আজ রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২৮ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ৩০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩১°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৬৯%

প্রযুক্তির পাঠশালা থেকে গানের মঞ্চে যাত্রা মো. তারেক হাসানের

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:06:48 am, Sunday, 13 September 2026
  • 9

প্রযুক্তির পাঠশালা থেকে গানের মঞ্চে যাত্রা মো. তারেক হাসানের

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

কম্পিউটারের পর্দা থেকে শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার থেকে মঞ্চে মো. তারেক হাসানের পথচলা যেন প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার দুই ভুবনের এক অনন্য গল্প। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে শিক্ষাজীবন পেরিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি পেশায় কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করে তিনি বেছে নিয়েছেন শিক্ষকতার পথ।

গবেষণা, শিক্ষকতা ও সংগীতÑ তিন ভিন্ন জগৎ নিয়ে কথা বলেছেন রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিনহাজুর রহমান নয়ন কম্পিউটার সায়েন্সের প্রতি আপনার আগ্রহের শুরুটা কীভাবে হয়েছিল? কম্পিউটার ও প্রযুক্তির প্রতি আমার আগ্রহ মূলত শিক্ষাজীবন থেকেই। কম্পিউটার কীভাবে মানুষের জটিল সমস্যাকে সহজভাবে সমাধান করতে পারে এবং নতুন কিছু তৈরির সুযোগ করে দেয়, এ বিষয়টি আমাকে সব সময় আকৃষ্ট করেছে।

কৌতূহল থেকেই ধীরে ধীরে কম্পিউটারবিজ্ঞানকে পড়াশোনা ও পেশার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিই। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি এর নতুন নতুন প্রয়োগ নিয়ে ভাবার আগ্রহ তৈরি হয়, যা পরে আমাকে শিক্ষকতা ও গবেষণার দিকে নিয়ে এসেছে। প্রযুক্তি আমার কাছে শুধু একটি বিষয় নয়; এটি নতুন কিছু ভাবার এবং তৈরি করার একটি মাধ্যম। মেধাবৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষাজীবনের শুরুÑ এই অর্জন আপনার পথচলায় কতটা অনুপ্রেরণা দিয়েছে?

শিক্ষাজীবনের শুরুতেই মেধাবৃত্তি পাওয়া আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের এবং উৎসাহের একটি বিষয় ছিল। এটি আমাকে বুঝতে সাহায্য করেছিল যে নিয়মিত পড়াশোনা, মনোযোগ এবং নিজের কাজের প্রতি আন্তরিকতার মূল্য রয়েছে। সেই সময়ের স্বীকৃতি আমাকে পরবর্তী শিক্ষাজীবনেও ভালো করার জন্য উৎসাহিত করেছে। তবে আমি এটিকে শুধু একটি অর্জন হিসেবে দেখি না; বরং শিক্ষাজীবনের শুরুতে পাওয়া একটি সুন্দর প্রেরণা হিসেবে দেখি, যা আমাকে ধারাবাহিকভাবে শেখার আগ্রহ ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।

‘শিক্ষাজীবনের শুরুতে পাওয়া স্বীকৃতি আমাকে শুধু আনন্দ দেয়নি, আরও ভালো করার আগ্রহও তৈরি করেছিল। ’ মার্কেন্টাইল ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি পেশা থেকে শিক্ষকতায় আসার সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছিলেন? ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে কাজ করার মাধ্যমে প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হয়েছিল। সেখানে কাজ করতে গিয়ে বুঝতে পারি, প্রযুক্তির জ্ঞান অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া এবং নতুন প্রজন্মকে এই জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত করানোর প্রতি আমার আলাদা আগ্রহ রয়েছে।

তাই শিক্ষকতায় আসার সিদ্ধান্তটি ছিল আমার আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য আরও অর্থবহ করার একটি স্বাভাবিক পদক্ষেপ। একজন শিক্ষক হিসেবে শুধু নিজের জ্ঞানকে কাজে লাগানো নয়, অন্যদের জ্ঞান ও দক্ষতা তৈরিতে ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছেÑ এ বিষয়টিই আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে। ‘একজন পেশাজীবী নিজের দক্ষতা দিয়ে কাজ করেন, আর একজন শিক্ষক সেই দক্ষতা দিয়ে আরও অনেক মানুষ তৈরি করার সুযোগ পান।

’ একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিমুখী করে তুলতে আপনার মূল ভাবনা কী? আমি মনে করি, একজন শিক্ষার্থীর লক্ষ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা হওয়া উচিত নয়; তাকে বাস্তব জীবনের সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধান করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে; বিশেষ করে কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যুক্তিভিত্তিক চিন্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।

আমি চাই আমার শিক্ষার্থীরা শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী না হয়ে ভবিষ্যতে প্রযুক্তির উদ্ভাবকও হোক। তারা যেন একটি সমস্যা দেখলে শুধু সমস্যাটি নিয়ে আলোচনা না করে; বরং কীভাবে তার একটি কার্যকর সমাধান তৈরি করা যায়Ñ সেটি নিয়ে চিন্তা করে। ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু উত্তর শেখানো নয়; শিক্ষার্থীকে নিজের উত্তর খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করে দেওয়া।

’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও যন্ত্রশিক্ষার দ্রুত পরিবর্তনের সময়ে একজন কম্পিউটারবিজ্ঞান শিক্ষার্থীর কোন দক্ষতাগুলো সবচেয়ে জরুরি? বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি এত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে যে আজকের একটি প্রযুক্তি কয়েক বছর পরেই পুরোনো হয়ে যেতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের শুধু নির্দিষ্ট কোনো সফটওয়্যার, প্রোগ্রামিং ভাষা বা প্রযুক্তি শেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।

তাদের প্রোগ্রামিংয়ের মৌলিক ধারণা, গণিত, যুক্তিভিত্তিক চিন্তা, সমস্যার সমাধান, তথ্য বিশ্লেষণ এবং সৃজনশীলতার ওপর শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিয়মিত নতুন কিছু শেখার অভ্যাস। ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হলো, নিজেকে প্রতিনিয়ত নতুন করে শেখার সক্ষমতা। ’ কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও ডিএনএ কম্পিউটিংÑ ভবিষ্যতের কম্পিউটিংয়ে এই প্রযুক্তিগুলোর সম্ভাবনা কতটা দেখছেন?

আমি মনে করি, ভবিষ্যতের কম্পিউটিং শুধু প্রচলিত কম্পিউটারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও ডিএনএ কম্পিউটিং আমাদের গণনা ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণ সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করছে। বিশেষ করে ডিএনএ কম্পিউটিং আমার গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ আগ্রহের জায়গা। জীবদেহের অণুকে ব্যবহার করে তথ্য সংরক্ষণ ও গণনার সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা হচ্ছে।

এটি এখনো অনেকটাই গবেষণানির্ভর ক্ষেত্র, তবে ভবিষ্যতে বৃহৎ পরিসরে সমান্তরাল গণনা ও বিশেষ ধরনের জটিল সমস্যা সমাধানে এর সম্ভাবনা রয়েছে বলে আমি মনে করি। ‘ভবিষ্যতের কম্পিউটার হয়তো শুধু সিলিকনের ভাষায় গণনা করবে না; জীবনের নিজস্ব ভাষাও একদিন গণনার অংশ হয়ে উঠতে পারে। ’ ২২ জার্নাল ও ৮ কনফারেন্স পেপারের গবেষণাযাত্রায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?

শিক্ষকতার পাশাপাশি গবেষণা চালিয়ে যাওয়া একটি সময়সাপেক্ষ কাজ। পাঠদান, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক দায়িত্ব, প্রশাসনিক কাজ, গবেষণা এবং নিজের পিএইচডির পড়াশোনাÑ সবকিছুর মধ্যে সময়ের ভারসাম্য রাখতে হয়। তবে গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমার কাছে শুধু প্রকাশনা সংখ্যা নয়; একটি ভালো সমস্যা নির্বাচন করা, নতুনভাবে চিন্তা করা এবং সেই চিন্তাকে গবেষণার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য ফলাফলে নিয়ে যাওয়া।

অনেক সময় একটি গবেষণার ফলাফল প্রত্যাশামতো আসে না। তখন সেটি থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার কাজ করতে হয়। ‘গবেষণায় শুধু সফল ফলাফলই গুরুত্বপূর্ণ নয়; কখনো কখনো ব্যর্থ ফলাফলও নতুন পথ দেখায়। ’ আইকিউএসির দায়িত্বে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও একাডেমিক পরিবেশ উন্নয়নে আপনার লক্ষ্য কী? আমি আইকিউএসির কাজ শুধু কোনো নির্দিষ্ট স্বীকৃতি বা মান যাচাইয়ের প্রস্তুতি হিসেবে দেখি না।

আমার কাছে এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত মানোন্নয়নের সংস্কৃতি তৈরি করার প্রক্রিয়া। শিক্ষার মান উন্নয়ন, পাঠ্যক্রমের নিয়মিত পর্যালোচনা, ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা, সঠিক নথিপত্র সংরক্ষণ, শিক্ষার্থীদের মতামত গ্রহণ এবং একাডেমিক কার্যক্রমের ধারাবাহিক মূল্যায়নÑ এসব বিষয়কে আরও কার্যকর ও নিয়মতান্ত্রিক করা প্রয়োজন। আমার লক্ষ্য হলো, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রশাসনÑ সব পক্ষকে নিয়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানোন্নয়ন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে।

‘মান নিশ্চিত করা কোনো একদিনের কাজ নয়; প্রতিদিন একটু একটু করে ভালো করার সংস্কৃতিই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মান তৈরি করে। ’ ২৫ বছরের সংগীতচর্চাÑ গিটার, গান ও মঞ্চ কি আপনার শিক্ষকতা ও গবেষণার জীবনে কোনো প্রভাব ফেলেছে? সংগীত আমার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। প্রায় ২৫ বছর ধরে গিটারের সঙ্গে যুক্ত আছি।

এই দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন ব্যান্ডের সঙ্গে কাজ করেছি, অসংখ্য কনসার্টে অংশ নিয়েছি এবং মঞ্চে গান ও গিটার পরিবেশন করেছি। টেলিভিশন ও বেতারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও সংগীত পরিবেশনের সুযোগ হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দাতব্য অনুষ্ঠান ও মানুষের কল্যাণে আয়োজিত সংগীতানুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছি। বর্তমানে ‘ইরোস’ নামের একটি ব্যান্ডের সঙ্গেও যুক্ত আছি।

দীর্ঘদিন সংগীতচর্চার পাশাপাশি একসময় গিটার শেখানোরও কাজ করেছি। সংগীতের এই দীর্ঘ পথচলা আমাকে শৃঙ্খলা, ধৈর্য, সৃজনশীলতা এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের শিক্ষা দিয়েছে। আমি মনে করি, একজন শিক্ষককেও অনেকটা মঞ্চশিল্পীর মতো হতে হয়। শ্রেণিকক্ষে শুধু কোনো বিষয় জানা যথেষ্ট নয়; সেটিকে শিক্ষার্থীদের কাছে সহজ, আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত করে উপস্থাপন করাও গুরুত্বপূর্ণ।

মঞ্চে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা সেই যোগাযোগের দক্ষতা তৈরিতে আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। আর গবেষণার ক্ষেত্রেও সংগীতের প্রভাব রয়েছে। সংগীত যেমন নতুন সুর ও নতুন বিন্যাসের জন্য সৃজনশীল চিন্তা দাবি করে, গবেষণাও তেমনি প্রচলিত চিন্তার বাইরে গিয়ে নতুন সমাধান খুঁজতে শেখায়। ‘সংগীত আমাকে শুধু গিটার বাজাতে শেখায়নি; মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে, নিজেকে প্রকাশ করতে এবং নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

