ভারতের রাফাল যুদ্ধবিমান ধ্বংসের ঘটনায় আলোচনায় আসা চীনের অত্যাধুনিক জে-১০সিই যুদ্ধবিমান এবার বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বহরে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায়। বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন ও আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করতে চীন থেকে ২০টি জে-১০সিই মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট সংগ্রহের চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় রয়েছে বাংলাদেশ।
ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে ক্রয়চুক্তির খসড়াও। তবে চুক্তি ও অনুমোদনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব যুদ্ধবিমান কবে বাংলাদেশে পৌঁছাবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সম্প্রতি সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের এ উদ্যোগের কথা জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি জানান, যুদ্ধবিমান সংগ্রহের বিষয়ে দর-কষাকষি শেষে খসড়া চুক্তিপত্র প্রস্তুত করে অনুমোদনের জন্য সশস্ত্র বাহিনী বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা ধরে ২০টি যুদ্ধবিমান কেনার জন্য সমন্বিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি বিমানের মূল দাম ৬২ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার। তবে প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা, লজিস্টিকস, অবকাঠামো নির্মাণ, বিমা ও করসহ অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হলে প্রতিটি বিমানের কার্যকর ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ডলার।
প্রস্তাবিত ক্রয় পরিকল্পনায় ২০টি যুদ্ধবিমানের মধ্যে ১০টি বিমান বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ‘টেবিল অব অর্গানাইজেশন অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট’ বা টিওঅ্যান্ডইতে অন্তর্ভুক্ত হবে। বাকি ১০টি থাকবে এর বাইরে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই সরকার-থেকে-সরকার (জিটুজি) পদ্ধতিতে চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল অ্যারো-টেকনোলজি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (সিএটিআইসি) সঙ্গে সরাসরি ক্রয়চুক্তি সইয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ২০৩৫-৩৬ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরের বিশেষ থোক বরাদ্দের মাধ্যমে এ ব্যয় মেটানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। নথির তথ্য অনুযায়ী, মূল যুদ্ধবিমানের দামের বাইরে বৈমানিক ও প্রকৌশলীদের দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষণ, অপারেশনাল সামগ্রী, কারিগরি ও লজিস্টিক সহায়তা এবং ফ্রেইট বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৮৮ মিলিয়ন ডলার। ভ্যাট, বিমা ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামোগত পূর্তকাজে আরও ১৫৮ মিলিয়ন ডলার এবং অতিরিক্ত জ্বালানি ট্যাংকের জন্য ২ দশমিক ২৮ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে।
জে-১০সিই বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, রাফালকে ৪ দশমিক ৫ প্রজন্মের অত্যন্ত আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রাফালের বিরুদ্ধে চীনের জে-১০সি যুদ্ধবিমান সফল পারফরম্যান্স দেখিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে সমমানের ইউরোপীয় যুদ্ধবিমানের তুলনায় চীনা যুদ্ধবিমানের দাম কম বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার এবং ইউএভি ড্রোন সিস্টেম সংগ্রহের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। জে-১০সিই সংগ্রহের উদ্যোগের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আলোচনা। ২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বেইজিং সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে বহুমাত্রিক যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
পরে বিমানবাহিনী প্রধানকে প্রধান করে ১১ সদস্যের একটি আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়। এরপর ক্রয়প্রক্রিয়া আরও গতি পায়। চলতি বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের প্রাক্কালে চীনের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনা চালায়। চীনের তৈরি একক ইঞ্জিন ও একক আসনের জে-১০সি যুদ্ধবিমানের রপ্তানি সংস্করণ হলো জে-১০সিই।
সুপারসনিক গতির এ যুদ্ধবিমান আকাশযুদ্ধের পাশাপাশি স্থল ও সমুদ্রের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা, নজরদারি এবং শত্রুর রাডার ব্যবস্থায় আঘাত হানার মতো বিভিন্ন মিশনে ব্যবহারের জন্য তৈরি। দূরপাল্লার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতার পাশাপাশি ড্রোনের সঙ্গে সমন্বয় করেও অভিযান পরিচালনা করতে পারে বিমানটি।




















