গ্যাস্ট্রিকের চিকিৎসায় জনপ্রিয় ওষুধের একটি হচ্ছে হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালের তৈরি সার্জেল ক্যাপসুলটি। ঠিক একইভাবে জনপ্রিয় স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালের তৈরি সেকলোও। শারীরিক নানা জটিলতায় জনপ্রিয় ফিনিক্স, লোসেকটিল, প্যানটনিক্স বা ইটোরিক্সও।
কোনো বাধ্য-বাধকতা না থাকায় সামান্য শারীরিক সমস্যায়ও মানুষ মুড়ি-মুড়কির মতো এসব ওষুধ সেবন করছে। কিন্তু যদি শোনেন এসবের বেশির ভাগ ওষুধই বাজারে নকল তৈরি করে বিক্রি করছে একটি গোষ্ঠী! ২০২২ সালের এক অভিযানে প্রায় ৯৮ হাজার পিস সার্জেল ২০এমজি, ৩৯ হাজার ৬০০ পিস সেকলো ২০এমজি, ১ লাখ ১৬ হাজার ৬২০ পিস ফিনিক্স ২০এমজি, ৩৯ হাজার ৭২০ পিস লোসেকটিল ২০এমজি, ২৮ হাজার ৪২০ পিস প্যানটোনিক্স ২০এমজি, ৬ হাজার পিস ইটোরিক্সের নকল ওষুধ জব্দ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ৯১৪ বক্স নকল ওষুধ জব্দ করা হয়। যার বাজারমূল্য প্রায় ৬ লাখ ৮৪ হাজার ৭৬০ টাকা। কিন্তু এর পরের বছরগুলোতে এমন অভিযান তো নেই-ই, নিয়োজিত নেই ওষুধের বাজার তদারকিতে কোনো বাহিনীও। ফলে ভেজাল ওষুধে ছেয়ে গেছে রাজধানীসহ দেশের বেশির ভাগ ফার্মেসি। আবার এসব ওষুধই রোগীদের জিম্মি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা বিক্রি করছেন বাড়তি দামে।
যেগুলো সেবনে রোগ তো সারবেই না, বরং তৈরি হচ্ছে আরও জটিল রোগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব নকল ওষুধ চেনা সাধারণ মানুষের পক্ষে তো অসম্ভবই, খোদ ঔষধ প্রশাসনকেও বেগ পেতে হয়। এমন অবস্থায় দেশে উৎপাদিত সব ওষুধের একটি করে সিরিয়াল নাম্বার তথা ইউনিট নাম্বার দেওয়ার কাজ ২০২৩ সালে শুরু হলেও তা থেমে আছে। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, দক্ষ জনশক্তির অভাবে এই কাজ আর সম্পন্ন হয়নি।
তবে বর্তমান বিএনপি সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের হাসপাতালগুলোতে নিয়মিত অভিযানের তৎপরতা দেখে সাধারণ রোগীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে যে এবার বুঝি ভেজাল ওষুধ বন্ধেও অভিযান শুরু হবে। শুধু নকল বা ভেজাল ওষুধই নয়, রাজধানীতে দেদার বিক্রি হচ্ছে বিক্রি নিষিদ্ধ ওষুধও। এগুলোর বিরুদ্ধে নানা সময় অভিযান চললেও তা খুবই সীমিত। পুলিশ জানিয়েছে, এসব নকল ওষুধ তৈরি করা হয় আটা, ময়দা ও বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে।
জনপ্রিয় ও বহুল প্রচলিত বেশ কিছু ওষুধ নকল করে বাজারজাত করে কিছু চক্র। রাজধানীর ওষুধের বাজারে ভেজাল, নকল ও নিম্নমানের ওষুধের দৌরাত্ম্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই। ওষুধ প্রশাসনের অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা এবং বিভিন্ন সময়ে বিপুল পরিমাণ নকল ও অনিবন্ধিত ওষুধ জব্দের পরও পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন মিলছে না কোনোভাবেই। নগরীর বিভিন্ন এলাকার ফার্মেসিতে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিকসহ নানা ধরনের ওষুধ বিক্রি, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের সঙ্গে নতুন ওষুধ মিশিয়ে রাখা, অনুমোদনহীন ওষুধ বিক্রিসহ অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
ফলে একদিকে রোগীরা প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে গিয়ে বাড়তি অর্থ ব্যয় করছেন, অন্যদিকে নকল বা নিম্নমানের ওষুধ সেবনের কারণে রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেজাল বা নিম্নমানের ওষুধের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো রোগী ও চিকিৎসক— উভয়েই অনেক সময় বুঝতে পারেন না যে, চিকিৎসায় কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার পেছনে ওষুধের মানহীনতা দায়ী।
রাজধানীর ব্যস্ততম হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকার আশপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ফার্মেসি। হাসপাতালকেন্দ্রিক এলাকায় রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় এসব দোকানে ওষুধের চাহিদাও বেশি। রোগীর স্বজনদের বড় একটি অংশ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ওষুধ খুঁজে না পেয়ে বিক্রেতার পরামর্শেই বিকল্প ব্র্যান্ডের ওষুধ কিনে থাকেন। সরেজমিনে রাজধানীর শাহবাগ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই ওষুধের প্যাকেট, মোড়ক থাকলেও নেই ওষুধের জেনেরিক নাম বা উৎপাদনের তারিখ।
