গরুর মাংসের সঙ্গে ঘোড়ার মাংস মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা বাজারের ফাইসাল হোটেল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অভিযোগের পর হোটেলটিতে অভিযান চালিয়ে কাঁচা ও রান্না করা মাংসের নমুনা সংগ্রহ করেছে উপজেলা প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ। তবে ঘোড়ার মাংস বিক্রির অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন হোটেল মালিক মো. ফাইসাল। বরং কেউ অভিযোগটি প্রমাণ করতে পারলে তাকে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার পাশাপাশি হোটেল বন্ধ করে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) পবা উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা নওহাটা বাজারের ফাইসাল হোটেল পরিদর্শন করেন। এ সময় হোটেল থেকে বিভিন্ন ধরনের কাঁচা ও রান্না করা মাংসের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নমুনাগুলো পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হবে। পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পরই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এর আগে সোমবার ফেসবুকে ১৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে ফাইসাল হোটেলে মানুষের ভিড় এবং কর্মচারীদের মাংস রান্না করতে দেখা যায়। ভিডিওটির সঙ্গে দেওয়া ক্যাপশনে দাবি করা হয়, সেখানে গরুর মাংসের সঙ্গে ঘোড়ার মাংস মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইবনুল আবেদীনের নেতৃত্বে প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা হোটেলটি পরিদর্শন করেন।
ইউএনও ইবনুল আবেদীন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাইসাল হোটেলের কালাভুনায় গরুর মাংসের সঙ্গে ঘোড়ার মাংস মেশানোর অভিযোগসংক্রান্ত একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে হোটেল পরিদর্শন করে কাঁচা ও রান্না করা মাংসের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর অভিযোগের সত্যতা জানা যাবে। অভিযোগ সত্য হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আর সত্যতা না মিললে অপপ্রচারের বিষয়টিও তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ভেটেরিনারি সার্জন সোহরাব খান জানান, সংগৃহীত নমুনা ঢাকার সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরিতে (সিডিআইএল) পাঠানো হবে। পরীক্ষার মাধ্যমে মাংসটি গরুর নাকি অন্য কোনো প্রাণীর—তা শনাক্ত করা সম্ভব। সাধারণত পরীক্ষার ফল পেতে চার-পাঁচ দিন সময় লাগে।
বিশেষ ক্ষেত্রে এক সপ্তাহও লাগতে পারে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ বলেন, শুধু ফাইসাল হোটেল নয়, নওহাটা এলাকার অন্যান্য মাংস বিক্রেতা ও কসাইদের বিষয়েও তথ্য নেওয়া হচ্ছে। মাংস কোথা থেকে আসছে এবং কারা সরবরাহ করছে—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় থাকবে। পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী নিয়মিত তদারকি করা হবে।
অভিযোগের বিষয়ে হোটেল মালিক মো. ফাইসাল বলেন, তাঁদের এলাকায় ঘোড়ার মাংস বিক্রির প্রশ্নই ওঠে না। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে তাঁদের হোটেলের সুনাম নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ফাইসাল বলেন, ‘কেউ যদি প্রমাণ করতে পারে যে আমি কখনো ঘোড়ার মাংস মিশিয়ে বিক্রি করেছি, তাহলে তাকে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার দেব এবং দোকান একেবারে বন্ধ করে দেব।
’ তার বাবা জাফর আলীও অভিযোগটিকে গুজব বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, তাদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। সুনাম নষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এমন প্রচার চালানো হয়েছে। তারাও তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসুক বলে চান। প্রায় অর্ধশত বছর আগে নওহাটা ব্রিজের পাশে ছোট একটি দোকানের মাধ্যমে ফাইসাল হোটেলের যাত্রা শুরু।
ফাইসালের দাদা বছির আলী সেখানে রুটি ও সবজির ঘাঁটি বিক্রি করতেন। পরে তারা ছেলে জাফর আলী ব্যবসার দায়িত্ব নেন। সময়ের সঙ্গে রুটি বিক্রি বন্ধ করে ভাতের সঙ্গে গরু, খাসি, মুরগি ও হাঁসের মাংস বিক্রি শুরু হয়। এর মধ্যে গরুর ভাজা মাংসই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ২০১০ সালের দিকে বাবার সঙ্গে ব্যবসায় যুক্ত হন ফাইসাল। তার দাবি, বর্তমানে হোটেলে প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কেজি রান্না করা মাংস বিক্রি হয়।
প্রতিদিন সেখানে খাবার খান প্রায় ৭০০ থেকে ১ হাজার মানুষ। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগের ঘটনায় পবা থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন ফাইসাল। পবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মতিন বলেন, অভিযোগটি সত্য না মিথ্যা, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে গুজব ছড়িয়ে হোটেলের সুনামহানির অভিযোগে ফাইসাল একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। এখন প্রশাসনের সংগ্রহ করা মাংসের নমুনার পরীক্ষার ফলের দিকেই তাকিয়ে আছেন হোটেল মালিক, স্থানীয় বাসিন্দা ও ভোজনরসিকেরা। পরীক্ষার প্রতিবেদনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেবে।


















