আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদসহ তিন স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় তোড়জোড় শুরু হয়েছে এবং ইসি ভবনে বেজে উঠেছে নির্বাচনের বাঁশি।
পরিকল্পনা সাজাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কর্মকর্তারা। এই ব্যস্ততার মধ্যেই আবারও প্রশ্ন উঠেছে- আওয়ামী লীগ সরকারের বিলাসী ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) প্রকল্পের আওতায় কেনা মেশিনগুলোর কি হবে! জানা গেছে, আপাতত মেশিনগুলোকে স্ক্র্যাপ (পরিত্যক্ত/বাতিল/ভাঙাড়ি) করা ছাড়া বিকল্প আর কোনো কিছু নেই ইসির কাছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই এগুলো ব্যবহারের অনুপযুক্ত ছিল।
তাই আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের কোনো সম্ভাবনাই নেই বলে দাবি করছেন ইসির কর্মকর্তারা। ফলে জনগণের টাকায় কেনা এসব মেশিন জঞ্জালে পরিণত হয়ে এখন ইসির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর ৪ হাজার কোটি টাকার এই মেশিন স্ক্র্যাপ করাকে জনগণের টাকা জলে ফেলার সঙ্গেই তুলনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজনৈতিক নানা বিতর্কের মধ্যেই ২০১৮ সালে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) প্রকল্প হাতে নেয় নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ওই বছর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র ছয়টি আসনে এ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। সর্বশেষ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১৫০টি আসনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন ইসি। তবে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে নতুন প্রকল্প অনুমোদন না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কোনো আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়নি। পরে ২০১৮ সালের পর বিভিন্ন সংসদীয় আসনে উপনির্বাচন ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়।
যার ফল নিয়ে এখনো প্রশ্নবোধক চিহ্ন রয়েছে সাধারণ মানুষের মাঝে। আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে জনমনে আবারও প্রশ্ন উঠেছে- এসব ইভিএম কার স্বার্থে কেনা হয়েছিল? আর কেনই বা কেনা হয়েছিল? যার উত্তর বর্তমান সরকারের কারো কাছে তো নেই-ই, নেই ইসির কাছেও। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের দপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাজারদরের চেয়ে ১০ গুণ বেশি দামে কেনা হয় এসব ইভিএম।
এসব কিনতে প্রাথমিকভাবে ৩৪৩ কোটি টাকার মতো খরচ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এসব কিনতে ৩ হাজার ১৭২ কোটি টাকা অতিরিক্ত অর্থ খরচ করা হয়। এ অভিযোগ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের টিম গঠন করার পর ইভিএম ক্রয়সংক্রান্ত নথিপত্র তলব করে দেওয়া এক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে জানা যায়, তৎকালীন নির্বাচন কমিশন ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম ও সরকারি আর্থিক বিধি লঙ্ঘন করে অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি প্রায় ৩ হাজার ১৭২ কোটি টাকার ক্ষতি করেছে।
তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই এ প্রকল্প গ্রহণ করে। এরপর টেন্ডার ছাড়াই বাজারমূল্যের চেয়ে ১০ গুণ বেশি দামে দেড় লাখ নিম্নমানের এসব ইভিএম মেশিন কেনে। ওই প্রকল্পে দুর্নীতির প্রমাণ পায় দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক)।
দুদকের অভিযুক্তদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগের তৎকালীন মহাপরিচালক মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির সেই সময়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুলতানুজ্জামান মুহাম্মদ সালেহ উদ্দিন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার শাহাদাত হোসেন চৌধুরী ও নির্বাচন কমিশনের সাবেক সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ।
