ফুল ফান্ড পাওয়ার পর মনে হয়েছিল পথটি ঠিক ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন থেকে ভিসা প্রসেসÑ সব নিজেই করেছি। সীমিত তথ্যের সময়ে ফুল স্কলারশিপের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন? তখন তথ্য খোঁজা আজকের মতো সহজ ছিল না। খুলনায় ইন্টারনেট ছিল অপ্রতুল ও ধীর। কয়েকজন বন্ধু মিলে একটি ইন্টারনেট লাইন শেয়ার করতাম।

চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো কোনো টুলও ছিল না। তাই নিজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ঘেঁটেছি, প্রফেসরদের গবেষণার আগ্রহের সঙ্গে নিজের ব্যাকগ্রাউন্ড মিলিয়েছি এবং এক্সেল ফাইলে তথ্য গুছিয়ে রেখেছি। প্রফেসরদের ই-মেইল করেছি, প্রয়োজন হলে ফলোআপ করেছি। কোন ডকুমেন্ট কখন পাঠিয়েছি, কত সময় লাগতে পারেÑ এসবও হিসাব করে এগিয়েছি। সীমিত সুযোগ ও ধীরগতির মধ্যেও ধৈর্য ধরে নিয়মিত চেষ্টা করেছি।

এনভায়রনমেন্টাল অ্যাসেসমেন্টে ক্যারিয়ার শুরুটা কেমন ছিল? ২০০৯ সালে ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স শুরু করার সময় প্রোগ্রামটি ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত ছিল। তখন বুঝতে পারি, বিদেশে ভালো ফলাফলের পাশাপাশি নেটওয়ার্কিং ও যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ। মাস্টার্স ও পিএইচডির সময় বিভিন্ন প্রফেশনাল, প্রফেসর, কনসাল্টিং ফার্ম ও রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়।

প্রথমে একটি ছোট এনভায়রনমেন্টাল কনসাল্টিং ফার্মে সুযোগ পাই। পরে পরিচিত একজনের মাধ্যমে এইকমে ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি পাই। আমার অভিজ্ঞতায়, নেটওয়ার্কিং মানে যোগ্যতা ছাড়া কিছু পাওয়া নয়; বরং নিজের কাজ ও সক্ষমতা সম্পর্কে মানুষকে জানানো, যাতে সুযোগ এলে সঠিক জায়গায় যোগাযোগ তৈরি হতে পারে। কানাডা ছেড়ে বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্ত কেন? ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি শুরু করার সময় গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার মধ্য দিয়ে যাই এবং একই সময়ে বাবাকেও হারাই।

ফলে গবেষণায় মন দিতে পারছিলাম না এবং পিএইচডি ছেড়ে দিই। পরে কিছুদিন কনসাল্টিং করি। এরপর মনে হলো উত্তর আমেরিকার ক্রমাগত চাপ ও দৌড়ের বাইরে একটু থেমে নিজের জীবন ও কাজের অর্থ নতুন করে ভাবা দরকার। এত পড়াশোনা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে নিজের দেশ বা একটি উন্নয়নশীল দেশের বাস্তব প্রেক্ষাপটে কতটা অবদান রাখতে পারি, সেটাও দেখতে চেয়েছিলাম। সেই ভাবনা থেকেই বাংলাদেশে ফিরে ইউএনডিপিতে কাজ করি।

সেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কাজ করার সময় মনে হয়েছে, পড়াশোনার জ্ঞান সরাসরি মানুষের জীবন ও উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। কানাডা, ইউএনডিপি ও জার্মানির অভিজ্ঞতা গবেষণায় কী পরিবর্তন এনেছে? ২০০৮ সালে ডালহৌসি ইউনিভার্সিটিতে অ্যাটমোসফেরিক সায়েন্সে মাস্টার্স শুরু করলেও বুঝতে পারি, প্রোগ্রামটি আমার আগের পড়াশোনার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

