আজ সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২৯ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ০১ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৮°C
সর্বোচ্চ: ৩৩°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৭৪%

হাসপাতালের বর্জ্য ছড়াচ্ছে বিষাক্ত সংক্রমণ

  • MIT ERP
  • Update Time : 11:04:35 pm, Saturday, 12 September 2026
  • 12

হাসপাতালের বর্জ্য ছড়াচ্ছে বিষাক্ত সংক্রমণ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

রোগ সারাতে মানুষ হাসপাতালে যায়। এর পাশাপাশি আরেকটি নির্মম সত্য হচ্ছে যে, দেশের এসব হাসপাতালই প্রতিমুহূর্তে আক্রান্ত করছে সুস্থ মানুষকে। এসব সেবাকেন্দ্র থেকে সারাক্ষণ বেরিয়ে আসছে এমন বর্জ্য, যা নতুন করে মানুষকে অসুস্থ করে তুলছে।

রোগীর রক্ত, সিরাম, মল, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ও অন্যান্য সংক্রামক বর্জ্যরে পাশাপাশি হাসপাতালের অপরিশোধিত তরল বর্জ্যও ঢুকে পড়ছে নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা আর খাল-পুকুরসহ নদীর পানিতে। এসব বর্জ্য শোধনের জন্য আইন আছে, বিধিমালা আছে, সরকারি নির্দেশিকাও আছে। নেই শুধু বাস্তবায়ন। বর্জ্য পানি শোধনাগার বা এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) থাকা বাধ্যতামূলক।

অথচ, পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাসেবামূলক প্রতিষ্ঠান আর বিদ্যাপিঠ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটিতেও ইটিপি নেই। অধিকাংশের নেই পরিবেশ ছাড়পত্রও। আর বেসরকারি হাসপাতালগুলোর অধিকাংশেই নেই এই বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা। সেবার ঘরেই যেন বসবাস করছে বিষধর সর্প। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে সমগ্র স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার এই অব্যবস্থাপনা আর মারাত্মক হুমকির তথ্য জানা গেছে।

অর্থাৎ, যেসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন সংক্রামক রোগী চিকিৎসা নেন, অস্ত্রোপচার হয়, রক্ত ও শরীরের নানা তরল নিয়ে কাজ হয়, সেসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশেই বর্জ্য পানি নিরাপদ করার ব্যবস্থা নেই। হাসপাতালের ভেতরে চিকিৎসা শেষ হলেও সেই বর্জ্যরে যাত্রা শেষ হচ্ছে না। বরং তা ছড়িয়ে পড়ছে হাসপাতালের বাইরের মুক্ত পরিবেশে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শাহ আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘সাধারণ বর্জ্যরে সঙ্গে চিকিৎসা বর্জ্যরে মৌলিক পার্থক্য হলো এর সংক্রামক ও বিষাক্ত চরিত্র।

এতে রোগজীবাণু, ধারালো উপকরণ, রাসায়নিক এবং বিশেষ ক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয় উপাদানও থাকতে পারে। যথাযথভাবে সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, পরিবহন ও ধ্বংস না করলে এসব বর্জ্য রোগ ছড়ানোর একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। ’ তিনি আরও বলেন, চিকিৎসা বর্জ্যে সংক্রামক, বিপজ্জনক এবং কখনো কখনো তেজস্ক্রিয় উপাদান থাকে। যথাযথ ব্যবস্থাপনা না হলে এগুলো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সাধারণ বর্জ্যরে মতো চিকিৎসা বর্জ্য ফেলে দেওয়ার সুযোগ নেই। সঠিকভাবে অপসারণ না করলে রোগ ছড়াতে পারে, পানির উৎস দূষিত হতে পারে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কর্মী, সাধারণ মানুষ ও পরিবেশ ক্ষতিকর জীবাণু ও বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসতে পারে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা অপরিশোধিত তরল বর্জ্য নিয়ে। হাসপাতাল থেকে নির্গত অপরিশোধিত বর্জ্য পানি কলেরা, ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিসের মতো সংক্রামক রোগ ছড়াতে পারে।

চিকিৎসা বর্জ্যরে মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি ও এইচআইভির মতো সংক্রমণের ঝুঁকিও রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৭০০ সরকারি হাসপাতাল, ৬ হাজার ৪৭টি নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল, ১২ হাজারেরও বেশি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার আর ব্লাড ব্যাংক রয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন যে পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, তার একটি অংশও যদি নিরাপদ ব্যবস্থাপনার বাইরে থাকে, তাহলে ঝুঁকির বিস্তারও কম নয়।

