আজ বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
১১ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৮°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯৬%

তারেক রহমানকে ভারতে নিতে দিল্লির আগ্রহের নেপথ্যে কী?

  • MIT ERP
  • Update Time : 11:45:30 pm, Wednesday, 26 August 2026
  • 13

তারেক রহমানকে ভারতে নিতে দিল্লির আগ্রহের নেপথ্যে কী?

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ভারতের সাউথ ব্লকের কূটনৈতিক নীতিতে এক ধরণের চরম অস্থিরতা, মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরকে কেন্দ্র করে দিল্লির রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণী মহল, প্রধান প্রধান গণমাধ্যম এবং সাবেক কূটনীতিকদের মধ্যে যে বাড়তি তোড়জোড় ও তোলপাড় দেখা যাচ্ছে, তা মূলত এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক চাপে রূপ নিয়েছে।

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের সরকারপ্রধান কখন, কোন পরিস্থিতিতে কিংবা কীভাবে কোন বিদেশি রাষ্ট্র সফর করবেন—তা সম্পূর্ণভাবে সেই দেশের নিজস্ব এখতিয়ার ও জাতীয় স্বার্থের ওপর নির্ভর করে। অথচ ভারতীয় গণমাধ্যমের অতিরঞ্জিত প্রচারণায় মনে হচ্ছে যেন দিল্লি থেকে নিমন্ত্রণপত্র পাঠানো মাত্রই ঢাকার সরকারপ্রধানের তড়িঘড়ি করে রওনা দেওয়া উচিত ছিল; ঠিক যেভাবে বিগত পনেরো বছরে পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার শাসনামলে দেখা যেত।

তবে এখানে বড় প্রশ্ন উঠে আসে যে, শেখ হাসিনার মতো বড় ধরণের অমীমাংসিত ইস্যু এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চালোনো দিল্লির বৈরী আচরণের কোনো সুরাহা না করে তারেক রহমানকে দ্রুত ভারতে নিয়ে যাওয়ার এই ব্যাকুলতার মূল রহস্য কী? এর নেপথ্যে কি সত্যিকারের সুসম্পর্ক গড়ার কোনো সৎ তাগিদ রয়েছে, নাকি শেখ হাসিনার আমলে হাতিয়ে নেওয়া একচেটিয়া বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত একপেশে স্বার্থগুলোকে যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখার চরম তাগিদ কাজ করছে?

এই ব্যাকুলতা বুঝতে হলে দিল্লির মানসিকতা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। মূলত ভারত এবং শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের যে দীর্ঘ ভ্রমণ, দিল্লি এখনও তা থেকে পুরোপুরি মানসিকভাবে মুক্ত হতে পারেনি কিংবা সেই মোহের চশমা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। যার ফলে তারা বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া এত বড় পরিবর্তনের বাস্তবতাকে স্বীকার না করে বরং আন্তর্জাতিক মহল ও বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে।

এর অংশ হিসেবেই তারা অতি পরিচিত ‘জঙ্গিবাদ’ ও ‘উগ্রবাদের’ সেই পুরনো জিগির ও ভিত্তিহীন বয়ান নতুন করে উৎপাদন করছে। গত পনেরো বছর ধরে শেখ হাসিনা যেভাবে নিজেকে তথাকথিত ‘ধর্মীয় উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ দমনের একমাত্র রক্ষক’ হিসেবে উপস্থাপন করে দিল্লির কাছে নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লাইসেন্স পেয়েছিলেন, দিল্লি আজও সেই একই ছাঁচে বাংলাদেশের চব্বিশ-উত্তর রাজনীতি ও গণআকাঙ্ক্ষাকে মেপে চলেছে।

তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোঝাতে চাইছে যে হাসিনা না থাকলে বাংলাদেশে নাকি উগ্রবাদের উত্থান ঘটবে—এমন এক কাল্পনিক ভয় তৈরি করে নিজেদের একচ্ছত্র প্রভাব ও হস্তক্ষেপকে বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। গত কয়েক মাসের ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, দিল্লি এই পুরনো বয়ানের আড়ালে আসলে শেখ হাসিনার ছায়া থেকে নিজেদের মুক্ত হতে দিতে চাচ্ছে না।

এর মূল কারণ হচ্ছে তাদের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ। দিল্লি খুব ভালো করেই হিসাব কষে রেখেছে যে, বাংলাদেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের মন জয় না করতে পারলেও যদি কোনো কৌশলে আওয়ামী লীগকে আবারও ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা যায়, তবে গত কয়েক বছরে তাদের যে রাজনৈতিক লোকসান হয়েছে তা তারা মাত্র কয়েক মাসেই সুদে-আসলে আদায় করে নিতে পারবে।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, শেখ হাসিনা নিজেই একসময় গর্ব করে বলেছিলেন তিনি ভারতকে যা দিয়েছেন তা দিল্লি চিরদিন মনে রাখবে। এমনকি তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন তো দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে অত্যন্ত দাসত্বমূলকভাবে ‘স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক’ বলে অ্যাখ্যা দিয়েছিলেন, যেখানে বাংলাদেশ কেবল দিয়েই গেছে আর বিনিময়ে সার্বভৌম স্বার্থ বিসর্জন দিয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে শেখ হাসিনার পলায়নের মাধ্যমে ভারতের সেই দীর্ঘদিনের প্রভুত্বভিত্তিক কাঠামোর পতন ঘটে। কিন্তু দিল্লি এখন চাণক্যনীতির পথ ধরে শেখ হাসিনাকে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে এবং এ দেশের জনআকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে এক ধরণের ট্রাম্পকার্ড হিসেবে জিইয়ে রেখেছে। অপরাধীদের ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে, তাঁর মাধ্যমে নানা ধরণের চক্রান্তের রসদ জোগানো হচ্ছে।

অথচ এই মূল আসামিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আইনি ও কূটনৈতিক দাবির কোনো তোয়াক্কা না করেই ভারত চাইছে তারেক রহমান দিল্লি সফরে যান। এর প্রধান কৌশল হলো, একদিকে শেখ হাসিনাকে ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার করে এবং উগ্রবাদের মনগড়া বয়ান ছড়িয়ে বাংলাদেশকে চাপে রাখা, অন্যদিকে তারেক রহমানকে দিল্লি নিয়ে অতীতের একচেটিয়া চুক্তিগুলো বহাল রাখার মৌখিক ও লিখিত সম্মতি আদায় করা।

তবে ভারতের নীতিনির্ধারকরা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছেন যে, এই পুরনো হাসিনা কার্ড কিংবা উগ্রবাদের জুজু দেখিয়ে বাংলাদেশে আর প্রাধান্য বিস্তার করা সম্ভব নয়; বরং এই নোংরা খেলা চালাতে থাকলে ভবিষ্যতে ভারতের জন্য বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্বের আর কোনো সুযোগ অবশিষ্ট থাকবে না। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মূলত দিল্লির সাউথ ব্লকের একটি এক্সটেনশনে রূপ নিয়েছিল।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতার জন্য জনগণের ওপর নয়, বরং ভারতের समर्थনের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতো। তবে চব্বিশের বিপ্লব বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন আনেনি, এনেছে আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালনার এক নতুন চেতনা। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে শুরু করে বর্তমান নির্বাচিত বিএনপি সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ওপর ভিত্তি করে নিজ দেশের পররাষ্ট্রনীতি সাজিয়েছে।

