রাত পোহালেই চিঠি দিবস। কত ঠিকানা থেকে চিঠি আসবে—এর, ওর, প্রিয়জনের, দূরের কারও। কেউ হয়তো হাতে লেখা চিঠি পাবে, কেউ ই-মেইল, কেউবা কোনো চিঠি অ্যাপে পাবে কয়েকটি শব্দ। মাধ্যম বদলেছে, ঠিকানা বদলেছে, অপেক্ষার ধরন বদলেছে।
তবু প্রিয় কারও কাছ থেকে কয়েকটি শব্দ পাওয়া—সে পাওয়াও কি কম? আধুনিক সময়ে কত কিছুই না পরিবর্তন হয়েছে। বদলে গেছে দৃশ্য, বদলে গেছে সুর, বদলে গেছে মানুষের ব্যস্ততার অভিধান। শুধু বদলায়নি মানুষের ভেতরে কারও জন্য অপেক্ষা করার সেই পুরোনো অভ্যাস। আমরা এখন মুহূর্তেই বার্তা পাঠাতে পারি, কয়েক সেকেন্ডেই উত্তর পেতে পারি। অথচ আশ্চর্য, এই দ্রুততার ভেতরেই যেন চিঠির জন্য মনটা আরও বেশি হাহাকার করে।
চিঠি দিবস এলে সবারই কাউকে চিঠি লিখতে ইচ্ছে করে। হয়তো লেখেও। কখনো বিষাদে, কখনো প্রেমে, কখনো অভিমানে। এমন কিছু কথা, যা মুখোমুখি বলা যায়নি; এমন কিছু অনুভূতি, যা মুঠোফোনের ছোট্ট পর্দায় লিখে পাঠাতে ইচ্ছে করেনি। যাকে উদ্দেশ করে লেখা, তার কাছে হয়তো এসবের আর কোনো মূল্য নেই। যে মানুষটির জন্য রাত জেগে একটি বাক্য লিখেছিলাম, সে হয়তো আজ অন্য কারও কাছে নিজের গল্প বলে।
যে ঠিকানায় একসময় আমার সমস্ত মায়া পৌঁছাতে চাইত, সেই ঠিকানার দরজায় হয়তো এখন আমার নামে কোনো ডাক পড়ে না। তবু চিঠি লেখা থামে না। কারণ চিঠি আসলে অন্যের কাছে পৌঁছানোর চেয়ে নিজের কাছে ফিরে আসার এক অদ্ভুত পথ। ফ্রান্ৎস কাফকার প্রেমের চিঠিগুলোর কথা মনে পড়ে। মিলেনা ইয়েসেনস্কাকে লেখা চিঠিতে কাফকা শুধু প্রেমিক ছিলেন না, ছিলেন এক গভীরভাবে অস্থির মানুষ।
দূরত্ব, ভয়, আকাঙ্ক্ষা আর ভালোবাসা—সবকিছুকে তিনি চিঠির পাতায় এমনভাবে মিশিয়েছিলেন যে তাঁর চিঠিগুলো কেবল প্রেমপত্র হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে একজন মানুষের নিজের ভেতরের অন্ধকারের সঙ্গে কথোপকথন। কাফকা এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘A book must be the axe for the frozen sea inside us.’ বইয়ের কথা বলা হলেও বাক্যটি চিঠির ক্ষেত্রেও যেন সত্যি।
কখনো কখনো একটি চিঠিও মানুষের ভেতরে জমে থাকা বরফে কুঠারের আঘাত করে। যে কথা মুখে আটকে থাকে, কাগজে এসে তার নিজস্ব একটি জীবন পায়। কাফকার আরেকটি বিখ্যাত পত্রবাক্য—‘I can’t live with you, and I can’t live without you.’ ভালোবাসার এই দ্বন্দ্বটুকু হয়তো চিঠির সবচেয়ে পুরোনো সত্য। কাছে এলেও ভয়, দূরে গেলেও শূন্যতা।