পরে ২০০৯ সালে ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জিওগ্রাফির অধীনে এনভায়রনমেন্টাল ইকোলজিতে ফুল ফান্ডিং পাই। সেখানে ইকোলজি, ইকোসিস্টেম ও পিটল্যান্ড নিয়ে কাজ করি। পরে পরিবেশগত অ্যাসেসমেন্ট ও সয়েল অ্যাসেসমেন্টে কাজ করি। ২০২১ সালে বাংলাদেশে ফিরে ইউএনডিপিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কাজ করি। এরপর জার্মানির টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব ড্রেসডেনে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে ফরেস্ট কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশন নিয়ে কাজ করেছি।

এখন কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডিতে কানাডিয়ান আর্থ সিস্টেম মডেলিং নিয়ে কাজ করছি। জিআইএস, রিমোট সেন্সিং, অ্যাটমোসফেরিক সায়েন্স, ইকোলজি, পিটল্যান্ড, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ফরেস্ট কার্বন ও আর্থ সিস্টেম মডেলিংÑ বিভিন্ন সময়ে এসব বিষয়ে কাজের সুযোগ পেয়েছি। আমার কাছে এগুলো একই বড় সিস্টেমের আলাদা অংশ। এই বৈচিত্র্য গবেষণার দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সমন্বিত করেছে।

পিএইচডি গবেষণার বিষয় ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কী? আমার পিএইচডির মূল বিষয় কানাডিয়ান আর্থ সিস্টেম মডেল, যা ক্যান-ই-এস-এম-ফাইভ নামে পরিচিত। এই মডেল বায়ুম-ল, মহাসাগর, স্থলভাগ ও বরফের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং জলবায়ু পরিবর্তন বোঝার চেষ্টা করে। আমার কাজ মূলত স্থলভাগের কার্বন ও নাইট্রোজেন চক্র নিয়ে। মানবসৃষ্ট কারণে বায়ুম-লে যুক্ত হওয়া কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ স্থলভাগের গাছপালা শোষণ করে।

কিন্তু এই ক্ষমতা সীমাহীন নয়। গাছের জন্য নাইট্রোজেনসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি সীমিত থাকলে কার্বন শোষণের ক্ষমতাও প্রভাবিত হয়। মডেলে এই নাইট্রোজেন সীমাবদ্ধতা সঠিকভাবে না ধরলে ভবিষ্যতে স্থলভাগ কতটা কার্বন শোষণ করতে পারবে, তার পূর্বাভাস ভুল হতে পারে। আমার গবেষণার লক্ষ্য হলোÑ এই সীমাবদ্ধতাগুলো আরও ভালোভাবে মডেলে অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে ভবিষ্যতের জলবায়ু পূর্বাভাস আরও নির্ভরযোগ্য হয় এবং নীতিনির্ধারণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

মাটির মানুষ থেকে জলবায়ুর সন্ধানে

Update Time : 07:55:44 am, Sunday, 20 September 2026

সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটার কুমিরা গ্রামের এক সাধারণ পরিবার থেকে যাত্রা শুরু। শৈশবে বৃত্তি পরীক্ষায় জেলায় প্রথম হওয়া, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা, একই সঙ্গে শিক্ষকতা ও উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি—প্রতিটি ধাপেই ছিল নিজের ওপর বিশ্বাস আর নিরন্তর চেষ্টা।

এত ব্যস্ততার মাঝেও ইন্টারনেটে রাত জেগে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কলারশিপের তথ্য খুঁজেছেন, প্রফেসরদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। সেই দীর্ঘ চেষ্টার ফল কানাডায় উচ্চশিক্ষা, পরিবেশবিষয়ক পেশা, বাংলাদেশে ফিরে ইউএনডিপিতে কাজ, জার্মানিতে গবেষণা এবং আবার কানাডায় পিএইচডির পথে এগিয়েছেন মো. শরীফ মাহমুদ। বর্তমানে তার গবেষণার বিষয় আর্থ সিস্টেম মডেলিংÑ কার্বন ও নাইট্রোজেন চক্রের মতো জটিল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে আরও ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা।

তার দীর্ঘপথচলা নিয়ে কথা বলছেন রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিনহাজুর রহমান নয়ন সাতক্ষীরার কুমিরা থেকে আপনার শিক্ষাজীবনের শুরুটা কীভাবে? আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটার কুমিরা গ্রামে। খুব সাধারণ পরিবেশে মা-বাবা ও ভাইবোনদের সঙ্গে শৈশব কেটেছে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিলাম। পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষায় সাতক্ষীরা জেলায় প্রথম হওয়ার পর পরিবার ও আশপাশের মানুষের মধ্যে আমাকে নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়।