সার কার্যক্রম তদারকিতে কন্ট্রোল রুম চালু করল কৃষি মন্ত্রণালয়

প্রযুক্তির পাঠশালা থেকে গানের মঞ্চে যাত্রা মো. তারেক হাসানের

Update Time : 10:06:48 am, Sunday, 13 September 2026

কম্পিউটারের পর্দা থেকে শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার থেকে মঞ্চে মো. তারেক হাসানের পথচলা যেন প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার দুই ভুবনের এক অনন্য গল্প। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে শিক্ষাজীবন পেরিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি পেশায় কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করে তিনি বেছে নিয়েছেন শিক্ষকতার পথ।

গবেষণা, শিক্ষকতা ও সংগীতÑ তিন ভিন্ন জগৎ নিয়ে কথা বলেছেন রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিনহাজুর রহমান নয়ন কম্পিউটার সায়েন্সের প্রতি আপনার আগ্রহের শুরুটা কীভাবে হয়েছিল? কম্পিউটার ও প্রযুক্তির প্রতি আমার আগ্রহ মূলত শিক্ষাজীবন থেকেই। কম্পিউটার কীভাবে মানুষের জটিল সমস্যাকে সহজভাবে সমাধান করতে পারে এবং নতুন কিছু তৈরির সুযোগ করে দেয়, এ বিষয়টি আমাকে সব সময় আকৃষ্ট করেছে।

কৌতূহল থেকেই ধীরে ধীরে কম্পিউটারবিজ্ঞানকে পড়াশোনা ও পেশার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিই। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি এর নতুন নতুন প্রয়োগ নিয়ে ভাবার আগ্রহ তৈরি হয়, যা পরে আমাকে শিক্ষকতা ও গবেষণার দিকে নিয়ে এসেছে। প্রযুক্তি আমার কাছে শুধু একটি বিষয় নয়; এটি নতুন কিছু ভাবার এবং তৈরি করার একটি মাধ্যম। মেধাবৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষাজীবনের শুরুÑ এই অর্জন আপনার পথচলায় কতটা অনুপ্রেরণা দিয়েছে?

শিক্ষাজীবনের শুরুতেই মেধাবৃত্তি পাওয়া আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের এবং উৎসাহের একটি বিষয় ছিল। এটি আমাকে বুঝতে সাহায্য করেছিল যে নিয়মিত পড়াশোনা, মনোযোগ এবং নিজের কাজের প্রতি আন্তরিকতার মূল্য রয়েছে। সেই সময়ের স্বীকৃতি আমাকে পরবর্তী শিক্ষাজীবনেও ভালো করার জন্য উৎসাহিত করেছে। তবে আমি এটিকে শুধু একটি অর্জন হিসেবে দেখি না; বরং শিক্ষাজীবনের শুরুতে পাওয়া একটি সুন্দর প্রেরণা হিসেবে দেখি, যা আমাকে ধারাবাহিকভাবে শেখার আগ্রহ ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।

‘শিক্ষাজীবনের শুরুতে পাওয়া স্বীকৃতি আমাকে শুধু আনন্দ দেয়নি, আরও ভালো করার আগ্রহও তৈরি করেছিল। ’ মার্কেন্টাইল ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি পেশা থেকে শিক্ষকতায় আসার সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছিলেন? ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে কাজ করার মাধ্যমে প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হয়েছিল। সেখানে কাজ করতে গিয়ে বুঝতে পারি, প্রযুক্তির জ্ঞান অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া এবং নতুন প্রজন্মকে এই জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত করানোর প্রতি আমার আলাদা আগ্রহ রয়েছে।

তাই শিক্ষকতায় আসার সিদ্ধান্তটি ছিল আমার আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য আরও অর্থবহ করার একটি স্বাভাবিক পদক্ষেপ। একজন শিক্ষক হিসেবে শুধু নিজের জ্ঞানকে কাজে লাগানো নয়, অন্যদের জ্ঞান ও দক্ষতা তৈরিতে ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছেÑ এ বিষয়টিই আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে। ‘একজন পেশাজীবী নিজের দক্ষতা দিয়ে কাজ করেন, আর একজন শিক্ষক সেই দক্ষতা দিয়ে আরও অনেক মানুষ তৈরি করার সুযোগ পান।

’ একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিমুখী করে তুলতে আপনার মূল ভাবনা কী? আমি মনে করি, একজন শিক্ষার্থীর লক্ষ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা হওয়া উচিত নয়; তাকে বাস্তব জীবনের সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধান করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে; বিশেষ করে কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যুক্তিভিত্তিক চিন্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।

আমি চাই আমার শিক্ষার্থীরা শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী না হয়ে ভবিষ্যতে প্রযুক্তির উদ্ভাবকও হোক। তারা যেন একটি সমস্যা দেখলে শুধু সমস্যাটি নিয়ে আলোচনা না করে; বরং কীভাবে তার একটি কার্যকর সমাধান তৈরি করা যায়Ñ সেটি নিয়ে চিন্তা করে। ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু উত্তর শেখানো নয়; শিক্ষার্থীকে নিজের উত্তর খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করে দেওয়া।

’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও যন্ত্রশিক্ষার দ্রুত পরিবর্তনের সময়ে একজন কম্পিউটারবিজ্ঞান শিক্ষার্থীর কোন দক্ষতাগুলো সবচেয়ে জরুরি? বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি এত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে যে আজকের একটি প্রযুক্তি কয়েক বছর পরেই পুরোনো হয়ে যেতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের শুধু নির্দিষ্ট কোনো সফটওয়্যার, প্রোগ্রামিং ভাষা বা প্রযুক্তি শেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।

তাদের প্রোগ্রামিংয়ের মৌলিক ধারণা, গণিত, যুক্তিভিত্তিক চিন্তা, সমস্যার সমাধান, তথ্য বিশ্লেষণ এবং সৃজনশীলতার ওপর শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিয়মিত নতুন কিছু শেখার অভ্যাস। ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হলো, নিজেকে প্রতিনিয়ত নতুন করে শেখার সক্ষমতা। ’ কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও ডিএনএ কম্পিউটিংÑ ভবিষ্যতের কম্পিউটিংয়ে এই প্রযুক্তিগুলোর সম্ভাবনা কতটা দেখছেন?

আমি মনে করি, ভবিষ্যতের কম্পিউটিং শুধু প্রচলিত কম্পিউটারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও ডিএনএ কম্পিউটিং আমাদের গণনা ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণ সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করছে। বিশেষ করে ডিএনএ কম্পিউটিং আমার গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ আগ্রহের জায়গা। জীবদেহের অণুকে ব্যবহার করে তথ্য সংরক্ষণ ও গণনার সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা হচ্ছে।

এটি এখনো অনেকটাই গবেষণানির্ভর ক্ষেত্র, তবে ভবিষ্যতে বৃহৎ পরিসরে সমান্তরাল গণনা ও বিশেষ ধরনের জটিল সমস্যা সমাধানে এর সম্ভাবনা রয়েছে বলে আমি মনে করি। ‘ভবিষ্যতের কম্পিউটার হয়তো শুধু সিলিকনের ভাষায় গণনা করবে না; জীবনের নিজস্ব ভাষাও একদিন গণনার অংশ হয়ে উঠতে পারে। ’ ২২ জার্নাল ও ৮ কনফারেন্স পেপারের গবেষণাযাত্রায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?

