আজ রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২৯ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ৩০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৯°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৪৯%

৩৩ বছরের গ্লানি পেরিয়ে উদ্বোধনের অপেক্ষায় চসিকের অত্যাধুনিক বাস টার্মিনাল

  • MIT ERP
  • Update Time : 06:29:26 pm, Saturday, 12 September 2026
  • 17

৩৩ বছরের গ্লানি পেরিয়ে উদ্বোধনের অপেক্ষায় চসিকের অত্যাধুনিক বাস টার্মিনাল

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

তিন দশকের গ্লানি পেছনে ফেলে এবার উত্তর চট্টগ্রামের কূলগাঁও-বালুছড়ায় উদ্বোধনের প্রহর গুনছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অত্যাধুনিক বাস টার্মিনাল। যুগের পর যুগ ধরে চলা অনিয়ম আর ভোগান্তির পুরোনো গল্প পেরিয়ে আগামীতে এখান থেকেই শুরু হবে স্বস্তির নতুন অধ্যায়—যেখানে বাস দাঁড়াবে নিয়মে, যাত্রী উঠবে স্বস্তিতে আর পথচলা হবে আরও শৃঙ্খলিত।

আগামীতে নগরের গণপরিবহন ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে—এমনটাই প্রত্যাশা নগর পরিকল্পনাবিদ ও সাধারণ যাত্রীদের। প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা চসিকের তথ্য মতে, ১৯৯৩ সালে বহদ্দারহাটে দ্বিতীয় টার্মিনাল চালুর পর পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ তিন দশক। এই ৩৩ বছরে নগরীতে গাড়ি ও মানুষের সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি টার্মিনালের সংখ্যা। চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চল এবং দুই পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িসহ উত্তর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ভূজপুর, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়াসহ সমগ্র উত্তর চট্টগ্রামের জন্য এই টার্মিনালটি ব্যবহার হবে।

এই রোডে প্রতিদিন ১৫ হাজারের অধিক যানবাহন চলাচল করে বলে জানা গেছে। চসিক বলছে, নগরের জিইসি, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, ২নং গেট, অক্সিজেন ও চৌধুরীহাটসহ একাধিক স্থানে যে যানজট তৈরি হয় তার অন্যতম কারণ এই এলাকায় নেই কোনো বাস-ট্রাক টার্মিনাল। এই রোডের বাসগুলো দাঁড়ায় রাস্তার উপর, যাত্রী নেয়া হয় রাস্তায় দাঁড়িয়ে। যার ফলে ব্যস্ততম সময়ে স্বাভাবিকভাবে রাস্তার ওপর তৈরি হয় জ্যাম।

এ সমস্যা নিরসনে এই এলাকায় একটি বাস ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ অপরিহার্য ছিল, সেই বাস্তবায়তায় এখানে গড়ে তোলা হবে বাস টার্মিনালটি। টার্মিনালটি চালু হলে হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের যানবাহনগুলো নগরের মূল অংশে প্রবেশ না করেই যাত্রী ওঠানামা করাতে পারবে। যেভাবে গড়ে উঠে প্রকল্পটি ২০১৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে (একনেক) অনুমোদন পাওয়া ৮.১০ একর জমির এই মেগা প্রকল্পে ব্যয়ের বড় অংশই গেছে জমি অধিগ্রহণে।

৮.১০ একর ভূমির জন্য ১০৩.১৫ কোটি টাকা। ২৫ হাজার বর্গমিটারের ইয়ার্ড ও ড্রেন নির্মাণে ২৫ কোটি টাকা, অবকাঠামোর ৩ হাজার বর্গমিটারের মূল ভবনে ৭.৫০ কোটি এবং ভূমি উন্নয়নে ৩.৩৭ কোটি টাকা এবং নির্মাণ খাতে মোট ব্যয় ৩৫.৮৭ কোটি টাকা। ভূমি জটিলতাই ছিল প্রতিদ্ধকতা চসিকের তথ্য মতে, প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও এক পাশের ভূমি নিয়ে ছিল একাধিক জটিলতা।

পূর্ববর্তী সরকারের আমলে প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও ভূমি জটিলতা নিয়ে স্থবির হয়ে পড়ে ছিল প্রকল্পের কাজ। এজন্য আওয়ামী লীগ আমল ও পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দৃশ্যমান কাজের অগ্রগতি হয়নি। এদিকে ডা. শাহাদাত হোসেন চসিকের মেয়রের দায়িত্ব নেয়ার পর বারে বারে ঢাকাসহ বিভিন্ন পক্ষের সাথে আলোচনা করে আইনিসহ একাধিক জটিলতা নিরসন করেন।

