আজ শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২১ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩২°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ১০০%

আজ বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদতবার্ষিকী

  • MIT ERP
  • Update Time : 02:22:44 pm, Saturday, 5 September 2026
  • 4

আজ বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদতবার্ষিকী

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

আজ ৫ সেপ্টেম্বর, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদতবার্ষিকী। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এই দিনে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে লড়াই করার সময় তিনি শহীদ হন।

এই দিনে জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে এই অকুতোভয় বীরকে, যিনি জীবন উৎসর্গ করে রচনা করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তার বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেম চিরকাল এ দেশের মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জানায়, নূর মোহাম্মদ ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইলের মহিষখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

শৈশবে লেখাপড়ার চেয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের দিকে তার বেশি ঝোঁক ছিল। তবে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মা-বাবাকে হারিয়ে তিনি অভিভাবকহীন হয়ে পড়েন। এরপর বিয়ে করে সাংসারিক প্রয়োজনে ১৯৫৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ২৩ বছর বয়সে ইপিআরে (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) যোগদান করেন। নূর মোহাম্মদ প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষে একই বছর ৩ ডিসেম্বর দিনাজপুর সেক্টরের কুঠিবাড়ি ক্যাম্পে সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন।

সৈনিক জীবনে তার স্বভাবসুলভ উচ্ছলতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি সবার প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠেন। দিনাজপুর সেক্টরে থাকাকালীন ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে তিনি সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে তাকে ইপিআরের যশোর সেক্টর সদর দপ্তরে বদলি করা হয়। ২৫ মার্চের গণহত্যার সময় নূর মোহাম্মদ নিয়মিত ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে ছিলেন।

বাড়িতে বসেই তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংসতার খবর জানতে পারেন। নিজ মাতৃভূমি ও জাতির এমন দুর্যোগ পরিস্থিতিতে সবার সঙ্গে আলোচনা করে নিজের করণীয় ঠিক করতে ছুটি শেষ হওয়ার আগেই তিনি নিজ কর্মস্থল ৪ নম্বর ইপিআর উইংয়ে যোগদান করেন। এসময় ৪ নম্বর উইং ৮ নম্বর সেক্টরের অধীনে যশোর এলাকায় অবস্থান করছিল। আগস্ট মাসে ৮ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডারের নির্দেশে সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদা তার অধীনস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের ছোটো ছোটো কয়েকটি দলে ভাগ করে দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা যুদ্ধের জন্য বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেন।

এরকম একটি দল আগস্ট মাসের শুরুতেই যশোরের চৌগাছা থানার ছুটিপুর গ্রামে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নেয়। ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার নেতৃত্বাধীন এই দলেই ছিলেন ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ। ছুটিপুর গ্রামটি যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না এবং দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী সদর দপ্তর যশোর ক্যান্টমেন্ট ছিল।

তা ছাড়া আগস্টের আগে এই এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানিদের বহুবার সংঘর্ষ হয়। এতে পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রতিবারই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে অনেক মরদেহ ফেলে রেখে পিছু হটে যেতে বাধ্য হয়। তবুও পাকিস্তান সেনাবাহিনী ছুটিপুর এলাকাটি তাদের দখলে রাখার জন্য বারবার আরও বেশি শক্তি নিয়ে আক্রমণ করে যাচ্ছিল। কারণ সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এই স্থানটি উভয়পক্ষের কাছেই কৌশলগত কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

৫ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ চারজন সহযোদ্ধাসহ ছুটিপুর প্রতিরক্ষা এলাকার সামনে গোয়ালহাটি গ্রামের কাছে স্ট্যান্ডিং টহল ডিউটিতে ছিলেন। তিনি ছিলেন টহল অধিনায়ক। শত্রুর ওপর দৃষ্টি রাখা ও তাদের আক্রমণের পরিকল্পনা নিজ প্রতিরক্ষা অবস্থানে পাঠানোর নির্দেশ ছিল তার ওপর। শত্রুপক্ষ তিন দিক থেকে তাদের আক্রমণাত্মকভাবে ঘিরে ফেলে এবং নূর মোহাম্মদের টহলকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করে।

সঙ্গে সঙ্গে শত্রুরা বিরামহীন গুলিবর্ষণ শুরু করে এবং নূর মোহাম্মদের দলের দিকে অগ্রসর হয়। শত্রুর প্রচণ্ড গোলাগুলিতে নূর মোহাম্মদের সহযোদ্ধা সিপাহি নান্নু মিয়া গুলিবিদ্ধ এবং মারাত্মকভাবে আহত হন। দলের অধিনায়ক হিসেবে নূর মোহাম্মদ দ্রুত আহত নান্নু মিয়ার দিকে এগিয়ে আসেন এবং নান্নু মিয়ার এলএমজি দিয়ে শত্রুর দিকে গুলিবর্ষণ শুরু করেন।

