বাংলা গানের আকাশে তিনি এমন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার কণ্ঠের জাদুতে বুঁদ হয়ে আছে কয়েক প্রজন্ম। চলচ্চিত্রের রুপালি পর্দা থেকে শুরু করে একাত্তরের মুক্তিসংগ্রাম—সবখানেই তার কণ্ঠের রয়েছে এক অনন্য জাদুকরি উপস্থিতি।
তিনি আর কেউ নন, বাংলা গানের ‘প্লেব্যাক সম্রাজ্ঞী’ এবং কোকিলকণ্ঠীখ্যাত জীবন্ত কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন। আজ বরেণ্য এই শিল্পীর শুভ জন্মদিন। ১৯৫৪ সালের এই দিনে ঢাকায় এক সংগীতাড্ডার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শৈশব থেকেই গানের আবহে বেড়ে ওঠা সাবিনা ইয়াসমিনের। মা বেগম মওলুদা খাতুন ছিলেন সংগীতশিল্পী এবং তার বোন ফারিলদা, ফৌজিয়া ও নীলুফার ইয়াসমিনও বাংলা গানের জগতে সুপরিচিত নাম।
ওস্তাদ পি সি গোমেজের কাছে টানা ১৩ বছর ক্লাসিক্যাল মিউজিকের তালিম নেওয়া সাবিনা মাত্র সাত বছর বয়সে প্রথম স্টেজ পারফর্ম করেন। ১৯৬৪ সালে নতুন কুঁড়ি ও খেলাঘর রেডিও প্রোগ্রামে নিয়মিত গাইতে শুরু করেন। তবে চলচ্চিত্রের নেপথ্য কণ্ঠে তার রাজকীয় অভিষেক ঘটে ১৯৬৭ সালে জহির রায়হানের ‘আগুন নিয়ে খেলা’ চলচ্চিত্রে আলতাফ মাহমুদের সুরে ‘মধু জোছনার দীপালি’ গানের মাধ্যমে।
সেই যে শুরু, এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে সাবিনা ইয়াসমিন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গান গাওয়ার রেকর্ড রয়েছে তার ঝুলিতে। মিষ্টি মেয়ে কবরী, ববিতা, শাবানা থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রজন্মের মৌসুমী, শাবনূর এবং হালের অপু বিশ্বাস কিংবা শবনম বুবলীÑসব গুণী অভিনেত্রীর ঠোঁটেই জীবন্ত হয়ে উঠেছে তার কণ্ঠ।
‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’, ‘এই মন তোমাকে দিলাম’, ‘চিঠি দিও প্রতিদিন’, ‘ও আমার রসিয়া বন্ধুরে’র মতো হাজার হাজার কালজয়ী রোমান্টিক ও বিরহের গান উপহার দিয়েছেন তিনি। চলচ্চিত্রে ও আধুনিক মাধ্যমে তার মোট রেকর্ডকৃত গানের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজারের বেশি। কেবল চলচ্চিত্রের প্রেমের গানেই নয়, সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠ এ দেশের দেশপ্রেমের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এবং পরবর্তী সময়ে তার গাওয়া দেশাত্মবোধক গানগুলো বাঙালিকে যুগে যুগে উদ্বুদ্ধ করেছে। ‘সব ক’টা জানালা খুলে দাও না’, ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো’, ‘মাগো আর তোমায় ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি বলব না’, ‘একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার’ কিংবা ‘সেই রেললাইনের ধারে’র মতো গানগুলো শুনলে আজও শ্রোতাদের গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সাবিনা ইয়াসমিন বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’ (১৯৮৪) এবং ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ (১৯৯৬) লাভ করেন। এ ছাড়া চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে রেকর্ডসংখ্যক ১৫ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন তিনি, যা দেশের ইতিহাসে যেকোনো শিল্পীর জন্য একটি অনন্য ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী রেকর্ড।
বরেণ্য এই শিল্পীর এবারের জন্মদিনটিকে বিশেষভাবে উদযাপন করতে দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে; বিশেষ করে জ্যেষ্ঠ চলচ্চিত্র সাংবাদিক আবদুর রহমানের সঞ্চালনায় চ্যানেল আইয়ে আজ রাত ১০টা ২০ মিনিটে প্রচারিত হবে বিশেষ আলাপচারিতামূলক অনুষ্ঠান ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’। যেখানে এই গুণী শিল্পী তার শৈশব, বাবা-মা, শিল্পী হয়ে ওঠার পেছনের অজানা গল্প এবং দীর্ঘ সংগীতজীবনের নানা স্মৃতিময় অভিজ্ঞতা দর্শকদের সঙ্গে ভাগ করে নেবেন।
বয়সের ফ্রেমে ৭১ বসন্ত পেরিয়ে ৭২-এ পা দিলেও তার কণ্ঠ আজও তরুণ, আজও সতেজ। জন্মদিনের এই শুভক্ষণে ভক্ত-অনুরাগী ও দেশবাসীর একটাই প্রার্থনাÑবাংলা গানের এই কোকিলকণ্ঠী আরও দীর্ঘকাল সুস্থ শরীরে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকুন এবং তার সুরের মায়ায় আমাদের হৃদয় জুড়িয়ে যান। শুভ জন্মদিন, সুরসম্রাজ্ঞী সাবিনা ইয়াসমিন!


















