আজ রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
৮ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৮°C
সর্বোচ্চ: ৩৩°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯৮%

অনলাইন কেনাকাটায় নকল পণ্যের প্রতারণা থেকে সাবধান

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:31:08 pm, Sunday, 23 August 2026
  • 4

অনলাইন কেনাকাটায় নকল পণ্যের প্রতারণা থেকে সাবধান

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

প্রযুক্তি মানুষের কেনাকাটাকে সহজ করে দিয়েছে। আগে পণ্য কিনতে ক্রেতাকে যেতে হতো বাজারে। এখন পণ্য নিজেই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেতার মোবাইল ফোন হয়ে ঘরের দরজায় হাজির হচ্ছে। কিন্তু এই আধুনিক প্রযুক্তিই নকল পণ্যের ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন এক অদৃশ্য বাজার তৈরি করেছে।

ফেসবুকের নিউজ ফিডে ভেসে উঠছে- আজকের অফার, অরিজিনাল প্রোডাক্ট, বিদেশ থেকে আনা- এই কথাগুলো। কিন্তু এর আড়ালে কী আছে, তা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না। বাজারে যে পণ্য নেই, সেটিই হয়তো আপনার দরজায় পৌঁছে যাচ্ছে চকচকে মোড়কে, পরিচিত ব্র্যান্ডের নামে; আর ভেতরে থাকছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু। ফেসবুক থেকে আপনার ঘর পর্যন্ত নকল পণ্যের এই যাত্রাপথ এখন আর শুধু ভোক্তা প্রতারণার গল্প নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থাপনার জন্যও একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু অধিকাংশ ক্রেতাই বুঝে উঠতে পারছেন না, অনলাইন বাজার যত বড় হবে, ততই বেশি প্রয়োজন হবে, বিক্রেতার পরিচয়, পণ্যের উৎস এবং বিজ্ঞাপনের সত্যতা নিশ্চিত করা। একসময় নকল পণ্যের বাজার বলতে বোঝানো হতো ফুটপাত, গলির ভেতরের দোকান কিংবা সীমান্তঘেঁষা কোনো অঘোষিত বাজারকে। আর নকল পণ্যের দুটো বড় বাজার হিসেবে পরিচিত ছিল পুরান ঢাকার চকবাজার এবং নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা।

এখন সেই বাজার চলে এসেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। একটি স্মার্টফোন, ফেসবুক অ্যাকাউন্ট কিংবা অনলাইন শপের পেজ। তাতেই খোলা হচ্ছে হাজার হাজার দোকান। স্ক্রল করতে করতে চোখে পড়ে বিশ্বখ্যাত প্রসাধনী, বিদেশি পারফিউম, শিশুদের খাদ্যপণ্য, ওজন কমানোর ওষুধ, ভিটামিন, ইলেকট্রনিকস সামগ্রী, মোবাইল ফোনের আনুষঙ্গিক পণ্য কিংবা নামি ব্র্যান্ডের পোশাক।

সবই অরিজিনাল-ইমপোর্টেড-স্টক ক্লিয়ারেন্স অথবা ১০০ শতাংশ জেনুইন বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে পণ্য দেশের প্রতিষ্ঠিত বাজারে পাওয়া যায় না, অনুমোদিত পরিবেশক বা ব্র্যান্ডের শোরুমেও নেই, সেটি হঠাৎ শত শত ফেসবুক পেজে পাওয়া যাচ্ছে কেমন করে?

অনলাইনভিত্তিক কেনাবেচার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে নকল ও সন্দেহজনক পণ্যের একটি সমান্তরাল বাজার গড়ে উঠছে বলে অভিযোগ উঠছে; বিশেষ করে ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটপ্লেস ব্যবহার করে পরিচিত দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের নাম ও লোগো লাগিয়ে পণ্য বিক্রির প্রবণতা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি পেজ বন্ধ হলে নতুন নামে আরেকটি পেজ খুলে একই ব্যবসা চলছে।

ফলে প্রতারিত গ্রাহক যেমন প্রতিকার পাচ্ছেন না, তেমনি নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্যও এসব বিক্রেতাকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বাজারে নেই, অনলাইনে অরিজিনাল এমন অনেক বিদেশি ব্র্যান্ডের স্কিন কেয়ার পণ্য রয়েছে, যেগুলো রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত শপিং মল কিংবা প্রতিষ্ঠিত কসমেটিকসের দোকানে খোঁজ করেও পাওয়া যায় না। অথচ ফেসবুকের সার্চ বক্সে নাম লিখলেই পাওয়া যায় কয়েক ডজন পেজ।

কোথাও লেখা সরাসরি ইউএসএ থেকে আনা, কোথাও ‘কোরিয়ান অরিজিনাল’, আবার কোথাও ডিউটি ফ্রি শপের পণ্য। দামও চমকপ্রদ- বাজারমূল্যের অর্ধেক, কখনো তার চেয়েও কম। শুধু প্রসাধনী নয়, একই অবস্থা স্বাস্থ্য ও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও। ওজন কমানো, যৌনক্ষমতা বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, চুল গজানো কিংবা ত্বক ফর্সা করার নামে বিক্রি হচ্ছে নানা ধরনের ক্যাপসুল, সিরাপ, পাউডার ও ক্রিম।

বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হচ্ছে বিদেশি চিকিৎসক, গবেষণাগার কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ছবি। কিন্তু পণ্যের উৎপাদক, আমদানিকারক, অনুমোদন বা উপাদান সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না। একইভাবে নামি ব্র্যান্ডের ইয়ারবাড, স্মার্টওয়াচ, চার্জার, পাওয়ার ব্যাংক ও অন্যান্য ইলেকট্রনিকস পণ্য অরিজিনাল দাবি করে বিক্রি হচ্ছে অস্বাভাবিক কম দামে।

হাতে পাওয়ার পর দেখা যায়, প্যাকেটের গায়ে ব্র্যান্ডের নাম থাকলেও পণ্যের মান সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক সময় নকল প্যাকেজিং এতটাই নিখুঁত হয় যে সাধারণ ক্রেতার পক্ষে আসল-নকল শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অফিশিয়াল পেজ নামের আরেক ফাঁদ অনলাইন ব্যবসায় সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তির জায়গাগুলোর একটি হলো অফিশিয়াল শব্দের ব্যবহার। কোনো ব্র্যান্ডের নামের সঙ্গে ইংরেজিতে বাংলাদেশ অফিশিয়াল, অফিশিয়াল স্টোর কিংবা অরিজিনাল বিডি বা অথরাইজড সেলার যুক্ত করে খোলা হচ্ছে পেজ ও ওয়েবসাইট।

নাম ও লোগো দেখে অনেক ক্রেতাই ধরে নিচ্ছেন, এটি সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ডের অনুমোদিত বিক্রেতা। কিন্তু বাস্তবে মিলবে ভিন্ন তথ্য। ওই পেজের সঙ্গে ব্র্যান্ডটির কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সেটি যাচাই করার সুযোগ বা অভ্যাস অধিকাংশ ক্রেতার নেই। পেজে কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ অনুসারী, আকর্ষণীয় ছবি এবং কিছু ইতিবাচক রিভিউ থাকলেই তৈরি হয় বিশ্বাসযোগ্যতা।

আর এই বিশ্বাসেরই সুযোগ নিচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। অনেক অনলাইন বিক্রেতা ক্যাশ অন ডেলিভারির সুবিধা দিলেও পণ্য হাতে পাওয়ার আগে খুলে দেখার সুযোগ দেন না। আর বাহক বেচারা পাঠাও বা অন্য কোনো সংস্থার লোক। তিনি শুধু বহনকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। টাকা পরিশোধের পর প্যাকেট খুলে পণ্য নকল বা নিম্নমানের মনে হলে শুরু হয় নতুন ভোগান্তি।