এর ফলে শত্রুর সামনে আসা বাধাগ্রস্ত হয়। এই পর্যায়ে নূর মোহাম্মদ নিজে এবং তার অধীনস্থ সৈনিকদের বারবার অবস্থান বদল করে শত্রুর দিকে গুলি ছুড়তে নির্দেশ দেন, যেন শত্রুপক্ষ তাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে না পারে। অবস্থান পরিবর্তনের সময় নূর মোহাম্মদ নিজেই আহত নান্নু মিয়াকে কাঁধে নিয়ে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাচ্ছিলেন। এসময় তার ডান কাঁধে একটি গুলি লাগে এবং ২ ইঞ্চি মর্টার শেলের আঘাতে ডান হাঁটু ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়।

এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অপর সহযোদ্ধা সিপাহি মোস্তফাকে নির্দেশ দেন আহত নান্নু মিয়াসহ সবাইকে নিরাপদ স্থানে ফিরে যেতে। এরই মধ্যেই শত্রুপক্ষ তাদের আরও কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তখন তাদের সামনে দুটো পথই খোলা ছিল। প্রথমটি হল পিছু হটা এবং অন্যটি সরাসরি শত্রুর মোকাবিলা করা। কিন্তু মারাত্মকভাবে আহত নূর মোহাম্মদ এরই মধ্যেই প্রচণ্ড রক্তক্ষরণজনিত কারণে অসম্ভব দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন।

সিপাহি মোস্তফা চাচ্ছিলেন তাদের দলনেতা নূর মোহাম্মদসহ সবাই একসঙ্গে প্রতিরক্ষা অবস্থানে ফিরে যেতে। মোস্তফা যখন নূর মোহাম্মদকে ধরে তুলতে চাচ্ছিলেন তখন তিনি পাশের একটি গাছের গুঁড়ি আঁকড়ে ধরে থাকেন এবং বলেন- ‘আহত নান্নু মিয়া ও এলএমজিটিসহ তোমরা নিরাপদ স্থানে ফিরে যাও নতুবা আমরা সবাই মারা যাব। সেই সঙ্গে আমাদের প্রতিরক্ষা অবস্থানটিও হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়বে।

’ দলনেতা ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদের এই অনড় সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হন সিপাহি মোস্তফা। তার এসএলআরটি নূর মোহাম্মদের হাতে দিয়ে নান্নু মিয়াসহ বাকি সবাই নিরাপদ স্থানের দিকে এগোতে থাকেন। এই পুরোটা সময় নূর মোহাম্মদ তার আঘাতপ্রাপ্ত দেহটাকে টেনে নিয়ে বারবার অবস্থান পরিবর্তন করে শত্রুদলের দিকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকেন।

এরই মধ্যে সহযোদ্ধারা নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছে গেছে দেখে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। কিন্তু মারাত্মক আহত অবস্থায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তিনি ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়েন। ঘটনাস্থল থেকে গুলিবর্ষণ কমে যেতে দেখে পাকিস্তানিরা অগ্রসর হয় এবং মৃতপ্রায় ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদকে একা দেখতে পেয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এর প্রায় এক ঘণ্টা পর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সংগঠিত দল সমন্বিতভাবে তীব্র আক্রমণ করে হানাদার বাহিনীকে পিছু হঠতে বাধ্য করে।

ঘটনাস্থলে পৌঁছে তারা দেখতে পান নূর মোহাম্মদের নিথর দেহটি পাশের ঝোপের আড়ালে পড়ে আছে। চোখ দুটি উপড়ানো এবং পুরো শরীর বেয়নেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। এই বীর যোদ্ধার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে যশোরের মুক্তাঞ্চল হিসেবে পরিচিত শার্শা থানার কাশিপুর গ্রামে সমাহিত করা হয়। তার আত্মত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করে।

বীরত্ব, দেশ ও সহযোদ্ধার প্রতি আবেগ এবং নিঃস্বার্থ দায়িত্ববোধের অনন্যসাধারণ যে উদাহরণ তিনি স্থাপন করেছেন তা নিঃসন্দেহে তাকে একজন দেশপ্রেমিক সৈনিক হিসেবে অনন্য করে তুলেছে। ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ নামটি তাই সবার মনে চিরন্তন প্রেরণার প্রতীক হয়ে আছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

