আজ শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
১৩ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৯°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯৮%

দেশের মেধা চলে যাচ্ছে বিদেশে: উচ্চশিক্ষার টানে বাড়ছে তরুণদের দেশত্যাগের প্রবণতা

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:38:18 pm, Friday, 28 August 2026
  • 14

দেশের মেধা চলে যাচ্ছে বিদেশে: উচ্চশিক্ষার টানে বাড়ছে তরুণদের দেশত্যাগের প্রবণতা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

হাতে ভিসা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার, সঙ্গে অসংখ্য স্বপ্ন। উন্নত শিক্ষা, গবেষণা, চাকরি ও নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় প্রতি বছর হাজার হাজার তরুণ পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশে। কেউ যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রে, কেউ কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি কিংবা জাপানে।

উচ্চশিক্ষা শেষে তাদের বড় একটি অংশ আর দেশে ফিরছেন না। চাকরি, গবেষণা, ব্যবসা কিংবা স্থায়ী বসতি গড়ে সেখানেই থেকে যাচ্ছেন। ফলে যে মেধা গড়ে তুলতে পরিবার ও রাষ্ট্র বছরের পর বছর বিনিয়োগ করছে, তার বড় অংশের সুফল মিলছে বিদেশের অর্থনীতি ও জ্ঞানব্যবস্থায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, তথ্যপ্রযুক্তিবিদসহ দক্ষ পেশাজীবীদের ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে একই প্রবণতা।

তবে এবার শুধু ‘ব্রেইন ড্রেন’ ঠেকানোর কথা বলছে না সরকার। বিদেশে থাকা বাংলাদেশি মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি যারা ফিরবেন না, তাদের জ্ঞান, গবেষণা, অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগকে দেশের কাজে লাগানোর কৌশল নেওয়া হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’ বা ‘মেধা আবর্তন’।

লক্ষ্য একটাই, মেধার স্রোত বন্ধ করা নয়, বরং সেই স্রোতের মুখ বাংলাদেশের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, সরকার প্রথমবারের মতো মেধা পাচারকে মেধা আবর্তনে রূপান্তরের কথা ভাবছে। সরকার যে মেধার স্রোত ঘোরাতে কাজ করছে, সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যেই।

জানা গেছে, এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভিজিটিং স্কলার, যৌথ গবেষণাসহ বেশ কিছু উদ্যোগের কথা ভাবছে সরকার। বিদেশে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, যে কারণে মেধাবীরা দেশ ছাড়ছেন, সেই কারণগুলো না বদলে শুধু তাদের দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়ে কি মেধার স্রোত ঘোরানো সম্ভব?

ইউনেস্কোর এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন ২৪ হাজার ১১২ জন। ২০২৩ সালে দাঁড়ায় ৫২ হাজার ৭৯৯ জনে। অর্থাৎ, এক দশকে বিদেশমুখী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ২ দশমিক ১৯ গুণ বা প্রায় ১১৯ শতাংশ। শুধু ২০২২ সালেই গিয়েছিলেন ৪৯ হাজার ১৫১ জন। আরেক পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২২ সালে বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজারের বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রেও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দ্রুত বেড়েছে। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৯৯, যা আগের শিক্ষাবর্ষের তুলনায় বেড়েছে ২৬ শতাংশ। এক দশকে দেশটিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ২৫০ শতাংশের বেশি। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান না পাওয়া গেলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে বৈ কমেনি।

এই সংখ্যা শুধু বিদেশে পড়তে যাওয়ার প্রবণতা নয়, বাংলাদেশের মেধা ও মানবসম্পদ নিয়ে ভবিষ্যতের একটি বড় প্রশ্নও সামনে আনে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে যাওয়ার কারণ শুধু বেশি বেতন নয়; উন্নত গবেষণাগার, আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা অনুদান, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক, পেশাগত স্বাধীনতা এবং দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়নও বড় কারণ। অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত সোহান রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সেখানে গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ করা হয়।

উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন কিছু করার আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আহমেদ তানভীর বলেন, ব্যবসা ও কাজের সুযোগের পাশাপাশি নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশও বড় বিষয়। তার ভাষায়, দেশে এমন পরিবেশ তৈরি হলে অনেকেই বাংলাদেশে ফিরে এসে উন্নয়নে অবদান রাখতে আগ্রহী। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এমন মন্তব্য আসলে সমস্যার গভীরে যাওয়ার পথ দেখায়।

