ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেড়েছে রক্ত বা প্লাটিলেট চেয়ে পোস্ট। তবে ডেঙ্গু রোগীর প্লাটিলেট কমে গেলেই যে সঙ্গে সঙ্গে প্লাটিলেট দিতে হবে এমন ধারণা সঠিক নয়।
চিকিৎসকদের মতে, রোগীর প্লাটিলেটের সংখ্যা, সক্রিয় রক্তক্ষরণ, রক্তচাপ ও সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করেই প্লাটিলেট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্লাটিলেট কত হলে ঝুঁকি বাড়ে? সুস্থ মানুষের রক্তে প্রতি মাইক্রোলিটারে সাধারণত দেড় লাখ থেকে সাড়ে চার লাখের মতো প্লাটিলেট থাকে। এর চেয়ে কমে গেলে তাকে থ্রোম্বোসাইটোপেনিয়া বলা হয়।
তবে শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা কমে যাওয়াই ডেঙ্গু রোগীর অবস্থা কতটা গুরুতর, তার একমাত্র সূচক নয়। প্লাটিলেট ২০ হাজারের নিচে নেমে গেলে স্বতঃস্ফূর্ত রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। আর ১০ হাজারের নিচে নামলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। তবে রক্তক্ষরণ না থাকলে শুধু কম প্লাটিলেটের কারণে সব রোগীকেই প্লাটিলেট দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। প্লাটিলেট কমলেই কি দিতে হবে?
ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট কমে যাওয়া রোগের স্বাভাবিক গতিপ্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে কয়েক দিন পর প্লাটিলেটের সংখ্যা নিজে থেকেই বাড়তে শুরু করে। ডেঙ্গুতে বরং রক্তনালি থেকে প্লাজমা বেরিয়ে যাওয়া, রক্তচাপ কমে যাওয়া, শক এবং সক্রিয় রক্তক্ষরণ—এসব জটিলতা বেশি উদ্বেগের কারণ। তাই শুধু একটি পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে প্লাটিলেট দেওয়ার সিদ্ধান্ত না নিয়ে রোগীর সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করা জরুরি।
কখন প্লাটিলেট বা রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে? ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে সক্রিয় রক্তক্ষরণ দেখা দিলে এবং রক্তের বিভিন্ন সূচকে গুরুতর পরিবর্তন হলে চিকিৎসক রক্ত বা রক্তের উপাদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। বিশেষ করে— নাক, মাড়ি, প্রস্রাব বা মলের সঙ্গে রক্তপাত; অতিরিক্ত মাসিক রক্তপাত; বমি বা পায়খানায় রক্ত; ত্বকে অস্বাভাবিক লাল বা বেগুনি দাগ; আঘাতের স্থান থেকে দীর্ঘ সময় রক্তপাত; রক্তচাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া; দ্রুত হৃৎস্পন্দন ও শকের লক্ষণ; পেটে বা বুকে তরল জমার মতো জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
তবে কখন প্লাটিলেট, কখন রক্ত বা অন্য কোনো রক্ত উপাদান দিতে হবে—এ সিদ্ধান্ত চিকিৎসকই নেবেন। খাবারে কি প্লাটিলেট বাড়ে? ডেঙ্গু রোগীর জন্য পর্যাপ্ত তরল, সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার গুরুত্বপূর্ণ। ফল, শাকসবজি, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারসহ সুষম খাদ্য শরীরের পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে পারে। পেঁপে পাতার রস, অ্যালোভেরা বা বিভিন্ন ফলের রস প্লাটিলেট দ্রুত বাড়িয়ে দেয়—এমন দাবি প্রচলিত থাকলেও এগুলোকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা বা প্লাটিলেট দেওয়ার বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
বিশেষ করে কোনো খাবার বা ভেষজ উপাদান গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ। কখন পরীক্ষা করবেন? জ্বরের শুরুতেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ডেঙ্গুর প্রথম কয়েক দিনে প্রয়োজন অনুযায়ী এনএস১ (NS1) অ্যান্টিজেন পরীক্ষা এবং সিবিসি করা হতে পারে। পরবর্তী সময়ে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসক পুনরায় রক্ত পরীক্ষা ও অন্যান্য পরীক্ষা করতে পারেন।
ডেঙ্গুতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ। প্লাটিলেটের সংখ্যা কমেছে কি না, তার পাশাপাশি রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ, রক্তক্ষরণের লক্ষণ এবং রোগীর সামগ্রিক অবস্থা নজরে রাখা জরুরি। তাই ডেঙ্গু সন্দেহ হলে নিজে থেকে প্লাটিলেট বা কোনো ওষুধ না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।





