আমার মধ্যেও আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে। পরে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করে এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফলাফল করি। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় ঢাকার আবাসিক মেসে মানিয়ে নিতে না পেরে কোচিং ছেড়ে বাড়িতে নিজে প্রস্তুতি নিই। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলেও ২০০১ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সে ভর্তি হই। মূল বই পড়তাম, নিজের নোট নিজেই তৈরি করতাম।

পরে বন্ধু ও জুনিয়ররাও সেই নোট ব্যবহার করত। চার বছরের ব্যাচেলর ডিস্টিংশন নিয়ে শেষ করি। ছোটবেলা থেকেই বিদেশে পড়াশোনা ও গবেষণার স্বপ্ন ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়, ২০০৩ সালের দিকে ইন্টারনেটে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কলারশিপ ও প্রফেসরদের খোঁজ শুরু করি। দ্বিতীয় বর্ষেই অক্সফোর্ডের একজন প্রফেসরকে ই-মেইল করেছিলাম। তিনি জানিয়েছিলেন, মাস্টার্সের জন্য আমি তখনো অনেক ছোট।

কিন্তু সেই উত্তর আমাকে বড় অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। তখন থেকেই মনে হয়েছিল, চেষ্টা করলে দূর থেকেও পৌঁছানো যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? ২০০৭ সালের নভেম্বরে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে যোগ দিই। তখন লেকচারার হতে ব্যাচেলর ডিগ্রিই যথেষ্ট ছিল। ছাত্রজীবন শেষ করে অল্প সময়ের মধ্যে শিক্ষক হিসেবে ক্লাসে দাঁড়ানো যেমন গর্বের ছিল, তেমনি চ্যালেঞ্জিংও।

একই সঙ্গে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স চলছিল। প্রায় আট মাসের মধ্যে শিক্ষকতা, মাস্টার্স শেষ করা এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিÑ সব একসঙ্গে চলেছে। ২০০৮ সালে কানাডায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়ার পর সেই স্বপ্নের টানে শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিই। সময়টা ছোট হলেও ক্যারিয়ারের জন্য সিদ্ধান্তটি বড় ছিল। একসঙ্গে পাঁচটি কোর্স ও মাস্টার্স কীভাবে সামলেছেন?

একসঙ্গে পাঁচটি কোর্স পড়ানো সহজ ছিল না। লেকচারার হিসেবে যোগ দেওয়ার সময় মাস্টার্সের কোর্সওয়ার্ক প্রায় শেষ, থিসিসের কাজ বাকি ছিল। প্রতিটি ক্লাসের আগে প্রস্তুতি নিতাম, লাইব্রেরি ও ল্যাবে বেশি সময় কাটাতাম এবং প্রায় প্রতিদিন রাত জেগে লেকচার তৈরি করতাম। শিক্ষার্থীদের টেস্ট ও আলোচনার পেছনেও সময় দিতাম। নিজের ছাত্রজীবনে যেসব ঘাটতি অনুভব করেছি, সেগুলো যেন আমার শিক্ষার্থীরা কম পায়Ñ সেদিকে নজর রাখতাম।

বই পড়া ও বিষয়গুলোর মধ্যে মিল খুঁজে শেখার অভ্যাস তৈরি করার চেষ্টা করেছি। অনেক বছর পরও সাবেক শিক্ষার্থীরা যোগাযোগ করে এবং তখনকার পড়ানোর কথা মনে করিয়ে দেয়। টিচার হিসেবে অবসর নিলেও ভেতরের শিক্ষক সত্তা থেকে এখনো অবসর নেওয়া হয়নি। কানাডায় মাস্টার্স ও পিএইচডির সময়ও টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের কারণে নোট তৈরি ও শিক্ষার্থীদের পড়াতে হয়েছে।

কানাডায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেন? বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্ন অনেক আগে থেকেই ছিল। অনার্সের দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই কোন দেশে, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে, কী যোগ্যতা লাগেÑ এসব খোঁজ শুরু করি। সিদ্ধান্ত ছিল, পূর্ণ স্কলারশিপ ছাড়া পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ দিয়ে বিদেশে যাব না। কানাডার প্রতি শুরু থেকেই আগ্রহ ছিল। দেশটি মাল্টিকালচারাল ও শান্তিপ্রিয়, পাশাপাশি গবেষণা ও লেখাপড়ার মানও উন্নত।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদের ল্যাবে সুযোগ খুঁজতে থাকি। ২০০৮ সালে ডালহৌসি ইউনিভার্সিটি থেকে অ্যাটমোসফেরিক সায়েন্সে ফুল ফান্ড পাই। পরে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারি ও ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটিতেও ফুল ফান্ডসহ মাস্টার্সের সুযোগ পাই। নিজের অবস্থা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে ক্যালগারিতে মাস্টার্স করার সিদ্ধান্ত নিই। স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়ার লক্ষ্য কীভাবে তৈরি হয়?

আমার বাবা ছিলেন গ্রামের সাধারণ মানুষ এবং কৃষিই ছিল আয়ের মূল উৎস। মা ছিলেন গৃহিণী। তাই শুরু থেকেই লক্ষ্য ছিল নিজের যোগ্যতায় স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়া। পরিবারের জমি বিক্রি করে স্বপ্ন পূরণ করতে চাইনি। তাই ঠিক করেছিলাম, ফুল ফান্ড পেলে তবেই যাব। স্কলারশিপকে লক্ষ্য করে বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রাম বেছে নিয়েছি, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ করেছি এবং বারবার চেষ্টা করেছি।

ডালহৌসি ইউনিভার্সিটি থেকে ফুল ফান্ড পাওয়ার পর মনে হয়েছিল পথটি ঠিক ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন থেকে ভিসা প্রসেসÑ সব নিজেই করেছি। সীমিত তথ্যের সময়ে ফুল স্কলারশিপের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন? তখন তথ্য খোঁজা আজকের মতো সহজ ছিল না। খুলনায় ইন্টারনেট ছিল অপ্রতুল ও ধীর। কয়েকজন বন্ধু মিলে একটি ইন্টারনেট লাইন শেয়ার করতাম।

চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো কোনো টুলও ছিল না। তাই নিজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ঘেঁটেছি, প্রফেসরদের গবেষণার আগ্রহের সঙ্গে নিজের ব্যাকগ্রাউন্ড মিলিয়েছি এবং এক্সেল ফাইলে তথ্য গুছিয়ে রেখেছি। প্রফেসরদের ই-মেইল করেছি, প্রয়োজন হলে ফলোআপ করেছি। কোন ডকুমেন্ট কখন পাঠিয়েছি, কত সময় লাগতে পারেÑ এসবও হিসাব করে এগিয়েছি। সীমিত সুযোগ ও ধীরগতির মধ্যেও ধৈর্য ধরে নিয়মিত চেষ্টা করেছি।

এনভায়রনমেন্টাল অ্যাসেসমেন্টে ক্যারিয়ার শুরুটা কেমন ছিল? ২০০৯ সালে ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স শুরু করার সময় প্রোগ্রামটি ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত ছিল। তখন বুঝতে পারি, বিদেশে ভালো ফলাফলের পাশাপাশি নেটওয়ার্কিং ও যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ। মাস্টার্স ও পিএইচডির সময় বিভিন্ন প্রফেশনাল, প্রফেসর, কনসাল্টিং ফার্ম ও রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়।

প্রথমে একটি ছোট এনভায়রনমেন্টাল কনসাল্টিং ফার্মে সুযোগ পাই। পরে পরিচিত একজনের মাধ্যমে এইকমে ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি পাই। আমার অভিজ্ঞতায়, নেটওয়ার্কিং মানে যোগ্যতা ছাড়া কিছু পাওয়া নয়; বরং নিজের কাজ ও সক্ষমতা সম্পর্কে মানুষকে জানানো, যাতে সুযোগ এলে সঠিক জায়গায় যোগাযোগ তৈরি হতে পারে। কানাডা ছেড়ে বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্ত কেন? ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি শুরু করার সময় গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার মধ্য দিয়ে যাই এবং একই সময়ে বাবাকেও হারাই।

ফলে গবেষণায় মন দিতে পারছিলাম না এবং পিএইচডি ছেড়ে দিই। পরে কিছুদিন কনসাল্টিং করি। এরপর মনে হলো উত্তর আমেরিকার ক্রমাগত চাপ ও দৌড়ের বাইরে একটু থেমে নিজের জীবন ও কাজের অর্থ নতুন করে ভাবা দরকার। এত পড়াশোনা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে নিজের দেশ বা একটি উন্নয়নশীল দেশের বাস্তব প্রেক্ষাপটে কতটা অবদান রাখতে পারি, সেটাও দেখতে চেয়েছিলাম। সেই ভাবনা থেকেই বাংলাদেশে ফিরে ইউএনডিপিতে কাজ করি।

সেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কাজ করার সময় মনে হয়েছে, পড়াশোনার জ্ঞান সরাসরি মানুষের জীবন ও উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। কানাডা, ইউএনডিপি ও জার্মানির অভিজ্ঞতা গবেষণায় কী পরিবর্তন এনেছে? ২০০৮ সালে ডালহৌসি ইউনিভার্সিটিতে অ্যাটমোসফেরিক সায়েন্সে মাস্টার্স শুরু করলেও বুঝতে পারি, প্রোগ্রামটি আমার আগের পড়াশোনার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

পরে ২০০৯ সালে ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জিওগ্রাফির অধীনে এনভায়রনমেন্টাল ইকোলজিতে ফুল ফান্ডিং পাই। সেখানে ইকোলজি, ইকোসিস্টেম ও পিটল্যান্ড নিয়ে কাজ করি। পরে পরিবেশগত অ্যাসেসমেন্ট ও সয়েল অ্যাসেসমেন্টে কাজ করি। ২০২১ সালে বাংলাদেশে ফিরে ইউএনডিপিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কাজ করি। এরপর জার্মানির টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব ড্রেসডেনে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে ফরেস্ট কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশন নিয়ে কাজ করেছি।

এখন কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডিতে কানাডিয়ান আর্থ সিস্টেম মডেলিং নিয়ে কাজ করছি। জিআইএস, রিমোট সেন্সিং, অ্যাটমোসফেরিক সায়েন্স, ইকোলজি, পিটল্যান্ড, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ফরেস্ট কার্বন ও আর্থ সিস্টেম মডেলিংÑ বিভিন্ন সময়ে এসব বিষয়ে কাজের সুযোগ পেয়েছি। আমার কাছে এগুলো একই বড় সিস্টেমের আলাদা অংশ। এই বৈচিত্র্য গবেষণার দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সমন্বিত করেছে।

পিএইচডি গবেষণার বিষয় ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কী? আমার পিএইচডির মূল বিষয় কানাডিয়ান আর্থ সিস্টেম মডেল, যা ক্যান-ই-এস-এম-ফাইভ নামে পরিচিত। এই মডেল বায়ুম-ল, মহাসাগর, স্থলভাগ ও বরফের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং জলবায়ু পরিবর্তন বোঝার চেষ্টা করে। আমার কাজ মূলত স্থলভাগের কার্বন ও নাইট্রোজেন চক্র নিয়ে। মানবসৃষ্ট কারণে বায়ুম-লে যুক্ত হওয়া কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ স্থলভাগের গাছপালা শোষণ করে।

কিন্তু এই ক্ষমতা সীমাহীন নয়। গাছের জন্য নাইট্রোজেনসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি সীমিত থাকলে কার্বন শোষণের ক্ষমতাও প্রভাবিত হয়। মডেলে এই নাইট্রোজেন সীমাবদ্ধতা সঠিকভাবে না ধরলে ভবিষ্যতে স্থলভাগ কতটা কার্বন শোষণ করতে পারবে, তার পূর্বাভাস ভুল হতে পারে। আমার গবেষণার লক্ষ্য হলোÑ এই সীমাবদ্ধতাগুলো আরও ভালোভাবে মডেলে অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে ভবিষ্যতের জলবায়ু পূর্বাভাস আরও নির্ভরযোগ্য হয় এবং নীতিনির্ধারণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।