এরপরেই মূলত প্রকল্পের কাজে গতি আসে। যাত্রী-শ্রমিকদের জন্য যে সুবিধা থাকবে শুধু গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখার জায়গা নয়, নতুন এই টার্মিনালটি সাজানো হচ্ছে এক ছাদের নিচে উন্নতমানের যাত্রীসেবা নিশ্চিয়তা। একসাথে ২০০টি বাস ও ট্রাক পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা থাকবে এই টার্মিনালে। মূল টার্মিনাল ভবনের ৩ হাজার বর্গমিটারের ভবনের নিচতলায় থাকছে ৮টি ডিজিটাল টিকিট কাউন্টার, বিশাল ওয়েটিং জোন ও স্টোর রুম।

প্রথম তলায় থাকবে আধুনিক ভিআইপি লাউঞ্জ ও পরিবহন মালিকদের অফিস। ৩০০ বর্গমিটারের বিশাল রেস্টুরেন্ট এলাকা, এসি অপেক্ষা কক্ষ ও ওয়াই-ফাই সুবিধা। দেশের কোন টার্মিনালে নেই বাস ট্রাক টার্মিনালে বিভিন্ন যানবাহনের চালক ও তাদের সহকারীদের বিশ্রামের ব্যবস্থা , যা এই টার্মিনালে রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে রাখা হয়েছে একাধিক খাবারের দোকান ও ক্যান্টিন।

যানবাহনগুলোর নিরবিচ্ছিন্ন জ্বালানী সরবরাহের জন্য স্থাপন করা হচ্ছে টার্মিনালে পেট্টোল পাম্প। একইসঙ্গে প্রত্যেক বাসের জন্যও রয়েছে আলাদা কাউন্টার। দেশের কোনো টার্মিনালে মহিলাদের জন্য আলাদা ব্রেস্ট ফিডিংয়ের ব্যবস্থা না থাকলেও এই টার্মিনালে মায়েদের জন্য রাখা হয়েছে সুরক্ষিত ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’। এ ছাড়াও একইসঙ্গে বয়স্ক যাত্রীদের জন্য বসার স্থানসহ আলাদা সুবিধা রাখা হয়েছে।

বিশেষ নাগরিক সুবিধার অংশ হিসেবে সাধারণ শৌচাগারের পাশাপাশি নারী ও পুরুষদের জন্য পৃথক নয়টি টয়লেট এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব বিশেষ টয়লেট। কমবে যাত্রী হয়রানি-যানজট চট্টগ্রাম-ফটিকছড়ি-নাজিরহাট-খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন ছোটবড় অন্তত ১১০০ থেকে ১২০০টি বাস ট্রাকআসা- যাওয়া করে। স্থায়ী টার্মিনাল না থাকায় বাসগুলোকে অক্সিজেন ও আশপাশের প্রধান সড়কের ওপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাস দাঁড় করিয়ে রাখতে হতো।

এতে যেমন নগরে সৃষ্টি হতো যানজট, তেমনই বাড়ত দুর্ঘটনা ও জ্বালানি চুরির ঝুঁকি। পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বালুছড়া টার্মিনাল চালু হলে হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের যানবাহনগুলো নগরের মূল অংশে প্রবেশ না করেই যাত্রী ওঠানামা করাতে পারবে। এতে করে যাত্রীরা অনাকাঙ্খিত হয়রানি–বিড়ম্বনা থেকে যেমন রক্ষা পাবেন তেমনি নগরীর মধ্যম ও উত্তরাংশের দীর্ঘদিনের যানজট একঝটকায় কমে আসবে।

কবে নাগাদ চালু? প্রকল্প সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে টানা পাঁচ-ছয় মাস নির্মাণকাজ স্থবির হয়ে পড়েছিল। তা না হলে চলতি বছরই এর উদ্বোধন সম্ভব হতো। চসিকের প্রধান প্রকৌশলী বলেন, টার্মিনালের ইয়ার্ড, ড্রেন ও সীমানা প্রাচীরসহ প্রকল্পের ৯৫-৯৭ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। শতভাগ কাজ শেষ করে টার্মিনালটি চালু করার সর্বাত্মক প্রস্তুতি চলছে।

চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিসুর রহমান সোহেল বলেন, মাঝখানে ৫-৬ মাস কাজ থমকে না থাকলে অনেক আগেই এটি উদ্বোধন হতো। তবে চসিকের তদারকিতে এখন কাজ চলছে দ্বিগুণ গতিতে। ভারী যানবাহনের চাপ ও বর্ষার পানি সামলাতে আমরা যুগোপযোগী ড্রেনেজ ও শক্তিশালী স্ট্রাকচার ব্যবহার করেছি। আগামী এক মাসের মধ্যেই শতভাগ কাজ বুঝিয়ে দিয়ে চট্টগ্রামবাসীকে নতুন টার্মিনাল উপহার দিতে আমরা প্রস্তুত।

এ বিষয়ে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, মানুষের সন্তুষ্টির জন্যই আমি কাজ করি। আমরা অনেক কাজ করি, তার অনেকটা নগরবাসী জানেন না। তিন দশকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এই টার্মিনাল চট্টগ্রামের গণপরিবহনে নতুন স্বস্তির দুয়ার খুলছে। প্রকল্পের অগ্রগতিতে আমরা সন্তুষ্ট; নাগরিকদের কাছে এর সুফল পৌঁছে দেওয়ায় এখন আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

এই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারাটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড় সন্তুষ্টির জায়গা। মেয়র আরও বলেন, টার্মিনাল হবে অবকাঠামোর দৃষ্টান্ত, আর এর পরিচালনা হবে শৃঙ্খলা ও নাগরিক সেবার দৃষ্টান্ত। বিষয়টি মাথায় রেখে একটি টিম কাজ করছে। আমরা শুধু টার্মিনাল নির্মাণ করতে চাই না, চট্টগ্রামের গণপরিবহনের সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে চাই। এখানে বাস-ট্রাক চলবে নিয়মে, যাত্রীসেবা হবে শৃঙ্খলায় আর ব্যবস্থাপনায় থাকবে জবাবদিহিতায়।

তিনি বলেন, এই টার্মিনাল যানজট কমানোর পাশাপাশি চট্টগ্রামকে আরও পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও সবুজ নগর হিসেবে গড়ে তোলার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যানজটমুক্ত সড়ক আর দূষণমুক্ত বাতাস—একটি বাস টার্মিনাল সেই বড় স্বপ্নেরই অংশ। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা শুধু বাস-ট্রাকের জন্য জায়গা তৈরি করছি না বরং চট্টগ্রামকে আরও বাসযোগ্য, স্বাস্থ্যকর ও সবুজ নগর হিসেবে গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি করছি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ নিয়ে মুখ খুললেন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ

৩৩ বছরের গ্লানি পেরিয়ে উদ্বোধনের অপেক্ষায় চসিকের অত্যাধুনিক বাস টার্মিনাল

Update Time : 06:29:26 pm, Saturday, 12 September 2026

তিন দশকের গ্লানি পেছনে ফেলে এবার উত্তর চট্টগ্রামের কূলগাঁও-বালুছড়ায় উদ্বোধনের প্রহর গুনছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অত্যাধুনিক বাস টার্মিনাল। যুগের পর যুগ ধরে চলা অনিয়ম আর ভোগান্তির পুরোনো গল্প পেরিয়ে আগামীতে এখান থেকেই শুরু হবে স্বস্তির নতুন অধ্যায়—যেখানে বাস দাঁড়াবে নিয়মে, যাত্রী উঠবে স্বস্তিতে আর পথচলা হবে আরও শৃঙ্খলিত।

আগামীতে নগরের গণপরিবহন ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে—এমনটাই প্রত্যাশা নগর পরিকল্পনাবিদ ও সাধারণ যাত্রীদের। প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা চসিকের তথ্য মতে, ১৯৯৩ সালে বহদ্দারহাটে দ্বিতীয় টার্মিনাল চালুর পর পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ তিন দশক। এই ৩৩ বছরে নগরীতে গাড়ি ও মানুষের সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি টার্মিনালের সংখ্যা। চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চল এবং দুই পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িসহ উত্তর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ভূজপুর, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়াসহ সমগ্র উত্তর চট্টগ্রামের জন্য এই টার্মিনালটি ব্যবহার হবে।

এই রোডে প্রতিদিন ১৫ হাজারের অধিক যানবাহন চলাচল করে বলে জানা গেছে। চসিক বলছে, নগরের জিইসি, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, ২নং গেট, অক্সিজেন ও চৌধুরীহাটসহ একাধিক স্থানে যে যানজট তৈরি হয় তার অন্যতম কারণ এই এলাকায় নেই কোনো বাস-ট্রাক টার্মিনাল। এই রোডের বাসগুলো দাঁড়ায় রাস্তার উপর, যাত্রী নেয়া হয় রাস্তায় দাঁড়িয়ে। যার ফলে ব্যস্ততম সময়ে স্বাভাবিকভাবে রাস্তার ওপর তৈরি হয় জ্যাম।