জানা যায়, ওই প্রকল্পের আওতায় কেনা প্রায় দেড় লাখ ইভিএমের মধ্যে অন্তত ৮০ হাজারের মতো অকেজো বা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। আর প্রায় ২০ হাজার ইভিএম একেবারেই নষ্ট বা মেরামত অনুপযোগী হয়ে গেছে। বিগত সরকারের আমলে ওই দেড় লাখ ইভিএম তিন জায়গায় সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে ৬১৮টি, গাজীপুরে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি লিমিটেডের (বিএমপিএফ) কাছে ৮৬ হাজার ও ইসির ১০টি আঞ্চলিক কার্যালয়ে ৬২ হাজার ইভিএম মেশিন থাকার কথা।
কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এগুলোর প্রায় সবই এখন জঞ্জালে পরিণত হয়েছে। তাই এসব মেশিনকে স্ক্র্যাপ হিসেবে ধ্বংস করার কথাও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। ইসি সূত্র জানায়, বিতর্কিত ওই ইভিএম প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। আর খরচ হয় ৩ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা। বরাদ্দ থেকে অবশিষ্ট ছিল ১১৬ কোটি টাকা। সেই টাকায় প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়াতে ২০২৪ সালের জুনে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে ইসি।
তখন আর্থিক সংকটের কথা বলে সেটির অনুমোদন দেয়নি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর সেই আবেদন নভেম্বরে নাকচ করে দেয় মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)। পরিচালকসহ ইভিএম প্রকল্পের জনবল ছিল ১৩ জন। গত বছরের জুনে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রকল্পের দায়িত্ব থেকে বিদায় নিয়েছেন।
কিছুদিন ওই প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে কর্নেল সৈয়দ রাকিকুল হাসানকে রাখা হলেও বর্তমানে এই প্রকল্পের আর কোনো অস্তিত্বই নেই। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ইভিএমে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হবে না।
তবে ফিরিয়ে আনা হবে ‘না’ ভোটের বিধান। নতুন এই বিধিমালা অনুযায়ী কোনো আসনে একজন প্রার্থী থাকলেও তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী ঘোষণা করা হবে না। বরং তাকে ‘না’ ভোটের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। যদি ‘না’ ভোট বেশি হয় তবে ওই আসনে পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সে সময় ইভিএম মেশিনগুলোর কী হবে- প্রশ্নের উত্তরে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেছিলেন, ‘এমন এক সময়ে এই প্রশ্ন আপনারা সামনে এনেছেন যখন রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
আর যেহেতু এই নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না বলা রয়েছে, তাই বিষয়টি নিয়ে এখন কারো মাথাব্যথা নেই। আমরা আপাতত এটা বিবেচনায় আনছি না’। এ প্রকল্পের শুরু থেকেই অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও গত সাত বছরে সরকারের কোনো তদন্ত সংস্থা অভিযোগটি তদন্ত করেনি। তবে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অভিযোগের পালে হাওয়া দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সংস্থাটি ইভিএম প্রকল্পের দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। এরই অংশ হিসেবে বেশ কয়েকবার নির্বাচন কমিশন পরিদর্শন এবং ইভিএমগুলোর মান যাচাইও করেছে তারা। এরই ধারাবাহিকতায় ইভিএম প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য চেয়ে কমিশনকে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। নিম্নমানের ইভিএম কেনার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি অভিযান পরিচালনা করে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম।
অভিযানে ইসির কেনা ইভিএমে ত্রুটি ধরা পড়ে। ইসি ভবনে দুদকের উপপরিচালক নুর আলম সিদ্দিকীর নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। ফ্যাসিবাদী মনোভাব বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যেই আওয়ামী লীগ সরকার ওই বিলাসী প্রকল্প হাতে নিয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘ইভিএম প্রকল্প নেওয়ার দুটি উদ্দেশ্য ছিল।
এর একটি রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন ও দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকার নীল-নকশা হিসেবে তারা এটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। যা বাস্তবায়িত হয়নি গণবিক্ষোভের মুখে। কিন্তু মাঝখান থেকে জনগণের পকেট থেকে হাতিয়ে নিয়েছে হাজার কোটি টাকা’।

















