মুরগির খামারে প্রতিদিন জমছে বিপুল পরিমাণ বিষ্ঠা। একসময় যা ছিল দুর্গন্ধ, পরিবেশদূষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বড় সমস্যা। প্রযুক্তির ব্যবহারে সেই বর্জ্যই এখন পরিণত হয়েছে জ্বালানিতে। মুরগির বিষ্ঠা ও অন্যান্য জৈববর্জ্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় অ্যানারোবিক ডাইজেশনের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে বায়োগ্যাস।
সেই গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে রান্নার কাজে। পাশাপাশি অবশিষ্ট বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে জৈবসার। গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার তুমলিয়া ইউনিয়নের বান্দাখোলা এলাকায় ‘খান এগ্রো’তে এমন পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় সাত হাজার লেয়ার মুরগির এই খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি উৎপাদিত বায়োগ্যাস স্থানীয় ২৭টি পরিবারে জ্বালানি হিসেবে সরবরাহ করা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, খামারের মুরগির বিষ্ঠা পানির সঙ্গে মিশে তরল আকারে নির্দিষ্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রবাহিত হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে তা ছোট-বড় দুটি চৌবাচ্চায় জমা হয়। সেখান থেকে পাইপের মাধ্যমে তরল বর্জ্য প্রবেশ করে প্রায় ১২ ফুট গভীর গম্বুজাকৃতির আবদ্ধ ডোমে। মূলত এই ডোমের ভেতর অক্সিজেনবিহীন পরিবেশে জৈববর্জ্যরে পচন প্রক্রিয়ায় মিথেনসহ বিভিন্ন গ্যাস উৎপন্ন হয়।
খামারের মালিক একেএম সবুজ জানান, উৎপাদিত বায়োগ্যাস স্থানীয় ২৭টি পরিবারকে মাসিক ভিত্তিতে সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতি চুলার জন্য পরিবারগুলোর কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ৭০০ টাকা। শুধু গ্যাস উৎপাদনেই থেমে নেই এ উদ্যোগ। ডাইজেস্টারে প্রক্রিয়াজাত হওয়ার পর অবশিষ্ট তরল ও আধা-ঠোস জৈব পদার্থ বা স্লারি একটি বড় হাউসে জমা হচ্ছে। এই স্লারি দুর্গন্ধ অনেকটাই কমে গিয়ে কৃষিজমিতে ব্যবহারযোগ্য জৈবসার হিসেবে কাজে লাগানো যায়।
ফলে একই বর্জ্য থেকে একদিকে জ্বালানি, অন্যদিকে কৃষির জন্য জৈবসার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বায়োগ্যাস ব্যবহারকারী স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজন জানান, আগে রান্নার জ্বালানি সংগ্রহে তাদের বাড়তি খরচ ও ঝামেলা পোহাতে হতো। এখন খামার হতে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ পাওয়ায় সুবিধা হচ্ছে। তাদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ বড় পরিসরে নেওয়া গেলে একদিকে পোলট্রি খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা কমবে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে বিকল্প জ্বালানির উৎস তৈরি হবে।
স্থানীয় একাধিক পোলট্রি খামারি জানান, মুরগির বিষ্ঠা ব্যবস্থাপনা তাদের দীর্ঘদিনের সমস্যা। খামারের আশপাশে বিষ্ঠা জমে থাকলে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি মাছি ও বিভিন্ন রোগ-জীবাণুর বিস্তার ঘটতে পারে। অনেক সময় বর্জ্য ফেলার জন্য আলাদা জায়গারও প্রয়োজন হয়। তাই বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদনের প্রযুক্তি সহজলভ্য ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর হলে তারাও এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণে আগ্রহী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পোলট্রি খামারের জৈববর্জ্য পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা গেলে পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়। অ্যানারোবিক ডাইজেশনের মাধ্যমে জৈববর্জ্য থেকে মূলত মিথেন-সমৃদ্ধ বায়োগ্যাস উৎপন্ন হয়। এটি রান্না, তাপ উৎপাদনসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। একই সঙ্গে ডাইজেস্টার থেকে পাওয়া অবশিষ্ট পদার্থ কৃষিতে জৈবসার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
কালীগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মাহমুদুল হাসান বলেন, অপরিশোধিত পোলট্রি বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস তৈরি পরিবেশবান্ধব একটি প্রক্রিয়া। বিশেষ করে লেয়ার পোলট্রি খামারের আশপাশে দুর্গন্ধ ও দূষণ কমাতে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি জৈববর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে পরিবারের রান্নার জ্বালানির চাহিদার একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব।
পরিবেশবিদদের মতে, দেশের ক্রমবর্ধমান পোলট্রি খাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জৈববর্জ্যরে পরিমাণ। এসব বর্জ্য অপরিকল্পিতভাবে খোলা জায়গায় ফেলা হলে দুর্গন্ধ, পানি ও মাটি দূষণসহ জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বিপরীতে বায়োগ্যাস প্লান্টের মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা গেলে একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা, বিকল্প জ্বালানি উৎপাদন এবং জৈবসার তৈরির সুযোগ পাওয়া যায়।


