এতদিন বাংলাদেশকে যে ভারতের একটি অনুগত অঞ্চল বানিয়ে রাখা হয়েছিল, বাংলাদেশ সেখান থেকে বের হয়ে স্বাতন্ত্র্য ও ভারসাম্যমূলক কূটনৈতিক সম্পর্কের যুগ শুরু করে। বাংলাদেশের এই স্বাধীন ও স্বাবলম্বী পররাষ্ট্রনীতিই মূলত দিল্লির জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত হয়ে দেখা দেয়, যার কারণে ভারতীয় মিডিয়া ও থিংকট্যাংকগুলো উগ্রবাদের বয়ান ফাঁদিয়ে টানা বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচারে মেতে ওঠে।

সম্প্রতি বিমসটেক সম্মেলন কিংবা বিভিন্ন অজুহাতে তারেক রহমানকে দিল্লি সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে ভারত ভেবেছিল যে পুরনো অভ্যাসে বাংলাদেশ হয়তো নতি স্বীকার করবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার অত্যন্ত আত্মমর্যাদার সাথে জানিয়ে দিয়েছে যে, সফরের জন্য আগে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত পলাতক আসামিদের হস্তান্তর এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতা না আসা পর্যন্ত বাংলাদেশ কোনো তড়িঘড়ি সফরে আগ্রহী নয়।

এই স্পষ্ট বার্তা পাওয়ার পর থেকেই ভারতের পক্ষ থেকে পরোক্ষ হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং ডিজেল কিংবা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের ভয় দেখানো হচ্ছে। তবে ভারত ভুলে গেছে যে তারা বাংলাদেশকে কোনো কিছুই ফ্রিতে দেয় না, সব পণ্যের দাম বাংলাদেশ পরিশোধ করে। ডিজেলের মূল চাহিদা অন্য উৎস থেকেও মেটানো সম্ভব, আর আদানির একপেশে বিদ্যুৎ চুক্তি ছিল মোদি সরকারকে তোষামোদ করার কৌশল, যার খেসারত বাংলাদেশ বহু বছর ধরে দিয়ে আসছে।

ভারতে তারেক রহমানকে তড়িঘড়ি নেওয়ার মূল রহস্যটি লুকিয়ে আছে শেখ হাসিনার আমলে সম্পাদিত তিনটি মারাত্মক বিতর্কিত ও একপেশে চুক্তির মধ্যে, যার মাধ্যমে ট্রানজিটের নামে ভারত বাংলাদেশের বন্দর, নদী ও সড়কপথকে নিজেদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। প্রথমত, ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন দ্য ইউস অব চট্টগ্রাম অ্যান্ড মোংলা পোর্টস’ বা এসিএমপি চুক্তির মাধ্যমে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে সেভেন সিস্টার্সে নামমাত্র মাশুলে পণ্য পরিবহনের সুবিধা দেওয়া হয়।

তবে এই চুক্তির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, ভারতীয় পণ্যবাহী কন্টেইনারগুলো বাংলাদেশের কাস্টমসের নিয়মিত সশরীরে পরীক্ষার আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের ভূখণ্ড দিয়ে কী ধরনের সংবেদনশীল পণ্য বা রসমদ এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে নেওয়া হচ্ছে, তা যাচাই করার সুযোগ বাংলাদেশের হাতে নেই। এছাড়া আমাদের দেশীয় পণ্যের চেয়ে ভারতীয় পণ্যকে বন্দরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জেটিতে ভেড়ার সুযোগ দেওয়ার বিধান রয়েছে, যা আমাদের নিজস্ব ব্যবসাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে।

দ্বিতীয়ত, ‘কোস্টাল শিপিং অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা সিএসএ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রা এবং পানগাঁও টার্মিনালকে ভারতের জন্য উপকূলীয় বন্দর হিসেবে উন্মুক্ত করা হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা মানদণ্ড ‘পোর্ট স্টেট কন্ট্রোল’ শিথিল করা হয়েছে এবং স্থানীয় শিপিং এজেন্ট ছাড়াই ভারতীয় কোম্পানিগুলো সরাসরি ব্যবসা করার সুযোগ পেয়েছে, যা বাংলাদেশের দেশীয় শিপিং খাতকে পুরোপুরি ধসিয়ে দিচ্ছে।

