প্রখ্যাত মার্কিন সমাজ ও অপরাধ বিজ্ঞানী রবার্ট কে মার্টনের মতে, সমাজ যখন তরুণদের সামনে ধনী হওয়া বা ক্ষমতা অর্জনের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয় এবং দরিদ্র বা প্রান্তিক তরুণদের জন্য সেই লক্ষ্য পূরণের বৈধ পথ বন্ধ করে দেয়, তখনই তারা অপরাধ কিংবা গ্যাংয়ের মতো অবৈধ পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়।
একসময় মোড়ে মোড়ে আড্ডা, মোটরসাইকেলের মহড়া, মহল্লার ভেতরে ছোটখাটো ছিচকে চাঁদাবাজি আর দলবাজিতেই সীমাবদ্ধ ছিল কিশোর গ্যাং সদস্য আহকামের প্রতিদিনের চালচিত্র। বয়স ১৭, বাসা মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প। গত এক সপ্তাহ ধরে তার সেই প্রতিদিনের একঘেয়ে চিত্র বদলে গেছে। পাড়া-মহল্লার গণ্ডি পেরিয়ে সে ঢুকে পড়ছে রাজধানীর সংঘটিত অপরাধের অন্ধকার জগতে।
তার হাতে এখন ক্ষুদ্রাকারের আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। মানিব্যাগে নতুন কড়কড়ে নোট। বাটন সেট ফেলে দিয়ে হাতে তুলে নিয়েছে আইফোনের সর্বশেষ মডেল। পাল্টে গেছে জুতা-পোশাক থেকে শুরু করে সিগারেটের ব্র্যান্ডও। আহকামের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু তার নিজের নয়। তাদের গ্যাংয়ের সদস্যদের অনেকের ভাগ্যই পাল্টে গেছে। গোটা ঢাকাতেই এখন তাদের পরিস্থিতি তুঙ্গে।
অদম্য সাহস, কোনো প্রকার পিছুটান না থাকা এবং অপরাধজগৎ নিয়ে অভিজ্ঞতা থাকার কারণে তাদের চাহিদা আর কদর দুটোই বেড়েছে। আহকামের কথার সূত্র ধরে জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা পূর্বপরিচিত আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেল অভিন্ন তথ্য। কদিন আগে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের শীর্ষস্থানীয় মাদক কারবারি ও পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সেলিম আশরাফী ওরফে চুয়া সেলিমকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ (৭.৬৫ মিলিমিটার বিদেশি একটি পিস্তল) গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।
সেলিম গ্রুপেরই সদস্য আহকাম, পিচ্চি সেলিম, হেদায়েত ও সানু। সেলিমের বিরুদ্ধে ৩৬টির বেশি মামলা রয়েছে। এসব মামলার অধিকাংশ ঘটনায় তারাও সম্পৃক্ত। জেনেভা ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টরের ব্লক ৫-এ বসে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় আহকাম, পিচ্চি সেলিম, হেদায়েত ও সানুর। কিশোর গ্যাংয়ের খোলস পাল্টে তারা সবাই এখন ভাড়াটে সন্ত্রাসী। সবাই অবৈধ অস্ত্রধারী অপরাধচক্রের অংশ।
সবারই ভাগ্য মাত্র কদিন আগেই পাল্টে গেছে। উদ্বেগের বিষয়, এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একটি অদৃশ্য নেটওয়ার্ক। তাদের ভাগ্য পাল্টে দিয়েছে বা দিচ্ছে পুরোনো অপরাধচক্রের সদস্যরা। প্রয়োজনমতো তাদের দেওয়া হচ্ছে টাকা, মোটরসাইকেল, মোবাইল ফোন কিংবা অস্ত্র। বিনিময়ে আদায় করা হচ্ছে অঙ্গীকার। আর সেই অঙ্গীকার হলো, আসছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের মফস্বল এলাকায় গিয়ে কাজ করতে হবে।
আহকামের ভাষায়, অগ্রিম টাকা দিয়ে বুকড করা হচ্ছে তাদের, যাতে পরে অন্য কেউ না টানতে পারে। আহকাম ও পিচ্চি সেলিম রূপালী বাংলাদেশকে জানায়, জন্মের পর থেকেই তাদের জীবন একঘেয়ে। এটা আর ভালো লাগে না। কাগজের পুরিয়া করে হেরোইন বিক্রি করা, এর-ওর হাতে ইয়াবা আর ফেনসিডিল তুলে দেওয়া, সিনিয়রদের কাছে অস্ত্র পৌঁছে দেওয়া, তাদের লেজুড়বৃত্তি করা, শরীরে দেশি আর ভারতীয় নিম্নমানের আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করা, মহল্লায় ছিচকে চাঁদাবাজি আর ছিনতাই করা— এগুলো এখন আর ভালো লাগে না তাদের।