রাজশাহীর বাঘমারা থেকে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমরা তো আর ওষুধের ভালোমন্দ বুঝি না। গতকাল চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী এক পাতা ওষুধ নিয়েছিলাম। চিকিৎসক বললেন এটি নকল ওষুধ। আজ বদলাতে এসেছি; কিন্তু দোকানদার ওষুধ ফেরত নেবে না। বলেন তো কী একটা সমস্যায় পড়লাম।
ওষুধ আসল না নকল তা সাধারণ মানুষ ক্যামনে বুঝব? ’ তবে এসব ভেজাল-নকল এবং মানহীন ওষুধের বাজারজাত বন্ধে শিগগির অভিযান শুরু হবে হুঁশিয়ারি দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘দেখেন এটা একটা কঠিন সিন্ডিকেট। ভেজাল ওষুধ শনাক্ত করা আসলেই একটু কঠিন। এগুলোর প্যাকেজিং একটি বিশেষ পদ্ধতিতে করা হয়।
তাই সাধারণ মানুষের পক্ষে খালি চোখে আসল ওষুধের সঙ্গে এর পার্থক্য বের করা প্রায় অসম্ভব। অভিযানে আমাদের যেগুলোতে সন্দেহ হবে প্রাথমিকভাবে সেগুলো জব্দ করে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মিনি ল্যাবে পরীক্ষা করা হবে। যেখানেই আটা-ময়দার দলা পাকানো কিছু পাওয়া যাবে, তখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেগুলোতে ওষুধের ন্যূনতম উপাদানও নেই। যা খেলে মানুষের শরীর সুস্থ হওয়া দূরে থাক বরং খারাপ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
এই ভেজাল বা নকল ওষুধ বাজারজাত বন্ধের উপায় কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিগত সরকার এই খাতটিকে এমনভাবে রেখে গেছে, যেখানে হাত দিই সেখানেই সীমাহীন গর্ত পাই। তাই এ ক্ষেত্রে আমাদের একটু সময় লাগবে। তবে প্রত্যেকটি ওষুধের একটি ইউনিট নাম্বার বা সিরিয়াল নাম্বার দেওয়ার কাজ শুরু হবে। প্রয়োজনে ওষুধ কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও কথা বলব।
কিন্তু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এর অন্যতম প্রতিবন্ধক। এ ছাড়া আমাদের ফার্মেসি ব্যবসায়ীরাও এতটা সচেতন না। সাধারণ মানুষ তো নয়ই। তবে এসব ওষুধ উৎপাদনকারী কারখানাগুলোকে যদি খুঁজে বের করা যায়, তাহলেও কিছুটা সমাধান হতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়াটি এতটা সহজ নয় জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক আ ব ম ফারুক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এসব খবর আমাদের কাছে প্রতিদিনই আসে।
আমরা বিভিন্ন অভিযান পরিচালিতও হতে দেখি। কিন্তু এটি একটি কঠিন সিন্ডিকেট। বিশেষ করে মিটফোর্ড এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হতে দেখি। এসব জায়গায় অভিযান চালাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বাধারও সম্মুখীন হতে হয়। শুধু তাই নয়, মিটফোর্ডের ওষুধ ব্যবসায়ীরা মার্কেট বন্ধ রেখে অবরোধও পালন করেন। এটা একটা কঠিন সিন্ডিকেট। এখানে ওষুধ প্রস্তুতকারী, বিপণনকারী, ওষুধ ব্যবসায়ী যেমন জড়িত, তেমনি প্রভাবশালী মহলও জড়িত।
কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ওষুধ মানুষের জীবন রক্ষা করে। এটিতেই যদি ভেজাল থাকে, তাহলে মানুষ কী করবে? তাই আমাদের আহ্বান থাকবে, ভেজাল বা নকল ওষুধ যাতে কোনোভাবেই বাজারজাত হতে না পারে, সে বিষয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা। তিনি বলেন, আমাদের অনেক ওষুধের দোকানেরই লাইসেন্স বা অনুমোদন নেই। এ কারণে সেসব দোকানের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে নকল ও ভেজাল ওষুধ।
এতে জনস্বাস্থ্য পড়ছে হুমকির মুখে। এসব ওষুধ বিপণনের জন্য রয়েছে বিশেষ নেটওয়ার্ক। সেই নেটওয়ার্কই সব ধরনের কাজ করে থাকে। অতীতে কয়েকটি ওষুধ কোম্পানির তৈরি প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে অনেক শিশু মারা গেছে। সেসব ওষুধ খেয়ে শিশুদের কিডনি বিকল হয়ে গিয়েছিল। কাজেই দেশে নকল ও ভেজাল ওষুধের কারবারিদের নির্মূল করতে হবে যেকোনো উপায়ে। এ জন্য ওষুধের বাজারে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে।
নকল ওষুধের সব কারখানা খুঁজে বের করতে হবে গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে। এ ধরনের ওষুধের বিক্রেতাদেরও আনতে হবে কঠোর শাস্তির আওতায়।


