তৃতীয়ত, ‘প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড’ বা পিআইডব্লিউটিটি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ৮টি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ নদীপথ ভারতের ট্রানজিট পরিবহনের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। ভারতীয় বিশাল কন্টেইনার জাহাজ চলাচলের জন্য নদী খনন ও পলি অপসারণের কোটি কোটি টাকার সিংহভাগ ব্যয় বাংলাদেশকে বহন করতে হয়, অথচ ভারত দেয় সামান্য নামমাত্র অর্থ।

নদী ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বাংলাদেশ ন্যায্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের চরম নতিস্বীকারের কারণে এসব চুক্তিতে দেশবিরোধী ধারা যুক্ত হয়েছিল, যা বাংলাদেশকে কার্যত ভারতের ভূ-রাজনৈতিক ক্লায়েন্ট স্টেটে পরিণত করেছিল। দিল্লির মূল ভয় এটাই যে, বাংলাদেশে এখন একটি জনসমর্থিত ও নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় রয়েছে।

এই সরকার যদি জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে এসব একপেশে ট্রানজিট ও বন্দর ব্যবহারের চুক্তিগুলো পর্যালোচনা বা বাতিল করে, তবে গত ১৫ বছরে ভারত যেসব সুনির্দিষ্ট সুবিধা বিনামূল্যে হাতিয়ে নিয়েছিল তা হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাই ভারত উগ্রবাদের ভুয়া বয়ান তৈরি করে এবং হাসিনাকে ট্রাম্পকার্ড বানিয়ে চাপ সৃষ্টি করে তারেক রহমানকে তড়িঘড়ি দিল্লি নিয়ে এসব চুক্তি সচল রাখার গ্যারান্টি আদায় করতে চাইছে।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রস্তাবিত ত্রিদেশীয় ফ্রেমওয়ার্কে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের বিষয়টি নিয়ে ভারতের চরম উদ্বেগ। অথচ বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা স্বার্থেই যেকোনো আন্তর্জাতিক জোটে যোগ দিতে পারে। ভারত যেমন নিজস্ব স্বার্থে ইরানকে বাদ দিয়ে ইসরায়েলের দিকে ভিড়তে পারে, বাংলাদেশও তেমনি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির অধীনে যেকোনো দেশের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার পূর্ণ অধিকার রাখে।

ভারতের চাণক্যনীতির মূল কৌশলই হলো নিজেদের অবস্থান নমনীয় না করে প্রতিপক্ষকে আলোচনার টেবিলে এনে নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দেওয়া। তারেক রহমানকে ভারতে নেওয়ার এই ব্যাকুলতা এবং উগ্রবাদের পুরনো কার্ড খেলা সেই কৌশলেরই অংশ। তবে ভারত ও হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনকাঠামোর হ্যাংওভার থেকে দিল্লিকে এখন বেরিয়ে আসতেই হবে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী আত্মমর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ আর কোনো চাণক্য ট্র্যাপ কিংবা ভূরাজনৈতিক ভীতিপ্রদর্শনের মুখে পা দেবে না।

তারেক রহমানের সরকারের উচিত হবে শেখ হাসিনাসহ ভারতে আশ্রয় নেওয়া সমস্ত মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফেরত আনা, একপেশে তিন চুক্তি জাতীয় সংসদে পর্যালোচনা করা এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধসহ অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া কোনো আনুষ্ঠানিক দিল্লি সফরে না যাওয়া।

ভারতকে বুঝতে হবে যে, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিস্বার্থের ওপর ভিত্তি করে নয়, কিংবা উগ্রবাদের জুজু দেখিয়ে নয়—বরং বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের ইচ্ছা, সার্বভৌম সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে; নতুবা এই অপকৌশলের কারণে ভারত বাংলাদেশে তার দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্বের শেষ সুযোগটুকুও চিরতরে হারিয়ে ফেলবে।

কারণ পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতি ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের সময় খুব দ্রুতই ফুরিয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

সারের কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা কেউ সফল করতে পারবে না: কৃষিমন্ত্রী

তারেক রহমানকে ভারতে নিতে দিল্লির আগ্রহের নেপথ্যে কী?