একজন মেধাবী তরুণ কেন দেশ ছাড়ছেন, শুধু তার উত্তর খুঁজলে হবে না; প্রশ্ন করতে হবে, তিনি কেন দেশে ফিরে আসতে চাইছেন না। বিদেশে যাওয়ার পর ফিরছেন কতজন? তারা বলছেন, মেধা পাচারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো সুনির্দিষ্ট তথ্যের ঘাটতি। প্রতি বছর কত শিক্ষার্থী স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে যাচ্ছে। কতজন নিজস্ব অর্থায়নে যাচ্ছে, কতজন পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরছে আর কতজন স্থায়ীভাবে থেকে যাচ্ছে- এসবের সমন্বিত ও হালনাগাদ জাতীয় ডাটাবেজ প্রয়োজন রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আব্দুস সালামের মতে, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া শিক্ষকদের একটি বড় অংশও দেশে ফিরে আসেন না। তিনি বলেন, বিদেশে যাওয়া মেধাবীদের জন্য দেশে একই ধরনের সুযোগ তৈরি করতে না পারলে তাদের ফেরানো কঠিন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিদেশে চলে যাওয়া নিজ দেশের মেধাকে নানা কৌশলে কাজে লাগাচ্ছে বিশ্বের অনেক দেশ।

চীন বিদেশে থাকা বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সঙ্গে দেশে থাকা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগাযোগ বাড়িয়েছে। গবেষণা অনুদান, অবকাঠামো ও প্রণোদনার মাধ্যমে অনেককে দেশে ফিরিয়েছে। আবার অনেকে বিদেশে থেকেও চীনের গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ভারতও প্রযুক্তিবিদ, গবেষক ও পেশাজীবীদের নিয়ে শক্তিশালী প্রবাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। প্রযুক্তি, স্টার্টআপ, গবেষণা ও বিনিয়োগে এসব নেটওয়ার্ক কাজে লাগানো হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারও একই পথে হাঁটার পরিকল্পনা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বিদেশে থাকা মেধাবীদের সবাইকে দেশে ফেরানো সম্ভব না হলেও তাদের জ্ঞান, পুঁজি, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দেশের কাজে লাগানোর পথ খুঁজছে সরকার। বিশেষজ্ঞদের মতে, মেধা ধরে রাখার সবচেয়ে বড় উপাদান শুধু টাকা নয়, আস্থা। একজন তরুণ গবেষক যদি বিশ্বাস করেন তার মেধার মূল্যায়ন হবে, যোগ্যতা অনুযায়ী সুযোগ পাবেন, গবেষণার অর্থ পাবেন এবং পেশাগত সিদ্ধান্তে অযাচিত হস্তক্ষেপ থাকবে না; তাহলে দেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক গভীর হবে।

অন্যদিকে সুযোগের অসমতা, প্রশাসনিক জটিলতা, গবেষণা অর্থের সংকট কিংবা মেধার যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ার অভিজ্ঞতা তৈরি হলে বিদেশে থাকা মেধাবীদের সম্পৃক্ত করা কঠিন হবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

যুক্তরাজ্যের শত কোটি পাউন্ডের সরকারি চুক্তি অবৈধ ইসরায়েলি বসতির সাথে যুক্ত কোম্পানির কাছে

দেশের মেধা চলে যাচ্ছে বিদেশে: উচ্চশিক্ষার টানে বাড়ছে তরুণদের দেশত্যাগের প্রবণতা

Update Time : 10:38:18 pm, Friday, 28 August 2026

হাতে ভিসা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার, সঙ্গে অসংখ্য স্বপ্ন। উন্নত শিক্ষা, গবেষণা, চাকরি ও নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় প্রতি বছর হাজার হাজার তরুণ পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশে। কেউ যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রে, কেউ কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি কিংবা জাপানে।

উচ্চশিক্ষা শেষে তাদের বড় একটি অংশ আর দেশে ফিরছেন না। চাকরি, গবেষণা, ব্যবসা কিংবা স্থায়ী বসতি গড়ে সেখানেই থেকে যাচ্ছেন। ফলে যে মেধা গড়ে তুলতে পরিবার ও রাষ্ট্র বছরের পর বছর বিনিয়োগ করছে, তার বড় অংশের সুফল মিলছে বিদেশের অর্থনীতি ও জ্ঞানব্যবস্থায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, তথ্যপ্রযুক্তিবিদসহ দক্ষ পেশাজীবীদের ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে একই প্রবণতা।

তবে এবার শুধু ‘ব্রেইন ড্রেন’ ঠেকানোর কথা বলছে না সরকার। বিদেশে থাকা বাংলাদেশি মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি যারা ফিরবেন না, তাদের জ্ঞান, গবেষণা, অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগকে দেশের কাজে লাগানোর কৌশল নেওয়া হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’ বা ‘মেধা আবর্তন’।

লক্ষ্য একটাই, মেধার স্রোত বন্ধ করা নয়, বরং সেই স্রোতের মুখ বাংলাদেশের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, সরকার প্রথমবারের মতো মেধা পাচারকে মেধা আবর্তনে রূপান্তরের কথা ভাবছে। সরকার যে মেধার স্রোত ঘোরাতে কাজ করছে, সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যেই।

জানা গেছে, এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভিজিটিং স্কলার, যৌথ গবেষণাসহ বেশ কিছু উদ্যোগের কথা ভাবছে সরকার। বিদেশে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, যে কারণে মেধাবীরা দেশ ছাড়ছেন, সেই কারণগুলো না বদলে শুধু তাদের দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়ে কি মেধার স্রোত ঘোরানো সম্ভব?