মানুষ কখনো কখনো এমন একজনকে ভালোবাসে, যার সঙ্গে থাকা যেমন অসম্ভব, তেমনি তাকে ছাড়া থাকাও অসম্ভব। আর তাই চিঠি শুধু ‘ভালোবাসি’ বলার জায়গা নয়। চিঠি হলো—‘আমি তোমাকে হারানোর পরও তোমার সঙ্গে কথা বলছি’ বলার জায়গা। বাংলা সাহিত্যের চিঠির পাতাতেও এই আকুলতা কম নেই। রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে যেমন প্রকৃতি, মানুষ, জীবন আর নিঃসঙ্গতা পাশাপাশি হেঁটেছে; জীবনানন্দের কবিতায় যেমন অনুপস্থিতির ভেতরেও কারও জন্য ফিরে তাকানো আছে, তেমনি অসংখ্য অখ্যাত মানুষের চিঠিতে লুকিয়ে আছে আমাদের ব্যক্তিগত ইতিহাস।
কেউ মায়ের কাছে লিখেছে—‘ভালো আছি’, অথচ ভালো ছিল না। কেউ প্রিয় মানুষকে লিখেছে—‘তোমাকে ভুলে গেছি’, অথচ চিঠিটা লেখার সময়ই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছিল তাকে। কেউ বাবাকে লিখতে চেয়েও লেখেনি। কেউ ক্ষমা চাইতে চেয়েও ঠিকানা খুঁজে পায়নি। কেউ শেষবারের মতো বলতে চেয়েছে—‘থেকো’, কিন্তু ডাকবাক্সে ফেলার আগেই চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলেছে।
কিছু চিঠি পৌঁছায়। কিছু চিঠি পৌঁছায় না। আর কিছু চিঠি পৌঁছালেও তার উত্তর আসে না। সবচেয়ে কষ্টের চিঠিগুলো বোধহয় সেগুলোই—যেগুলোর উত্তর আমরা জানি, তবু অপেক্ষা করি। আজকের দিনে চিঠির সবচেয়ে বড় শত্রু হয়তো প্রযুক্তি নয়; আমাদের তাড়াহুড়ো। আমরা কথা বলতে চাই, কিন্তু সময় নিয়ে বলতে চাই না। আমরা অনুভূতি জানাতে চাই, কিন্তু অনুভূতির ভেতরটুকু লিখে রাখার ধৈর্য নেই।
একটি নীল টিক, একটি ‘seen’, একটি ছোট্ট ইমোজি—এসবের মধ্যেই যেন সম্পর্কের দীর্ঘ বাক্যগুলো আটকে গেছে। আগে একটি চিঠি আসত মানে ছিল অপেক্ষার শেষ। এখন একটি মেসেজ আসে, আর আমরা উত্তর দেওয়ার আগেই অন্য দশটি নোটিফিকেশন এসে তাকে ঢেকে দেয়। চিঠির সৌন্দর্য ছিল তার ধীরতায়। চিঠি লিখতে বসলে মানুষকে নিজের সঙ্গে একটু সময় কাটাতে হতো।
কাগজের সামনে বসে ভাবতে হতো—কী লিখব? কোন কথাটা আগে বলব? কোথায় থামব? একটি নাম লিখতে গিয়েও হয়তো হাত কেঁপে উঠত। একটি বাক্য কেটে আবার লিখতে হতো। সেই কাটাকাটির দাগও ছিল ভালোবাসার অংশ। আজ আমরা ভুল বাক্য মুছে ফেলতে পারি এক মুহূর্তে। চিঠিতে ভুল বাক্য মুছে ফেলার পরও তার দাগ থেকে যেত। হয়তো সেই দাগের কারণেই চিঠি এত মানবিক ছিল।
অনেকেরই হয়তো কিছু চিঠি আছে। কেউ জানে না। হয়তো সে আরও কিছু লেখেওনি, শুধু মনে মনে রেখেছে।