Update Time : 11:45:30 pm, Wednesday, 26 August 2026

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ভারতের সাউথ ব্লকের কূটনৈতিক নীতিতে এক ধরণের চরম অস্থিরতা, মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরকে কেন্দ্র করে দিল্লির রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণী মহল, প্রধান প্রধান গণমাধ্যম এবং সাবেক কূটনীতিকদের মধ্যে যে বাড়তি তোড়জোড় ও তোলপাড় দেখা যাচ্ছে, তা মূলত এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক চাপে রূপ নিয়েছে।

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের সরকারপ্রধান কখন, কোন পরিস্থিতিতে কিংবা কীভাবে কোন বিদেশি রাষ্ট্র সফর করবেন—তা সম্পূর্ণভাবে সেই দেশের নিজস্ব এখতিয়ার ও জাতীয় স্বার্থের ওপর নির্ভর করে। অথচ ভারতীয় গণমাধ্যমের অতিরঞ্জিত প্রচারণায় মনে হচ্ছে যেন দিল্লি থেকে নিমন্ত্রণপত্র পাঠানো মাত্রই ঢাকার সরকারপ্রধানের তড়িঘড়ি করে রওনা দেওয়া উচিত ছিল; ঠিক যেভাবে বিগত পনেরো বছরে পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার শাসনামলে দেখা যেত।

তবে এখানে বড় প্রশ্ন উঠে আসে যে, শেখ হাসিনার মতো বড় ধরণের অমীমাংসিত ইস্যু এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চালোনো দিল্লির বৈরী আচরণের কোনো সুরাহা না করে তারেক রহমানকে দ্রুত ভারতে নিয়ে যাওয়ার এই ব্যাকুলতার মূল রহস্য কী? এর নেপথ্যে কি সত্যিকারের সুসম্পর্ক গড়ার কোনো সৎ তাগিদ রয়েছে, নাকি শেখ হাসিনার আমলে হাতিয়ে নেওয়া একচেটিয়া বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত একপেশে স্বার্থগুলোকে যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখার চরম তাগিদ কাজ করছে?

এই ব্যাকুলতা বুঝতে হলে দিল্লির মানসিকতা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। মূলত ভারত এবং শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের যে দীর্ঘ ভ্রমণ, দিল্লি এখনও তা থেকে পুরোপুরি মানসিকভাবে মুক্ত হতে পারেনি কিংবা সেই মোহের চশমা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। যার ফলে তারা বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া এত বড় পরিবর্তনের বাস্তবতাকে স্বীকার না করে বরং আন্তর্জাতিক মহল ও বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে।

এর অংশ হিসেবেই তারা অতি পরিচিত ‘জঙ্গিবাদ’ ও ‘উগ্রবাদের’ সেই পুরনো জিগির ও ভিত্তিহীন বয়ান নতুন করে উৎপাদন করছে। গত পনেরো বছর ধরে শেখ হাসিনা যেভাবে নিজেকে তথাকথিত ‘ধর্মীয় উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ দমনের একমাত্র রক্ষক’ হিসেবে উপস্থাপন করে দিল্লির কাছে নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লাইসেন্স পেয়েছিলেন, দিল্লি আজও সেই একই ছাঁচে বাংলাদেশের চব্বিশ-উত্তর রাজনীতি ও গণআকাঙ্ক্ষাকে মেপে চলেছে।

তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোঝাতে চাইছে যে হাসিনা না থাকলে বাংলাদেশে নাকি উগ্রবাদের উত্থান ঘটবে—এমন এক কাল্পনিক ভয় তৈরি করে নিজেদের একচ্ছত্র প্রভাব ও হস্তক্ষেপকে বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। গত কয়েক মাসের ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, দিল্লি এই পুরনো বয়ানের আড়ালে আসলে শেখ হাসিনার ছায়া থেকে নিজেদের মুক্ত হতে দিতে চাচ্ছে না।

