শরৎ আসতেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার সীমান্তঘেঁষা ঘাঘুটিয়া ও মিনারকুট এলাকার পদ্মবিলে ফুটেছে অসংখ্য গোলাপি ও শ্বেতপদ্ম। সবুজ জলাভূমির বুকজুড়ে ফুটে থাকা পদ্ম দেখতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন দর্শনার্থীরা।
নৌকায় চড়ে পদ্মবিল ঘুরে দেখার পাশাপাশি অনেকে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন। ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত বিলের বিভিন্ন ঘাটে দর্শনার্থীদের আনাগোনা দেখা যায়। পরিবার নিয়ে আসা মানুষের পাশাপাশি শিশু-কিশোর ও তরুণদের উপস্থিতিও রয়েছে। নৌকায় করে পদ্মের মাঝখানে ঘুরে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছেন তারা। কসবার নয়নপুর থেকে পরিবার নিয়ে আসা মো. বাবু বলেন, এখানকার পরিবেশটা খুব কোমল।
পরিবার নিয়ে এখানে এসে খুব ভালো লাগছে। নৌকা নিয়ে পদ্মবিল ঘুরেছি, মনে শান্তি পেয়েছি। বিজয়নগর থেকে আসা বাপ্পি বলেন, এই পরিবেশে এতটাই মুগ্ধ হয়েছি, তা বলে বোঝানো যাবে না। জীবনে প্রথমবার পদ্মবিলে এলাম। ঘুরে খুব ভালো লেগেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা ফারিয়া আক্তার বলেন, এখানে এত ভালো লেগেছে যে বাড়িতে যাওয়ার মনই মানছে না। পুরো পরিবেশটা যেন মুগ্ধতা ছড়িয়ে রেখেছে।
দর্শনার্থীদের আগমনে স্থানীয় মাঝিদেরও আয় বেড়েছে। পদ্মবিলে নৌকা নিয়ে দর্শনার্থীদের ঘুরিয়ে দেখিয়ে প্রতিদিন আয় করছেন তারা। বর্ষা মৌসুমে নৌকা চলাচল কমে গেলে যেসব মাঝি অনেকটা কর্মহীন থাকেন, পদ্ম ফুটে ওঠার পর তাদের ব্যস্ততা বেড়েছে। পদ্মবিলের মাঝি মো. শাহআলম মিয়া বলেন, এই পদ্মবিলের কারণে আলহামদুলিল্লাহ ভালো উপার্জন হচ্ছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ আসে।
আমি দৈনিক ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত উপার্জন করতে পারি। আরেক মাঝি বিল্লাল হোসেন বলেন, প্রতিদিন পর্যটক আসছেন। নৌকা নিয়ে তাদের পদ্মফুলের মধ্যে ঘুরিয়ে দেখাই। তারা আনন্দ করেন, তাদের আনন্দ দেখে আমাদেরও ভালো লাগে। আগে বর্ষার মৌসুমে বেকার বসে থাকতে হতো। এখন এই বিলের কারণে আর অবসর থাকতে হচ্ছে না। তবে দর্শনার্থীদের ভিড়ে পদ্মবিলের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগও দেখা দিয়েছে।
অনেকে ছবি তোলা কিংবা আনন্দের জন্য পদ্মফুল ছিঁড়ে ফেলছেন এবং পদ্মগাছের ক্ষতি করছেন। এতে বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন পরিবেশকর্মীরা। পরিবেশ ও নদী সুরক্ষাবিষয়ক সংগঠন তরী বাংলাদেশের আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, শত শত বছর ধরে প্রকৃতি নিজের নিয়মে এই বিলকে সাজিয়েছে। অযথা ছবি তোলা বা সাময়িক আনন্দের জন্য পদ্মফুল, পদ্মকাঁটা কিংবা ফুলগাছ উপড়ে ফেলা উচিত নয়।
একটি ফুল ছেঁড়াও বিলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও প্রজনন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। তিনি বলেন, পদ্মবিল অসংখ্য দেশি ও অতিথি পাখির বিচরণক্ষেত্র। তাই দর্শনার্থীদের শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। স্থানীয় মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবুল আলম চৌধুরী দীপক বলেন,আমাদের মনিয়ন্দ ইউনিয়নের এই সীমান্তঘেঁষা বিলটি প্রকৃতি অপূর্ব সাজে সাজিয়েছে।
শত শত মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এখানে আসছেন, যা পুরো এলাকার জন্য আনন্দ ও গর্বের বিষয়। পরিবেশ রক্ষা এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। স্থানীয়রা বলছেন, পদ্মবিলকে পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি ভবিষ্যতে আখাউড়ার অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে দর্শনার্থীদের সচেতনতা ও প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো গেলে পদ্মের সৌন্দর্য এবং বিলের জীববৈচিত্র্য দুটিই রক্ষা করা সম্ভব হবে।
আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপসী রাবেয়া বলেন, পদ্মবিলটি আখাউড়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এলাকাটিকে পরিবেশবান্ধব ও পর্যটনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য যাতে নষ্ট না হয়, সেদিকেও নজরদারি রাখা হচ্ছে।





















