ঝড়-বৃষ্টি, তীব্র রোদ কিংবা তীব্র শীত—সবই যেন তার কাছে এক সাধারণ বিষয়। মাথার ওপর সামান্য একটি পলিথিন টাঙিয়ে পথের ধারে কাঠের চৌকিতে শুয়েই কাটছে তার জীবন। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছেন কোনো ক্লান্ত পথিক।
কিন্তু কাছে গেলেই উন্মোচিত হয় এক নিদারুণ করুণ চিত্র। এটি কোনো ক্ষণিক বিশ্রামাগার নয়, এটাই গত সাত বছর ধরে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও এলাকার পলাশীকুড়া গ্রামের বাসিন্দা শহীদ মিয়ার (৭০) একমাত্র ঠিকানা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তিন সন্তানের জনক শহীদ মিয়ার জীবন বদলে যায় স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর। মানসিক ট্রমা থেকে ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন তিনি।
এরপর থেকেই ঘরসংসার ছেড়ে নিঃসঙ্গ জীবন বেছে নেন। সন্তানরা তাকে কয়েকবার নিজেদের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও চার দেয়ালের বন্দিদশা সইতে পারেননি তিনি; বারবার পালিয়ে এসেছেন খোলা প্রান্তরে, ঘুরে বেরিয়েছেন পাহাড়ের নির্জন সব জায়গায়। স্থানীয় বাসিন্দা নূর ইসলাম জানান, শহীদ দীর্ঘদিন পাহাড়ি এলাকায় একা একা বসবাস করেছেন। বুনো হাতি, সাপ বা হিংস্র কোনো জীবজন্তুও কখনো তার ক্ষতি করেনি বা তিনিও কাউকে ভয় পাননি।
বিগত সাত বছর ধরে তিনি এই পলাশীকুড়া গ্রামের পথের ধারেই অবস্থান করছেন। নিজের কোনো জমিজমা নেই। মানুষের কাছ থেকে চেয়ে আনা সামান্য চাল-ডাল ইটের চুলায় নিজে ফুটিয়ে কোনোমতে জীবন বাঁচিয়ে রাখছেন। স্থানীয় এক বিএনপির নেতা থাকার জন্য একটি চৌকি বানিয়ে দিয়েছেন। কথা বলার চেষ্টা করলে শহীদ মিয়া নিচু স্বরে অস্পষ্টভাবে বিড়বিড় করেন, যার অর্থ উদ্ধার করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না।
নিভৃতচারী ও রহস্যময় এই মানুষটির এই চরম কষ্টকর জীবনে সামান্য মানবিক সহযোগিতার আকুতি জানাচ্ছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, সরকারি উদ্যোগে কিংবা সমাজের কোনো সহৃদয় ব্যক্তি যদি অন্তত তার চৌকিটির ওপর একটি স্থায়ী ছাউনি বা ছোট্ট একটি ঘর তুলে দিতেন, তবে জীবনের শেষ দিনগুলোতে কিছুটা আরাম ও আশ্রয়ের সুযোগ পেতেন এই অসহায় মানুষটি।


















