ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের চাপুলিয়ায় ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের আশ্রয়ের জন্য নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্প ও গুচ্ছগ্রামটি মধুমতি নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। একসময় যেখানে শত শত মানুষ নতুন জীবনের স্বপ্ন বুনতেন, নদীভাঙনের ফলে তাদের সেই ঘরবাড়ির অধিকাংশ এখন নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে।
শেষ সম্বল হারিয়ে অনেক পরিবার খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মধুমতি নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে ওই এলাকায় নদীভাঙন তীব্র হয়েছে। তাদের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে দ্রুত ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে গুচ্ছগ্রাম ও পুরো চাপুলিয়া গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
নদীভাঙন বন্ধ, অবৈধ বালু উত্তোলন স্থায়ীভাবে বন্ধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবিতে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকালে চাপুলিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পসংলগ্ন মধুমতি নদীর তীরে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কর্মসূচিতে নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারানো মানুষের কান্না ও আহাজারিতে আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় তরুণ আকিব আহমেদের আহ্বানে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তব্য দেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আলফাডাঙ্গা উপজেলা শাখার সভাপতি মাওলানা শরিফুল ইসলাম জুয়েল, স্থানীয় বাসিন্দা নিয়ামুল মোল্যা, তাইফুর হোসেন ও সোহাগ মোল্যাসহ অনেকে। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ভূমিহীন ও আশ্রয়হীন মানুষের জন্য সরকার চাপুলিয়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্প ও গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করেছিল।
কিন্তু পার্শ্ববর্তী নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার একদল ড্রেজার ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে মধুমতি নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন। এতে নদীর গতিপথ ও তীরের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বক্তাদের অভিযোগ, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো ধীরে ধীরে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। শেষ সম্বলটুকুও হারিয়ে শত শত মানুষ আবার গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।
তাঁরা অবিলম্বে বালু উত্তোলন বন্ধের পাশাপাশি ভাঙন ঠেকাতে স্থায়ী নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১১-২০১২ অর্থবছরে চাপুলিয়া গ্রামের খাসজমিতে ভূমিহীনদের জন্য ১৩০টি ঘর নির্মাণ করে ‘চাপুলিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প’ করা হয়। এর পাশেই ২০০টি পরিবারের জন্য নির্মাণ করা হয় ‘গুচ্ছগ্রাম’।
প্রকল্প দুটি নির্মাণের সময় মধুমতি নদী থেকে এগুলোর দূরত্ব ছিল প্রায় এক কিলোমিটার। ২০২১ সাল থেকে ওই এলাকায় নদীভাঙন শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় আশ্রয়ণ প্রকল্প ও গুচ্ছগ্রামটি ঝুঁকির মুখে পড়ে। সম্প্রতি নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের পর ভাঙন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পটি পুরোপুরি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
টগরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিয়া আসাদুজ্জামান বলেন, ‘অসহায় পরিবারগুলোর ঘরবাড়ি চোখের সামনে বিলীন হয়ে গেছে। এখন তাদের যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। অনেকে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের জন্য দ্রুত সরকারি সহায়তা ও জরুরি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ’ ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) মো. মজিবর রহমান বলেন, ভাঙনকবলিত ওই এলাকার জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
এর স্টাডি রিপোর্টও পাঠানো হয়েছে। দ্রুত এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ড. ইলিয়াস মোল্লা বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে তা বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



