তারা জাতে উঠতে চেয়েছিল। এখন সেই সময় এসেছে। অবশ্য অপরাধজগতের এটাই নাকি নিয়ম বলে তারা জানায়। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য থেকে এভাবেই তারা একেকজন সিনিয়র হয়ে ওঠে। হেদায়েত ও সানুর কথা আরেক ধাপ উঁচুতে। তাদের মতে, তারা আর অন্ধকার জগতে কাজ করতে চায় না। ছিনতাই করলে লোকে তাদের চেনে না। তারা অন্ধকারেই থেকে যায়। ফলে রাস্তাঘাটে তারা ‘বড়ভাই’ হিসেবে সম্মান পায় না।
লোকে তাদের চেনে না বলে ভয়ও পায় না। এটা তাদের জন্য লজ্জার ও অপমানজনক। কাছে অস্ত্র আছে, অথচ কেউ জানবে না, ভয় পাবে না, এটা কি হয়? তাই তারা এখন খোলস পাল্টে পরিচিত মুখ হয়ে উঠতে চায়। আর সেই সুযোগটাই এখন বড়ভাইয়েরা করে দিচ্ছে। যদিও এটা ওই বড় ভাইদের প্রয়োজনেই। আর প্রয়োজন ছাড়া কেই-বা এটা করবে? একজন অপরাধ বিশ্লেষক বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে এই নেটওয়ার্কের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন ঘিরে স্থানীয় আধিপত্যের লড়াই তীব্র হলে কিশোর গ্যাংয়ের এই ‘নতুন সংস্করণ’কে ব্যবহার করা হতে পারে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে। কিশোর গ্যাং আর শুধু কিশোরদের অপরাধ নয়, এর পেছনে তৈরি হচ্ছে অর্থ, অস্ত্র ও প্রভাবের ত্রিমুখী সিন্ডিকেট। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং নির্মূলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযান চলছে।
গ্রেপ্তারও হচ্ছে অনেকে। কিন্তু একটি দল ভেঙে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই নতুন নামে আরেকটি গ্রুপ সক্রিয় হচ্ছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এর অন্যতম কারণ হলো আইনের আওতায় আসছে মূলত মাঠের সদস্যরা। নেপথ্যের নিয়ন্ত্রকরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি কিশোরদের ব্যবহার করছেন নিজেদের স্বার্থে। তাদের দিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভয় দেখানো কিংবা এলাকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কাজ করানো হচ্ছে।
আর এখন সময় বুঝে তাদের ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। অপরাধসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পুরোনো গ্যাংয়ের সদস্যদের মধ্য থেকেই এখন বাছাই করে তৈরি করা হচ্ছে ছোট ছোট ‘অ্যাকশন গ্রুপ’। এসব গ্রুপের সদস্যরা প্রয়োজনে নিজ এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় গিয়েও কাজ করছে। ফলে অপরাধের ধরনও পাল্টাচ্ছে।
আগে ছিল এলাকার গ্যাং, এখন তৈরি হচ্ছে কাজভিত্তিক গ্যাং। পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজি ইমতিয়াজ আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র— এই অভিযোগ এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন কিশোরের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া মানে শুধু একটি অপরাধের ঝুঁকি তৈরি করা নয়; তাকে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধকাঠামোর অংশ বানানোর পথ খুলে দেওয়া।
পুলিশ বা র‌্যাব মাঝেমধ্যেই অস্ত্র উদ্ধার করে। পুলিশ তদন্ত করে চার্জশিট দেয়। সেখানে এটাই প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় যে, আসামির কাছে অস্ত্র পাওয়া গেছে। কিন্তু তার হাতে অস্ত্রটি কোথা থেকে কার মাধ্যমে এসেছে, সেই চেইন আর খুঁজে বের করা হয় না। অস্ত্রের উৎস, সরবরাহকারী ও অর্থের জোগানদাতাদের শনাক্ত করা না গেলে শুধু অস্ত্র উদ্ধার করে সমস্যার সমাধান হবে না; বরং একজনকে গ্রেপ্তার করার পর আরেকজন তার জায়গা নেবে।