এর মূল কারণ হচ্ছে তাদের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ। দিল্লি খুব ভালো করেই হিসাব কষে রেখেছে যে, বাংলাদেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের মন জয় না করতে পারলেও যদি কোনো কৌশলে আওয়ামী লীগকে আবারও ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা যায়, তবে গত কয়েক বছরে তাদের যে রাজনৈতিক লোকসান হয়েছে তা তারা মাত্র কয়েক মাসেই সুদে-আসলে আদায় করে নিতে পারবে।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, শেখ হাসিনা নিজেই একসময় গর্ব করে বলেছিলেন তিনি ভারতকে যা দিয়েছেন তা দিল্লি চিরদিন মনে রাখবে। এমনকি তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন তো দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে অত্যন্ত দাসত্বমূলকভাবে ‘স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক’ বলে অ্যাখ্যা দিয়েছিলেন, যেখানে বাংলাদেশ কেবল দিয়েই গেছে আর বিনিময়ে সার্বভৌম স্বার্থ বিসর্জন দিয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে শেখ হাসিনার পলায়নের মাধ্যমে ভারতের সেই দীর্ঘদিনের প্রভুত্বভিত্তিক কাঠামোর পতন ঘটে। কিন্তু দিল্লি এখন চাণক্যনীতির পথ ধরে শেখ হাসিনাকে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে এবং এ দেশের জনআকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে এক ধরণের ট্রাম্পকার্ড হিসেবে জিইয়ে রেখেছে। অপরাধীদের ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে, তাঁর মাধ্যমে নানা ধরণের চক্রান্তের রসদ জোগানো হচ্ছে।

অথচ এই মূল আসামিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আইনি ও কূটনৈতিক দাবির কোনো তোয়াক্কা না করেই ভারত চাইছে তারেক রহমান দিল্লি সফরে যান। এর প্রধান কৌশল হলো, একদিকে শেখ হাসিনাকে ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার করে এবং উগ্রবাদের মনগড়া বয়ান ছড়িয়ে বাংলাদেশকে চাপে রাখা, অন্যদিকে তারেক রহমানকে দিল্লি নিয়ে অতীতের একচেটিয়া চুক্তিগুলো বহাল রাখার মৌখিক ও লিখিত সম্মতি আদায় করা।

তবে ভারতের নীতিনির্ধারকরা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছেন যে, এই পুরনো হাসিনা কার্ড কিংবা উগ্রবাদের জুজু দেখিয়ে বাংলাদেশে আর প্রাধান্য বিস্তার করা সম্ভব নয়; বরং এই নোংরা খেলা চালাতে থাকলে ভবিষ্যতে ভারতের জন্য বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্বের আর কোনো সুযোগ অবশিষ্ট থাকবে না। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মূলত দিল্লির সাউথ ব্লকের একটি এক্সটেনশনে রূপ নিয়েছিল।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতার জন্য জনগণের ওপর নয়, বরং ভারতের समर्थনের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতো। তবে চব্বিশের বিপ্লব বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন আনেনি, এনেছে আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালনার এক নতুন চেতনা। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে শুরু করে বর্তমান নির্বাচিত বিএনপি সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ওপর ভিত্তি করে নিজ দেশের পররাষ্ট্রনীতি সাজিয়েছে।

এতদিন বাংলাদেশকে যে ভারতের একটি অনুগত অঞ্চল বানিয়ে রাখা হয়েছিল, বাংলাদেশ সেখান থেকে বের হয়ে স্বাতন্ত্র্য ও ভারসাম্যমূলক কূটনৈতিক সম্পর্কের যুগ শুরু করে। বাংলাদেশের এই স্বাধীন ও স্বাবলম্বী পররাষ্ট্রনীতিই মূলত দিল্লির জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত হয়ে দেখা দেয়, যার কারণে ভারতীয় মিডিয়া ও থিংকট্যাংকগুলো উগ্রবাদের বয়ান ফাঁদিয়ে টানা বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচারে মেতে ওঠে।