মানদণ্ড অনুযায়ী, হাসপাতালের প্রতি শয্যা থেকে গড়ে প্রতিদিন ১ দশমিক ৬২ কেজি বর্জ্য উৎপন্ন হয়। দেশে বছরে আনুমানিক ৭৫ হাজার ৩০৮ টন চিকিৎসা বর্জ্য তৈরি হয়। অন্যদিকে ‘ওয়েস্ট কনসার্ন’-এর গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ৮০ টন চিকিৎসা বর্জ্য উৎপন্ন হয়। পূর্বাভাস বলছে, আগামী ২০ বছরে তা বেড়ে ১৫০ টনে পৌঁছাতে পারে।

অর্থাৎ, আগামী দিনে হাসপাতাল বাড়বে, শয্যা বাড়বে, চিকিৎসাসেবা বাড়বে— সঙ্গে বাড়বে চিকিৎসা বর্জ্যও। কিন্তু বর্তমান অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা যদি একই জায়গায় পড়ে থাকে, তাহলে চিকিৎসাবর্জ্য ভবিষ্যতের বড় নগর ও জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো প্রয়োজনীয় সক্ষমতা আমাদের নেই।

কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কিছু কাজ তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে করা হলেও তরল বর্জ্যরে ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই। ফলে হাসপাতালের নিজস্ব ইটিপি না থাকলে অপরিশোধিত তরল বর্জ্য পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থায় চলে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। ’ বাংলাশে প্রাইভেট হসপিটাল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ইটিপি স্থাপন ও পরিচালনার উচ্চ ব্যয়ের কারণে হাসপাতাল বিধিমালা মেনে চলতে মালিকেরা নিরুৎসাহিত হচ্ছে।

কিন্তু জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে ব্যয় প্রসঙ্গটা কতটা গ্রহণযোগ্য অজুহাত, সেটিই বড় প্রশ্ন। কারণ হাসপাতাল নিজের বর্জ্য নিরাপদ করতে না পারলে সেই ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় সমাজকে— দূষিত পানি, রোগের বিস্তার, পরিবেশের ক্ষতি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির মাধ্যমে। পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, চিকিৎসা বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ) বিধিমালা, ২০০৮ না মানা হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং অনেককে জরিমানাও করা হয়েছে।

তাৎক্ষণিকভাবে পুরো ব্যবস্থার উন্নতি করা কঠিন হলেও নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং সেটা করা হলে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে যদি আইন থাকে, আদালতের নির্দেশ থাকে, পরিবেশ অধিদপ্তরের নজরদারি থাকে, তার পরও সরকারি হাসপাতালের একটিতেও ইটিপি না থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই— সমস্যা কি আইনের অভাবে, নাকি আইনের প্রয়োগে?

হাসপাতালে তরল বর্জ্য পরিশোধনের জন্য ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট), ডব্লিউটিপি (ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট), এসটিপি (স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) থাকা বাধ্যতামূলক হলেও অধিকাংশ হাসপাতালে তা নেই। জাতীয় পরিবেশ নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, ‘প্রতিটি মেডিকেল বর্জ্যরে কোডিং করিয়া পরিমাণের হিসাব রাখিতে হইবে।

প্রতিটি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মেডিকেল বর্জ্য কোডিং করিয়া আলাদা ঢাকনাওয়ালা পাত্রের মাধ্যমে নিরাপদ স্থানে ও দরত্বে সংরক্ষণ করিতে হইবে এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও ধ্বংসকরণের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করিবে। স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান উৎপাদিত মেডিকেল বর্জ্যরে পরিমাণ (কোড অনুযায়ী) আলাদাভাবে সংশ্লিষ্ট রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ রাখিবে।

স্বাস্থ্যসেবায় ন্যূনতম বর্জ্য উৎপাদনকারী প্রযুক্তি বা উপায় গ্রহণ করিতে হইবে। স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সকল প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করিতে হইবে এবং এই সকল প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা বর্জ্যসহ সকল বর্জ্যরে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করিতে হইবে। ’’ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্জ্য ফেলা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদুল্লাহ হলের সামনে একটি আধা ঘেরা এলাকায়।

দুর্গন্ধে পথচারীদের চলাফেরা করতে নাকে রুমাল চেপে ধরতে হয়। এই এলাকায় দেখা গেছে, কাগজ, টিস্যু, প্যাকেট, প্যাথলজিক্যাল নমুনা, ব্যবহৃত রক্তমাখা গজ, ব্যান্ডেজ, প্লাস্টিক, পলিথিন ব্যাগ, পানির বোতল, কাগজপত্র, স্যালাইন ব্যাগ, ওষুধের প্যাকেট মোজা, ন্যাকড়া, রক্ত, দেহরস, সিরামসহ সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন বর্জ্য কনটেইনারে বোঝাই করছেন বর্জ্যকর্মীরা।