বিক্রেতার ফোন বন্ধ, ইনবক্সে প্রশ্নের উত্তর নেই, পেজের নাম পরিবর্তন। কখনো কখনো পুরো পেজই উধাও। নকলের কারখানা থেকে ডিজিটাল শোরুম সংশ্লিষ্টদের মতে, নকল পণ্যের ব্যবসায় এখন আর শুধু উৎপাদন ও সরবরাহের বিষয় নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা। পণ্যের আকর্ষণীয় ছবি, বিদেশি মডেল, ভুয়া বিফোর-আফটার ছবি, কৃত্রিম রিভিউ এবং অর্থের বিনিময়ে বিজ্ঞাপন- সব মিলিয়ে একটি সাধারণ পণ্যকেও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে।

কিছু ক্ষেত্রে একই পণ্য ভিন্ন ভিন্ন ব্র্যান্ডের মোড়কে বিক্রি হচ্ছে। একটি অজ্ঞাত উৎসের ক্রিমের গায়ে একদিন কোরিয়ান ব্র্যান্ডের স্টিকার, তো পরদিন ইউরোপীয় কোনো ব্র্যান্ডের লেবেল। সাধারণ গ্রাহকের পক্ষে এর উৎস অনুসন্ধান করা প্রায় অসম্ভব। আর এখানেই অনলাইন বাজারের সবচেয়ে বড় সুবিধা নিচ্ছে প্রতারকচক্র। একটি দোকান খুলতে যেমন নির্দিষ্ট ঠিকানা, ভাড়া, কর্মচারী ও দৃশ্যমান অস্তিত্ব প্রয়োজন, ফেসবুকের দোকানে তার কিছুই বাধ্যতামূলক নয়।

একটি মোবাইল নম্বর, কয়েকটি ছবি এবং একটি পেমেন্ট-ব্যবস্থা থাকলেই ব্যবসা শুরু। শুধু টাকা নয়, ঝুঁকিতে স্বাস্থ্যও নকল প্রসাধনী বা ইলেকট্রনিকস পণ্য কিনে আর্থিক ক্ষতি হওয়া একধরনের সমস্যা। কিন্তু নকল ওষুধ, খাদ্যপণ্য ও স্বাস্থ্যসামগ্রীর ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও ভয়াবহ। অজানা উপাদানে তৈরি স্লিমিং পাউডার, ভিটামিন, যৌনক্ষমতা বৃদ্ধির ওষুধ কিংবা ত্বকের ক্রিম শরীরে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, সে বিষয়ে ক্রেতাদের অধিকাংশই জানেন না।

নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সানোয়ার হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, কোনো স্বাস্থ্যপণ্য বা ওষুধের উৎস, অনুমোদন, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ এবং উপাদান নিশ্চিত না হয়ে তা ব্যবহার করা বিপজ্জনক হতে পারে; বিশেষ করে অনলাইনে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ম্যাজিক ফল পাওয়ার বিজ্ঞাপন মানুষের দুর্বলতাকে পুঁজি করে ব্যবসার সুযোগ তৈরি করছে।

তিনি নিজেও এ ধরনের অসংখ্য রোগী পাচ্ছেন, যারা অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেখে ওষুধ কিনে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অধ্যাপক সানোয়ার হোসেনের মতে, অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রে বিক্রেতার প্রকৃত পরিচয় ও ব্যবসায়িক ঠিকানা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পণ্যের বিজ্ঞাপনে অরিজিনাল, ইমপোর্টেড বা অনুমোদিত শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে জবাবদিহি থাকতে হবে।

অন্যথায় একটি পেজ বন্ধ হলেও নতুন নামে একই ব্যবসা চলতেই থাকবে। নিয়ন্ত্রণের বাইরে কত পেজ বাংলাদেশ ভোক্তা অধিকার সংস্থার কর্মকর্তা রেজাউল হাসানি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, মান নিয়ন্ত্রণ, ঔষধ প্রশাসন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্ব থাকলেও অনলাইন বাজারের বিশাল অংশ এখনো কার্যকর নজরদারির বাইরে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আসলে কোন পেজে কী পণ্য বিক্রি হচ্ছে, এর উৎস কোথায়, আমদানির কাগজপত্র ও ব্র্যান্ডের অনুমোদন আছে কি না- এসব বিষয়ে সমন্বিত ও নিয়মিত নজরদারির অভাব রয়েছে। অভিযান চালিয়ে কয়েকটি পেজ বা প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হলেও পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। আসলে সচেতন হতে হবে ক্রেতাদের। যেসব প্রতিষ্ঠান শুধু ফেসবুকে বা অনলাইনে সীমাবদ্ধ, যাদের প্রতিষ্ঠানের কোনো বাস্তব উপস্থিতি বা ঠিকানা নেই, তাদের পরিহার করা উচিত; বিশেষ করে খাদ্য বা ওষুধজাতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে এটা খুবই জরুরি।

কীভাবে বুঝবেন আসল-নকল বাংলাদেশ কসমেটিক ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজি আলতাফ হোসেন বলেন, ক্রেতাদের আরও সচেতন হতে হবে। শুধু পেজের ফলোয়ার, রিভিউ বা বিজ্ঞাপন দেখে পণ্য কেনা নিরাপদ নয়। ব্র্যান্ডটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে অনুমোদিত বিক্রেতার তালিকা আছে কি না, পণ্যের উৎপাদক ও আমদানিকারকের নাম-ঠিকানা দেওয়া আছে কি না, দাম অস্বাভাবিক কম কি না, এসব বিষয় যাচাই করা জরুরি; বিশেষ করে ওষুধ, শিশুখাদ্য, খাদ্যপণ্য ও শরীরে ব্যবহারযোগ্য প্রসাধনী কেনার ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রয়োজন।

সন্দেহজনক পণ্য হাতে এলে ছবি, চালান ও বিক্রেতার তথ্য সংরক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অনেকেই সেটা করেন না। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে বৈধভাবে আমদানি হয় না এমন অনেক পণ্য অনলাইনে পাওয়া যায়। এর প্রায় সবই নকল। অথচ বাজারে মন্দ কথা শুনতে হয় তাদের মতো আমদানিকারক আর ব্যবসায়ীদের। খেলনা বা শৌখিন সামগ্রী হলে ভিন্ন কথা; কিন্তু ওষুধ বা প্রসাধনসামগ্রী কেনার আগে ক্রেতার অধিকতর সচেতন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

পাশাপাশি কেউ প্রতারিত হলে পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগকে জানানোর পরামর্শ দেন তিনি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় নিহত ১০ শ্রমিকের পরিবার পেল আর্থিক সহায়তা

অনলাইন কেনাকাটায় নকল পণ্যের প্রতারণা থেকে সাবধান

Update Time : 10:31:08 pm, Sunday, 23 August 2026

প্রযুক্তি মানুষের কেনাকাটাকে সহজ করে দিয়েছে। আগে পণ্য কিনতে ক্রেতাকে যেতে হতো বাজারে। এখন পণ্য নিজেই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেতার মোবাইল ফোন হয়ে ঘরের দরজায় হাজির হচ্ছে। কিন্তু এই আধুনিক প্রযুক্তিই নকল পণ্যের ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন এক অদৃশ্য বাজার তৈরি করেছে।

ফেসবুকের নিউজ ফিডে ভেসে উঠছে- আজকের অফার, অরিজিনাল প্রোডাক্ট, বিদেশ থেকে আনা- এই কথাগুলো। কিন্তু এর আড়ালে কী আছে, তা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না। বাজারে যে পণ্য নেই, সেটিই হয়তো আপনার দরজায় পৌঁছে যাচ্ছে চকচকে মোড়কে, পরিচিত ব্র্যান্ডের নামে; আর ভেতরে থাকছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু। ফেসবুক থেকে আপনার ঘর পর্যন্ত নকল পণ্যের এই যাত্রাপথ এখন আর শুধু ভোক্তা প্রতারণার গল্প নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থাপনার জন্যও একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু অধিকাংশ ক্রেতাই বুঝে উঠতে পারছেন না, অনলাইন বাজার যত বড় হবে, ততই বেশি প্রয়োজন হবে, বিক্রেতার পরিচয়, পণ্যের উৎস এবং বিজ্ঞাপনের সত্যতা নিশ্চিত করা। একসময় নকল পণ্যের বাজার বলতে বোঝানো হতো ফুটপাত, গলির ভেতরের দোকান কিংবা সীমান্তঘেঁষা কোনো অঘোষিত বাজারকে। আর নকল পণ্যের দুটো বড় বাজার হিসেবে পরিচিত ছিল পুরান ঢাকার চকবাজার এবং নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা।

এখন সেই বাজার চলে এসেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। একটি স্মার্টফোন, ফেসবুক অ্যাকাউন্ট কিংবা অনলাইন শপের পেজ। তাতেই খোলা হচ্ছে হাজার হাজার দোকান। স্ক্রল করতে করতে চোখে পড়ে বিশ্বখ্যাত প্রসাধনী, বিদেশি পারফিউম, শিশুদের খাদ্যপণ্য, ওজন কমানোর ওষুধ, ভিটামিন, ইলেকট্রনিকস সামগ্রী, মোবাইল ফোনের আনুষঙ্গিক পণ্য কিংবা নামি ব্র্যান্ডের পোশাক।

সবই অরিজিনাল-ইমপোর্টেড-স্টক ক্লিয়ারেন্স অথবা ১০০ শতাংশ জেনুইন বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে পণ্য দেশের প্রতিষ্ঠিত বাজারে পাওয়া যায় না, অনুমোদিত পরিবেশক বা ব্র্যান্ডের শোরুমেও নেই, সেটি হঠাৎ শত শত ফেসবুক পেজে পাওয়া যাচ্ছে কেমন করে?

অনলাইনভিত্তিক কেনাবেচার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে নকল ও সন্দেহজনক পণ্যের একটি সমান্তরাল বাজার গড়ে উঠছে বলে অভিযোগ উঠছে; বিশেষ করে ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটপ্লেস ব্যবহার করে পরিচিত দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের নাম ও লোগো লাগিয়ে পণ্য বিক্রির প্রবণতা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি পেজ বন্ধ হলে নতুন নামে আরেকটি পেজ খুলে একই ব্যবসা চলছে।

ফলে প্রতারিত গ্রাহক যেমন প্রতিকার পাচ্ছেন না, তেমনি নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্যও এসব বিক্রেতাকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বাজারে নেই, অনলাইনে অরিজিনাল এমন অনেক বিদেশি ব্র্যান্ডের স্কিন কেয়ার পণ্য রয়েছে, যেগুলো রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত শপিং মল কিংবা প্রতিষ্ঠিত কসমেটিকসের দোকানে খোঁজ করেও পাওয়া যায় না। অথচ ফেসবুকের সার্চ বক্সে নাম লিখলেই পাওয়া যায় কয়েক ডজন পেজ।

কোথাও লেখা সরাসরি ইউএসএ থেকে আনা, কোথাও ‘কোরিয়ান অরিজিনাল’, আবার কোথাও ডিউটি ফ্রি শপের পণ্য। দামও চমকপ্রদ- বাজারমূল্যের অর্ধেক, কখনো তার চেয়েও কম। শুধু প্রসাধনী নয়, একই অবস্থা স্বাস্থ্য ও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও। ওজন কমানো, যৌনক্ষমতা বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, চুল গজানো কিংবা ত্বক ফর্সা করার নামে বিক্রি হচ্ছে নানা ধরনের ক্যাপসুল, সিরাপ, পাউডার ও ক্রিম।

বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হচ্ছে বিদেশি চিকিৎসক, গবেষণাগার কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ছবি। কিন্তু পণ্যের উৎপাদক, আমদানিকারক, অনুমোদন বা উপাদান সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না। একইভাবে নামি ব্র্যান্ডের ইয়ারবাড, স্মার্টওয়াচ, চার্জার, পাওয়ার ব্যাংক ও অন্যান্য ইলেকট্রনিকস পণ্য অরিজিনাল দাবি করে বিক্রি হচ্ছে অস্বাভাবিক কম দামে।

হাতে পাওয়ার পর দেখা যায়, প্যাকেটের গায়ে ব্র্যান্ডের নাম থাকলেও পণ্যের মান সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক সময় নকল প্যাকেজিং এতটাই নিখুঁত হয় যে সাধারণ ক্রেতার পক্ষে আসল-নকল শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অফিশিয়াল পেজ নামের আরেক ফাঁদ অনলাইন ব্যবসায় সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তির জায়গাগুলোর একটি হলো অফিশিয়াল শব্দের ব্যবহার। কোনো ব্র্যান্ডের নামের সঙ্গে ইংরেজিতে বাংলাদেশ অফিশিয়াল, অফিশিয়াল স্টোর কিংবা অরিজিনাল বিডি বা অথরাইজড সেলার যুক্ত করে খোলা হচ্ছে পেজ ও ওয়েবসাইট।

নাম ও লোগো দেখে অনেক ক্রেতাই ধরে নিচ্ছেন, এটি সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ডের অনুমোদিত বিক্রেতা। কিন্তু বাস্তবে মিলবে ভিন্ন তথ্য। ওই পেজের সঙ্গে ব্র্যান্ডটির কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সেটি যাচাই করার সুযোগ বা অভ্যাস অধিকাংশ ক্রেতার নেই। পেজে কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ অনুসারী, আকর্ষণীয় ছবি এবং কিছু ইতিবাচক রিভিউ থাকলেই তৈরি হয় বিশ্বাসযোগ্যতা।

আর এই বিশ্বাসেরই সুযোগ নিচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। অনেক অনলাইন বিক্রেতা ক্যাশ অন ডেলিভারির সুবিধা দিলেও পণ্য হাতে পাওয়ার আগে খুলে দেখার সুযোগ দেন না। আর বাহক বেচারা পাঠাও বা অন্য কোনো সংস্থার লোক। তিনি শুধু বহনকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। টাকা পরিশোধের পর প্যাকেট খুলে পণ্য নকল বা নিম্নমানের মনে হলে শুরু হয় নতুন ভোগান্তি।

বিক্রেতার ফোন বন্ধ, ইনবক্সে প্রশ্নের উত্তর নেই, পেজের নাম পরিবর্তন। কখনো কখনো পুরো পেজই উধাও। নকলের কারখানা থেকে ডিজিটাল শোরুম সংশ্লিষ্টদের মতে, নকল পণ্যের ব্যবসায় এখন আর শুধু উৎপাদন ও সরবরাহের বিষয় নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা। পণ্যের আকর্ষণীয় ছবি, বিদেশি মডেল, ভুয়া বিফোর-আফটার ছবি, কৃত্রিম রিভিউ এবং অর্থের বিনিময়ে বিজ্ঞাপন- সব মিলিয়ে একটি সাধারণ পণ্যকেও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে।

কিছু ক্ষেত্রে একই পণ্য ভিন্ন ভিন্ন ব্র্যান্ডের মোড়কে বিক্রি হচ্ছে। একটি অজ্ঞাত উৎসের ক্রিমের গায়ে একদিন কোরিয়ান ব্র্যান্ডের স্টিকার, তো পরদিন ইউরোপীয় কোনো ব্র্যান্ডের লেবেল। সাধারণ গ্রাহকের পক্ষে এর উৎস অনুসন্ধান করা প্রায় অসম্ভব। আর এখানেই অনলাইন বাজারের সবচেয়ে বড় সুবিধা নিচ্ছে প্রতারকচক্র। একটি দোকান খুলতে যেমন নির্দিষ্ট ঠিকানা, ভাড়া, কর্মচারী ও দৃশ্যমান অস্তিত্ব প্রয়োজন, ফেসবুকের দোকানে তার কিছুই বাধ্যতামূলক নয়।

একটি মোবাইল নম্বর, কয়েকটি ছবি এবং একটি পেমেন্ট-ব্যবস্থা থাকলেই ব্যবসা শুরু। শুধু টাকা নয়, ঝুঁকিতে স্বাস্থ্যও নকল প্রসাধনী বা ইলেকট্রনিকস পণ্য কিনে আর্থিক ক্ষতি হওয়া একধরনের সমস্যা। কিন্তু নকল ওষুধ, খাদ্যপণ্য ও স্বাস্থ্যসামগ্রীর ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও ভয়াবহ। অজানা উপাদানে তৈরি স্লিমিং পাউডার, ভিটামিন, যৌনক্ষমতা বৃদ্ধির ওষুধ কিংবা ত্বকের ক্রিম শরীরে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, সে বিষয়ে ক্রেতাদের অধিকাংশই জানেন না।

নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সানোয়ার হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, কোনো স্বাস্থ্যপণ্য বা ওষুধের উৎস, অনুমোদন, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ এবং উপাদান নিশ্চিত না হয়ে তা ব্যবহার করা বিপজ্জনক হতে পারে; বিশেষ করে অনলাইনে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ম্যাজিক ফল পাওয়ার বিজ্ঞাপন মানুষের দুর্বলতাকে পুঁজি করে ব্যবসার সুযোগ তৈরি করছে।

তিনি নিজেও এ ধরনের অসংখ্য রোগী পাচ্ছেন, যারা অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেখে ওষুধ কিনে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অধ্যাপক সানোয়ার হোসেনের মতে, অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রে বিক্রেতার প্রকৃত পরিচয় ও ব্যবসায়িক ঠিকানা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পণ্যের বিজ্ঞাপনে অরিজিনাল, ইমপোর্টেড বা অনুমোদিত শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে জবাবদিহি থাকতে হবে।

অন্যথায় একটি পেজ বন্ধ হলেও নতুন নামে একই ব্যবসা চলতেই থাকবে। নিয়ন্ত্রণের বাইরে কত পেজ বাংলাদেশ ভোক্তা অধিকার সংস্থার কর্মকর্তা রেজাউল হাসানি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, মান নিয়ন্ত্রণ, ঔষধ প্রশাসন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্ব থাকলেও অনলাইন বাজারের বিশাল অংশ এখনো কার্যকর নজরদারির বাইরে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আসলে কোন পেজে কী পণ্য বিক্রি হচ্ছে, এর উৎস কোথায়, আমদানির কাগজপত্র ও ব্র্যান্ডের অনুমোদন আছে কি না- এসব বিষয়ে সমন্বিত ও নিয়মিত নজরদারির অভাব রয়েছে। অভিযান চালিয়ে কয়েকটি পেজ বা প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হলেও পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। আসলে সচেতন হতে হবে ক্রেতাদের। যেসব প্রতিষ্ঠান শুধু ফেসবুকে বা অনলাইনে সীমাবদ্ধ, যাদের প্রতিষ্ঠানের কোনো বাস্তব উপস্থিতি বা ঠিকানা নেই, তাদের পরিহার করা উচিত; বিশেষ করে খাদ্য বা ওষুধজাতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে এটা খুবই জরুরি।

কীভাবে বুঝবেন আসল-নকল বাংলাদেশ কসমেটিক ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজি আলতাফ হোসেন বলেন, ক্রেতাদের আরও সচেতন হতে হবে। শুধু পেজের ফলোয়ার, রিভিউ বা বিজ্ঞাপন দেখে পণ্য কেনা নিরাপদ নয়। ব্র্যান্ডটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে অনুমোদিত বিক্রেতার তালিকা আছে কি না, পণ্যের উৎপাদক ও আমদানিকারকের নাম-ঠিকানা দেওয়া আছে কি না, দাম অস্বাভাবিক কম কি না, এসব বিষয় যাচাই করা জরুরি; বিশেষ করে ওষুধ, শিশুখাদ্য, খাদ্যপণ্য ও শরীরে ব্যবহারযোগ্য প্রসাধনী কেনার ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রয়োজন।

সন্দেহজনক পণ্য হাতে এলে ছবি, চালান ও বিক্রেতার তথ্য সংরক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অনেকেই সেটা করেন না। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে বৈধভাবে আমদানি হয় না এমন অনেক পণ্য অনলাইনে পাওয়া যায়। এর প্রায় সবই নকল। অথচ বাজারে মন্দ কথা শুনতে হয় তাদের মতো আমদানিকারক আর ব্যবসায়ীদের। খেলনা বা শৌখিন সামগ্রী হলে ভিন্ন কথা; কিন্তু ওষুধ বা প্রসাধনসামগ্রী কেনার আগে ক্রেতার অধিকতর সচেতন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

পাশাপাশি কেউ প্রতারিত হলে পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগকে জানানোর পরামর্শ দেন তিনি।