সম্প্রতি বিমসটেক সম্মেলন কিংবা বিভিন্ন অজুহাতে তারেক রহমানকে দিল্লি সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে ভারত ভেবেছিল যে পুরনো অভ্যাসে বাংলাদেশ হয়তো নতি স্বীকার করবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার অত্যন্ত আত্মমর্যাদার সাথে জানিয়ে দিয়েছে যে, সফরের জন্য আগে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত পলাতক আসামিদের হস্তান্তর এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতা না আসা পর্যন্ত বাংলাদেশ কোনো তড়িঘড়ি সফরে আগ্রহী নয়।

এই স্পষ্ট বার্তা পাওয়ার পর থেকেই ভারতের পক্ষ থেকে পরোক্ষ হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং ডিজেল কিংবা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের ভয় দেখানো হচ্ছে। তবে ভারত ভুলে গেছে যে তারা বাংলাদেশকে কোনো কিছুই ফ্রিতে দেয় না, সব পণ্যের দাম বাংলাদেশ পরিশোধ করে। ডিজেলের মূল চাহিদা অন্য উৎস থেকেও মেটানো সম্ভব, আর আদানির একপেশে বিদ্যুৎ চুক্তি ছিল মোদি সরকারকে তোষামোদ করার কৌশল, যার খেসারত বাংলাদেশ বহু বছর ধরে দিয়ে আসছে।

ভারতে তারেক রহমানকে তড়িঘড়ি নেওয়ার মূল রহস্যটি লুকিয়ে আছে শেখ হাসিনার আমলে সম্পাদিত তিনটি মারাত্মক বিতর্কিত ও একপেশে চুক্তির মধ্যে, যার মাধ্যমে ট্রানজিটের নামে ভারত বাংলাদেশের বন্দর, নদী ও সড়কপথকে নিজেদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। প্রথমত, ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন দ্য ইউস অব চট্টগ্রাম অ্যান্ড মোংলা পোর্টস’ বা এসিএমপি চুক্তির মাধ্যমে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে সেভেন সিস্টার্সে নামমাত্র মাশুলে পণ্য পরিবহনের সুবিধা দেওয়া হয়।

তবে এই চুক্তির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, ভারতীয় পণ্যবাহী কন্টেইনারগুলো বাংলাদেশের কাস্টমসের নিয়মিত সশরীরে পরীক্ষার আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের ভূখণ্ড দিয়ে কী ধরনের সংবেদনশীল পণ্য বা রসমদ এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে নেওয়া হচ্ছে, তা যাচাই করার সুযোগ বাংলাদেশের হাতে নেই। এছাড়া আমাদের দেশীয় পণ্যের চেয়ে ভারতীয় পণ্যকে বন্দরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জেটিতে ভেড়ার সুযোগ দেওয়ার বিধান রয়েছে, যা আমাদের নিজস্ব ব্যবসাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে।

দ্বিতীয়ত, ‘কোস্টাল শিপিং অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা সিএসএ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রা এবং পানগাঁও টার্মিনালকে ভারতের জন্য উপকূলীয় বন্দর হিসেবে উন্মুক্ত করা হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা মানদণ্ড ‘পোর্ট স্টেট কন্ট্রোল’ শিথিল করা হয়েছে এবং স্থানীয় শিপিং এজেন্ট ছাড়াই ভারতীয় কোম্পানিগুলো সরাসরি ব্যবসা করার সুযোগ পেয়েছে, যা বাংলাদেশের দেশীয় শিপিং খাতকে পুরোপুরি ধসিয়ে দিচ্ছে।