এ কাজে তারা কোনো রকম সুরক্ষাসামগ্রী যেমন পিপিই, হ্যান্ড গ্লাভস, মাস্ক, স্যানিটাইজার, হেলমেট, জুতা ব্যবহার করছেন না। সুরক্ষাসামগ্রী নেই কেন জানতে চাইলে বর্জ্যকর্মী আলম হোসেন বলেন, ‘আমাদের এসব লাগে না। পরলে আরও গরম লাগে। করোনার সময়ও পরিনি। আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। ’ এগুলো এখান থেকে নিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলা হবে বলে আলম জানান।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক চালানোর জন্য ছাড়পত্র নিতে হলে ইটিপি স্থাপনসহ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিধিতেও বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়। সরকারি হাসপাতালগুলোর একটিরও পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। স্থাপন করা হয়নি ইটিপি। বেশ কিছু বেসরকারি হাসপাতালের আগে নেওয়া পরিবেশ ছাড়পত্র থাকলেও এখন আর নবায়ন করার সুযোগ হচ্ছে না।

এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আশরাফুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘জানামতে, পুরাতন হাসপাতালের কোনোটিতেই এই ছাড়পত্র নেই। নতুন করে যেসব প্রতিষ্ঠান হচ্ছে, সেগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ইটিপি স্থাপন চলছে। ’ তারাও আবেদন করছে এবং সেটা প্রক্রিয়াধীন বলে তিনি জানান। কিছু বেসরকারি হাসপাতালে অবশ্য ভিন্ন চিত্রও পাওয়া গেছে।

রাজধানীর বেসরকারি আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের সচিব এ বি এম কায়কোবাদ রূপালী বাংলাশেকে জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে হাসপাতালে তরল বর্জ্য পরিশোধনের জন্য ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট), ডব্লিউটিপি (ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট), এসটিপি (স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) আছে। এটি বাধ্যতামূলক। তবে কঠিন পদার্থগুলো বা বর্জ্য অপসারণ করে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্ধারিত জাপানি একটি প্রতিষ্ঠান।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

বিশ্বের তরুণদের স্বপ্নপূরণে রাশিয়াকে সহযোগী করার আহ্বান পুতিনের

হাসপাতালের বর্জ্য ছড়াচ্ছে বিষাক্ত সংক্রমণ

Update Time : 11:04:35 pm, Saturday, 12 September 2026

রোগ সারাতে মানুষ হাসপাতালে যায়। এর পাশাপাশি আরেকটি নির্মম সত্য হচ্ছে যে, দেশের এসব হাসপাতালই প্রতিমুহূর্তে আক্রান্ত করছে সুস্থ মানুষকে। এসব সেবাকেন্দ্র থেকে সারাক্ষণ বেরিয়ে আসছে এমন বর্জ্য, যা নতুন করে মানুষকে অসুস্থ করে তুলছে।

রোগীর রক্ত, সিরাম, মল, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ও অন্যান্য সংক্রামক বর্জ্যরে পাশাপাশি হাসপাতালের অপরিশোধিত তরল বর্জ্যও ঢুকে পড়ছে নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা আর খাল-পুকুরসহ নদীর পানিতে। এসব বর্জ্য শোধনের জন্য আইন আছে, বিধিমালা আছে, সরকারি নির্দেশিকাও আছে। নেই শুধু বাস্তবায়ন। বর্জ্য পানি শোধনাগার বা এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) থাকা বাধ্যতামূলক।

অথচ, পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাসেবামূলক প্রতিষ্ঠান আর বিদ্যাপিঠ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটিতেও ইটিপি নেই। অধিকাংশের নেই পরিবেশ ছাড়পত্রও। আর বেসরকারি হাসপাতালগুলোর অধিকাংশেই নেই এই বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা। সেবার ঘরেই যেন বসবাস করছে বিষধর সর্প। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে সমগ্র স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার এই অব্যবস্থাপনা আর মারাত্মক হুমকির তথ্য জানা গেছে।