শিক্ষকতার পাশাপাশি গবেষণা চালিয়ে যাওয়া একটি সময়সাপেক্ষ কাজ। পাঠদান, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক দায়িত্ব, প্রশাসনিক কাজ, গবেষণা এবং নিজের পিএইচডির পড়াশোনাÑ সবকিছুর মধ্যে সময়ের ভারসাম্য রাখতে হয়। তবে গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমার কাছে শুধু প্রকাশনা সংখ্যা নয়; একটি ভালো সমস্যা নির্বাচন করা, নতুনভাবে চিন্তা করা এবং সেই চিন্তাকে গবেষণার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য ফলাফলে নিয়ে যাওয়া।

অনেক সময় একটি গবেষণার ফলাফল প্রত্যাশামতো আসে না। তখন সেটি থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার কাজ করতে হয়। ‘গবেষণায় শুধু সফল ফলাফলই গুরুত্বপূর্ণ নয়; কখনো কখনো ব্যর্থ ফলাফলও নতুন পথ দেখায়। ’ আইকিউএসির দায়িত্বে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও একাডেমিক পরিবেশ উন্নয়নে আপনার লক্ষ্য কী? আমি আইকিউএসির কাজ শুধু কোনো নির্দিষ্ট স্বীকৃতি বা মান যাচাইয়ের প্রস্তুতি হিসেবে দেখি না।

আমার কাছে এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত মানোন্নয়নের সংস্কৃতি তৈরি করার প্রক্রিয়া। শিক্ষার মান উন্নয়ন, পাঠ্যক্রমের নিয়মিত পর্যালোচনা, ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা, সঠিক নথিপত্র সংরক্ষণ, শিক্ষার্থীদের মতামত গ্রহণ এবং একাডেমিক কার্যক্রমের ধারাবাহিক মূল্যায়নÑ এসব বিষয়কে আরও কার্যকর ও নিয়মতান্ত্রিক করা প্রয়োজন। আমার লক্ষ্য হলো, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রশাসনÑ সব পক্ষকে নিয়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানোন্নয়ন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে।

‘মান নিশ্চিত করা কোনো একদিনের কাজ নয়; প্রতিদিন একটু একটু করে ভালো করার সংস্কৃতিই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মান তৈরি করে। ’ ২৫ বছরের সংগীতচর্চাÑ গিটার, গান ও মঞ্চ কি আপনার শিক্ষকতা ও গবেষণার জীবনে কোনো প্রভাব ফেলেছে? সংগীত আমার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। প্রায় ২৫ বছর ধরে গিটারের সঙ্গে যুক্ত আছি।

এই দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন ব্যান্ডের সঙ্গে কাজ করেছি, অসংখ্য কনসার্টে অংশ নিয়েছি এবং মঞ্চে গান ও গিটার পরিবেশন করেছি। টেলিভিশন ও বেতারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও সংগীত পরিবেশনের সুযোগ হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দাতব্য অনুষ্ঠান ও মানুষের কল্যাণে আয়োজিত সংগীতানুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছি। বর্তমানে ‘ইরোস’ নামের একটি ব্যান্ডের সঙ্গেও যুক্ত আছি।

দীর্ঘদিন সংগীতচর্চার পাশাপাশি একসময় গিটার শেখানোরও কাজ করেছি। সংগীতের এই দীর্ঘ পথচলা আমাকে শৃঙ্খলা, ধৈর্য, সৃজনশীলতা এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের শিক্ষা দিয়েছে। আমি মনে করি, একজন শিক্ষককেও অনেকটা মঞ্চশিল্পীর মতো হতে হয়। শ্রেণিকক্ষে শুধু কোনো বিষয় জানা যথেষ্ট নয়; সেটিকে শিক্ষার্থীদের কাছে সহজ, আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত করে উপস্থাপন করাও গুরুত্বপূর্ণ।

মঞ্চে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা সেই যোগাযোগের দক্ষতা তৈরিতে আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। আর গবেষণার ক্ষেত্রেও সংগীতের প্রভাব রয়েছে। সংগীত যেমন নতুন সুর ও নতুন বিন্যাসের জন্য সৃজনশীল চিন্তা দাবি করে, গবেষণাও তেমনি প্রচলিত চিন্তার বাইরে গিয়ে নতুন সমাধান খুঁজতে শেখায়। ‘সংগীত আমাকে শুধু গিটার বাজাতে শেখায়নি; মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে, নিজেকে প্রকাশ করতে এবং নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।