তৃতীয়ত, ‘প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড’ বা পিআইডব্লিউটিটি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ৮টি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ নদীপথ ভারতের ট্রানজিট পরিবহনের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। ভারতীয় বিশাল কন্টেইনার জাহাজ চলাচলের জন্য নদী খনন ও পলি অপসারণের কোটি কোটি টাকার সিংহভাগ ব্যয় বাংলাদেশকে বহন করতে হয়, অথচ ভারত দেয় সামান্য নামমাত্র অর্থ।

নদী ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বাংলাদেশ ন্যায্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের চরম নতিস্বীকারের কারণে এসব চুক্তিতে দেশবিরোধী ধারা যুক্ত হয়েছিল, যা বাংলাদেশকে কার্যত ভারতের ভূ-রাজনৈতিক ক্লায়েন্ট স্টেটে পরিণত করেছিল। দিল্লির মূল ভয় এটাই যে, বাংলাদেশে এখন একটি জনসমর্থিত ও নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় রয়েছে।

এই সরকার যদি জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে এসব একপেশে ট্রানজিট ও বন্দর ব্যবহারের চুক্তিগুলো পর্যালোচনা বা বাতিল করে, তবে গত ১৫ বছরে ভারত যেসব সুনির্দিষ্ট সুবিধা বিনামূল্যে হাতিয়ে নিয়েছিল তা হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাই ভারত উগ্রবাদের ভুয়া বয়ান তৈরি করে এবং হাসিনাকে ট্রাম্পকার্ড বানিয়ে চাপ সৃষ্টি করে তারেক রহমানকে তড়িঘড়ি দিল্লি নিয়ে এসব চুক্তি সচল রাখার গ্যারান্টি আদায় করতে চাইছে।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রস্তাবিত ত্রিদেশীয় ফ্রেমওয়ার্কে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের বিষয়টি নিয়ে ভারতের চরম উদ্বেগ। অথচ বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা স্বার্থেই যেকোনো আন্তর্জাতিক জোটে যোগ দিতে পারে। ভারত যেমন নিজস্ব স্বার্থে ইরানকে বাদ দিয়ে ইসরায়েলের দিকে ভিড়তে পারে, বাংলাদেশও তেমনি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির অধীনে যেকোনো দেশের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার পূর্ণ অধিকার রাখে।

ভারতের চাণক্যনীতির মূল কৌশলই হলো নিজেদের অবস্থান নমনীয় না করে প্রতিপক্ষকে আলোচনার টেবিলে এনে নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দেওয়া। তারেক রহমানকে ভারতে নেওয়ার এই ব্যাকুলতা এবং উগ্রবাদের পুরনো কার্ড খেলা সেই কৌশলেরই অংশ। তবে ভারত ও হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনকাঠামোর হ্যাংওভার থেকে দিল্লিকে এখন বেরিয়ে আসতেই হবে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী আত্মমর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ আর কোনো চাণক্য ট্র্যাপ কিংবা ভূরাজনৈতিক ভীতিপ্রদর্শনের মুখে পা দেবে না।

তারেক রহমানের সরকারের উচিত হবে শেখ হাসিনাসহ ভারতে আশ্রয় নেওয়া সমস্ত মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফেরত আনা, একপেশে তিন চুক্তি জাতীয় সংসদে পর্যালোচনা করা এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধসহ অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া কোনো আনুষ্ঠানিক দিল্লি সফরে না যাওয়া।

ভারতকে বুঝতে হবে যে, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিস্বার্থের ওপর ভিত্তি করে নয়, কিংবা উগ্রবাদের জুজু দেখিয়ে নয়—বরং বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের ইচ্ছা, সার্বভৌম সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে; নতুবা এই অপকৌশলের কারণে ভারত বাংলাদেশে তার দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্বের শেষ সুযোগটুকুও চিরতরে হারিয়ে ফেলবে।

কারণ পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতি ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের সময় খুব দ্রুতই ফুরিয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে।