উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় নদীর তীরবর্তী মানুষের জীবনে নেমে এসেছে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। পানি বৃদ্ধি ও হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে আগ্রাসী রূপ নেওয়া তিস্তার তীব্র ভাঙনে গত এক সপ্তাহে রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও কুড়িগ্রাম জেলায় অন্তত ৩৮৬টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
আকস্মিক এই ভাঙনে ফসলি জমি, গাছপালা ও গ্রামীণ জনপদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হুমকির মুখে পড়েছে, যার ফলে শত শত পরিবার গৃহহীন হয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ভাঙনের এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবীব জানান, ভাঙন শুধু এক-দুই স্থানে নয়, বরং পাঁচ জেলার ১১৩টি পয়েন্টে ভাঙন এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে।
আকস্মিক এই ভাঙন প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও তাৎক্ষণিক তহবিলের ঘাটতি রয়েছে। ফলে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে তা ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না এবং বিষয়টি এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে তিস্তা নদীর পানির গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন ও স্রোতের তীব্রতা হঠাৎ অনেক বেড়ে যাওয়ায় নদীপাড়ের মাটি ধসে পড়ার হার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
এই ভাঙন এতটাই আকস্মিক ও দ্রুতগতির ছিল যে, অনেক পরিবার ঘরের আসবাবপত্র, ধান-চাল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রটুকুও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ পায়নি। চোখের সামনে বহু সাধের বসতভিটা ও মাথাগোঁজার শেষ ঠাঁইটুকু নদীগর্ভে তলিয়ে যেতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন অসহায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা। বিশেষ করে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের চর খরিবাড়ি এলাকার বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন কেউ নদীর তীরে খোলা আকাশের নিচে আবার কেউ স্বজনদের আঙিনায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
সেখানে রান্নার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তারা চরম খাদ্য ও বাসস্থানের সংকটে ভুগছেন। শহিদুল ইসলাম নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, হঠাৎ করে নদীর পাড় ভাঙতে শুরু করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরবাড়ি নদীতে চলে যায়। ঘরের অনেক মালামাল বের করারও সুযোগ হয়নি। অন্যদিকে, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের সিংগীজানী ও ভোরের পাখি এলাকায় আকস্মিক ভাঙনে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
এ ছাড়া কুড়িগ্রামের উলিপুর ও রাজহাট উপজেলায় গত সাত দিনে ৮০টি এবং রংপুরের পীরগাছা, কাউনিয়া ও গঙ্গাচড়া উপজেলায় ৫৩টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলাতেও তিস্তার ভাঙন সমানভাবে অব্যাহত রয়েছে। ভাঙনকবলিত বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফফাত জাহান তুলি ক্ষতিগ্রস্তদের খোঁজখবর নিয়ে সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
তবে গাইবান্ধা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানান, ভাঙনপ্রবণ এলাকায় তাৎক্ষণিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কিছু স্থানে জিওব্যাগ ফেলার কাজ করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও লালমনিরহাট পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল রায় জানান, ‘আমরা কিছু জায়গায় ভাঙন প্রতিরোধে জিওব্যাগ ফেলেছি, কিন্তু স্থায়ী ভাঙন রোডের জন্য বরাদ্দ না থাকায় করার কিছুই নেই।
’ লালমনিরহাট সদর উপজেলায় খুলিয়াগাছ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান বাদল জানান, এলাকাবাসী ভাঙন প্রতিরোধের দাবিতে বিভিন্ন সময় মানববন্ধন করলেও কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো বড় পদক্ষেপ নেয়নি। ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর একটাই সুরÑ তারা কোনো ত্রাণ চান না, তিস্তার এই আগ্রাসন থেকে চিরতরে বাঁচতে তাদের দরকার স্থায়ী বাঁধ। তিস্তার এই সর্বগ্রাসী রূপ থেকে উত্তরণের বিষয়ে লালমনিরহাট-৩ (সদর) সংসদ সদস্য ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া কোনোভাবেই এই ভয়াবহ ভাঙন রোধ করা সম্ভব নয়।
সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব ২০২৭ সালের শুরুতেই নিজস্ব অর্থায়নে হলেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করার। অন্যথায় এই অঞ্চলের নদীপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দুঃখ-কষ্ট ও তিস্তার গ্রাস থেকে তাদের জীবন-জীবিকা রক্ষা করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।


