সাবেক আইজিপি খন্দকার হাসান মাহমুদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য শুধু ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। নির্বাচনের আগে কোন এলাকায় কারা হঠাৎ সক্রিয় হচ্ছে, কারা বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, নতুন করে কারা অস্ত্র সংগ্রহ করছে এবং পুরোনো অপরাধীরা কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে— এসবও নজরদারির আওতায় আনা জরুরি। কিশোর গ্যাং দমনে এতদিনের বড় দুর্বলতা হলো, অভিযান অনেক সময় মাঠের সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
কিন্তু একটি গ্যাংয়ের পেছনে যদি অর্থদাতা থাকে, অস্ত্রের জোগানদাতা থাকে এবং রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রশ্রয় থাকে, তাহলে কেবল কয়েকজন কিশোরকে গ্রেপ্তার করে নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন অপরাধের পুরো চেইন শনাক্ত করা। একই সঙ্গে যেসব কিশোর এরই মধ্যে গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে, তাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগও জরুরি। কারণ গ্রেপ্তার করে ছেড়ে দেওয়া হলে তারা আবার একই চক্রে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, একটি কিশোর প্রথমে হয়তো বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দল তৈরি করছে। পরে ছোটখাটো চাঁদাবাজিতে জড়াচ্ছে। এরপর অস্ত্রের সংস্পর্শে এসে বড় অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। একপর্যায়ে সেই কিশোরই হয়ে উঠছে একটি অপরাধী দলের নেতৃত্বদানকারী। অর্থাৎ, আজকের কিশোর গ্যাং আগামী দিনের পেশাদার অপরাধী তৈরির কারখানা হয়ে উঠতে পারে।
আর সেই প্রক্রিয়াকে যদি অর্থ, অস্ত্র ও রাজনৈতিক প্রশ্রয় শক্তিশালী করে, তাহলে এর পরিণতি শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়, সমাজ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্যও বড় হুমকি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, এই আশঙ্কা ততই বাড়বে। এখনই যদি কিশোর গ্যাংয়ের নতুন এই রূপের পেছনের অর্থ ও অস্ত্রের নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করা না যায়, তাহলে নির্বাচনের মাঠে দেখা যেতে পারে এমন এক বাহিনী, যার সামনে থাকবে কিশোর-তরুণ মুখ আর পেছনে অদৃশ্য ‘বস’।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক এবং সামাজিক অবক্ষয় ও জেন্ডারবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক ড. রাশেদা ইরশাদ নাসির বলেন, কিশোররা মূলত দুটি কারণে গ্যাং সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়ছে। প্রথমত, সমাজে মাদক ও অস্ত্রের সহজলভ্যতা এবং অপরাধপ্রবণতার বাড়বাড়ন্ত। দ্বিতীয়ত, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ থেকে কিশোরদের পর্যাপ্ত মনোযোগ ও মানসিক সমর্থনের অভাব।
সামাজিক অপরাধ এবং পারিবারিক কাঠামো নিয়ে কাজ করা সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষক ড. সারা সালমান বলেন, পরিবার ও সমাজ যখন উঠতি বয়সি শিশু-কিশোরদের ওপর থেকে তাদের নৈতিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তখনই কিশোর অপরাধ বা গ্যাং কালচারের বিস্তার ঘটে। অপরাধ গবেষক ড. সাখাওয়াত মুন বলেন, ঢাকার মতো বড় শহরগুলোতে কিশোর গ্যাংয়ের উত্থানের পেছনে পারিবারিক অবহেলার পাশাপাশি স্থানীয় ‘রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা’ বা বড়ভাইদের দ্বারা কিশোরদের ব্যবহার করার প্রবণতা দায়ী।
সার্বিক বিষয়ে পুলিশের আইজি মো. আলী হোসেন ফকির রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে অপরাধী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও কিশোর গ্যাং সদস্যদের ধরতে এবং অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করবে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।





