ইউনেস্কোর এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন ২৪ হাজার ১১২ জন। ২০২৩ সালে দাঁড়ায় ৫২ হাজার ৭৯৯ জনে। অর্থাৎ, এক দশকে বিদেশমুখী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ২ দশমিক ১৯ গুণ বা প্রায় ১১৯ শতাংশ। শুধু ২০২২ সালেই গিয়েছিলেন ৪৯ হাজার ১৫১ জন। আরেক পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২২ সালে বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজারের বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রেও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দ্রুত বেড়েছে। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৯৯, যা আগের শিক্ষাবর্ষের তুলনায় বেড়েছে ২৬ শতাংশ। এক দশকে দেশটিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ২৫০ শতাংশের বেশি। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান না পাওয়া গেলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে বৈ কমেনি।

এই সংখ্যা শুধু বিদেশে পড়তে যাওয়ার প্রবণতা নয়, বাংলাদেশের মেধা ও মানবসম্পদ নিয়ে ভবিষ্যতের একটি বড় প্রশ্নও সামনে আনে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে যাওয়ার কারণ শুধু বেশি বেতন নয়; উন্নত গবেষণাগার, আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা অনুদান, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক, পেশাগত স্বাধীনতা এবং দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়নও বড় কারণ। অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত সোহান রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সেখানে গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ করা হয়।

উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন কিছু করার আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আহমেদ তানভীর বলেন, ব্যবসা ও কাজের সুযোগের পাশাপাশি নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশও বড় বিষয়। তার ভাষায়, দেশে এমন পরিবেশ তৈরি হলে অনেকেই বাংলাদেশে ফিরে এসে উন্নয়নে অবদান রাখতে আগ্রহী। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এমন মন্তব্য আসলে সমস্যার গভীরে যাওয়ার পথ দেখায়।

একজন মেধাবী তরুণ কেন দেশ ছাড়ছেন, শুধু তার উত্তর খুঁজলে হবে না; প্রশ্ন করতে হবে, তিনি কেন দেশে ফিরে আসতে চাইছেন না। বিদেশে যাওয়ার পর ফিরছেন কতজন? তারা বলছেন, মেধা পাচারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো সুনির্দিষ্ট তথ্যের ঘাটতি। প্রতি বছর কত শিক্ষার্থী স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে যাচ্ছে। কতজন নিজস্ব অর্থায়নে যাচ্ছে, কতজন পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরছে আর কতজন স্থায়ীভাবে থেকে যাচ্ছে- এসবের সমন্বিত ও হালনাগাদ জাতীয় ডাটাবেজ প্রয়োজন রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আব্দুস সালামের মতে, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া শিক্ষকদের একটি বড় অংশও দেশে ফিরে আসেন না। তিনি বলেন, বিদেশে যাওয়া মেধাবীদের জন্য দেশে একই ধরনের সুযোগ তৈরি করতে না পারলে তাদের ফেরানো কঠিন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিদেশে চলে যাওয়া নিজ দেশের মেধাকে নানা কৌশলে কাজে লাগাচ্ছে বিশ্বের অনেক দেশ।

চীন বিদেশে থাকা বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সঙ্গে দেশে থাকা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগাযোগ বাড়িয়েছে। গবেষণা অনুদান, অবকাঠামো ও প্রণোদনার মাধ্যমে অনেককে দেশে ফিরিয়েছে। আবার অনেকে বিদেশে থেকেও চীনের গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ভারতও প্রযুক্তিবিদ, গবেষক ও পেশাজীবীদের নিয়ে শক্তিশালী প্রবাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। প্রযুক্তি, স্টার্টআপ, গবেষণা ও বিনিয়োগে এসব নেটওয়ার্ক কাজে লাগানো হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারও একই পথে হাঁটার পরিকল্পনা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বিদেশে থাকা মেধাবীদের সবাইকে দেশে ফেরানো সম্ভব না হলেও তাদের জ্ঞান, পুঁজি, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দেশের কাজে লাগানোর পথ খুঁজছে সরকার। বিশেষজ্ঞদের মতে, মেধা ধরে রাখার সবচেয়ে বড় উপাদান শুধু টাকা নয়, আস্থা। একজন তরুণ গবেষক যদি বিশ্বাস করেন তার মেধার মূল্যায়ন হবে, যোগ্যতা অনুযায়ী সুযোগ পাবেন, গবেষণার অর্থ পাবেন এবং পেশাগত সিদ্ধান্তে অযাচিত হস্তক্ষেপ থাকবে না; তাহলে দেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক গভীর হবে।

অন্যদিকে সুযোগের অসমতা, প্রশাসনিক জটিলতা, গবেষণা অর্থের সংকট কিংবা মেধার যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ার অভিজ্ঞতা তৈরি হলে বিদেশে থাকা মেধাবীদের সম্পৃক্ত করা কঠিন হবে।