নারায়ণগঞ্জের পথসভায় জামায়াত আমিরের বক্তব্য

আজ বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদতবার্ষিকী

Update Time : 02:22:44 pm, Saturday, 5 September 2026

আজ ৫ সেপ্টেম্বর, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদতবার্ষিকী। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এই দিনে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে লড়াই করার সময় তিনি শহীদ হন।

এই দিনে জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে এই অকুতোভয় বীরকে, যিনি জীবন উৎসর্গ করে রচনা করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তার বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেম চিরকাল এ দেশের মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জানায়, নূর মোহাম্মদ ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইলের মহিষখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

শৈশবে লেখাপড়ার চেয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের দিকে তার বেশি ঝোঁক ছিল। তবে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মা-বাবাকে হারিয়ে তিনি অভিভাবকহীন হয়ে পড়েন। এরপর বিয়ে করে সাংসারিক প্রয়োজনে ১৯৫৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ২৩ বছর বয়সে ইপিআরে (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) যোগদান করেন। নূর মোহাম্মদ প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষে একই বছর ৩ ডিসেম্বর দিনাজপুর সেক্টরের কুঠিবাড়ি ক্যাম্পে সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন।

সৈনিক জীবনে তার স্বভাবসুলভ উচ্ছলতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি সবার প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠেন। দিনাজপুর সেক্টরে থাকাকালীন ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে তিনি সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে তাকে ইপিআরের যশোর সেক্টর সদর দপ্তরে বদলি করা হয়। ২৫ মার্চের গণহত্যার সময় নূর মোহাম্মদ নিয়মিত ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে ছিলেন।

বাড়িতে বসেই তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংসতার খবর জানতে পারেন। নিজ মাতৃভূমি ও জাতির এমন দুর্যোগ পরিস্থিতিতে সবার সঙ্গে আলোচনা করে নিজের করণীয় ঠিক করতে ছুটি শেষ হওয়ার আগেই তিনি নিজ কর্মস্থল ৪ নম্বর ইপিআর উইংয়ে যোগদান করেন। এসময় ৪ নম্বর উইং ৮ নম্বর সেক্টরের অধীনে যশোর এলাকায় অবস্থান করছিল। আগস্ট মাসে ৮ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডারের নির্দেশে সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদা তার অধীনস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের ছোটো ছোটো কয়েকটি দলে ভাগ করে দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা যুদ্ধের জন্য বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেন।

এরকম একটি দল আগস্ট মাসের শুরুতেই যশোরের চৌগাছা থানার ছুটিপুর গ্রামে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নেয়। ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার নেতৃত্বাধীন এই দলেই ছিলেন ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ। ছুটিপুর গ্রামটি যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না এবং দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী সদর দপ্তর যশোর ক্যান্টমেন্ট ছিল।

তা ছাড়া আগস্টের আগে এই এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানিদের বহুবার সংঘর্ষ হয়। এতে পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রতিবারই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে অনেক মরদেহ ফেলে রেখে পিছু হটে যেতে বাধ্য হয়। তবুও পাকিস্তান সেনাবাহিনী ছুটিপুর এলাকাটি তাদের দখলে রাখার জন্য বারবার আরও বেশি শক্তি নিয়ে আক্রমণ করে যাচ্ছিল। কারণ সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এই স্থানটি উভয়পক্ষের কাছেই কৌশলগত কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

৫ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ চারজন সহযোদ্ধাসহ ছুটিপুর প্রতিরক্ষা এলাকার সামনে গোয়ালহাটি গ্রামের কাছে স্ট্যান্ডিং টহল ডিউটিতে ছিলেন। তিনি ছিলেন টহল অধিনায়ক। শত্রুর ওপর দৃষ্টি রাখা ও তাদের আক্রমণের পরিকল্পনা নিজ প্রতিরক্ষা অবস্থানে পাঠানোর নির্দেশ ছিল তার ওপর। শত্রুপক্ষ তিন দিক থেকে তাদের আক্রমণাত্মকভাবে ঘিরে ফেলে এবং নূর মোহাম্মদের টহলকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করে।

সঙ্গে সঙ্গে শত্রুরা বিরামহীন গুলিবর্ষণ শুরু করে এবং নূর মোহাম্মদের দলের দিকে অগ্রসর হয়। শত্রুর প্রচণ্ড গোলাগুলিতে নূর মোহাম্মদের সহযোদ্ধা সিপাহি নান্নু মিয়া গুলিবিদ্ধ এবং মারাত্মকভাবে আহত হন। দলের অধিনায়ক হিসেবে নূর মোহাম্মদ দ্রুত আহত নান্নু মিয়ার দিকে এগিয়ে আসেন এবং নান্নু মিয়ার এলএমজি দিয়ে শত্রুর দিকে গুলিবর্ষণ শুরু করেন।