অর্থাৎ, যেসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন সংক্রামক রোগী চিকিৎসা নেন, অস্ত্রোপচার হয়, রক্ত ও শরীরের নানা তরল নিয়ে কাজ হয়, সেসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশেই বর্জ্য পানি নিরাপদ করার ব্যবস্থা নেই। হাসপাতালের ভেতরে চিকিৎসা শেষ হলেও সেই বর্জ্যরে যাত্রা শেষ হচ্ছে না। বরং তা ছড়িয়ে পড়ছে হাসপাতালের বাইরের মুক্ত পরিবেশে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শাহ আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘সাধারণ বর্জ্যরে সঙ্গে চিকিৎসা বর্জ্যরে মৌলিক পার্থক্য হলো এর সংক্রামক ও বিষাক্ত চরিত্র।

এতে রোগজীবাণু, ধারালো উপকরণ, রাসায়নিক এবং বিশেষ ক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয় উপাদানও থাকতে পারে। যথাযথভাবে সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, পরিবহন ও ধ্বংস না করলে এসব বর্জ্য রোগ ছড়ানোর একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। ’ তিনি আরও বলেন, চিকিৎসা বর্জ্যে সংক্রামক, বিপজ্জনক এবং কখনো কখনো তেজস্ক্রিয় উপাদান থাকে। যথাযথ ব্যবস্থাপনা না হলে এগুলো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সাধারণ বর্জ্যরে মতো চিকিৎসা বর্জ্য ফেলে দেওয়ার সুযোগ নেই। সঠিকভাবে অপসারণ না করলে রোগ ছড়াতে পারে, পানির উৎস দূষিত হতে পারে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কর্মী, সাধারণ মানুষ ও পরিবেশ ক্ষতিকর জীবাণু ও বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসতে পারে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা অপরিশোধিত তরল বর্জ্য নিয়ে। হাসপাতাল থেকে নির্গত অপরিশোধিত বর্জ্য পানি কলেরা, ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিসের মতো সংক্রামক রোগ ছড়াতে পারে।

চিকিৎসা বর্জ্যরে মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি ও এইচআইভির মতো সংক্রমণের ঝুঁকিও রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৭০০ সরকারি হাসপাতাল, ৬ হাজার ৪৭টি নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল, ১২ হাজারেরও বেশি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার আর ব্লাড ব্যাংক রয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন যে পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, তার একটি অংশও যদি নিরাপদ ব্যবস্থাপনার বাইরে থাকে, তাহলে ঝুঁকির বিস্তারও কম নয়।

মানদণ্ড অনুযায়ী, হাসপাতালের প্রতি শয্যা থেকে গড়ে প্রতিদিন ১ দশমিক ৬২ কেজি বর্জ্য উৎপন্ন হয়। দেশে বছরে আনুমানিক ৭৫ হাজার ৩০৮ টন চিকিৎসা বর্জ্য তৈরি হয়। অন্যদিকে ‘ওয়েস্ট কনসার্ন’-এর গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ৮০ টন চিকিৎসা বর্জ্য উৎপন্ন হয়। পূর্বাভাস বলছে, আগামী ২০ বছরে তা বেড়ে ১৫০ টনে পৌঁছাতে পারে।

অর্থাৎ, আগামী দিনে হাসপাতাল বাড়বে, শয্যা বাড়বে, চিকিৎসাসেবা বাড়বে— সঙ্গে বাড়বে চিকিৎসা বর্জ্যও। কিন্তু বর্তমান অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা যদি একই জায়গায় পড়ে থাকে, তাহলে চিকিৎসাবর্জ্য ভবিষ্যতের বড় নগর ও জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো প্রয়োজনীয় সক্ষমতা আমাদের নেই।

কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কিছু কাজ তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে করা হলেও তরল বর্জ্যরে ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই। ফলে হাসপাতালের নিজস্ব ইটিপি না থাকলে অপরিশোধিত তরল বর্জ্য পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থায় চলে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। ’ বাংলাশে প্রাইভেট হসপিটাল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ইটিপি স্থাপন ও পরিচালনার উচ্চ ব্যয়ের কারণে হাসপাতাল বিধিমালা মেনে চলতে মালিকেরা নিরুৎসাহিত হচ্ছে।

কিন্তু জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে ব্যয় প্রসঙ্গটা কতটা গ্রহণযোগ্য অজুহাত, সেটিই বড় প্রশ্ন। কারণ হাসপাতাল নিজের বর্জ্য নিরাপদ করতে না পারলে সেই ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় সমাজকে— দূষিত পানি, রোগের বিস্তার, পরিবেশের ক্ষতি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির মাধ্যমে। পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, চিকিৎসা বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ) বিধিমালা, ২০০৮ না মানা হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং অনেককে জরিমানাও করা হয়েছে।

তাৎক্ষণিকভাবে পুরো ব্যবস্থার উন্নতি করা কঠিন হলেও নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং সেটা করা হলে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে যদি আইন থাকে, আদালতের নির্দেশ থাকে, পরিবেশ অধিদপ্তরের নজরদারি থাকে, তার পরও সরকারি হাসপাতালের একটিতেও ইটিপি না থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই— সমস্যা কি আইনের অভাবে, নাকি আইনের প্রয়োগে?