এ সমস্যা নিরসনে এই এলাকায় একটি বাস ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ অপরিহার্য ছিল, সেই বাস্তবায়তায় এখানে গড়ে তোলা হবে বাস টার্মিনালটি। টার্মিনালটি চালু হলে হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের যানবাহনগুলো নগরের মূল অংশে প্রবেশ না করেই যাত্রী ওঠানামা করাতে পারবে। যেভাবে গড়ে উঠে প্রকল্পটি ২০১৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে (একনেক) অনুমোদন পাওয়া ৮.১০ একর জমির এই মেগা প্রকল্পে ব্যয়ের বড় অংশই গেছে জমি অধিগ্রহণে।

৮.১০ একর ভূমির জন্য ১০৩.১৫ কোটি টাকা। ২৫ হাজার বর্গমিটারের ইয়ার্ড ও ড্রেন নির্মাণে ২৫ কোটি টাকা, অবকাঠামোর ৩ হাজার বর্গমিটারের মূল ভবনে ৭.৫০ কোটি এবং ভূমি উন্নয়নে ৩.৩৭ কোটি টাকা এবং নির্মাণ খাতে মোট ব্যয় ৩৫.৮৭ কোটি টাকা। ভূমি জটিলতাই ছিল প্রতিদ্ধকতা চসিকের তথ্য মতে, প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও এক পাশের ভূমি নিয়ে ছিল একাধিক জটিলতা।

পূর্ববর্তী সরকারের আমলে প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও ভূমি জটিলতা নিয়ে স্থবির হয়ে পড়ে ছিল প্রকল্পের কাজ। এজন্য আওয়ামী লীগ আমল ও পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দৃশ্যমান কাজের অগ্রগতি হয়নি। এদিকে ডা. শাহাদাত হোসেন চসিকের মেয়রের দায়িত্ব নেয়ার পর বারে বারে ঢাকাসহ বিভিন্ন পক্ষের সাথে আলোচনা করে আইনিসহ একাধিক জটিলতা নিরসন করেন।

এরপরেই মূলত প্রকল্পের কাজে গতি আসে। যাত্রী-শ্রমিকদের জন্য যে সুবিধা থাকবে শুধু গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখার জায়গা নয়, নতুন এই টার্মিনালটি সাজানো হচ্ছে এক ছাদের নিচে উন্নতমানের যাত্রীসেবা নিশ্চিয়তা। একসাথে ২০০টি বাস ও ট্রাক পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা থাকবে এই টার্মিনালে। মূল টার্মিনাল ভবনের ৩ হাজার বর্গমিটারের ভবনের নিচতলায় থাকছে ৮টি ডিজিটাল টিকিট কাউন্টার, বিশাল ওয়েটিং জোন ও স্টোর রুম।

প্রথম তলায় থাকবে আধুনিক ভিআইপি লাউঞ্জ ও পরিবহন মালিকদের অফিস। ৩০০ বর্গমিটারের বিশাল রেস্টুরেন্ট এলাকা, এসি অপেক্ষা কক্ষ ও ওয়াই-ফাই সুবিধা। দেশের কোন টার্মিনালে নেই বাস ট্রাক টার্মিনালে বিভিন্ন যানবাহনের চালক ও তাদের সহকারীদের বিশ্রামের ব্যবস্থা , যা এই টার্মিনালে রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে রাখা হয়েছে একাধিক খাবারের দোকান ও ক্যান্টিন।

যানবাহনগুলোর নিরবিচ্ছিন্ন জ্বালানী সরবরাহের জন্য স্থাপন করা হচ্ছে টার্মিনালে পেট্টোল পাম্প। একইসঙ্গে প্রত্যেক বাসের জন্যও রয়েছে আলাদা কাউন্টার। দেশের কোনো টার্মিনালে মহিলাদের জন্য আলাদা ব্রেস্ট ফিডিংয়ের ব্যবস্থা না থাকলেও এই টার্মিনালে মায়েদের জন্য রাখা হয়েছে সুরক্ষিত ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’। এ ছাড়াও একইসঙ্গে বয়স্ক যাত্রীদের জন্য বসার স্থানসহ আলাদা সুবিধা রাখা হয়েছে।