এর ফলে শত্রুর সামনে আসা বাধাগ্রস্ত হয়। এই পর্যায়ে নূর মোহাম্মদ নিজে এবং তার অধীনস্থ সৈনিকদের বারবার অবস্থান বদল করে শত্রুর দিকে গুলি ছুড়তে নির্দেশ দেন, যেন শত্রুপক্ষ তাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে না পারে। অবস্থান পরিবর্তনের সময় নূর মোহাম্মদ নিজেই আহত নান্নু মিয়াকে কাঁধে নিয়ে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাচ্ছিলেন। এসময় তার ডান কাঁধে একটি গুলি লাগে এবং ২ ইঞ্চি মর্টার শেলের আঘাতে ডান হাঁটু ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়।

এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অপর সহযোদ্ধা সিপাহি মোস্তফাকে নির্দেশ দেন আহত নান্নু মিয়াসহ সবাইকে নিরাপদ স্থানে ফিরে যেতে। এরই মধ্যেই শত্রুপক্ষ তাদের আরও কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তখন তাদের সামনে দুটো পথই খোলা ছিল। প্রথমটি হল পিছু হটা এবং অন্যটি সরাসরি শত্রুর মোকাবিলা করা। কিন্তু মারাত্মকভাবে আহত নূর মোহাম্মদ এরই মধ্যেই প্রচণ্ড রক্তক্ষরণজনিত কারণে অসম্ভব দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন।

সিপাহি মোস্তফা চাচ্ছিলেন তাদের দলনেতা নূর মোহাম্মদসহ সবাই একসঙ্গে প্রতিরক্ষা অবস্থানে ফিরে যেতে। মোস্তফা যখন নূর মোহাম্মদকে ধরে তুলতে চাচ্ছিলেন তখন তিনি পাশের একটি গাছের গুঁড়ি আঁকড়ে ধরে থাকেন এবং বলেন- ‘আহত নান্নু মিয়া ও এলএমজিটিসহ তোমরা নিরাপদ স্থানে ফিরে যাও নতুবা আমরা সবাই মারা যাব। সেই সঙ্গে আমাদের প্রতিরক্ষা অবস্থানটিও হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়বে।

’ দলনেতা ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদের এই অনড় সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হন সিপাহি মোস্তফা। তার এসএলআরটি নূর মোহাম্মদের হাতে দিয়ে নান্নু মিয়াসহ বাকি সবাই নিরাপদ স্থানের দিকে এগোতে থাকেন। এই পুরোটা সময় নূর মোহাম্মদ তার আঘাতপ্রাপ্ত দেহটাকে টেনে নিয়ে বারবার অবস্থান পরিবর্তন করে শত্রুদলের দিকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকেন।

এরই মধ্যে সহযোদ্ধারা নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছে গেছে দেখে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। কিন্তু মারাত্মক আহত অবস্থায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তিনি ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়েন। ঘটনাস্থল থেকে গুলিবর্ষণ কমে যেতে দেখে পাকিস্তানিরা অগ্রসর হয় এবং মৃতপ্রায় ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদকে একা দেখতে পেয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এর প্রায় এক ঘণ্টা পর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সংগঠিত দল সমন্বিতভাবে তীব্র আক্রমণ করে হানাদার বাহিনীকে পিছু হঠতে বাধ্য করে।

ঘটনাস্থলে পৌঁছে তারা দেখতে পান নূর মোহাম্মদের নিথর দেহটি পাশের ঝোপের আড়ালে পড়ে আছে। চোখ দুটি উপড়ানো এবং পুরো শরীর বেয়নেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। এই বীর যোদ্ধার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে যশোরের মুক্তাঞ্চল হিসেবে পরিচিত শার্শা থানার কাশিপুর গ্রামে সমাহিত করা হয়। তার আত্মত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করে।

বীরত্ব, দেশ ও সহযোদ্ধার প্রতি আবেগ এবং নিঃস্বার্থ দায়িত্ববোধের অনন্যসাধারণ যে উদাহরণ তিনি স্থাপন করেছেন তা নিঃসন্দেহে তাকে একজন দেশপ্রেমিক সৈনিক হিসেবে অনন্য করে তুলেছে। ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ নামটি তাই সবার মনে চিরন্তন প্রেরণার প্রতীক হয়ে আছে।