হাসপাতালে তরল বর্জ্য পরিশোধনের জন্য ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট), ডব্লিউটিপি (ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট), এসটিপি (স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) থাকা বাধ্যতামূলক হলেও অধিকাংশ হাসপাতালে তা নেই। জাতীয় পরিবেশ নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, ‘প্রতিটি মেডিকেল বর্জ্যরে কোডিং করিয়া পরিমাণের হিসাব রাখিতে হইবে।

প্রতিটি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মেডিকেল বর্জ্য কোডিং করিয়া আলাদা ঢাকনাওয়ালা পাত্রের মাধ্যমে নিরাপদ স্থানে ও দরত্বে সংরক্ষণ করিতে হইবে এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও ধ্বংসকরণের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করিবে। স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান উৎপাদিত মেডিকেল বর্জ্যরে পরিমাণ (কোড অনুযায়ী) আলাদাভাবে সংশ্লিষ্ট রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ রাখিবে।

স্বাস্থ্যসেবায় ন্যূনতম বর্জ্য উৎপাদনকারী প্রযুক্তি বা উপায় গ্রহণ করিতে হইবে। স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সকল প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করিতে হইবে এবং এই সকল প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা বর্জ্যসহ সকল বর্জ্যরে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করিতে হইবে। ’’ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্জ্য ফেলা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদুল্লাহ হলের সামনে একটি আধা ঘেরা এলাকায়।

দুর্গন্ধে পথচারীদের চলাফেরা করতে নাকে রুমাল চেপে ধরতে হয়। এই এলাকায় দেখা গেছে, কাগজ, টিস্যু, প্যাকেট, প্যাথলজিক্যাল নমুনা, ব্যবহৃত রক্তমাখা গজ, ব্যান্ডেজ, প্লাস্টিক, পলিথিন ব্যাগ, পানির বোতল, কাগজপত্র, স্যালাইন ব্যাগ, ওষুধের প্যাকেট মোজা, ন্যাকড়া, রক্ত, দেহরস, সিরামসহ সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন বর্জ্য কনটেইনারে বোঝাই করছেন বর্জ্যকর্মীরা।

এ কাজে তারা কোনো রকম সুরক্ষাসামগ্রী যেমন পিপিই, হ্যান্ড গ্লাভস, মাস্ক, স্যানিটাইজার, হেলমেট, জুতা ব্যবহার করছেন না। সুরক্ষাসামগ্রী নেই কেন জানতে চাইলে বর্জ্যকর্মী আলম হোসেন বলেন, ‘আমাদের এসব লাগে না। পরলে আরও গরম লাগে। করোনার সময়ও পরিনি। আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। ’ এগুলো এখান থেকে নিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলা হবে বলে আলম জানান।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক চালানোর জন্য ছাড়পত্র নিতে হলে ইটিপি স্থাপনসহ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিধিতেও বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়। সরকারি হাসপাতালগুলোর একটিরও পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। স্থাপন করা হয়নি ইটিপি। বেশ কিছু বেসরকারি হাসপাতালের আগে নেওয়া পরিবেশ ছাড়পত্র থাকলেও এখন আর নবায়ন করার সুযোগ হচ্ছে না।

এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আশরাফুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘জানামতে, পুরাতন হাসপাতালের কোনোটিতেই এই ছাড়পত্র নেই। নতুন করে যেসব প্রতিষ্ঠান হচ্ছে, সেগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ইটিপি স্থাপন চলছে। ’ তারাও আবেদন করছে এবং সেটা প্রক্রিয়াধীন বলে তিনি জানান। কিছু বেসরকারি হাসপাতালে অবশ্য ভিন্ন চিত্রও পাওয়া গেছে।

রাজধানীর বেসরকারি আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের সচিব এ বি এম কায়কোবাদ রূপালী বাংলাশেকে জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে হাসপাতালে তরল বর্জ্য পরিশোধনের জন্য ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট), ডব্লিউটিপি (ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট), এসটিপি (স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) আছে। এটি বাধ্যতামূলক। তবে কঠিন পদার্থগুলো বা বর্জ্য অপসারণ করে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্ধারিত জাপানি একটি প্রতিষ্ঠান।