বিশেষ নাগরিক সুবিধার অংশ হিসেবে সাধারণ শৌচাগারের পাশাপাশি নারী ও পুরুষদের জন্য পৃথক নয়টি টয়লেট এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব বিশেষ টয়লেট। কমবে যাত্রী হয়রানি-যানজট চট্টগ্রাম-ফটিকছড়ি-নাজিরহাট-খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন ছোটবড় অন্তত ১১০০ থেকে ১২০০টি বাস ট্রাকআসা- যাওয়া করে। স্থায়ী টার্মিনাল না থাকায় বাসগুলোকে অক্সিজেন ও আশপাশের প্রধান সড়কের ওপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাস দাঁড় করিয়ে রাখতে হতো।

এতে যেমন নগরে সৃষ্টি হতো যানজট, তেমনই বাড়ত দুর্ঘটনা ও জ্বালানি চুরির ঝুঁকি। পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বালুছড়া টার্মিনাল চালু হলে হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের যানবাহনগুলো নগরের মূল অংশে প্রবেশ না করেই যাত্রী ওঠানামা করাতে পারবে। এতে করে যাত্রীরা অনাকাঙ্খিত হয়রানি–বিড়ম্বনা থেকে যেমন রক্ষা পাবেন তেমনি নগরীর মধ্যম ও উত্তরাংশের দীর্ঘদিনের যানজট একঝটকায় কমে আসবে।

কবে নাগাদ চালু? প্রকল্প সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে টানা পাঁচ-ছয় মাস নির্মাণকাজ স্থবির হয়ে পড়েছিল। তা না হলে চলতি বছরই এর উদ্বোধন সম্ভব হতো। চসিকের প্রধান প্রকৌশলী বলেন, টার্মিনালের ইয়ার্ড, ড্রেন ও সীমানা প্রাচীরসহ প্রকল্পের ৯৫-৯৭ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। শতভাগ কাজ শেষ করে টার্মিনালটি চালু করার সর্বাত্মক প্রস্তুতি চলছে।

চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিসুর রহমান সোহেল বলেন, মাঝখানে ৫-৬ মাস কাজ থমকে না থাকলে অনেক আগেই এটি উদ্বোধন হতো। তবে চসিকের তদারকিতে এখন কাজ চলছে দ্বিগুণ গতিতে। ভারী যানবাহনের চাপ ও বর্ষার পানি সামলাতে আমরা যুগোপযোগী ড্রেনেজ ও শক্তিশালী স্ট্রাকচার ব্যবহার করেছি। আগামী এক মাসের মধ্যেই শতভাগ কাজ বুঝিয়ে দিয়ে চট্টগ্রামবাসীকে নতুন টার্মিনাল উপহার দিতে আমরা প্রস্তুত।

এ বিষয়ে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, মানুষের সন্তুষ্টির জন্যই আমি কাজ করি। আমরা অনেক কাজ করি, তার অনেকটা নগরবাসী জানেন না। তিন দশকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এই টার্মিনাল চট্টগ্রামের গণপরিবহনে নতুন স্বস্তির দুয়ার খুলছে। প্রকল্পের অগ্রগতিতে আমরা সন্তুষ্ট; নাগরিকদের কাছে এর সুফল পৌঁছে দেওয়ায় এখন আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

এই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারাটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড় সন্তুষ্টির জায়গা। মেয়র আরও বলেন, টার্মিনাল হবে অবকাঠামোর দৃষ্টান্ত, আর এর পরিচালনা হবে শৃঙ্খলা ও নাগরিক সেবার দৃষ্টান্ত। বিষয়টি মাথায় রেখে একটি টিম কাজ করছে। আমরা শুধু টার্মিনাল নির্মাণ করতে চাই না, চট্টগ্রামের গণপরিবহনের সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে চাই। এখানে বাস-ট্রাক চলবে নিয়মে, যাত্রীসেবা হবে শৃঙ্খলায় আর ব্যবস্থাপনায় থাকবে জবাবদিহিতায়।

তিনি বলেন, এই টার্মিনাল যানজট কমানোর পাশাপাশি চট্টগ্রামকে আরও পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও সবুজ নগর হিসেবে গড়ে তোলার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যানজটমুক্ত সড়ক আর দূষণমুক্ত বাতাস—একটি বাস টার্মিনাল সেই বড় স্বপ্নেরই অংশ। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা শুধু বাস-ট্রাকের জন্য জায়গা তৈরি করছি না বরং চট্টগ্রামকে আরও বাসযোগ্য, স্বাস্থ্যকর ও সবুজ নগর হিসেবে গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি করছি।