নোয়াখালীর ভানুয়াই মিয়াবাড়িতে একসময় কষ্টের জীবন কাটানো মনিরুল ইসলাম আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। হাজার কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়ার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিদেশে ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ পাচারের মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুসারে, মনিরুল ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের ‘ক্যাশিয়ার’। তাদের টাকা বিদেশে পাচারের অন্যতম কারিগর। এসব অপকর্ম থেকেই খুলে যায় তার ভাগ্য। আবাস গড়েন রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে। অভিযোগ রয়েছে, মূল মালিককে ‘আত্মহত্যায় প্ররোচিত’ করে তিনি দখলে নেন ৩৫০০ বর্গফুটের এক বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট।
এটি গুলশানের ৬০ নম্বর সড়কের ১৩/বি নম্বর বাড়ির দ্বিতীয় তলায়। ভবনটির নাম ভিআইপি পিনাকেল। বর্তমানে মনিরুলের ছেলেমেয়েরা সবাই নামিদামি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে। সম্প্রতি মনিরুলের বিদেশে অর্থ পাচারের তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। শুধু তা-ই নয়, তার বিরুদ্ধে এসব দপ্তরে জমেছে অভিযোগের পাহাড়।
এসব কাগজ এসেছে রূপালী বাংলাদেশের হাতে। জানা যায়, নুন আনতে পান্তা ফুরানো অবস্থা থেকে মনিরুলের উত্থান আওয়ামী আমলে। এর পেছনে ছিল মূলত হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার, সুদের কারবার, চাঁদাবাজি, জমি দখল ও সিন্ডিকেট বাণিজ্য। এ ছাড়া এমন কোনো অপকর্ম নেই যা তিনি করেননি। এমনকি টাকার জন্য মানুষ খুন করাও তার কাছে ডালভাত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
মনিরুলের ত্রাসের রাজত্বে কেউ অভিযোগ করার সাহস পেতেন না। আর সাহস করে অভিযোগ দিলেও তা আমলে নেয়নি হাসিনা সরকার। অভিযোগ অনুসারে, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ‘ক্যাশিয়ার’ ছিলেন মনিরুল।
এই প্রভাবশালীদের মধ্যে ছিলেন— আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদ, শহীদুল হক ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, ফারস গ্রুপের চেয়ারম্যান আকরাম হোসেন হুমায়ুন, প্রিমিয়ার লিজিংয়ের সাবেক পরিচালক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন, সোনাইমুড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মনিরুল ইসলাম বকুল, সাবেক এএসপি মোয়াজ্জেম, হুন্ডি কারবারির সহযোগী ও রক্ষাকবচ সোনাইমুড়ী উপজেলার অ্যাডমিন অফিসার সিদ্দিকুর রহমান ও অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহমান।
তাদের প্রশ্রয় ও সহায়তাতেই মনিরুল তার অপকর্ম চালিয়ে গেছেন নির্বিঘ্নে। তথ্য অনুসারে, গাজীপুরের বাঘেরবাজারে ২০ বিঘা জমি, নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে কয়েকশ বিঘা জমি, তেজগাঁও শিল্প এলাকায় ১০ কাঠা জমি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ১০ কাঠা জমি, পূর্বাচলে ১০ কাঠা জমি, মোহাম্মদপুরের ঢাকা হাউজিংয়ে ৫ কাঠা জমি, মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানে ৫ কাঠা জমি ও নারায়ণগঞ্জে ৫ কাঠা জমির মালিক মনিরুল।
এ ছাড়া শাহবাগের আজিজ কো-অপারেটিভে ফ্ল্যাট, মিরপুরে বহুতল ভবন, বংশালের আগা মসিহ লেনে বহুতল ভবন, নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে একাধিক বাণিজ্যিক ভবন, গুলশানের পুলিশ প্লাজায় দোকান, রাজধানীর বউবাজারে দোকান ছাড়াও তার নামে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে আছে কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকার স্থায়ী হিসাব। কথিত রয়েছে, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ির ‘অঘোষিত জমিদার’ এই মনিরুল।
এই এলাকার প্রায় অর্ধেক জমি তার দখলে। খাজা হোটেল, চৌধুরী মার্কেট, সাবেক এনাম ব্যাংক ভবন, অল স্কয়ার হাসপাতাল, সাবেক মিজান সুপার মার্কেট, ইস্টার্ন কলেজ, রেসিডেনসিয়াল স্কুল, লাইফ শাইন স্কুলসহ তার দখলে না থাকা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুবই কম। দুদকে দেওয়া অভিযোগে ভুক্তভোগীরা বলেন, মনিরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া ছিল জীবন বাজি রাখার শামিল।
আওয়ামী লীগ আমলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়ম করলেও তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার বা অভিযোগ করার সাহস পাননি। এর মধ্যেও কেউ কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের পড়তে হয়েছে নানা ধরনের বিপদ-বিড়ম্বনায়। ভুক্তভোগীরা আরও বলেন, সুদের ব্যবসা পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করে সুকৌশলে অনেক সাধারণ মানুষকে পথে বসিয়েছেন প্রতারক মনিরুল। শুধু তা-ই নয়, ভূমিদস্যুতা ও অবৈধ উপায়ে হুন্ডির লেনদেনেরও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক ছিলেন তিনি।
তার প্রতারণার ফাঁদে আর্থিকভাবে নিঃস্ব, হয়রানির শিকার ও সামাজিকভাবে অপমানিত হয়েছেন অনেক মানুষ। হাফিজ আহমেদ নামে এক ভুক্তভোগী রূপালী বাংলাদেশকে জানান, তিনি মনিরুল ইসলামের কাছ থেকে ৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ২০২২ সালে সুদসহ প্রায় ১৮ কোটি টাকা ফেরত দিলেও অবৈধভাবে সম্পূর্ণ ব্যবসা দখলের জন্য মিথ্যা মামলা ও হুমকি দিচ্ছেন মনিরুল।
এর প্রেক্ষাপটে হাফিজ আহমেদ একটি মামলা করেছেন। কিন্তু তাতেও সমস্যার কোনো সুরাহা হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো সময়ই হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার করেন মনিরুল। পাচার টাকার গন্তব্য— যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। পাচার অর্থের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
বিভিন্ন মানুষের অর্থ লুট ও জমি দখল করতে নিজস্ব ক্যাডার বাহিনীও তৈরি করেছিলেন মনিরুল। বাহিনীর নাম ছিল ‘টক্কা গ্রুপ’। এই গ্রুপ এমন কোনো অপকর্ম নেই যা করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। গাজীপুরের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ‘টিউলিপ টেরিটোরির’ প্রধান মধ্যস্থতাকারী ছিলেন মনিরুল। প্রতারণার মাধ্যমে জমি দখলেও সিদ্ধহস্ত তিনি।
গাজীপুর জেলার এক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে জমি দখল করে এখনো ভোগদখল করে চলেছেন মনিরুল। রূপালী বাংলাদেশের হাতে আসা একটি কাগজের মাধ্যমে জানা যায়, গাজীপুরের আরএস ৫০৭০ নম্বর দাগে ৫৪ শতাংশ জমি মনিরুল জোর করে দখল করে নিজের কব্জায় রেখেছেন। আওয়ামী সরকারের পতনের পর ওই জমির মালিক মামলা করেছেন মনিরুলের বিরুদ্ধে। একই জেলার ভবানীপুর মৌজার আরএস দাগ নং ৫০৭০ থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকারি কোষাগারের টাকা আত্মসাৎ করেন প্রতারক মনিরুল।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন স্থানীয়রা। অবৈধ নিলামেও ছিল মনিরুলের ভূমিকা। অভিযোগ আছে, তিনি বিচারাধীন অবস্থায় ও হাইকোর্টের আদেশ থাকা সত্ত্বেও এক ভুক্তভোগীর বাড়ি-জমি বেআইনিভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন, যা সরাসরি ২০০৩ সালের অর্থঋণ আদালত আইনের লঙ্ঘন। সূত্র জানায়, এমন কর্মকাণ্ডে আগে থেকেই অভ্যস্ত মনিরুল। প্রায় এক যুগ আগে জোর খাটিয়ে তিনি গুলশান-২-এর এক ব্যবসায়ীর বাড়ি দখল করেন।
পরে সেই ব্যবসায়ী সব হারিয়ে লজ্জা-অপমানে আত্মহত্যা করেন। মনিরুলের এসব অপকর্মের মূল পুঁজি ছিল ভয়ের সংস্কৃতি, হয়রানি ও মামলায় জড়ানো। অনেক ভুক্তভোগী ‘টক্কা গ্রুপে’র হুমকি থেকে রক্ষা পেতে থানায় জিডি করেছেন। অভিযোগ আছে, তেমন ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তি নয়, অভিযোগকারীর পুরো পরিবারকেই টার্গেট করত মনিরুল ও তার গ্রুপ। করা হতো হয়রানি, দেওয়া হতো মিথ্যা মামলা।
ভুক্তভোগীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সরকারের উচিত মনিরুলের ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তি ও পাসপোর্ট জব্দ করা। জমি দখলসংক্রান্ত মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, অবৈধ সুদের তদন্ত করে মামলা ও ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ ছাড়া দুদক, এনবিআর ও বিএফআইইউর সমন্বয়ে যৌথ অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে শাস্তির আওতায় আনা উচিত মনিরুলকে।
এসব বিষয়ে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। এনবিআর, বিএফআইইউ কিছু তথ্য চেয়েছে তার ব্যাপারে। আমরা সেগুলো তৈরি করছি। ’ এদিকে নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন মনিরুল ইসলাম। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘আমি একজন ব্যবসায়ী।
আমি স্পষ্টভাবে জানাচ্ছি, আমি কখনো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কিংবা এর কোনো অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠনের কোনো পদ-পদবি ধারণ করিনি এবং সমর্থনও করিনি। আমরা বিরুদ্ধে আনা ২০ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অবমাননাকর। আমি কোনো অর্থ পাচার, হুন্ডি বা অবৈধ অর্থ স্থানান্তরের সঙ্গে জড়িত নই।
কখনো জড়িতও ছিলাম না। আমার বিরুদ্ধে কর ফাঁকি, চাঁদাবাজি, জমি দখল, সুদের কারবার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। ’ সে ক্ষেত্রে রূপালী বাংলাদেশের হাতে আসা কাগজপত্রও মিথ্যা কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কেউ আমাকে ফাঁসাতে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।



















